বোর্ডরুমের বাইরে...
রাফির সহকারী আবার বলল,
— "স্যার, মেহরিন ম্যাডাম আপনার সঙ্গে একবার কথা বলতে চান।"
রাফি কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
বহু বছর পর...
যে মানুষটার জন্য সে একসময় রাতের পর রাত ঘুমাতে পারেনি, আজ সেই মানুষটাই তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।
সে ধীরে ধীরে বলল,
— "তাকে ভেতরে আসতে বলুন।"
কয়েক মুহূর্ত পর...
মেহরিন দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
হালকা রঙের শাড়ি পরা।
চোখ দুটো লাল।
মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছে।
দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু কেউ কোনো কথা বলতে পারল না।
শেষ পর্যন্ত মেহরিনই নীরবতা ভাঙল।
— "কেমন আছো, রাফি?"
রাফি মৃদু হেসে বলল,
— "আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। তুমি?"
মেহরিন নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "ভালো থাকার অভিনয় করছি।"
রাফি কিছু বলল না।
তার সামনে বসে থাকা মানুষটা সেই আগের মেহরিন নয়।
চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।
মুখে হাসি নেই।
জীবন যেন তাকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছে।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর মেহরিন বলল,
— "তুমি কি আমাকে খুব ঘৃণা করো?"
রাফি জানালার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— "একটা সময় হয়তো কষ্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু ঘৃণা করিনি। ঘৃণা করলে মানুষ নিজেরই ক্ষতি করে।"
মেহরিনের চোখ আবার ভিজে উঠল।
— "সেদিন যদি আমি তোমার হাতটা না ছাড়তাম..."
রাফি তাকে থামিয়ে দিল।
— "অতীত বদলানো যায় না, মেহরিন।"
মেহরিন কাঁপা গলায় বলল,
— "আমি জানি। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে ভালোবাসতাম। পরিবারের ভয়ে সাহস পাইনি। আজ বুঝি, সেই ভয়ই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।"
রাফি গভীর শ্বাস নিল।
— "ভালোবাসা শুধু মুখে বলার বিষয় নয়। কঠিন সময়ে যে পাশে থাকে, সেই সত্যিকারের ভালোবাসে।"
এই কথাটা শুনে মেহরিন মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগল।
তার চোখের জল মেঝেতে পড়তে লাগল।
ঠিক তখনই মাহবুব রহমান ভেতরে এলেন।
তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
— "রাফি... একটা অনুরোধ করতে পারি?"
— "জি, আঙ্কেল।"
— "যদি সম্ভব হয়... আমাদের কোম্পানির পুরোনো কর্মচারীদের চাকরিগুলো যেন না যায়। তারা তো কোনো দোষ করেনি।"
রাফি এক মুহূর্তও দেরি করল না।
হাসিমুখে বলল,
— "আঙ্কেল, আমি কোম্পানি কিনছি, মানুষের রুটি কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়। একজন কর্মচারীকেও চাকরি হারাতে হবে না। বরং যারা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করবেন, তাদের বেতনও বাড়ানো হবে।"
মাহবুব রহমান স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
তিনি বললেন,
— "তুমি চাইলে আজ আমাদের পথে বসিয়ে দিতে পারতে।"
রাফি শান্তভাবে উত্তর দিল,
— "প্রতিশোধ নিয়ে জেতা যায় না, আঙ্কেল। মানুষকে ক্ষমা করে সামনে এগিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে বড় জয়।"
মেহরিন অবাক হয়ে রাফির দিকে তাকিয়ে রইল।
সে ভাবছিল—
আজ রাফি হয়তো তাদের অপমান করবে।
কিন্তু সে যা করল...
তা কল্পনারও বাইরে।
ঠিক তখনই রাফির ফোন বেজে উঠল।
ওপাশ থেকে তার মা বললেন,
— "বাবা, আজ সন্ধ্যায় একটু তাড়াতাড়ি বাসায় আসিস।"
— "কেন মা?"
মা হেসে বললেন,
— "তোর জন্য একটা মেয়ে দেখতে আসছে।"
রাফি হালকা হেসে বলল,
— "আচ্ছা মা, আমি সময়মতো চলে আসব।"
ফোন রেখে সে মেহরিনের দিকে তাকাল।
মেহরিন সব শুনেছে।
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে শূন্য হয়ে গেল।
সে বুঝে গেল...
আজ সত্যিই রাফিকে সে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেছে।
রাফি ধীরে ধীরে বলল,
— "আল্লাহ তোমার জীবন সহজ করে দিন, মেহরিন। ভালো থেকো।"
এই কথাটুকু বলেই সে বোর্ডরুম থেকে বেরিয়ে গেল।
মেহরিন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
চোখের সামনে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
আর তার মনে হলো...
আজ শুধু একটা দরজা নয়,
তার জীবনের শেষ আশাটাও চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।

0 Comments