ফাইয়ানের মুখের হাসি এক সেকেন্ডে উধাও হয়ে গেল। শ্রাবন্তীর এই আকস্মিক ও মারাত্মক পরিবর্তন তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সে টেবিলের ওপর থেকে নিজের হাত বাড়িয়ে শ্রাবন্তীর কাঁপতে থাকা হাত দুটোকে শক্ত করে আগলে ধরল। তার কণ্ঠে তখন রাজ্যের ব্যস্ততা আর গভীর উদ্বেগ, "শ্রাবণ! আর ইউ ওকে? শ্রাবণ, কী হয়েছে তোমার? বলো আমাকে! কোনো কষ্ট হচ্ছে?"
শ্রাবন্তী তখনো কাঁপছে। তার চোখের সামনে শপিং মলের ঝকঝকে আলো, কফির টেবিল—সব যেন ঝাপসা হয়ে আসছিল। সে জোর করে নিজের চোখ দুটো খুলল। চোখের কোণ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। ফাইয়ানের অস্থির ও চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে সে যেন কোনোমতে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করল। তার ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছিল, গলা দিয়ে স্পষ্ট কোনো আওয়াজ বের হতে চাইছিল না।
সে ফাইয়ানের শার্টের হাতাটা খপ করে চেপে ধরল। নিজের সবটুকু শক্তি সঞ্চয় করে, ভাঙা এবং অত্যন্ত কাতর গলায় বলল, "আমার... আমার খুব খারাপ লাগতেছে। প্লিজ... আমাকে এখানে আর এক মুহূর্তও রাখবেন না। আমাকে বাসায় নিয়ে চলেন... প্লিজ!"
ফাইয়ান আর কোনো প্রশ্ন করল না, কোনো কৈফিয়ত চাইল না। কাউন্টারে বিল মেটানোর জন্য এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে, সে শ্রাবন্তীর কাঁধে আলতো করে হাত দিয়ে তাকে আগলে ধরে চেয়ার থেকে দাঁড় করাল। এক হাত দিয়ে তার শপিং ব্যাগ আর অন্য হাত দিয়ে শ্রাবন্তীকে শক্ত করে ধরে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে এল।
রেস্টুরেন্টের এক্সিট গেটের কাছাকাছি আসতেই আচমকা সামনে এসে পথ আগলে দাঁড়াল সৃষ্টি। তার পেছনে হাঁপাতে হাঁপাতে ফারহাও এসে পৌঁছেছে। ফাইয়ানের হাত শক্ত করে ধরে রাখা শ্রাবন্তীকে দেখা মাত্রই সৃষ্টির ফর্সা মুখটা হিংসা আর রাগে কুৎসিত রূপ নিল। সে নিজের চোখের সানগ্লাসটা ঝটকা দিয়ে খুলে সোজা ফাইয়ানের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল,"ফাইয়ান! এটা কী ধরনের তামাশা? তুমি আমাকে ওই নাভিদের হাতে হাত ধরিয়ে দিয়ে বাজারের মেয়েটার সাথে এখানে এসে আদিখ্যেতা করছ? কোন সাহসে ও তোমার হাত ধরে আছে?"
সৃষ্টির এমন চড়া গলার চিৎকারে রেস্টুরেন্টের আশেপাশের দু-চারজন মানুষ ঘুরে তাকাতে লাগল। শ্রাবন্তী এমনিতেই ভেতরে ভেতরে একটা তীব্র মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, সৃষ্টির এই কর্কশ চেঁচামেচি আর অপমানে তার শরীর আরও বেশি কাঁপতে শুরু করল। সে ফাইয়ানের থেকে হাত সরিয়ে দূরে সরে কিছুটা গুটিয়ে গিয়ে নিজের মাথা নিচু করে নিল।
ফাইয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তার চোখের মণি দুটো যেন জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল হয়ে গেছে। সে সৃষ্টিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা কিন্তু চাবুকের মতো ধারালো গলায় বলল, "সৃষ্টি, নিজের মুখটা বন্ধ করো। আর একটা ফালতু কথা যদি তোমার মুখ থেকে বের হয়, তবে আমি ভুলে যাব যে তুমি আমার চাচাতো বোন!"
সৃষ্টি তাও দমবার পাত্রী নয়। সে শ্রাবন্তীর দিকে আঙুল উঁচিয়ে আরও কটু সুরে বলল, "কেন বলব না? ও তো একটা অপয়া! ও তোমাকে ফাঁদে ফেলার জন্য জাল বিছিয়েছে। ফাইয়ান, তুমি দেখতে পাচ্ছ না ও কীভাবে ন্যাকামি করে অসুস্থ হওয়ার নাটক করে তোমাকে আঁচলে বাঁধতে চাইছে? এই ধড়িবাজ মেয়েকে তো রাস্তা ঘাটে..."
"স্টপ সৃষ্টি!"
ফাইয়ানের বজ্রকণ্ঠে পুরো চত্বরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ফাইয়ান সৃষ্টিকে আর এক সেকেন্ডও পাত্তা না দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফারহার দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে ছিল চূড়ান্ত আদেশ, "ফারহা, সৃষ্টিকে নিয়ে এখনই নাভিদের গাড়িতে গিয়ে বস। ও যেন আর একটা মুহূর্তও আমার চোখের সামনে না থাকে।"
ফারহাও সৃষ্টির এই নোংরা আচরণে চরম বিরক্ত হয়েছিল। সে সৃষ্টির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে টানতে টানতে বলল, "চলো সৃষ্টি! অনেক সিন ক্রিয়েট করো না। এবার অন্তত থামো!"
ফাইয়ান সৃষ্টির কোনো আজেবাজে কথা কানেই তুলল না। তার নিজেরও আজ অফিসে ব্যাক-টু-ব্যাক জরুরি মিটিং রয়েছে, তাই এই ফালতু ঝামেলার পেছনে নষ্ট করার মতো এক সেকেন্ড সময়ও তার নেই। সে শ্রাবন্তীর কাঁপতে থাকা হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় আরও চেপে ধরল এবং তাকে আগলে নিয়ে সোজা নাভিদের ড্রাইভ করা মার্সিডিজ গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল।
গাড়ির কাছে এসে ফাইয়ান নিজেই পেছনের দরজাটা খুলে অত্যন্ত যত্ন ও সতর্কতার সাথে শ্রাবন্তীকে ভেতরে বসিয়ে দিল। শ্রাবন্তী সিটে হেলান দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে রইল, তার কপাল বেয়ে তখনো আতঙ্কের ঘাম ঝরছে।
শ্রাবন্তীকে গাড়িতে বসিয়ে ফাইয়ান দরজাটা আটকে দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নাভিদের দিকে ঘুরল। তার চোখ-মুখ রাগে থমথম করছে। সে অত্যন্ত কড়া ও গম্ভীর গলায় নাভিদকে নির্দেশ দিল, "নাভিদ, শ্রাবন্তী সৃষ্টি আর ফারহা নিয়ে তুমি বাড়িতে দিয়ে এসো। আমার অফিসে খুব ইম্পর্টেন্ট মিটিং আছে, আমি অফিসের গাড়িতে সরাসরি অফিসে চলে যাচ্ছি।"
নাভিদ ফাইয়ানের এমন চন্ডাল রূপ আর জরুরি পরিস্থিতির কথা শুনে ভয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়ল, "জি স্যার, আমি এখনই ওনাদের নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হচ্ছি।"
ফাইয়ান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করল না। সৃষ্টি তখনো দূর থেকে চিল্লাতে চিল্লাতে পার্কিংয়ের দিকে আসছিল, কিন্তু ফাইয়ান সেদিকে ফিরেও তাকাল না। সে দ্রুত পায়ে মেইন রোডের দিকে এগিয়ে গেল অফিসের গাড়ি ডেকে সরাসরি কোম্পানির মিটিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার জন্য। আর ওদিকে নাভিদ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে শ্রাবন্তীকে নিয়ে খন্দকার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
____________
ফাইয়ান অফিসে ঢুকেই একের পর এক মিটিং শেষ করছে। কিন্তু আজ তার মনটা অদ্ভুত অস্থির। ল্যাপটপের স্ক্রিনে প্রেজেন্টেশন চললেও বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে শ্রাবন্তীর আতঙ্কিত মুখটা।
ঠিক তখনই দরজায় নক পড়ল।— "কাম ইন।"
দরজা খুলে মুখে চওড়া হাসি নিয়ে ঢুকল পরশ। হাতে এক কাপ কফি।পরশ ঢুকেই সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল,
— "মিস্টার বিজনেস টাইকুন! পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ আছে, যে অফিসে বসেও এমন মুখ করে যেন কেউ তার ব্যাংক লুট করে নিয়ে গেছে?"
ফাইয়ান ল্যাপটপ থেকে চোখ না তুলেই বলল,— "ফাজলামি না করে আসল কথা বল
পরশ নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে ধরল— "উফ! মেয়েদের নিয়ে রোমান্স করিস, শপিং মলে ঘুরে বেড়াস কিন্তু কিছু অধম ভাইয়ের সাথে দুইটা মিষ্টি কথা বলার সময় নেই!"
পরশ নিজের হাতঘড়িটা দেখে নিয়ে বলল, "আগে গুড নিউজ দেই।" কফিতে আলতো করে একটা ফু দিয়ে সে আবার বলল, "আজ আপনার ভবিষ্যৎ ভাবির সাথে দেখা হয়ে গেছে।"
ফাইয়ানের মুচকি হেসে বললো:বদল ভাবি কি তোর বৌ আমার ও বৌ,,
পরশ হাত নেড়ে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল, চুপ বেদ্দপ মেয়েটার নাম ইশানি।"
ফাইয়ান চেয়ার ছেড়ে একটু সোজা হয়ে বসল। ঠোঁটের কোণে চতুর হাসি ফুটিয়ে বলল, "ইশানি? নামটা তো বেশ। কিন্তু ঘটনা কী? তুই তো আবার রোগী আর প্রেসক্রিপশন ছাড়া কিছু বুঝিস না। স্টেথোস্কোপ দিয়ে হার্টবিট মাপতে গিয়ে নিজের হার্টবিট হারিয়ে ফেললি নাকি?"
পরশ কফির মগে চুমুক দিয়ে চোখ কপালে তুলল, "হারিয়ে ফেলা মানে? এক্কেবারে ডাকাতি হয়ে গেছে দোস্ত! মেয়েটা যেমন কড়া মেজাজের, তেমনই ধড়িবাজ। সেদিন রাস্তায় আমার গাড়ির হাওয়া ছেড়ে কাঁচ ভেঙ্গে পালিয়েছে,, সেদিন ধরা করলে বলে আমি নাকি কোটিপতি,,
ফাইয়ান এবার হোহো করে হেসে উঠল, "বলিস কী! তোকে কোটিপতি বানিয়ে দিল? যে মানুষটা দিনে বিশটা করে হার্ট সার্জারি করে, আবার ছেঁড়া জাংগা পরে তাকে না কি কোটিপতি বলে
"সাহসের কথা আর বলিস না," পরশ কফির মগটা টেবিলে রেখে বেশ গম্ভীর হওয়ার ভনিতা করল, কাল হাসপাতালে আমার এক নার্স ওর হাত চেপে ধরেছিল। মেয়েটা এক সেকেন্ডও ভাবেনি, ঠাস করে গালে এক চড় বসিয়ে দিল! পুরো কেবিন পাঁচ সেকেন্ডের জন্য নিস্তব্ধ। আমি তো দেখেই কুপোকাত!"
ফাইয়ান কলমটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, "বাহ্! তোর জীবনের শান্ত সমুদ্রে তাহলে শেষমেশ একটা সুনামি এসেই গেল। তা ডক্টর সাহেব, এখন প্রেসক্রিপশন কী? লভ-ফিভারের কোনো অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করলি?"
পরশ সোফা থেকে উঠে ফাইয়ানের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। নিজের কলারটা একটু ঝাঁকিয়ে বলল, "অ্যান্টিবায়োটিক লাগবে না। আপাতত শর্ত দিয়েছি, প্রতিদিন আমার জন্য নিজের হাতে কড়া লিকারের এক ফ্লাস্ক চা বানিয়ে আনতে হবে। চা খেতে খেতেই চিকিৎসা চলবে!"
ফাইয়ান মাথা নেড়ে হাসল, "তুই আসলেই ইম্পসিবল! মেয়েটা তোকে কোনোদিন বিষ খাইয়ে না দিলে হয়।"
"আরে, বিষ দিলেও সেটা অমৃতের মতো খাব!" পরশ ফাইয়ানের কাঁধে একটা চাপড় মেরে বলল, "চল, এবার তোর ওই গম্ভীর সিইও ফেসটা বাদ দিয়ে একটু হাস। সারাক্ষণ এমন মুখ করে থাকলে সৃষ্টি তো দূর, অফিসের ফাইলপত্রও ভয় পেয়ে পালাবে।"
কথাটা বলেই পরশ দরজার দিকে হাঁটা দিল। ফাইয়ান পেছন থেকে ডেকে বলল, "কফিটা তো রেখে যা!"
পরশ না থেমেই হাত নেড়ে বলল, "বিলে অ্যাড করে দিস! ডাক্তারদের কফি ফ্রি হয় !"
___________________
বিকেলের দিকে অনামিকা তার একঝাঁক বন্ধু-বান্ধবীকে নিয়ে শেখ বাড়িতে এক জমকালো পার্টির আয়োজন করে বসল। ড্রইংরুম জুড়ে সাউন্ড সিস্টেমে জোরে গান বাজছে, অনামিকার বন্ধুদের হাসাহাসি আর আড্ডায় পুরো বাড়ি মুখরিত। আর এই বিশাল পার্টির সব রান্নাবান্নার পুরো দায়িত্ব অনামিকা এক প্রকার জোর করেই চাপিয়ে দিয়েছে শাশুড়ি সালমা বেগমের ওপর।
সালমা বেগম রান্নাঘরের গরমের মধ্যে একা হাতে হরেক রকমের স্ন্যাক্স, বিরিয়ানি আর কাবাব তৈরিতে ব্যস্ত। বয়সের ভারে ওনার শরীরটা কুঁকড়ে আসছে, কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে, কিন্তু অনামিকার সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। সে তার বন্ধুদের সাথে সেলফি তুলতে আর রিলস বানাতে ব্যস্ত।
ঠিক তখনই অফিস শেষ করে কলিং বেল বাজাল ইফান। দরজা খুলেই ঘরের ভেতরের হট্টগোল আর অনামিকাকে বন্ধুদের সাথে নাচানাচি করতে দেখে তার মাথা গরম হয়ে গেল। সে সোজা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল এবং দেখল তার মা চুলার সামনে দাঁড়িয়ে হাপাচ্ছেন। ওনার ফ্যাকাশে মুখটা দেখে ইফানের ভেতরের রাগ এক মুহূর্তে চরম সীমায় পৌঁছে গেল।
ইফান ড্রইংরুমে এসে মিউজিকটা এক ঝটকায় বন্ধ করে দিল। পুরো ঘর মুহূর্তের মধ্যে শান্ত হয়ে গেল। অনামিকা ভ্রু কুঁচকে রেগে গিয়ে বলল, "কী হচ্ছে এসব ইফান? আমার ফ্রেন্ডদের সামনে এভাবে সিন ক্রিয়েট করছ কেন?"
ইফান সবার সামনে অনামিকার দিকে আঙুল উঁচিয়ে কড়া গলায় বলল, "সিন আমি করছি না অনামিকা, সিন তুমি করছ! আমার মা রান্নাঘরে একা হাতে তোমাদের এই ফালতু পার্টির জন্য খাটছে, আর তুমি এখানে নবাবজাদির মতো নাচছ? তোমার বন্ধুদের এখনই এই বাড়ি থেকে বের হতে বলো, আর নয়তো আমি নিজেই ওদের ঘাড় ধরে বের করে দেব!"
ইফানের এমন রুদ্ররূপ দেখে অনামিকার বন্ধুরা বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেল এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, দ্রুত ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। বন্ধুদের এভাবে চলে যেতে দেখে অনামিকা রাগে একেবারে অন্ধ হয়ে গেল। সে ইফানের দিকে এগিয়ে এসে আঙুল উঁচিয়ে অত্যন্ত তপ্ত আর কড়া গলায় বলতে লাগল, "তুই নিজেকে কী ভাবিস ইফান? তোর এত বড় সাহস! তুই আমার বন্ধুদের সামনে আমাকে এভাবে অপমান করলি? ওই বুড়ি রান্নাঘরে একটু কাজ করছে বলে তোর গায়ে এত লাগছে? তুই তো আসলে একটা..."
অনামিকার মুখ থেকে এমন চরম অপমানজনক কথা আর শাশুড়িকে নিয়ে 'তুই' তোকারি করে অসম্মান করার ভাষা শুনে ইফান নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলল। মায়ের এই অপমান সে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারল না।
ঠাস!
ড্রইংরুমে এক তীব্র চড়ের শব্দ হলো। ইফানের সজোরে দেওয়া থাপ্পড়টা অনামিকার গালে গিয়ে পড়ল।
আচমকা এই চড়ে অনামিকা ছিটকে সোফার ওপর গিয়ে পড়ল। পুরো ঘর এক সেকেন্ডে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। অনামিকা হতভম্ব হয়ে এক হাত গালে দিয়ে অবিশ্বাস্য চোখে ইফানের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে রাগের জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
ইফানের নিজের হাতটা তখনো কাঁপছে, কিন্তু তার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে আছে। সে অনামিকার দিকে ঝুঁকে এসে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "মুখ সামলে কথা বলবে অনামিকা! আমার মাকে আর একটা বার যদি 'তুই' বলেছিস বা অপমান করেছো তুমি আমার স্ত্রী আমি দ্বিতীয় বার ভাববো না,,,,
সালমা বেগম রান্নাঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এসে ছেলের হাত চেপে ধরলেন, ওনার চোখও পানিতে ভরা। অনামিকা আর কোনো কথা না বলে সোফা থেকে ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়াল,,ড্রইংরুমজুড়ে থমথমে নীরবতা। মুহূর্ত আগের ঘটনায় যেন পুরো বাড়িটাই স্তব্ধ হয়ে গেছে। সালমা বেগম কাঁপা হাতে ইফানের বাহু শক্ত করে ধরে আছেন। তাঁর চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে।
অনামিকা গালে স্পষ্ট পাঁচ আঙুলের লালচে দাগ ফুটে উঠেছে। ঠোঁটের কোণে বিষাক্ত এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে ইফানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।দাঁতে দাঁত চেপে সে ফিসফিস করে বলল,— "আমার গায়ে হাত তুললি?"
ইফান কিছু বলার আগেই অনামিকা বিদ্যুতের গতিতে তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুই হাত দিয়ে সোজা ইফানের গলা চেপে ধরল। তার ধারালো নখগুলো ইফানের শার্টের কলার ভেদ করে চামড়ায় বসে গেল।রাগে কাঁপতে কাঁপতে অনামিকা হিসহিস করে বলল,— "তুই আমাকে মারলি, ইফান? আমার বন্ধুদের সামনে আমাকে অপমান করলি? আমার গায়ে হাত দেওয়ার সাহস হলো তোর?"
ইফান হতভম্ব হয়ে গেল। সে কল্পনাও করেনি অনামিকা এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে। এক হাতে অনামিকার কবজি ধরে তাকে সরানোর চেষ্টা করলেও জোর করে আঘাত করল না।
দাঁতে দাঁত চেপে বলল,— "ছাড়ো, অনামিকা। এটা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।"
কিন্তু অনামিকা যেন আরও উন্মত্ত হয়ে উঠল। গলার ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলল,— "সীমা? সীমা তুই পার করেছিস! তুই জানিস আমি কে? জানিস আমার বাবা কে?"
সালমা বেগম ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন,— "অনামিকা! ছেড়ে দাও! আমার ছেলেকে!"
ইফানের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। তবুও সে পাল্টা হাত তুলল না। শুধু স্থির চোখে অনামিকার দিকে তাকিয়ে কষ্ট করে বলল,— "আমি... তোমার স্বামী। আর উনি... আমার মা। আমার মাকে অপমান করলে... আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না।"
এই কথাটা যেন অনামিকার রাগে আরও ঘি ঢেলে দিল। সে প্রচণ্ড জোরে ইফানকে ধাক্কা দিল। ভারসাম্য হারিয়ে ইফান সোফার ওপর পড়ে গেল।অনামিকা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে চিৎকার করে উঠল,— "স্বামী? কিসের স্বামী তুই? তুই তো আমার পায়ের জুতার যোগ্যও না! থার্ড ক্লাস একটা লোক
ইফান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো ভিজে উঠেছে। সেটা রাগের নয়—অসহ্য কষ্টের।সে শান্তভাবে নিজের জামার কলারটা ঠিক করল। তারপর অত্যন্ত সংযত কিন্তু কঠিন কণ্ঠে বলল,— "ঠিক আছে, অনামিকা। তুমি আজই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাও। যে বাড়িতে আমার মা অপমানিত হন, সেখানে তোমাকে আর রাখতে পারব না।"
কথাটা শুনে অনামিকা কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে হয়তো ভেবেছিল, ইফান ক্ষমা চাইবে। কিন্তু ইফানের সিদ্ধান্ত দেখে হতভম্ব হয়ে গেলো,,
পরক্ষণেই ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে সে বলল,— "চলে যাব? দেখি, কীভাবে বের করিস আমাকে!"
কথা শেষ করেই সে হনহন করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। দরজাটা প্রচণ্ড জোরে লাগিয়ে দিলোশুধু ড্রইংরুমের এক কোণে সালমা বেগমের চাপা কান্নার শব্দ আর ইফানের ভারী নিঃশ্বাস নীরবতা আর জেবা দুর থেকে দেখে হতভম্ব হয়ে গেলো,,।
____________
বিকেলের মিষ্টি আলোতে শ্রাবন্তীর ঘুম ভাঙল। দুপুরে খেয়ে একটু লম্বা ঘুম দেওয়ার কারণে মাথাধরাটা এখন অনেকটাই ছেড়ে গেছে, শরীরটাও বেশ হালকা লাগছে।
সে আলতো পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে ড্রইংরুম পেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে দেখল এক চমৎকার পারিবারিক দৃশ্য। জিনাত খন্দকার আর ফাইয়ানের ভাবি মিসরি মিলে রাতের রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আর ফারহার কোলে বসে আছে পুচকে মিষ্টি, যে হাত-পা নেড়ে তার মা আর দাদুর রান্নার তদারকি করছে!
শ্রাবন্তী রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বলল, আন্টি... আমি কি একটু সাহায্য করব? এখন আমার শরীরটা একদম ঠিক আছে।"
ফারহা কোল থেকে মিষ্টিকে নামাতে নামাতে শ্রাবন্তীর দিকে তাকিয়ে একগাল হাসল। তবে জিনাত খন্দকার এগিয়ে এসে শ্রাবন্তীর কপালে হাত রাখলেন। ওনার স্পর্শে এক অদ্ভুত মাতৃত্বের ওম ছিল। কিন্তু দৃঢ় গলায় বললেন, "একদম না, শ্রাবন্তী। দুপুরে তোমার ওই অবস্থা দেখার পর তোমাকে এখন কোনো কাজ করতে দেওয়া যাবে না। তোমার শরীর এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। তুমি বরং মিষ্টিকে নিয়ে ড্রইংরুমে গিয়ে বসো, আমরাই বাকিটা গুছিয়ে নিচ্ছি।"
ফারহাও সায় দিয়ে বলল, "হ্যাঁ শ্রাবন্তী, মা ঠিকই বলেছেন। শপিং মলের ওই ধকলের পর তোমার বিশ্রাম দরকার। মিষ্টিকে একটু রাখো, ও তো আমাদের কাজ করতেই দিচ্ছে না!"
মিষ্টিকে কোলে তুলে নিতেই সে শ্রাবন্তীর গলা জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হেসে উঠল। শিশুর নিষ্পাপ হাসিটা শ্রাবন্তীর মনের ওপর এক অদ্ভুত জাদুর মতো কাজ করল।
সে মিষ্টির নরম গালে আলতো করে চুমু খেয়ে সোফায় বসল। মিষ্টি তার পুচকে আঙুল দিয়ে শ্রাবন্তীর কানের দুলটা ধরে টানতে টানতে নিজের আধো-আধো গলায় নানারকম গল্প বলা শুরু করে দিল। শ্রাবন্তী মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওর কথা শুনছিল আর ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর ফারহা রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে এই দৃশ্য দেখে মুচকি হাসল। সে বলল, "দেখেছ মা, মিষ্টি কিন্তু সবাইকে এভাবে পাত্তা দেয় না। ও শ্রাবন্তীকে কত পছন্দ করে ফেলেছে!"
জিনাত খন্দকারও প্লেটে করে কিছু কাটা ফল ড্রইংরুমের টেবিলে এনে রাখলেন। তিনি শ্রাবন্তীর দিকে তাকিয়ে পরম স্নেহে বললেন, "মিষ্টির সাথে থাকলে সব ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে যায়। তুমি ওর সাথে গল্প করো শ্রাবন্তী, আর এই ফলগুলো একটু খেয়ে নাও।"
ড্রইংরুমের সেই শান্ত আর স্নিগ্ধ পরিবেশটা মুহূর্তের মধ্যে বিষিয়ে উঠল সায়মা বেগম আর সৃষ্টির আগমনে। সৃষ্টি হনহন করে ড্রইংরুমে ঢুকেই কোনো কিছু না ভেবে, অত্যন্ত রুক্ষভাবে শ্রাবন্তীর কোল থেকে মিষ্টিকে এক ঝটকায় কেড়ে নিল। আচমকা এই অনাকাঙ্ক্ষিত টানে পুচকে মিষ্টি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে বিকট শব্দে কেঁদে উঠল। ফারহা রান্নাঘর থেকে মিষ্টির কান্নার আওয়াজ শুনে কিছু বুঝে ওঠার আগেই, সায়মা বেগম শ্রাবন্তীর দিকে তীব্র ঘৃণা আর হিংসাভরা চোখে তাকিয়ে চড়া গলায় চিৎকার করে উঠলেন।
সায়মা বেগম দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, "অনেক হয়েছে! আর কত ন্যাকামি আর নাটক দেখাবে তুমি এই বাড়িতে? দুপুরের শপিং মলে আমার মেয়ের হবু বরের মাথা চিবিয়ে খেয়েছ, ফাইয়ানকে নিজের হাতের পুতুল বানানোর চেষ্টা করেছ, আর এখন আবার এই বাড়ির বাচ্চার ওপর মায়া দেখিয়ে ভালো সাজার চেষ্টা করছ? তোমার মতো একটা অপয়া, মেয়েকে আমার দেখতেও ঘেন্না লাগে!"
কথাটা শেষ হতে না হতেই সৃষ্টি আর সায়মা বেগম দুজনে মিলে শ্রাবন্তীর দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরলেন। শ্রাবন্তী দুপুরের ধকলের পর এমনিতেই শারীরিকভাবে দুর্বল ছিল, সে কিছু বুঝে ওঠার বা নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই তারা তাকে সোফা থেকে টেনে হিঁচড়ে দাঁড় করাল। সৃষ্টির নখের আঁচড় শ্রাবন্তীর নরম ত্বকে বসে গেল, কিন্তু সেদিকে সৃষ্টির কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। তারা দুজনে মিলে শ্রাবন্তীকে দরজার দিকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল।
শ্রাবন্তী ব্যথায় ও অপমানে কুঁকড়ে উঠে কোনোমতে বলল, "চাচি, প্লিজ আমার কথা শুনুন... আমি তো কোনো অপরাধ করিনি..."
"মুখ বন্ধ করো একদম! তোমার কোনো কৈফিয়ত শোনার সময় আমাদের নেই!" সৃষ্টি আর সায়মা বেগম একসঙ্গে গর্জে উঠলেন। শ্রাবন্তী যে নিজের পক্ষে দুটো কথা বলবে বা নিজের আত্মপক্ষ সমর্থন করে কোনো প্রতিবাদ করবে, সেই ন্যূনতম সুযোগটুকুও তারা তাকে দিল না। তার প্রতিটি আকুতি আর কথাকে সৃষ্টির চড়া গলার চিৎকারের নিচে পিষে ফেলা হলো।
রান্নাঘর থেকে ফারহা আর জিনাত খন্দকার মিষ্টির কান্না আর এই হট্টগোল শুনে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। ফারহা সৃষ্টিকে থামানোর জন্য তীব্র গলায় চেঁচিয়ে উঠল, "চাচি! সৃষ্টি! কী করছ এসব? পাগল হয়ে গেছ তোমরা? হাত ছাড়ো ওর!"
জিনাত খন্দকারও এগিয়ে আসতে চাইলেন, কিন্তু সায়মা বেগম ও সৃষ্টি ততক্ষণে শ্রাবন্তীকে সদর দরজার কাছে নিয়ে গেছেন।শ্রাবন্তীর চোখের কোণ বেয়ে তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে, নিজের ওপর হওয়া এই চরম অন্যায়ের বিরুদ্ধে সে পুরোপুরি অসহায়।
সায়মা বেগম আর সৃষ্টি কোনো কথা না শুনে শ্রাবন্তীকে দরজার বাইরে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিল। শ্রাবন্তী বারান্দার মেঝেতে ছিটকে পড়ল। সে কিছু বলার বা উঠে দাঁড়ানোর আগেই সৃষ্টি ভেতরের ভারী কাঠের দরজাটা সজোরে টেনে বন্ধ করে দিল।
পর মুহূর্তেই খটখট শব্দে দরজায় ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হলো। শুধু তাই নয়, সায়মা বেগম ড্রইংরুমের বাকি জানালা এবং ভেতরের লকের চাবিগুলো নিজের মুঠোয় পুরে নিলেন, যেন বাড়ির অন্য কেউ হুট করে বাইরে গিয়ে শ্রাবন্তীকে ভেতরে ফিরিয়ে আনতে না পারে।
ভেতর থেকে জিনাত খন্দকার আর ফারহা দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে চিৎকার করতে লাগলেন। ফারহা রাগে ফেটে পড়ে বলল, "চাচি, চাবি দেও! এই লক খোলো! আপনারা একটা মানুষের সাথে এতটা অমানুষিক আচরণ করতে পারো না!"
কিন্তু সায়মা বেগম চাবিটা শক্ত করে ধরে রেখে শীতল গলায় বললেন, "কেউ এই দরজা খুলবে না। আজ ফাইয়ান আসুক, বড় কর্তা আসুক আমি কথা বলবো,,
______________
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে শ্রাবন্তী কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল। ভেতর থেকে ভেসে আসছে ফারহার চিৎকার, জিনাত খন্দকারের অসহায় কণ্ঠস্বর। কিন্তু সেই ভারী কাঠের দরজার ওপারেই থাকলো।ধীরে ধীরে সে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াল।
বারান্দার ঠান্ডা মেঝেতে পড়ে যাওয়ায় তার কনুই ছিঁড়ে গেছে, হাতের কবজিতে লাল দাগ ফুটে উঠেছে। কিন্তু শরীরের ব্যথার চেয়ে বুকের ভেতরের কষ্টটা হাজার গুণ বেশি।সে একবার শেষবারের মতো বন্ধ দরজাটার দিকে তাকাল।
চোখ বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।নিজের মনেই খুব শান্ত স্বরে বলল,— "আর না... অনেক হয়েছে।"
কথাটা বলেই ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
এই বাড়িতে আসার পর কত অপমান, কত অবহেলা, কত ভুল বোঝাবুঝি—সবকিছু আজ একসঙ্গে মনে পড়তে লাগল।
সে কখনো কাউকে কষ্ট দিতে চায়নি।কারও সংসার ভাঙতে চায়নি।কারও ভালোবাসা কেড়ে নিতে চায়নি।তবুও প্রতিটা মুহূর্তে তাকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে।
সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে সে একবার আকাশের দিকে তাকাল।
সূর্যটা পশ্চিমে হেলে পড়েছে। আকাশজুড়ে লালচে আভা।
শ্রাবন্তী চোখের জল মুছে নিল।তার কণ্ঠে আর কোনো কান্না নেই, ছিল শুধু ভাঙা হৃদয়ের এক নীরব দৃঢ়তা।— "আজ থেকে আর কারও বোঝা হয়ে থাকব না। যে বাড়িতে আমার সম্মান নেই, সেখানে আমার থাকারও কোনো অধিকার নেই।"
সে ধীরে ধীরে গেট খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।একবারও পেছন ফিরে তাকাল না।
পথের পাশে দাঁড়িয়ে সে নিজের ওড়নার আঁচলটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।কোথায় যাবে, কী করবে—তার কিছুই জানা নেই।
তবু আজ সে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।সে আর কখনো খন্দকার বাড়িতে ফিরবে না।
______________
হাসপাতালে ছাদে ইশানি দাঁড়িয়ে আছে তার খুব মনে পড়ল শ্রাবন্তীর কথা।বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।"আপু... তুমি এখন কোথায়?"
ইশানি জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে মনে বলতে লাগল,
"আজ যদি তুমি আমার পাশে থাকতে! আমি এতটা ভেঙে পড়তাম না। ছোটবেলা থেকে যখনই কোনো বিপদ এসেছে, তুমিই তো আমাকে আগলে রেখেছ। আজ আব্বু হাসপাতালে, আর তুমি... তুমি কোথায় আছো সেটাই জানি না।"
শ্রাবন্তীর হাসিমাখা মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠতেই ইশানির চোখের পানি আর বাঁধ মানল না।
সে ফিসফিস করে বলল,— "আপু... তুমি কি ঠিক আছো? খেয়েছো? তোমার শরীরটা কেমন আছে? কেউ কি তোমার যত্ন নিচ্ছে, নাকি তুমিও আমার মতো একা একা কাঁদছো?"
তার বুকটা হুহু করে উঠল।— "আল্লাহ... আমার আপুকে যেখানে রেখেছেন, তাকে নিরাপদে রাখুন। শুধু একবার... একবার যেন তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেন।
তানিয়া ইশানির কাঁধে আলতো করে হাত রাখল।— "ইনশাআল্লাহ, শ্রাবন্তী আপুও ফিরে আসবে, আর আঙ্কেলও সুস্থ হয়ে যাবেন। তুই ভেঙে পড়িস না।"
ইশানি চোখের পানি মুছে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। কিন্তু তার মন বারবার একই প্রশ্নে আটকে রইল—"আপু... তুমি কোথায়?"
___________
নিজের কেবিনে ল্যাপটপের সামনে গম্ভীর মুখে বসে ছিল ফাইয়ান। তার সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল, কিন্তু কোনো কাজেই যেন মন বসছে না।
ঠিক তখনই দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকল নাভিদ।
ফাইয়ানের সামনে এসে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে দাঁড়িয়ে থেকে সে ধীর গলায় বলল, "ভাই... একটা কথা বলব?"
ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই ফাইয়ান বলল,— "বলো।"
নাভিদ একটু ইতস্তত করে বলল,— "আপনার কী মনে হয়... সৃষ্টি ম্যাডাম শ্রাবন্তী ম্যাডামকে কিছুই বলবেন না?"
নাভিদের কথা শুনে ফাইয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে ধীরে ধীরে ল্যাপটপটা বন্ধ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে কেবিনের বড় কাঁচের জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিচে ব্যস্ত শহরের আলো ঝলমল করছে, কিন্তু তার চোখে-মুখে শুধু উদ্বেগের ছাপ।নাভিদ ফাইয়ানের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,— "ভাই, শপিং মলের ঘটনার পর সৃষ্টি ম্যাডামের যে রূপ দেখলাম... আমার কেন যেন মনে হচ্ছে বাড়িতে কোনো অঘটন ঘটে গেছে। উনি আর সায়মা আন্টি যে মানুষ, শ্রাবন্তী ম্যাডামকে সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন।"
ফাইয়ান কোনো উত্তর দিল না। পকেট থেকে ফোন বের করে একে একে বাড়ির কয়েকজনকে কল করল।
একবার...
দু'বার...
তিনবার...
কিন্তু কারও ফোনই রিসিভ হলো না।ফাইয়ানের কপালের রগ ফুলে উঠল। বিরক্তিতে ফোনটা টেবিলের ওপর ছুড়ে রেখে সে নাভিদের দিকে তাকাল।তার কণ্ঠে তখন বরফশীতল কঠোরতা।— "আমি সৃষ্টি আর চাচির স্বভাব খুব ভালো করেই জানি, নাভিদ। ওরা যদি আজ বাড়িতে কোনো নাটক তৈরি করার চেষ্টা করে, তাহলে ওই বাড়িতে এমন এক ঝড় উঠবে, যেটা ওরা নিজেরাও সামলাতে পারবে না।"
ফাইয়ান আবার বললো:আশা রাখছি কিছুই করবে না বাড়িতে মম আছে তো,
________________
পরশ গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত শক্ত করে ধরে জ্যামের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হরেছিল, কিন্তু ঠিক তখনই রাস্তার পাশে বসা মেয়েটার ওপর নজর পড়তেই তার পুরো দুনিয়া যেন এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল!
মেয়েটার পরনে সাধারণ একটা থ্রি-পিস, চুলে সেই চেনা বাঁধন নেই, পুরো অবয়ব জুড়েই এক বুকভাঙা ক্লান্তি আর অসহায়ত্ব। পরশ নিজের চোখ দুটোকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। হসপিটালের সেই ডানপিটে, কড়া মেজাজের ইশানি, যে কি না কথায় কথায় চড় মারে আর ধড়িবাজির গল্প করায় ওস্তাদ, সে এভাবে ধুলোবালির মাঝে ফুটপাথে একা বসে থাকবে?
নিজের শরীরের তপ্ত জ্বর আর ক্লান্তি ভুলে, পরশ এক ঝটকায় গাড়ির দরজা খুলে সোজা নেমে পড়ল। জ্যামে আটকে থাকা অন্য গাড়িগুলোর হর্নের আওয়াজ ছাপিয়ে সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল মেয়েটার দিকে।
মেয়েটা তখনো বেঞ্চিতে বসে আছে। পরশ তার ঠিক সামনে এসে দাড়ালো। তার চিরচেনা ফাজলামি বা চতুর হাসির লেশমাত্র নেই মুখে, সেখানে এখন শুধু এক আকাশ উদ্বেগ আর মায়া। সে অত্যন্ত আকুল আর নরম গলায় ডাক দিল—
"ইশানি?"
হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো পরশ পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাল—হসপিটাল থেকে অত্যন্ত জরুরি একটা কল এসেছে। জ্যামের হট্টগোল আর চারপাশের হর্নের আওয়াজ এড়াতে সে কিছুটা অন্যদিকে ঘুরে, কানের কাছে ফোনটা চেপে ধরে কথা বলতে শুরু করল। ওপাশ থেকে আসা জরুরি নির্দেশনাগুলো শুনতে শুনতে তার পুরো মনোযোগ ফোনের দিকে চলে গেল।
কথা শেষ করে ফোনটা কেটে সে যেই না আবার সোজা হয়ে সামনের দিকে তাকাল,সামনে কেউ নেই! মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য অন্যদিকে ঘুরে কথা বলার সুযোগে মেয়েটি ফুটপাথ থেকে উধাও হয়ে গেছে। পরশ ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়িয়ে চারদিকের ভিড়ের মধ্যে চোখ বুলাল, কিন্তু ওই থ্রি-পিস পরা মেয়েটি জ্যামের মাঝে থাকা শত শত মানুষের ভিড়ে কোথায় যেন নিমেষেই মিলিয়ে গেছে।
"ইশানি!" বলে সে দু-কদম এগিয়ে গেল, কিন্তু চারপাশের গাড়ির হর্ন আর মানুষের হট্টগোলে তার ডাক ঢাকা পড়ে গেল। মেয়েটি যেন এক মুহূর্তের মধ্যে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
পরশ চরম অবাক আর এক বুক অস্থিরতা নিয়ে কপালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শরীরটা জ্ব, তার ওপর এই আকস্মিক ও অদ্ভুত কাণ্ড তাকে পুরো বিভ্রান্ত করে দিল। আর কোনো উপায় না দেখে, সে অত্যন্ত বিমূঢ় হয়ে ধীর পায়ে আবার নিজের গাড়ির দিকে ফিরে এল। দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে বসে সে স্টিয়ারিংয়ের ওপর হাত রেখে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার মনের ভেতর তখন কেবলই একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—ইশানি আমাকে দেখে কথা না বলেই চলে গেলো,,?
____________
রাত আটটার ঘরে বাড়ি ফিরে পুরো ঘটনাটা শোনা মাত্রই ফাইয়ানের মাথায় যেন আগুন ধরে গেল। তার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল, হাতের মুঠো শক্ত হয়ে কাঁপতে লাগল।
ফাইয়ান প্রচণ্ড রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সোজা জিনাত খন্দকার আর ফারহার দিকে তাকাল। তার চিৎকার আর ক্ষোভ যেন পুরো ঘরের দেওয়ালে আছড়ে পড়ল। সে ফারহা আর তার নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে চাবুকের মতো ধারালো গলায় গর্জে উঠল:তোমরা থাকতে এটা কীভাবে হলো? ফারহা! মা! তোমরা দুজনে বাড়িতে থাকা সত্ত্বেও সৃষ্টি আর চাচি মিলে একটা মেয়েকে এইভাবে ঘাড় ধরে রাস্তায় বের করে দিল, আর তোমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলে? কেন তোমরা ওদের থামাওনি? কী করছিল তখন তোমাদের হাত দুটো?"
ফারহা ভাইয়ার এই রুদ্ররূপ দেখে ভয়ে আরও জোরে কেঁদে উঠল। সে কাঁপতে কাঁপতে নিজের মায়ের দিকে ইশারা করে বলল, "ভাইয়া, আমরা তো থামাতে চেয়েছিলাম! কিন্তু চাচি ড্রইংরুমের সব জানালা আর সদর দরজার চাবি নিজের মুঠোয় পুরে নিয়ে লক করে দিয়েছিলেন! আমরা দরজায় ধাক্কা দিয়ে চিল্লাতে চিল্লাতেই ওরা শ্রাবন্তীকে বাইরে ফেলে দরজা আটকে দিল!"
ফাইয়ান রাগে পুরোপুরি অন্ধ হয়ে সৃষ্টির দিকে এগিয়ে গেল। তার বজ্রকণ্ঠে পুরো ড্রইংরুম কেঁপে উঠল, "সৃষ্টি! জবাব দাও আমাকে! কোন সাহসে তুমি এই কাজ করলে?"
কথাটা শেষ করেই নিজের ভেতরের প্রচণ্ড ক্ষোভ আর আগুন সামলাতে না পেরে ফাইয়ান টেবিলের ওপর থাকা দামি কাঁচের শোপিসগুলো এক ঝটকায় ফ্লোরে ছুড়ে মারল। ঝনঝন শব্দে শোপিসগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল ড্রইংরুমের মেঝেতে। তার এই চন্ডাল রূপ দেখে সৃষ্টি আর সায়মা বেগম ভয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেলেন। ফাইয়ান যেন একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি, যা এই মুহূর্তে পুরো খন্দকার বাড়িকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারে। সে হাতের কাছে থাকা আরও কিছু শোপিস ভাঙার জন্য হাত বাড়াল।
ঠিক তখনই ড্রইংরুমের প্রবেশদ্বারে এসে দাঁড়ালেন ফাইয়ানের বাবা, তৌসিফ খন্দকার।তিনি অত্যন্ত গম্ভীর এবং ভারী গলায় ছেলেকে ধমক দিয়ে উঠলেন, "স্টপ ইট, ফাইয়ান! রাগ দিয়ে কোনো সমস্যার সমাধান হয় না।"
তৌসিফ খন্দকার ধীর পায়ে ছেলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। ফাইয়ানের কাঁপতে থাকা কাঁধে একটা শক্ত হাত রেখে অত্যন্ত ঠান্ডা এবং শান্ত গলায় বললেন, "নিজেকে শান্ত করো, ফাইয়ান। এই ঘরের জিনিসপত্র ভাঙলে বা এখানে দাঁড়িয়ে চিল্লাচিল্লি করলে মেয়েটা ফিরে আসবে না। রাতের অন্ধকার বাড়ছে, মেয়েটা একা আছে। রাগ দেখানোর অনেক সময় পাবে, এখন আসল কাজটা করো। আগে ওকে খুঁজে বের করো।"
বাবার এই শান্ত কিন্তু দূরদর্শী কথাগুলো ফাইয়ানের মাথায় গিয়ে লাগল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের রাগকে কোনোমতে চেপে ধরল। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ভাঙা কাঁচের টুকরো আর সৃষ্টির ফ্যাকাশে মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে সে তৌসিফ খন্দকারের দিকে মাথা নাড়ল।
ফাইয়ান আর এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে নাভিদের দিকে ইশারা করল এবং দ্রুত পায়ে খন্দকার বাড়ির সদর দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল শ্রাবন্তীকে খুঁজতে।
_________
গাড়িতে বসেই ফাইয়ান এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। তার হাত দুটো রাগে আর উদ্বেগে তখনো কাঁপছিল। সে দ্রুত শ্রাবন্তীর ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করার চেষ্টা করল। ভাগ্য ভালো যে শ্রাবন্তীর কাছেই ছিলো ফোনের জিপিএস তখনো অন ছিল।
স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই ফাইয়ানের চোখ আটকে গেল। লোকেশন দেখাচ্ছে শহরের প্রধান বাস স্টপের কাছাকাছি একটা এলাকায়।
"নাভিদ! বাস স্টপের দিকে নাও, জলদি!" ফাইয়ান চিৎকার করে উঠল।
নাভিদ আর কিছু না ভেবে গাড়ির এক্সিলারেটরে পুরো চাপ দিল। মার্সিডিজটা রাতের অন্ধকার আর ট্রাফিক চিরে তীব্র গতিতে বাস স্টেশনের উদ্দেশ্যে ছুটে চলল। ফাইয়ান জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে মনে শুধু একটাই প্রার্থনা করছিল—"শ্রাবণ, প্লিজ কোথাও যেও না। আর মাত্র কয়েকটা মিনিট নিজের খেয়াল রেখো, আমি আসছি।"
বাস স্টেশনে পৌঁছানো মাত্রই গাড়ি থেকে প্রায় ঝাঁপিয়ে নেমে পড়ল ফাইয়ান। চারপাশের চিল্কার, বাসের হর্ন আর চোর-পকেটমারদের ভিড়ের মধ্যে সে পাগলের মতো শ্রাবন্তীকে খুঁজতে লাগল। প্রতিটি বাসের কাউন্টারে, ওয়েটিং রুমে, এমনকী আশেপাশে যতদূর চোখ সে খুঁজলো। কিন্তু কোথাও তার 'শ্রাবণ' নেই।
লোকেশন দেখানোর পরও শ্রাবন্তীকে না পেয়ে ফাইয়ানের ভেতরের সব শক্তি যেন এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। কোলাহলপূর্ণ বাস স্টপের নোংরা মেঝের ওপরই দুই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
চোখ ফেটে তার জল বেরিয়ে আসতে চাইল। নিজের ওপর তীব্র ক্ষোভ আর অপরাধবোধে ফেটে পড়ে সে চিৎকার করে উঠল, "It's all because of my mistake! সব আমার ভুলের জন্য হয়েছে!"
বলেই সে প্রচণ্ড রাগে আর হতাশায় নিজের ডান হাতটা মুষ্টিবদ্ধ করে পাশের একটা শক্ত লোহার পিলারে সজোরে আঘাত করল। চামড়া ছিঁড়ে হাত থেকে রক্ত ফোঁটায় ফোঁটায় মেঝেতে পড়তে লাগল, কিন্তু মনের ভেতরের তীব্র যন্ত্রণার কাছে ফাইয়ান সেই শারীরিক আঘাতের কোনো ব্যথাই অনুভব করতে পারল না। ওদিকে নাভিদ দূর থেকে ফাইয়ানের এই অবস্থা দেখে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
"আপনি!"
আচমকা এক পরিচিত, ক্লান্ত অথচ মধুর কণ্ঠস্বর ফাইয়ানের কানে এসে পৌঁছাল। ফাইয়ান ধড়ফড় করে মাথা তুলে তাকাল। তার ঝাপসা হয়ে আসা চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে শ্রাবন্তী! ওড়নাটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বিষণ্ন চোখে সে তাকিয়ে আছে ফাইয়ানের দিকে।
"আপনি এখানে?" শ্রাবন্তীর এই অল্প কটা কথা শেষ হওয়ার ন্যূনতম সুযোগটুকুও ফাইয়ান দিল না।
সে কোনো কিছু না ভেবে, মানুষের ভিড়ের কথা পুরোপুরি ভুলে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল। পরক্ষণেই সে শ্রাবন্তীকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যেন এই মেয়েটিকে সে আর কোনোদিন, কোনো অবস্থাতেই নিজের থেকে দূরে যেতে দেবে না।
ফাইয়ানের শক্ত বাঁধনে আটকে গিয়ে শ্রাবন্তী স্তব্ধ হয়ে গেল। ফাইয়ানের শরীর তখনো রাগে আর ভীতিতে কাঁপছে,ফাইয়ান শ্রাবন্তীর কাঁধে মুখ গুঁজে এক অদ্ভুত স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলতে লাগল, "কোথায় চলে গিয়েছিলে তুমি? জানো আমার কী অবস্থা হচ্ছিল?"
আচ্ছা অনেকেই বলছে ফাইয়ান এর চরিত্র না কি পছন্দ হচ্ছে না,, (কালকে পর্বে দুটোকে বিয়ে করিয়ে দিবো) ভালো করে বলো জুটি হিসেবে কাকে কাকে চাও (পরশ-ইশানি)(ইশানি-ফাইয়ান) (শ্রাবন্তী -ফাইয়ান) (সৃষ্টি -ফাইয়ান)

0 Comments