অপরাজিতা

অপরাজিতা


আরাফাতের সেই মেসেজের পর তিন দিন কেটে গেছে।
নীলা প্রতিদিন অপেক্ষা করত।
হয়তো আজ ফোন করবে...
হয়তো বলবে, "আমি সব সামলে নিয়েছি।"
কিন্তু না।
প্রতিবার ফোন করলে আরাফাত শুধু বলত,
— "আর একটু সময় দাও, প্লিজ।"
নীলা বিশ্বাস করত। কারণ পাঁচ বছরের ভালোবাসাকে সে মিথ্যা ভাবতে পারেনি।
এক বিকেলে নীলা বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিল।
হঠাৎ তার চোখ পড়ল একটি বড় গয়নার দোকানের সামনে।
আরাফাত...
সে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু একা নয়।
তার পাশে এক অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে। দামি শাড়ি, গয়না, আর চারপাশে কয়েকজন আত্মীয়।
মেয়েটি হেসে আরাফাতের হাতে একটি আংটি পরিয়ে দিল।
আরাফাতও হাসল।
সেই হাসিটা একসময় শুধু নীলার জন্য ছিল।
নীলার পা যেন থেমে গেল।
সে দূর থেকে সবকিছু দেখছিল, কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছিল না।
ঠিক তখনই পাশের দুজনের কথা তার কানে এল।
— "জানো, মেয়েটার বাবা বড় ব্যবসায়ী।"
— "আরাফাতের ভাগ্য খুলে গেছে। বিয়েতে নাকি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট আর নতুন গাড়িও দিচ্ছে!"
নীলার বুকের ভেতরটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল।
সে কাঁপা হাতে আরাফাতকে ফোন করল।
প্রথমবার...
দ্বিতীয়বার...
তৃতীয়বার...
কোনো উত্তর নেই।
কিছুক্ষণ পর একটি ছোট্ট মেসেজ এল।
**"আমি পরে কথা বলছি।"**
সেদিন রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ভাইরাল হলো।
**"আরাফাত ও ইরার আংটি বদল সম্পন্ন। সবাই দোয়া করবেন।"**
ছবিটা দেখে নীলার হাত থেকে ফোনটা মেঝেতে পড়ে গেল।
সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
যে মানুষটা কয়েক দিন আগেও বলেছিল "সব ঠিক হয়ে যাবে", সেই মানুষটাই অন্য কারও আঙুলে আংটি পরিয়ে দিয়েছে।
নীলার মা দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
নীলা শুধু একটাই প্রশ্ন করল—
— "মা... আমি কি শুধু সুন্দর ছিলাম না বলেই হারিয়ে গেলাম?"
মায়ের চোখেও পানি।
কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর তার কাছেও ছিল না।
সেদিন গভীর রাতে আরাফাতের ফোন এল।
অনেকক্ষণ রিং হওয়ার পর নীলা ফোন ধরল।
ওপাশ থেকে ভেসে এল ঠান্ডা একটি কণ্ঠ—
— "নীলা... আমাদের সম্পর্কটা এখানেই শেষ করি। মা-বাবার সিদ্ধান্তের বাইরে আমি যেতে পারব না। ইরাকে বিয়ে করছি। তুমি আমাকে ভুলে যাও।"
কথাগুলো শেষ হতেই ফোন কেটে গেল।
এক ফোঁটা চোখের পানি নীরবে গড়িয়ে পড়ল নীলার গাল বেয়ে।
সেই রাতেই সে নিজের ঘরের সব ছবি, সব উপহার, সব চিঠি একত্র করে একটি বাক্সে ভরে আলমারির নিচে রেখে দিল।
তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাঙা কণ্ঠে বলল—
**"আজ আমার ভালোবাসার মৃত্যু হলো... কিন্তু হয়তো আজই নতুন নীলার জন্ম হতে যাচ্ছে।"**
আরাফাতের বিয়ের পর পুরো এক মাস নীলা ঘর থেকে প্রায় বেরই হয়নি।
যে মেয়েটা সবসময় হাসিখুশি থাকত, সে এখন আয়নার সামনেও দাঁড়াত না।
আত্মীয়রা এসে বলত,
— "মেয়েটার ভাগ্যটাই খারাপ।"
কেউ আবার ফিসফিস করে বলত,
— "আরাফাত ঠিকই করেছে। এত সুন্দর ছেলে, ওর পাশে আরও সুন্দর মেয়েই মানায়।"
কথাগুলো নীলার কানে যেত।
প্রতিটি শব্দ তার হৃদয়ে নতুন করে আঘাত করত।
একদিন রাতে সে আলমারির নিচ থেকে সেই পুরোনো বাক্সটা বের করল।
আরাফাতের দেওয়া ঘড়ি, জন্মদিনের কার্ড, একসঙ্গে তোলা ছবিগুলো...
একটার পর একটা হাতে নিল।
চোখে আবারও পানি চলে এল।
ঠিক তখনই তার বাবা ঘরে ঢুকলেন।
চুপচাপ মেয়ের পাশে বসে বললেন,
— "যে মানুষ তোর মূল্য বুঝল না, তার জন্য নিজের জীবন নষ্ট করবি?"
নীলা কোনো উত্তর দিল না।
বাবা আবার বললেন,
— "একদিন এমন মানুষ হবি, যেদিন মানুষ তোর সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলার জন্যও অপেক্ষা করবে।"
কথাগুলো নীলার বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করল।
সেই রাতেই সে একটা খাতা বের করল।
প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরে লিখল—
**"আমাকে আর কেউ করুণা করবে না।"**
তার নিচে আরও তিনটি লাইন লিখল—
✔ নিজের পায়ে দাঁড়াব।
✔ এমন সফল হব, যেন পরিচয় আমার সাফল্য হয়।
✔ কোনো দিন আর নিজের মূল্য অন্যের হাতে তুলে দেব না।
পরদিন ভোরে, অনেকদিন পর সূর্য ওঠার আগেই নীলা ঘুম থেকে উঠল।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকাল।
আজ তার চোখে কান্না ছিল না।
ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
সে নিজের সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দিল।
ফোন থেকে আরাফাতের নম্বর মুছে ফেলল।
তারপর ল্যাপটপ খুলে চাকরির আবেদন, অনলাইন কোর্স আর নতুন দক্ষতা শেখার তালিকা তৈরি করতে শুরু করল।
সেদিনই সে নিজেকে একটা প্রতিশ্রুতি দিল—
**"একদিন তুমি নিজেই আমার খবর খুঁজবে। কিন্তু সেদিন আমার কাছে পৌঁছাতে তোমার নাম নয়, অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগবে।"**
সেই মুহূর্তে নীলা জানত না...
তার এই ছোট্ট সিদ্ধান্তই একদিন তাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে, যেখানে দাঁড়িয়ে অতীতের সব অপমান খুব ছোট মনে হবে।

Post a Comment

0 Comments