আবার_এলো_যে_সন্ধ্যা

 

আবার_এলো_যে_সন্ধ্যা

রাতে চাচীর ডাক শুনতে পেলো।ভয়ে জেনির আত্না শুকিয়ে যাচ্ছিলো।আজকে ওর খবর আছে।অথচ ও তো শুধু শুধু এই কাজ করেনি।কিন্তু সেটাতো কাউকে বলতেও পারবেনা।এই ছেলেটা এত অ'*সভ্য কেনো?
কেমনভাবে জেনিকে ফাঁসিয়ে দিলো।এখন জেনির এমন করার কোনো কারণও ব্যাখ্যা করতে পারবেনা সে।ভয়ে ভয়ে জেনি বের হলো রুম থেকে।বের হয়ে দেখে চাচী বাইরে নেই,ঘরে চলে গেছে হয়তো।জেনি হাফ ছেড়ে বাঁচলো।চোখ বন্ধ করে যেই তাকাবে,দেখে স্মরণ সামনে দাঁড়িয়ে।একপায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে।এবার জেনির সত্যি অনুতাপ হতে লাগলো। অপরাধীর মত মুখ কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ।
স্মরণ একটা চেয়ার টান দিয়ে বসলো সামনে।
জেনি হুট করেই স্মরণকে বললো,
" আমি বুঝতে পারিনি আসলে,এমনি রাগে ছুঁ'*ড়ে মে'*রেছিলাম।সত্যি সত্যিই লেগে যাবে ভাবতে পারিনি। আমাকে মাফ করে দাও প্লিজ।তুমি এমন দুষ্টুমি না করলে তো আমি এমনটা করতাম না কখনো।তখন আমার মাথায় র'*ক্ত উঠে গেছিলো।স্মরণ কোনো কথা বলছেনা,চুপচাপ বসে আছে।সেটা দেখে জেনির আরো বেশি ভয় লাগছে।জেনি প্রায় কেঁদে দিবে,তখন স্মরণ বলতে লাগলো,
" মাফ করতে পারি, যদি দশবার কান ধরে উঠবস করো।"
জেনি এবারও বিস্ফোরিত চোখে তাকালো।তবে কোনো সাড়াশব্দ না করে,কান ধরে উঠবস করতে লাগলো। তখন তো এখনের মত এতো স্মার্টফোন ছিলো না, থাকলে নিশ্চিত ভিডিও করতো স্মরণ।গুণে গুণে দশবারই উঠবস করলো জেনি।স্কুলেও কোনোদিন কান ধরতে হয়নি,আর আজ?
জেনির মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ স্মরণের মায়া হলো।শাস্তিটা বোধহয় বেশিই হয়ে গেছে।পায়ে খুব বেশি লাগেনি,তবে ব্যাথা করছে অনেক।পা ফেলতে পারছেনা ঠিক মত।ব্যাথার মলম মালিশ করেছে অবশ্য।সেড়ে যাবে দুই-তিনদিনে।জেনি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিলো।হঠাৎ চোখ তুলে তাকিয়ে,সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নিলো।স্মরণের চোখের দিকে-ও তাকাতে পারছেনা অদ্ভুতভাবে।কেমন যেনো দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো স্মরণ।কোনো কিছু তো ছিল সেই দৃষ্টিতে।যেটা জেনিকে অপ্রস্তুুত করে তুলেছিলো।তবে আজ জেনি বুঝতে পারে,কিছুই ছিলো না সেই দৃষ্টিতে।সবটাই জেনির বুঝার ভুল ছিলো।এতে স্মরণের হয়তো কোনো দোষ নেই। কারন একপাক্ষিক অনুভূতি তৈরি হলে, সেখানে অপর পাশের ব্যাক্তিটাকে কখনো দায়ী করা যায় না।তাই জেনির মনের অনুভূতি মনেই রয়ে গেলো। এটাও একটা ভালো যে কেউ জানেনা।জানলে হয়তো অনেক কথা শুনতে হতো।কিছু কিছু অনুভূতি প্রকাশিত না হওয়াই ভালো।তাতে কেউ একজন কষ্ট পেলেও,বাকীরা তো ভালো থাকে।তবে স্মরণ কি ভালো আছে,সেটা জেনি জানেনা।এখন আর জানার কোন মানেও হয় না।অনেকটা সময় কে'*টে গেছে,অনেক কিছু ঘটে গেছে আমাদের জীবনে।কারণ জীবন থমকে গেলেও,থেমে থাকেনা।এটাই জীবনের চরম সত্য।
জেনির ঘোর কাঁ'*টলো সাইরার কথায়।স্মরণ চোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে জেনির দিকে।জেনি স্বাভাবিক হয়ে বসলো।
"স্মরণ সামান্য বিচলিত হয়ে বললো,
" কি হয়েছে তোমার বলো তো?এত অন্যমনস্ক কবে থেকে হলে শুনি?"
" কই,কিছু হয়নি তো।আমি স্বাভাবিক আছি একদম। বরং আগেই হয়তো অস্বাভাবিক ছিলাম।এটা বলে একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস খুব গোপনে লুকালো জেনি। যদিও সেটা স্মরণ ঠিকই ধরতে পেরেছে।মেয়েটা কেমন জানি হয়ে গেছে।স্মরণের সাথেও কেমন ফর্মালিটি দেখিয়ে কথা বলছে।আচ্ছা,অনেকদিন পর দেখা হয়েছে দেখে কি এমন অদ্ভুত আচরণ?হুম, হতে পারে সেটা।সময় কখনো কখনো দূরত্ব ঘুচিয়ে দেয়,আবার কখনো বাড়িয়ে দেয়।জেনির সাথে বোধহয় দূরত্বটা বেড়ে গেলো।অবশ্য এটার জন্য হয়তো স্মরণই দায়ী। তবে জেনিও কিছুটা দায়ী।কারণ স্মরণের বিয়ের পর জেনি কেমন জানি সম্পূর্ণ বদলে গেছে।হ্যাঁ,একটু রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক।নিজে তো কোন খোঁজ নেয়নি,কিন্তু তাই বলে স্মরণের ফোনও ধরবেনা,এটা কেমন কথা?"
সেই ছোটবেলা থেকে দুজনের একটা অদ্ভুত ভালো সম্পর্ক।সেটা ভাই-বোন,বন্ধুত্বেরও উর্ধ্বে।সে সম্পর্কের হয়তো নির্দিষ্ট কোনো নামই নেই।কিন্তু দুজন এটা জানতো,দুজন দুজনের জন্য কি।তবে প্রমির সাথে দেখা হওয়ার পর থেকেই,জেনি স্মরণকে কেমন জানি এড়িয়ে চলতো।আগে যেখানে কোথাও ঘুরতে গেলেই জেনি যেতো,প্রমি আসার পর থেকে জেনি নানা অযুহাতে দূরে থাকতে চাইতো।স্মরণও আর জোর করতোনা জেনিকে।হয়তো ওর ভালো লাগতোনা,তাই যেতো না।স্মরণ এটাকে স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছিলো। ঘুনাক্ষরেও টের পাইনি,জেনির মনে তখন কি চলছিলো।যদি টের পেতো,হয়তো আজকে সবকিছু অন্যরকম হতে পারতো।অবশ্য নিশ্চিত করে বলা যায় না।কারণ জেনিকে স্মরণের মা মেনে নিতো কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে জেনির।মাঝে মাঝে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী মেয়ে মনে হয় জেনির।আচ্ছা সিনড্রেলা কি জেনির চেয়েও দুঃখী ছিলো?"
জেনি সেটা জানেনা।
কিন্তু তবুও তো কেউ সিনড্রেলার জীবনে এসেছিলো তার সকল দুঃখ ঘুঁচাতে।কিন্তু জেনি?জেনির জীবনে কি কেউ আসবে?"কোনো রাজকুমার চাই না সে।চায় অতি সাধারণ একজন,যে অন্তত জেনিকে মন থেকে বুঝবে। একটু বেশিই আগলে রাখবে জেনিকে।আজ যে বড়ই বিপর্যস্ত সে।জীবনের প্রতিটা মোড়ে মোড়ে হোঁচট খেয়ে,আজ বড্ড ক্লান্ত সে।এতটুকু বয়সে,কতটুকু দুঃখ সয়েছে সে।এখনও সইছে।হয়তো বাকী জীবন এভাবেই সয়ে যেতেই হবে।একটা কথা আছে না,দুঃখে যাদের জীবন গড়া,তাদের আবার দুঃখ কি!সত্যিই আজ সেই কথাটা ভীষণভাবে মনে পড়ছে জেনির।নিজেকে দিয়ে সেই কথাটা দিব্যি উপলব্ধি করতে পারছে।তাইতো এতোকিছুর পরও কেমন স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে।কারণ ঐ যে,জীবন তো একটাই।যদি দুইবার জন্মানোর সুযোগ থাকতো!সেটা যেহেতু নেই,তাই একজীবনে যত লড়াই করার সে করবে।দেখতে চাই,জীবনের কতটুকু পথ দুঃখে ভরা।কন্টকাকীর্ণ পথের পরেই তো,ফুলেল পথ।তুমুল বর্ষণের পর যেমন কড়া রোদ উঠে,তেমনি একদিন হয়তো জেনির জীবনের আকাশে সুখ পাখিরা উড়াউড়ি করবে। সেদিনটার অপেক্ষায় হলেও যে বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে,বড্ড ইচ্ছে করে।সেই সুখ পাখিদের সাথে নিজের জীবনের অপূর্ণতাগুলোও উড়িয়ে দিবে সে।আসবে কি সেদিনটা!কবে আসবে?তা জেনি জানেনা।শুধু জানে, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে,সব।সেদিন জেনি রেললাইন ধরে হেঁটে চলে যাবে অজানায়,দূর দিগন্তের পথে।"কেউ কি থাকবে সেদিন জেনির পাশে?"
রেললাইনে যেমন একা একা হেঁটে যাওয়াতে কোনো মজা নেই,জীবন নামের রেললাইনটাতেও সঙ্গী বিহীন পাড়ি দেয়া বড্ড কঠিন।বড়ই ব্যাথার,যন্ত্রণার।
একাকীত্ব খুঁড়ে খুঁড়ে খায় প্রতিনিয়ত।এজন্যই বোধহয় মানুষকে সামাজিক জীব বলা হয়।কারণ মানুষ একা বাস করতে পারেনা,এটা যেমন সত্য।ঠিক তেমনি সঙ্গী ছাড়া চলাটাও অনেক কঠিন।তবে কজনই আর নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের জীবন সঙ্গী হিসেবে পাই!কেউবা পেয়েও হারায়। আবার কেউ যাকে পাই,তাকেই ভালোবেসে জীবন সাজায়।ঐ যে জীবন একটাই।নিজের সাথে প্রিয় মানুষের সাথে অভিমান করা গেলেও,জীবনের সাথে অভিমান করার সাধ্যি কার?"
আমাদের জীবনটা অনেকটা সাপলুডুর মতো।আমরা না চাইতেও যেমন সাপের মুখে পড়ে যায়,ঠিক তেমনি না চাইলেও জীবনে দুঃখ আসেই,আসবেই।সাপলুডু খেলাতে যদি সাপের মুখেই না পড়ি,তাহলে সে খেলার মজা কোথায়?সাপের মুখে পড়লেই না,খেলাটা দীর্ঘ হয়।"না হলে তো মুহুর্তেই খেলা শেষ!জীবনটাও তেমন,দুঃখ আছে দেখেই জীবনের মানে খোঁজে পাই আমরা।শুধু সুখে থাকলে,কখনোই তার মর্ম বুঝতাম না আমরা।দুঃখের পরশ পাথরে পুড়েই না সুখ টাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই আমরা।যার জীবনে যত দুঃখ,সে তত শক্ত মানুষ।ছোট বা'*চ্ছা যেমন হামাগু'ড়ি দেয়ার সময় বারবার পড়ে যাওয়া স্বত্তেও,একসময় ঠিকই উঠে দাঁড়ায়।দুঃখে ভারাক্রান্ত মানুষগুলোও একসময় অনেক শক্ত হয়ে যায়।তাই নতুন কোনো দুঃখ এদের সহজে কাবু করতে পারেনা।
জেনিকে দেখে কেউ বলতেই পারবেনা,ঠিক কি কি ঘটেছে ওর জীবনে।সেই ছোট্ট থেকে,এখন পর্যন্ত।
নিজের মা থাকা স্বত্বেও,সৎমায়ের কাছে থাকা।এটা যে একটা ছোট মেয়ের জন্য কতটা কষ্টের,সেটা কেউ বলতে পারবেনা।সাত বছর বয়স থেকে জেনি ওর নিজের মাকে ছাড়া বাবার কাছে থাকছে,সৎমায়ের সাথে।ওর মা কে কখনোই ওর বাবা আসতে দেয় না। আবার উনাদের ডি'*ভো*র্স'ও হয়নি।জেনি বড় হয়ে সম্পূর্ণ বিষয়টা বুঝতে পারে।আর সবটার জন্য জেনির দাদী'ই হয়তো দায়ী।জেনির মা ছিলো ওর বাবার দ্বিতীয় বউ।জেনির মা অসম্ভব সুন্দরী।ঐ সময়ে আশেপাশে এমন সুন্দরী বউ আরেকটা ছিলো না হয়তো।তবে জেনির মাকে বিয়ে করানোর পরিকল্পনা টা ছিলো ওর দাদীর।ওর দাদী পাশের বাড়িতে আরেকজনের ছেলের বউ দেখে,হিংসা করতে লাগলেন।তাই তিনি নিজেও ঠিক করলেন,তার ছেলেকে আবার বিয়ে করাবেন।যেই কথা,সেই কাজ। ছেলেকে দ্বিতীয় বিয়ে করালেন।আগের দিনে যদিও দুই-তিনটা বিয়ে পুরুষদের জন্য তেমন কোনো বিষয় ছিলো না।কিন্তু বিপত্তি ঘটলো আগের বউয়ের ভাইদের নিয়ে।জেনির সৎ মা ছিলো সাত ভাইয়ের এক বোন। মানে কেমন আদরের বোঝাই যায়।আর সেই বোনের স্বামী কিনা দ্বিতীয় বিয়ে করেছে?প্রথমে কিছু না বললেও,যখন ওদের বোনকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়,তখনি ঝামেলা বাঁধে।ভাইয়েরা জেনির বাবার বিরুদ্ধে কেইস করে।জেনির সৎমায়ের মাথায় একটু মানসিক সমস্যা আছে।অতঃপর জেনির বাবা এবার জেনির মাকে তাড়িয়ে দেয়।তখন জেনির ভাইটার বয়স তিনবছর।আর জেনির সাত।জেনিকে ওর বাবা নিজের কাছে রেখে দেয়।আর জেনির মা জোভানকে নিয়ে তার বাপের বাড়ি চলে যায় নিঃশব্দে।আর কোনোদিনও আসেনি এখানে।জেনির জন্য প্রতি ঈদে জামা কাপড় পাঠাতো শুধু।মায়ের আদর আর পাওয়া হয়নি তার। সবকিছুর জন্য জেনির ওর দাদীকে দায়ী মনে হয় বরাবরই।চোখের পানিটা পড়ার আগেই মুছে নিলো জেনি।অতীতকে অতীতেই চা'পা দিয়ে আসতে হয়। আর এখনতো জেনি ওর মা/ভাইয়ের সাথেই আছে। ভাইটার অবশ্য নৌবাহিনীতে চাকরি হয়ে গেছে,ইন্টার দেয়ার পরই।প্রায় ছয় ফুট লম্বা,সুঠাম দেহ।জেনিকে আবার বিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে,কিন্তু সে রাজি হতে চাইছেনা।নিজেকে একটু সময় দিতে চাই সে।এখনি কোনোকিছুর জন্য প্রস্তুুত নয় সে।
একদম না!
' রাতের নীরবতা ভেঙে ট্রেন ছুটে চলেছে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে।যেখানে থামার শুধু সেখানে সেখানেই থামবে।
আর শুধু আমরাই ভুল মানুষকে ভালোবেসে,ভুল করে থেমে যায়।আবার জোরে বাতাস বইছে শা শা করে। বাতাসের সাথে হালকা বৃষ্টির কণাও ভেসে আসছে। আজ প্রবল বর্ষণ হতে পারে মনে হচ্ছে।শিরশির করা বাতাস গায়ে কাঁপন তুলছে।আর কারো কারো মনে বইছে আক্ষেপের কাঁপন।সময় আমাদের কত পরিস্থিতিতেই না ফেলে দেয়।যা আমরা এড়িয়ে চলতে চাই,তার মুখোমুখিই আমাদের হতে হয় বারবার।জেনি কোনদিনও স্মরণের মুখোমুখি হতে চাইনি,কোনদিনও না।না,স্মরণের প্রতি কোন অভিযোগ নেই তার।কারো প্রতিই কোনো অভিযোগ নেই।কারণ অভিযোগে কিছু মিলে না।
(অপরদিকে)
সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে বিদ্যুৎ চলে গেলো,এখনো আসার নামগন্ধ নেই।রাত নয়টা বেজে পনের মিনিট। বিছানায় বসে তজবি জপতে জপতে ছেলের বউকে ডাকতে লাগলেন সুরাইয়া বেগম।শ্বাশুড়ীর ডাক শুনে ছুটে আসে তিতিক্ষা।পুরো নাম তারান্নুম তিতিক্ষা। সুরাইয়া বেগমের বড় ছেলের বউ।গায়ের রংটা একটু চাপা,কিন্তু অসম্ভব ধৈর্যশীল আর গুণবতী একটা মেয়ে। নামটার সাথে নিজের মিল রাখতেই এতো ধৈর্যশীল কিনা,কে জানে।গোলগাল চেহারার এই মেয়েটাকে দেখলেই এক অদ্ভুত ভালোলাগা বিরাজ করে মনে।সদা হাস্যময়ী এই মেয়েটার মনে জমে রয়েছে ভীষণ কালো মেঘ।অথচ সে মেঘ লুকিয়ে নিজেকে কেমন সূর্যের আলোর মত ঝলমলে করে উপস্থাপন করে নিজেকে সবার সামনে।কিছু মানুষ আছে এরা নিজেদের মনের ভেতরের কালো মেঘের নাগাল কাউকে পেতে দেয় না।সেই কালো মেঘ বৃষ্টিতে পরিণত হয়ে নিজের বুকের ভেতরেই ঝরে পড়ে শুধু।চোখে আসা তার বারণ।তবে একজন সেই কালো মেঘটা খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারে।কিন্তু তিতিক্ষা তাকে সাতপাঁচ বুঝিয়ে ফেলে।সমীরণ তিতিক্ষার হাত ধরে প্রায় রাতেই কেঁদে ফেলে।সমীরণ কাঁদলে তিতিক্ষার নিজেকে দিশেহারা লাগে।ওদের বিয়ে হয়েছে আজ ছয়বছর।যে কেউ ওদের দেখেই অনুমান করে নেই,ওদের লাভ ম্যারিজ।অথচ বিয়ের আগে সমীরণকে কেবল একপলক দেখেছিলো তিতিক্ষা।তাও বিয়ের দিন,যখন আয়নাতে বর বউয়ের মুখ একে অপরকে দেখানো হয়।একপলক দেখে প্রেম হয় কিনা,সেটা তিতিক্ষার জানা নেই।নিজের বর দেখেই হয়তো মুহুর্তেই প্রেমে পড়ে গেছিলো।অথবা তাকে দেখলেই প্রেমে পড়ে যাবে,তাই হয়তো দেখাই হইনি আগে।যে আমাদের জন্য নির্ধারিত থাকে,তার প্রেমে পড়ার মত মিষ্টি অনুভূতি আর দুইটা হয় না।কতজনই আমরা বছর বছর সংসার করেও,একে অন্যকে আকৃষ্ট করতে পারিনা।বা হয়তো আকৃষ্ট করার কোনো ইচ্ছেই আমাদের থাকেনা।সংসার করতে হয়,তাই করি।সংসার করতে যা প্রয়োজন,কেবল তাই করি।বিষয়টা এমন; ভাত,পানি না খেলে আমরা বাঁচতে পারবোনা,তাই খায়।তেমনি সমাজের নিয়মে যেভাবে সংসার করতে হয়,শুধু সেভাবেই করে যায়। নিজেদের অনুভূতি গুলো খোঁজার মত সময় আমাদের কাছে নেই।অথচ শুধু ভাত,পানি খেয়ে বেঁচে থাকাটাই জীবন নয়।তেমনি শুধু সংসার করতে হয়,সেজন্যই সংসার করাটাই কোনো কথা নয়।সংসার হলো দুটো মানুষের পারস্পরিক অনুভূতি আদান-প্রদানের ক্ষেত্র। সেখানে পরিবারের সবার অনুভূতি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।সমীরণ তিতিক্ষার কথা শুনে মাঝে মাঝে ভীষণ বো'*কা বনে যায়।একদিন রাতে উঠোনে বসে দুজন জ্যোৎস্না পোহাচ্ছিলো।ছোট পাটি বিছিয়ে বসে ছিলো দুজন।সহসা সমীরণ আহ্লাদ করে তিতিক্ষার কোলে শুয়ে পড়ে।তিতিক্ষা লাজুক হাসে।সমীরণের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে।সমীরণ আবেশে চোখ বুজে ফেলে।কিছুক্ষণ পর চোখ বন্ধ রেখেই বলে উঠে,
" এতো মিষ্টি কেনো তুমি তিতি?"
" সমীরণের কথা শুনে তিতিক্ষা সমীরনের গায়ের উপর হেসে লুটিয়ে পড়ে।সমীরণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় তিতিক্ষার এমন কান্ডে।কিছুক্ষণ পর হাসি থামিয়ে তিতিক্ষার মাথায় দুষ্টুমি ভর করে।সে ভীষণ জ্ঞানীর মত ভাব করে বলতে লাগলো,
" আমি পেটে থাকার সময় আম্মা মনে হয় শুধু মধুই খেয়েছিলো,তাই এতো মিষ্টি। এটা বলেই আবার হাসতে লাগলো, তবে তিতিক্ষার হাসিতে কোন শব্দ হয় না। শুধু ওর চোখমুখ কুঁচকে যায়।
তিতিক্ষাকে এভাবে হাসতে দেখে সমীরণ হুট করেই উঠে বসে পড়ে।তারপর আচমকায় তিতিক্ষার দুই হাত নিজের মুঠোয় পুরে নেয়।তিতিক্ষা তখন হাসি থামিয়ে চুপচাপ বুঝার চেষ্টা করে সমীরণের মাথায় কি চলছে। সমীরণ ততক্ষণে দুই হাত তিতিক্ষার গালে দিয়ে মুখটা উঁচু করে বললো,
" দেখিতো মিষ্টিটা আরেকটু চেকে।"সমীরণের কথা শোনা মাত্রই তিতিক্ষা লাফিয়ে সরে গেলো।চাহনি দেখেই বুঝতে পেরেছিলো,তার মাথায়ও দুষ্টুমি ভর করেছে। তিতিক্ষা দূরে সরে গিয়ে বললো,
" বাহিরে কোনো উল্টাপাল্টা নই,আপনার লজ্জা না থাকতে পারে,আমার আছে।"
" সমীরণ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো।এখানে লজ্জার কথা আসছে কোথা থেকে?নিজের বউকে আদর করতেও লজ্জা পেতে হবে এখন?আর এখানে কেউ আছে নাকি,সে আর আমি ছাড়া।সমীরণকে চুপ থাকতে দেখে তিতিক্ষা দৌড়ে ঘরে চলে যেতে নিলো। কিন্তু পারলোনা,তার আগেই সমীরণ পেছন থেকে হাত ধরে ফেললো।
" কই যাও,বউ?জানোনা,স্বামীর অনুমতি ছাড়া বউয়ের কোথাও যাওয়া নিষেধ।এই কথা শুনে তিতিক্ষা চোখ বড় বড় করে তাকালো সমীরণের দিকে।তারপর নিজেই সমীরণের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললো,
" আচ্ছা, এখন ঘরে যাওয়ার জন্যও আপনার অনুমতি নিতে হবে তাই না?"
" হ্যাঁ,হবে।স্বাভাবিক ভঙ্গীতে সেটা বললো সমীরণ।"
" তখন তিতিক্ষা মুখ ভেংচি কে'*টে বললো,আসছে আমার সোয়ামিরে।এই হাদীস জানেন শুধু তাইনা? আর এভাবে খোলা আকাশের নিচে স্বামী-স্ত্রী কোনোকিছু করতে নেই,তা জানেন না বুঝি?"
" আরে আমি এমন কি করতে নিয়েছিলাম?"
" সেটাতো আপনিই আমার চেয়ে ভালো জানেন। "
" তিতিক্ষার কথা শুনে সমীরণ ঠোঁট কামড়ে ধরে হাসতে লাগলো।সেটা দেখে তিতিক্ষা অন্যদিকে মুখ ঘুরালো।এবার সমীরণ হো হো করে হেসে দিলো। তারপর হুঁট করেই তিতিক্ষাকে কোলে তুলে নিলো। তারপর তিতিক্ষার নাকে নাক ঘষে দিয়ে বললো,
" আমার বউটা যে আমাকে ঘরে গিয়ে কোনকিছু করার ইঙ্গিত দিচ্ছিলো,সেটা তুই বুঝতেই পারিস নি ব্যাটা বেক্কল সমীরণ।
তিতিক্ষা কোনো কথা বলতে পারছেনা আর লজ্জায়। সে নিজেই নিজেকে বেক্কল বলছে,এটা শুনে তিতিক্ষার পেট ফেটে হাসি আসছে।সমীরণ তিতিক্ষার মুখের দিকে মোহময় ঘোর লাগানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হেঁটে ঘরে যেতে যেতে বললো,
" ঠিক কতোটা মিষ্টি তা জানিনা,তবে এই মিষ্টিতে যেহেতু ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা নেই,তাই যত খুশি খাওয়া যেতেই পারে।এটা বলেই চোখ মারলো সমীরণ। তিতিক্ষা চোখ বন্ধ করে অসভ্য বলে সমীরণের বুকে হাত ছুড়াছুঁড়ি করতে লাগলো।সমীরণ সেসব গায়েই লাগাচ্ছেনা। নিজের মতো করে ঘরের দিকে এগুচ্ছে।
বিছানায় তিতিক্ষাকে শুইয়ে দিয়ে, চুপচাপ তাকিয়ে রইলো।তারপর বললো,
" আচ্ছা,সবাই বলে আমাদের দেখে নাকি মনে হয় আমরা প্রেম করে বিয়ে করেছি।কেন বলোতো?"
" কেন,তা জানিনা।তবে আমি আপনার প্রেমে পড়িনি,প্রথম দেখায়ই ভালবেসে ফেলেছি।আর বিয়ের পর প্রতিনিয়ত প্রেমে পড়ছি।তাই হয়তো সবাই এমনটা ভাবে।"
" প্রেমে না পড়লে কি ভালোবাসা যায় কাউকে?"
" হ্যাঁ,কেন নয়?"
" জানিনা।"
" জানতে হবে না এতো।প্রেমে না পড়েও ভালোবাসা যায়,কিন্তু ভালো না বাসলে,কারো প্রেমে পড়া যায় না। আর পড়লেও,সেটা হলো সাময়িক মোহ,যে কোনো সময়ই কে'*টে যেতে পারে।প্রেম হলো চোখের নেশা, আর ভালোবাসা মনের।তাই আগে মনের নেশা হয়ে গেলে,চোখের নেশা হতে কতক্ষণ!"
" তারমানে তুমি বলতে চাইছো ভালোবাসাটা আগে জরুরি?"
" নিঃসন্দেহে।"
" তাহলে আসো ভালোবাসি।সমীরনের দুষ্টু কথা আর দৃষ্টি দেখে তিতিক্ষা বালিশ ছুঁ'*ড়তে লাগলো।সমীরণ বালিশ ধরে নিজের কাছেই রাখছে,আর একধ্যানে তাকিয়ে আছে তিতিক্ষার দিকে।তিতিক্ষার সেদিকে তাকানোর আর সাহস নেই,তাই একদম চুপসে গেলো। নিঃশ্বাস বেড়ে চলেছে ক্রমাগত।ভালোবাসা এক অদ্ভুত অনুভূতির নাম।যে বেসেছে,সেই ম'*রেছে।তবুও সে ম'*র*'ণ যে সুখের ম'*র*ণ। এমন অদ্ভুত ভালোবাসায় বারবার,হাজারবার মরতে রাজি তিতিক্ষা।আর কি চাই জীবনে?"
হাজার অপূর্ণতা পূর্ণ করে দেয় ভালোবাসা।যেমন বিয়ের ছয়বছর পরও মা হতে না পারার অপূর্ণতা নিয়েও,দিব্যি ভালো আছে তিতিক্ষা।তিতিক্ষা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে,একদিন সে এই খুশির খবরটা সমীরণকে দিতে পারবে।এটা ওদের ভালোবাসার প্রতি অগাধ বিশ্বাস থেকেই জানে।শুধু সেই দিনটার অপেক্ষায় দিন গুনছে সে।
" স্মরণকে ফোন দিছিলা,বউমা?"
" জ্বি, আম্মা।কাছাকাছিই এসে গেছে।আর আধা ঘন্টার মত লাগবে মনে হয়।"
" নাতিটার জন্য বড়ই মন কেমন করছে বুঝলা বউমা। এতোটুকু মেয়ে কিভাবে থাকবে মা ছাড়া?
কিচ্ছু বুঝিনা।আমার ছেলেটা ঝোঁকের মাথায় নিজের পছন্দে বিয়ে করলো,আচ্ছা মেনে নিলাম আমরা।তবুও তোরা সুখে শান্তিতে সংসার করতি।কিন্তু এমন মেয়েকেই বউ করে আনলো,যে শুধু নিজের চেহারা নিয়ে ব্যস্ত।আমাদের সাথেও থাকলোনা,গ্রামে থাকতে হবে বলে।অথচ ওর নিজের বাড়িও গ্রামে।তবুও কি জেদটাই না ধরলো সে ঢাকা শহর থাকবে বলে। ছেলেটাও পা'*গ'লের মত বউ নিয়ে ঢাকায় চলে গেলো। কিন্তু যে চাকরি করতো,তাতে তো তার বউয়ের পোষায় না।তাই বিদেশে পাড়ি জমালো। এখন বিদেশ থেকে ফিরে এসে কি হলো?"শুধু চেহারা সুন্দর হলেই হয়না, যদি চরিত্র সুন্দর না হয়।আক্ষেপের সুরে কথাটা বললেন সুরাইয়া বেগম।
শ্বাশুড়ীর কথাটা শুনে একটা মলিন হাসি হাসলো তিতিক্ষা।তিতিক্ষাকে ওর শ্বাশুড়ীর খুব একটা পছন্দ ছিলো না।আর সেটা ওর গায়ের রঙয়ের জন্যই। তিতিক্ষার শ্বশুর তিতিক্ষাকে পছন্দ করে এনেছিলেন। যদিও বিয়ের একবছর পরই তিনি পরলোকগমন করেন।তিতিক্ষাকে ভীষণ আদর করতেন।তিতিক্ষা মনে মনে ভাবলো,যাক আম্মা অন্তত এটাতো বুঝতে পেরেছে যে,চরিত্রটাই আসল।গায়ের রঙ তো আজকাল বিউটি ক্রিম দিয়েও ফর্সা করা যায়,কিন্তু চরিত্র ভালো করার তো কোনো ক্রিম নেই।ব্যবহারেই আসল পরিচয়।
কি যেনো ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো তিতিক্ষা।
(এদিকে)
আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।জেনি জানালার বাইরে হাতে বৃষ্টির পানি স্পর্শ করছিলো।সেটা দেখে সাইরাও জেদ ধরলো সে বৃষ্টি স্পর্শ করবে।স্মরণ কি করবে বুঝতে পারছেনা।মেয়েটাকে সামলানো আজকাল বড্ড কঠিন হয়ে যাচ্ছে।জেনি হুট করেই একটা বুদ্ধি পেয়ে গেলো। বৃষ্টির পানি ওর হাতে একটু জমিয়ে সেটা সাইরার হাতের উপর একটু একটু করে ফেললো।আর স্মরণকে ইশারা করলো যেনো জানালা পুরোটা বন্ধ করে দেয়। স্মরণ প্রথমে বুঝতে পারেনি।পরে বুঝতে পেরে দ্রুত বন্ধ করে দিলো।সাইরা জেনির হাত থেকে পানি নিয়ে খেলা করতে লাগলো।পানি নিয়ে ওর বাবার মুখেও ছিটিয়ে দিলো।তারপর চুপচাপ জেনির কোলে গিয়ে বসে পড়লো।স্মরণ পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছে নিলো।সত্যি কি মা ছাড়া বা'*চ্চা মানুষ করা যায় না,স্মরণ মুখ মুছতে মুছতে এটা ভাবতে লাগলো। মেয়েটা কত সহজে জেনির সাথে মিশে গেছে,যেনো অনেকদিনের পরিচয়।অথচ একটু পরেই ওরা নেমে যাবে,আর জেনিও চলে যাবে।একটু সময়ের দেখায় জেনি সাইরার মনে কোনো অবান্তর ইচ্ছে না বুনে দিলেই হলো।স্মরণ এখন কোনকিছু ভাবতে চাইছেনা। কিন্তু ভাবীর কাছে শুনেছে মা নাকি এখনি মেয়ে দেখাদেখি শুরু করে দিয়েছে।স্মরণ সরাসরি না'ও করতে পারছেনা।একবার মায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে ভুল করেছে,আবার করতে চাইনা।কিন্তু এখন কোনোকিছু ভাবাও সম্ভব না।নিজেকে একটু স্পেস দেয়া দরকার। মস্তিষ্ক জ্যাম হয়ে গেছে একদম।রিফ্রেশমেন্ট দরকার একটু।
হঠাৎ সাইরার একটা ডাক শুনে স্মরণ,জেনি দুজনই একে অপরের দিকে ঘাবড়ে গিয়ে তাকালো।দুজনেই অপ্রস্তুুত হয়ে পড়লো।সাইরা জেনিকে,মামুণি বলে ডেকে উঠলো সহসাই।
' বৃষ্টি হালকা থেমে গিয়ে ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু করেছে।শান্ত প্রকৃতিটা,হুঁট করেই কেমন অশান্ত রূপ ধারণ করে ফেলে।অনেকটা মানুষের মনের মত।হঠাৎ করেই কোনো কারণ ব্যতীতই কেমন অস্থিরতা বিরাজ করে।অথবা হয়তো কারণটা বুঝেও বুঝে উঠতে পারেনা মন।মানব মন যে, প্রকৃতির চেয়েও অশান্ত।
ট্রেন গৌরিপুর স্টেশনে এসে গেছে।তার মানে স্মরণ নেমে যাবে।জেনি চুপচাপ উদাস চোখে কামড়ার মানুষগুলোর ব্যাস্ততা দেখছে।অনেকেই এখানে নেমে যাবে।গৌরিপুর স্টেশন সারাদেশে বেশ পরিচিত একটা জায়গা।এটা নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের একটা বই'ও আছে অবশ্য। নাম 'গৌরিপুর জংশন।' গৌরিপুর জায়গাটা প্রাচীনকাল থেকেই সুপরিচিত,এখানকার প্রাচীন রাজ রাজাদের বসবাসের জন্য।জেনি ছোটবেলায় একবার সেসব জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখেছিলো।চাচীর সাথে স্মরণদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলো,তখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে সে।গৌরিপুরের সরকারী কলেজ,মহিলা কলেজ,প্রেসক্লাব সব আগের দিনের রাজাদের বাড়িতেই গড়ে উঠেছে।একেকটা অবশ্য একেক জায়গায়।তবে প্রেসক্লাব আর মহিলা কলেজ কাছাকাছি।স্মরণ নামার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো।সাইরা জেনির হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বলছে,
" তুমি আমাদের সাথে যাবা না খামুণি?"
জেনি মুখটা অসহায় করে সাইরার দিকে তাকিয়েছিলো।আর একটা ব্যাপার বুঝতে পারলো,সাইরা তখন খামুণি বলতে গিয়ে হয়তো ঐ শব্দটা বলে ফেলেছিলো।ছোট বা'*চ্চা,ঠিকমতো কথাও বলতে পারেনা এখনো। মুখ ফসকে বেড়িয়ে গেছে হয়তো।জেনি বিষয়টাকে স্বাভাবিক ভাবেই নিলো। তবে স্মরণের বিষয়টা জেনি ঠিক বুঝতে পারছেনা। এখন স্মরণকে কিছু জিজ্ঞেস করতেও মন সায় দিচ্ছে না।আর সময়ও নেই এখন।তারচেয়ে পরে জেনে নিবে না হয়।তবে কোনো বড়সড় ঘটনা ঘটেছে,সে ব্যাপারে জেনি নিশ্চিত।মুখ থেকে চিন্তার রেখাটা সরিয়ে,মৃদু হেসে সাইরার দিকে তাকালো।সাইরার কপালে চুমু এঁকে দিয়ে বললো...
" খামুণি অন্য কোনো সময় আসবে তোমার সাথে দেখা করতে কেমন?"
" আজকে গেলে কি হয়?সাইরা গাল ফুলিয়ে কথাটা বললো।স্মরণ বুঝতে পারছে সাইরা এবার এ বিষয়টা নিয়েও বাড়াবাড়ি শুরু না করলেই হয়।তাই মেয়েকে বুঝাতে লাগলো,
" খামুণির জন্য তার আম্মু চিন্তা করছে হয়তো,তাই তাকে তার আম্মুর কাছে যেতে হবে যে মামণি।না গেলে তার আম্মু কান্না করবে যে।
" সাইরা জেদ করতে লাগলো এবার।স্মরণ কি করবে বুঝতে পারছেনা।এ পরিস্থিতিতে জেনিকে সাথে নিয়ে বাড়িতে গেলে গ্রামের মানুষ বিভিন্ন কথা রটিয়ে বেড়াবে।বিশেষ করে কিছু কুটনি মহিলা।এরা তিলকে তাল করতে অভ্যস্ত।কোনো ছেলের সাথে কোনো মেয়েকে দেখলেই,এদের ধারণা এরা প্রেম করে। তারপর সেটা পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে আলাপ করে সারা গ্রাম ছড়িয়ে দিবে।এদের কাজই এটা,অসহ্যকর।
এদিকে মেয়েটাও হয়েছে একগুঁয়ে,জেদি।বড় হলে যে কি হবে,আল্লাহ ভালো জানে।এখন না নামলে,স্টেশন মিস করবে।জেনি সাইরাকে বিভিন্নভাবে বুঝানোর চেষ্টা করছে।অবশেষে সাইরাকে জেনিদের বাড়িতে নিয়ে যাবে স্মরণ,এ কথায় সাইরাকে বুঝানো গেলো।জেনি যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।স্মরণের দিকে চোখ তুলে তাকালো।স্মরণ একদৃষ্টিতে জেনির দিকেই তাকিয়েছিলো,যেটা জেনিকে অপ্রস্তুুত করে তুললো। পরিবেশ স্বাভাবিক করতে চোখের পলক ফেলে, মৃদু হাসি বিনিময় করলো জেনি।স্মরণও দু'ঠোট হালকা প্রসারিত করলো।মনে মনে ছোট্ট করে একটা ধন্যবাদ দিলো জেনিকে।অনেক অনেক দিন পর দেখা হলে কি সম্পর্ক গুলো ফিকে হয়ে যায় ? দুজন কেমন ফরমালিটি দেখাচ্ছে, অথচ তাদের সম্পর্কে ফরমালিটির কোনো বালাইও ছিলো না।অথচ সময়ের ব্যাবধানে আজ দুজন অচেনা পথের পথযাত্রীর মত হয়ে গেছে।যেনো আজ প্রথমেই তাদের দেখা,পরিচয়।
সম্পর্ক গুলো বোধহয় লোহার মতো।যত্ন না করলে,লোহায় যেমন ম'*রচে ধরে।ঠিক তেমনি খোঁজ খবর না রাখলে সম্পর্ক গুলোতেও ম'*রচে ধরে যায়।
জেনির ডাকে নিজেকে ধাতস্থ করে নিলো স্মরণ। ভাবনা থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক ভাবে তাকালো।আর মনে মনে বলতে লাগলো,তুই এতো বেশিই কেনো ভাবছিস ওর কথা?"
জীবনের বাঁকে বাঁকে সম্পর্ক গতিপথ বদলায়,ঠিক নদীর মতো।দূরের মানুষ কাছের হয়,কাছের মানুষ দূরের।এটাই ধ্রুব সত্য জীবনের।আমরা চাইলেও সবাইকে আঁকড়ে রাখতে পারিনা।আবার না চাইলেও, অনেকের সাথে জড়িয়ে থাকতে হয়।তবে যখন কোনো সম্পর্কে তিক্ততা চলে আসে,তখন সে সম্পর্ক থেকে চুপচাপ সরে পড়া দুজনের জন্যই ভালো।আর স্মরণ ঠিক সেটাই করেছে।জোর করে বনের মুক্ত পাখিকে বন্দি করে রাখা গেলেও,মানুষকে যায় না।আর যেখানে ভালোবাসার অস্তিত্বই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়,সেখানে নতুন করে ভালোবাসা খোঁজা,মরীচিকা ছাড়া কিছুই নয়।
চূড়াবালিতে পা রেখে, ভালোবাসা পাওয়ার আশা করাটা যে বড্ড ছেলেমানুষি।একবার ছেলেমানুষি করেছে সে,দ্বিতীয়বার একই ভুল করতে চাই না।
নিজে থেকে আর কোনো সিদ্ধান্ত নিবে না সে এ বিষয়ে,পরিবার যেটা চাইবে সেটাই করবে।একবার তো অবাধ্য হয়েছে,আর সেই ভুল করবে না সে।জীবন থেকে কোনো প্রত্যাশাও নেই আর।যেভাবে চলার, সেভাবেই চলুক।প্রত্যাশা যত কম,কষ্টও তত কম।উচ্চ প্রত্যাশায় আমাদের জীবনে দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে মাঝেমধ্যে আকাশের দিকে তাকিয়ে স্মরণ ভাবে,সে তো কোনো উচ্চ আশা মনে পোষণ করেনি? শুধু যাকে ভালোবাসে,তাকে নিয়ে ঘর বাঁধতে চেয়েছিলো।ঘর বেঁধেছিলোও,হয়তো পন্থাটা ভুল ছিলো।কিন্তু তাও তো পরে সব ঠিক হয়েছিলো।তবুও সে কেনো এমন একটা কাজ করলো?মেয়েটার কথা পর্যন্ত ভাবলনা।এমন মা যেনো আর কারো না হয়। সন্তানের মুখ দেখলে নাকি,মা পৃথিবীর সব কষ্ট ভুলে যায়।আর সে এমন মা যে,যাওয়ার আগে নিজের সন্তানের মুখটাও পর্যন্ত দেখলোনা।স্মরণ চাই'ও না এমন কারো কাছে তার মেয়ে থাকুক।সে চাইলেও, স্মরণ তার মেয়েকে দিতো না।হয়তো আইনি ক্ষেত্রে গেলে,সাইরার কাস্টেডি স্মরণের পাওয়ার সম্ভাবনা কম ছিলো।যা হয়,ভালোর জন্যই হয়।নিজে চলে যাওয়ার, চলে গিয়েছে।মেয়েটাকে নিয়ে কোনো ঝামেলা করেনি সেই ঢের।তার প্রতি আমার ভালোবাসা সেদিনই কবর দিয়ে দিয়েছি,যেদিন সে অন্য কারো স্বপ্নে বিভোর হয়েছিলো।একসময় যে আমার অস্তিত্ব জুড়ে ছিলো, সেই অস্তিত্বে এখন তার কোনো ঠাঁই নেই আর!
স্বার্থপর,বেঈমানরা ভালোবাসা পাওয়ার কোনো যোগ্যতাই রাখেনা।ওরা হয়তো ভালো থাকতে পারবে কাউকে ঠঁকিয়ে,কিন্তু কোনদিনও সুখী হতে পারবেনা। বড়জোর সুখী হওয়ার ভান ধরতে পারে।
(এদিকে)
সমীরণ স্টেশনেই দাঁড়িয়েছিলো।বাতাস কিছুটা কমে এসেছে এ মুহুর্তে,তবে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে,মৃদু বাতাসের সাথে।জেনি স্মরণকে বিদায় জানালো। আকস্মিক স্মরণের উপস্থিতি যেনো,অতীত তোলপাড় করে দিচ্ছিলো জেনির।জানে এসব ভেবে আর কোন লাভ নেই। তবুও মন কি আর মানে!জানালা দিয়ে স্মরণের যাওয়ার পানে নির্লিপ্তভাবে তাকিয়ে রইলো শুধু।মাঝে মাঝে খুব আক্ষেপ হয় জেনির।স্মরণ কি কোনোদিনও জেনির চোখের দিকে তাকিয়েছিলো,যে দৃষ্টি নিয়ে প্রমির দিকে তাকাতো!যদি একবার তাকাতো,দেখতে পেতো তার জন্য কেউ ভালোবাসার সমুদ্র সাজিয়ে রেখেছিলো ঐ চোখের গহীনে। আফসোস স্মরণ সেটা দেখলনা,জানলোনা।আর কোনদিন জানবেও না!জীবন কত অদ্ভুত না?যার জন্য ভালোবাসার পসরা সাজিয়ে বসে থাকি আমরা,সে সেটা জানতেই পারেনা।হঠাৎ বুকের ভিতরটা চিনচিন করতে লাগলো,সেই চিরচেনা ব্যথায়।যেটা এতোদিন ছাই চাপা দিয়ে রেখেছিলো।সেটা আজ আগ্নেয়গিরির লাভার মতই ফুঁস করে বের হয়ে আসতে চাইছে।জেনি সেটাকে প্রাণপণে চাপা দিয়ে দিতে চাইছে আবার।কিন্তু মন বড্ড অবাধ্যতা করছে আজকে।চিৎকার করে কেঁদে সব ব্যথা উগড়ে দিতে মন চাইছে।যেটা বহুবছর ধরে খুব গোপনে পুষে রেখেছিলো।আজ বোধহয় সেটা বেরিয়ে আসতে চাইছে। কি লাভ ব্যথা পুষে রেখে?
যেখানে দুজনের জীবন দু'দিকে বয়ে গেছে।তারচেয়ে সবকিছু স্বাভাবিক ভাবে নিতে শিখতে পারাটাই ভালো।
চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ার আগেই, জেনি সেটা মুছে নিলো।কিন্তু জানালার দিকে তাকিয়েই থমকে গেলো পুরো।স্মরণ অদ্ভুত চাহনি নিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।জেনি একটু বিচলিত বোধ করতে লাগলো।স্মরণ কি কোনোভাবে জেনির চোখের জল দেখে ফেলেছে!এটা ভেবেই একটা ঢোক গিললো জেনি।নিজেকে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে স্বাভাবিক করে নিলো।মৃদু হেসে বললো,
" কি ব্যাপার,আবার এলে যে?"
" স্মরণ কি যেনো ভাবলো।তারপর পেছন থেকে হাত বের করে,তিনটা বার্মিস আচারের প্যাকেট জেনির দিকে বাড়িয়ে দিলো।
"জেনি চমকে তাকালো।এবার ওর চোখের জল আর কোনো বাঁধা মানলোনা।ফোয়ারার মত গড়িয়ে পড়তে লাগলো।সেটা দেখে স্মরণ ভীমড়ি খেয়ে গেলো।

Post a Comment

0 Comments