"ছেলের বিছানার নিচে লুকানো ছিল ডজন ডজন চামচ-ছুরি, কিন্তু সত্যিটা জানার পর আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম"
রান্নাঘরের ড্রয়ারে রাখা চামচগুলো যখন একে একে হারিয়ে যেতে শুরু করল, প্রথমে আমি বিষয়টাকে খুব একটা গুরুত্ব দিইনি।
কারণ একটা-দুইটা চামচ হারানো আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের জন্য অস্বাভাবিক কিছু নয়।
কিন্তু যখন দেখলাম, যে ড্রয়ারে আগে প্রায় তিন ডজন চামচ থাকত, সেখানে মাত্র দুই-তিনটা পড়ে আছে—তখন সত্যিই অবাক হয়ে গেলাম।
আমি একজন গৃহিণী। সংসারের প্রতিটা জিনিস কোথায় আছে, সেটা আমার নখদর্পণে।
তাই শুরু করলাম খোঁজাখুঁজি।
রান্নাঘরের সব তাক খালি করলাম।
বাসন রাখার আলমারি দেখলাম।
ফ্রিজের পেছনে, খাটের নিচে, সোফার পাশে—সব জায়গায় খুঁজলাম।
এমনকি ময়লার ঝুড়িতেও দেখলাম।
কিন্তু কোনো চামচের দেখা পেলাম না।
শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে বাজার থেকে নতুন করে এক সেট স্টিলের চামচ কিনে আনলাম।
আমার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে রায়ানকে প্রথমে সন্দেহ হয়েছিল।
কারণ ওর মাঝে মাঝে ছোটখাটো জিনিস নিয়ে খেলার অভ্যাস ছিল।
কিন্তু যখনই আমি জিজ্ঞেস করতাম,
"রায়ান, তুমি কি চামচগুলো কোথাও রেখেছ?"
ওর মুখটা সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেত।
ও চোখ নিচু করে ফেলত, ঠোঁট চেপে ধরত, তারপর আস্তে করে মাথা নাড়ত।
কিন্তু ওর চেহারায় অপরাধবোধ ছিল না।
ছিল ভয়।
আমার স্বামী সজীব ঢাকার বাইরে নির্মাণকাজে চাকরি করতেন।
সকালেই বের হয়ে যেতেন, আর অনেক রাতে বাসায় ফিরতেন।
সারাদিন রোদে-ধুলায় কাজ করার কারণে শরীর একদম ভেঙে পড়ত।
তবুও একটা বিষয় কখনো বাদ দিতেন না।
প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে ছেলেকে নিজে বিছানায় শুইয়ে দিতেন।
গল্প বলতেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন।
তাই আমি কখনো ভাবিনি, এই হারানো চামচের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে।
দুই সপ্তাহ পর আমি নিজেকেই অদ্ভুত মনে হতে লাগল।
আমি একটা পাঁচ বছরের শিশুকে বারবার প্রশ্ন করছি, আর স্বামীকে বিরক্ত করছি কয়েকটা চামচের জন্য!
কিন্তু মনের ভেতর একটা অস্বস্তি থেকেই যাচ্ছিল।
সত্যিটা সামনে এলো এক শুক্রবার রাতে।
সজীবকে জরুরি কাজে তিন দিনের জন্য চট্টগ্রাম যেতে হলো।
তাই সেদিন রাতে রায়ানকে ঘুম পাড়ানোর দায়িত্ব আমার ছিল।
আমি ওকে গল্পের বই পড়ে শোনালাম।
কম্বল গায়ে দিয়ে দিলাম।
তারপর ওর পাশে বসে মাথায় হাত বুলাচ্ছিলাম।
হঠাৎ আমার হাতের নিচে কিছু একটা শক্ত জিনিস অনুভব করলাম।
বিছানাটা যেন সমান ছিল না।
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
প্রথমে ভাবলাম, হয়তো খাটের কোনো অংশ নষ্ট হয়েছে।
আমি রায়ানকে বললাম,
"বাবু, তুমি একটু পাশে দাঁড়াও তো।"
ও অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।
আমি ধীরে ধীরে গদি উঠালাম।
আর তখন যা দেখলাম, তাতে আমার পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
বিছানার নিচে সারি সারি করে সাজানো ছিল অসংখ্য চামচ।
কিছু ছিল আমাদের পুরোনো সেটের।
আর কিছু ছিল সেই নতুন সেটের, যেগুলো আমি কয়েকদিন আগেই কিনেছিলাম।
আমি কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলাম না।
তারপর রায়ানের দিকে তাকিয়ে বললাম,
"বাবু, তুমি এগুলো এখানে কেন রেখেছ? আমাকে বলোনি কেন?"
আমার কথা শুনেই ওর চোখে পানি চলে এলো।
ও কাঁদতে কাঁদতে বলল,
"মা, এগুলো নিয়ে যেও না।"
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
"কিন্তু কেন? এগুলো দিয়ে তুমি কী করবে?"
রায়ান নিচু গলায় বলল,
"এগুলো দরকার… বাবা আর আমার জন্য।"
আমার বুকের ভেতর কেমন একটা অজানা ভয় ঢুকে গেল।
আমি ওর সামনে বসে বললাম,
"বাবু, আমাকে সত্যিটা বলো। মা তোমাকে কখনো বকা দেবে না।"
রায়ান কান্নাভেজা চোখে বলল,
"বাবা বলেছে কাউকে বলতে নেই। এটা আমাদের গোপন কথা।"
আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।
সজীব?
সে কেন আমার পাঁচ বছরের ছেলেকে এমন কিছু লুকাতে বলবে?
আমি আর জোর করলাম না।
সব চামচ ঠিক যেভাবে ছিল, সেভাবেই রেখে দিলাম।
রায়ানকে আবার ঘুম পাড়িয়ে দিলাম।
তারপর ঘরের বাইরে এসে দরজা বন্ধ করে স্বামীকে ফোন করলাম।
অনেকবার রিং হওয়ার পর সে ফোন ধরল।
আমি কোনো ভূমিকা না করেই বললাম,
"সজীব, তুমি কি আমাকে বলতে পারবে আমাদের ছেলের বিছানার নিচে এতগুলো চামচ কেন লুকানো?"
ওপাশে কিছুক্ষণ কোনো শব্দ হলো না।
শুধু নীরবতা।
তারপর আমি আবার বললাম,
"আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম চামচগুলো কোথায় গেছে। তুমি বলেছিলে কিছু জানো না।"
কিছুক্ষণ পর সজীবের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
সে ধীরে ধীরে বলল,
"আমি তোমার কাছে সত্যিটা লুকিয়েছি… কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম তুমি আমাকে ভুল বুঝবে।"
আমি চুপ করে রইলাম।
তারপর সে যে কথা বলল, তা শুনে আমার চোখে পানি চলে এলো…
কারণ চামচগুলো চুরি করার পেছনে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না। বরং সজীব আর রায়ান মিলে এমন একটি কাজ করছিল, যেটা জানলে হয়তো আমি তাকে আরও বেশি ভালোবাসতাম…

0 Comments