মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী

মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী

দেখতে দেখতে সময় গড়িয়েছে দুই মাস।রোদেলার এসএসসি পরিক্ষার আজ শেষ দিন।আহিয়ান আর শিবলী ঈদের তৃতীয় দিনেই তাদের কর্মস্থলে ফিরে গিয়েছিল। আহিয়ান সেখানে চলে যাবার একদিন পর মাশরিফারা রাজশাহী সদরের তাদের বাসায় ফিরে এসেছিল। আহিয়ান কর্মস্থলে পুনরায় যোগ দেওয়ার পর থেকে বাসায় ফিরেনি একবারও। মাঝে মাঝে ফোনে সে মাশরিফা আর জাবির সাহেবর সাথে কথা বলে।তবে এই দুই মাসে রোদেলার সাথে একবারও কথা হয়নি।

রোদেলাকে জাবির সাহেব নয়তো মাশরিফা পরিক্ষা দিতে নিয়ে যায় আবার নিয়ে আসে। দুই দিন অন্বেষা আর অবন্তিও গিয়েছিল ছোট ভাইয়ের বউ এর সাথে।তারা তাদের বাসায় চলে গিয়েছিল রাজশাহীতে ফিরেই। জয় আর অন্তুর বাবা দেশে ফিরে আসায় তারা এখানে আর থাকতে পারেনি।তার উপর নিজেদেরও কলেজে ক্লাস নিতে হয়। এই করণে চলে গিয়েছিল।
সকাল ৯:২৫ বাজছে।রোদেলা জাবির সাহেবের সাথে গাড়িতে করে পরিক্ষার কেন্দ্রে যাচ্ছে। রোদেলার ছোট্ট মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে আছে ।এত গুলো দিনে একদিনও আহিয়ান তার খোঁজ করলো না, ভাবতেই তার যখন তখন কান্না পায়। এই যেমন এখন গাড়িতে বসে বসেই দুই মাসের ঘটা ঘটনা গুলো স্মরণ করেই মেয়েটার চোখ দুইটা কেমন টলমলে হয়ে উঠেছে।রোদেলা হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানিটুকু মুছতে মুছতে বলল,
----" আপনি আমার এই ক্ষুদ্র জীবনের এক অমীমাংসিত অধ্যায়, মেজর সাহেব। যে অধ্যায়ের শুরুটা হয়েছিল আকস্মিক, কিন্তু শেষটা আজও রহস্যেই থেকে গেল। কিছু অনুভূতি, অসমাপ্ত প্রশ্ন হয়ে বুকের গভীরে থেকে যায়। আপনি আমার কাছে ঠিক তেমনই এক অনুভূতির নাম ।"
________
সেদিন রামিশা যখন রোদেলাকে চড় মেরেছিল,সেটা কারো নজরে না পরলেও জাবির সাহেবের নজরে পড়েছিল। রোদেলা কেঁদে কুটে বেরিয়ে আসার পর জাবির সাহেব এ নিয়ে পুরো বাড়ি মাথায় তুলেছিল।কত বড় সাহস তার বউমাকে তার বাহিরের একটা মেয়ে চড় মারে। আহিয়ানকে ডেকে এনেও ধমকে পুরো বাড়ি মায়া তুলেছিলেন তিনি। রামিশা তখন লজ্জায় কাচুমুচু করছিল কেবল। মাশরিফাও এ নিয়ে রামিশাকে ইচ্ছা মতো কথা শুনিয়েছিল। রাফতান রশিদ মেয়ের এরকম উদ্ভট কাজে লজ্জা পেয়ে মেয়েকে নিয়ে সেদিনই ফিরে গিয়েছিল।তবে রামিশা ফিরে যাওয়ার আগে তার সাথে এক অঘটন ঘটেছিল। কে যেন রামিশার ওয়াশরুমে এক পলিথিন ভরে তেলাপোকা রেখে এসেছিল, ওয়াশরুমে যাওয়ার পর তেলাপোকাকে কিলবিল করে উড়ে উড়ে নিজের গায়ের উপর বসতে দেখে মেয়েটা এক চিৎকারে পুরো বাড়ি মায়ায় তুলেছিল।তারপর ভয় পেয়ে ওয়াশরুম থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসার সময় পিচ্ছিল মেঝেতে ধপ্পাস করে পড়ে গিয়ে বেচারী পা ভেঙে ফেলেছিল। রামিশার চিৎকারে সবাই সেখানে পৌঁছে রামিশাকে উদ্ধার করলেও আহিয়ান এই মেয়ের ধারে কাছেও ঘেঁষেনি। রামিশাকে সেখান থেকে হসপিটালে নিয়ে যাবার পর,হসপিটাল থেকেই মেয়েকে নিয়ে নিজেদের বাড়ি ফিরে গিয়েছিল রাফতান রশিদ।
__
রোদেলার পরিক্ষা শুরু হয়েছে সকাল দশটায়।সয় গড়িয়ে এখন দুপুর একটা বাজছে। জাবির আর মাশরিফা পুত্রবধূর জন্য অপেক্ষা করছে।রোদেলাকে চমকে দিতে মাশরিফাও এসেছে। রোদেলা তার বান্ধবীদের সাথে কথা বলতে বলতে বের হচ্ছিল। সামনেই শশুড় শাশুড়িকে একসাথে পেয়ে মনটা তার খুশিতে লাফিয়ে উঠলো যেন। মাশরিফা আর জাবির সাহেবের কাছে রোদেলা পুত্রবধূ কম মেয়েই বেশি। তাদের সন্তান তিন জনই নিজেদের চাকরী বা সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকে,রোদেলা তাদের কাছে থাকায় তাদের বেশ ভালোই সময় কেটে যায় এই মেয়েকে নিয়ে।বাবা-মা হিসাবে এই ছোট মেয়ের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে দুইজন।
রোদেলা, ইনায়া আর তানিয়াকে ইশারা করে বলল,
----" আমার আম্মু আব্বু এসেছে। আমি গেলাম টাটা।তোদের সাথে কাল দেখা হবে বুঝলি। ঘুরতে বের হবো কিন্তু। আজ যায়। "
মেয়েটা খুশিতে গদগদ করতে করতে মাশরিফা আর জাবির সাহেবকে ডাক দিল,
----" আম্মুউউ, আব্বুউউউ "
মাশরিফা আর জাবির সাহেব রোদেলাকে একদম নিজের মেয়ের মতো আগলে রাখতে রাখতে তাদের এই মেয়েটার প্রতি এত মায়া জন্মেছে যে,এই মেয়ে চোখের আঁড়াল হলেই তাদের দম ফুরাবে বুঝি। তাই তো কেমন এক সাথে দুইজনেই চলে এসেছে ছোট মেয়েটাকে সারপ্রাইজ দিতে।
মাশরিফার ৫ ফুট ৭ ইঞ্চির লম্বা গড়ন,আর ধবধবে ফর্সা শরীরে হালকা মিষ্টি কালারের একটা তাতের শাড়ি। সাথে ম্যাচিং ব্লাউজ আর হিজাব বাঁধা। আহিয়ানের মুখটা অনেকটা তার মায়ের সাথে মিল আছে। রোদেলা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চির হাইট নিয়ে তার শাশুড়ির সামনে দাড়ালে বাচ্চা মেয়েটাকে আরও বাচ্চা লাগে।জাবির আহমেদের গায়ে ফর্মাল পোশাক। তিনি সাদা শার্টের সাথে নীল রঙা ব্লেজার আর প্যান্ট পড়েছে। জাবির সাহেবও বেশ লম্বা। রোদেলা দুইজনে দেখতে দেখতে সামনে এসে দাড়ালো। রোদেলা আসতেই মাশরিফা জিঙ্গাসা করলো,
---- " পরিক্ষা কেমন হয়েছে? সব লিখেছিস তো? "
রোদেলা মাথা নাড়িয়ে ভদ্র মেয়ের মতো বলল,
---- " সব লিখে এসেছি আম্মু। পরিক্ষা আলহামদুলিল্লাহ ভালোই হয়েছে। "
জাবির সাহেব খুশিতে গদগদ হয়ে বললেন,
---- " দেখতে হবে না মেয়েটা করার? আমার মেয়ের মতো লক্ষ্মী মেয়ে হয় নাকি? সে তো আলবাত ভালো পরিক্ষায় দিবে। "
রোদেলা শশুড়ের কথায় মিটি হেসে শাশুড়ি মায়ের দিকে তাকালো। মাশরিফা শাড়ির আঁচল টেনে রোদেলার ঘর্মাক্ত মুখখানা মুছে দিতে লাগলো। রোদেলা অপলক চোখে তাকিয়ে থাকলো সেই মানবীর দিকে। জাবির সাহেব রোদেলার হাত থেকে ফাইলটা নিয়ে রোদেলার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।রোদেলা টলমলে চোখে শ্বশুর শাশুড়ির দিকে মায়া মায়া চোখে তাকিয়ে বলল,
---- " তোমরা এত ভালো কেন আম্মু আব্বু? আমাকে এত আহ্লাদ করবে না তোমরা। আম্মু তুমি আমার সাথে দজ্জাল শাশুড়ির মতো ব্যবহার করবে।আর আব্বু তুমি আমার সাথে পাশের বাসা'র রফিক চাচার মতো ব্যবহার করবে। তিনি যেমন তার ছেলের বউদের দেখতে পারে না, তুমিও তেমন করবে।কথায় কথায় বাবার বাড়ি নিয়ে খোটা দিবে। তোমাদের কোমল আচরণে আমি শশুর বাড়িতে থেকেও, শশুর বাড়ি ; শশুর বাড়ি ফিলটা পাচ্ছি না।আর দুই বড় ননদ আমার, তারা এতো মিষ্টি যে মনে হয় তাদের মুখ থেকেই দুনিয়ার সব রসমালায় তৈরি হয়। তাদের থেকে কি আর দূর্ব্যবহার আশা করা যায়? আমিও করি না। তবে তোমাদের ছেলে বাড়িতে থাকলে তবুও একটা কথা ছিল, কেননা সে একাই দজ্জাল স্বামীর রোল প্লে করে আমাকে শশুড় বাড়ির ফিল দিতে পারতো। "
রোদেলার কথায় মাশরিফা আর জাবির সাহেব নিজেদের পেট চেপে হাসি আটকালো।মাশরিফা রোদেলার কান টেনে বলল,
----- " তবে রে পাজি মেয়ে, আমাদের সামনেই আমাদের ছেলেকে নিয়েই নিন্দে করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে আদর বেশি করে একদম মাথায় উঠিয়েছি। দাড়া আজ থেকে আমিও রিনা খানের মতো দজ্জাল শাশুড়ির রোল প্লে করা স্টার্ট করব। "
রোদেলা শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে খিল খিল করে হেসে বলল,
---- " তবে আমিও শাবনূর এর মতো প্রতিবাদী বউমা'র রোল প্লে করবো। "
জাবির সাহেব হাসতে হাসতে বলল,
---- " তবে লাগিয়ে দাও বউ শাশুড়ির যুদ্ধ। এমনিতেও জীবনটা পানসেটে হয়ে আসছে। ফ্রীতে না হয় ঘরে বসে বিনোদন দেখে নিব। "
জাবির সাহেবের কথায় রোদেলা আর মাশরিফা খিল খিল করে হেসে উঠলো। রোদেলা এক হাত বাড়িয়ে তার আব্বু আর আম্মুর হাত ধরলো। মাশরিফা রোদেলার অগচরে জাবির সাহেবের পেটে কুনুই দিয়ে গুতো মেরে ফিসফিস করে বলল,
---- " মনে রঙ কত?আমি তোমাকে ফ্রীতে এরকম বিনোদন দেখতে দিলে তো।আমার একটা পিচ্চি মেয়েটাকে আহ্লাদ করে সমার পায় না,তার সাথে দজ্জাল গিরি করব তা তো জীবনে কল্পনাও করতে পারি না। "
জাবির সাহেব পেটে কুনুইয়ের গুতো খেয়েও খিলখিল করে হেসে দিল।
-
রোদেলা আর মাশরিফাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে জাবির সাহেব নিজেও গাড়ির ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল। তারা রোদেলাকে নিয়ে এখন রেস্টুরেন্টে যাবে। তারপর তিনজন খাওয়া দাওয়া করে একটু ঘুরতে বের হবে।
_________
রাজশাহী মহানগরের মতিহার থানার অন্তর্গত অভিজাত্য একটি এলাকার নাম কাজলা।এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় অনেক শিক্ষিত ও পেশাজীবী মানুষের বসবাস রয়েছে।আহিয়ানদের বাসাও এই এলাকায়।
কাজলার আশেপাশের একটা ভালো মানের রেস্টুরেন্টের । এটাই পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে বসে খাওয়ার জন্য ভালো পরিবেশ আছে।জাবির সাহেব এই রেস্টুরেন্টের সামনে এসে গাড়ি থামালো। রোদেলা আর মাশরিফা বেরিয়ে এলো গাড়ি থেকে। রেস্টুরেন্ট ঢুকে জাবির সাহেব পুত্রবধূর আর স্ত্রীর পছন্দের খাবার অর্ডার করলেন। ওয়েটার এসে খাবার পরিবেশন করে দিয়ে গেল। রোদেলা,মাশরিফা আর জাবির সাহেব খাবার শেষ করে বিল পে করে বেরিয়ে পরলো। রোদলাকে জাবির সাহেব কথা দিয়ে রেখেছিল যেদিন রোদেলার পরিক্ষা শেষ হবে সেদিন রোদেলাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে। এখন তিনি তার কথা রাখতে রোদেলা আর মাশরিফাকে নিয়ে কাছাকাছি একটা পার্কে যাচ্ছেন।
"শহীদ এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা" (রাজশাহী সেন্ট্রাল পার্ক ও চিড়িয়াখানা) একটি পরিচিত পার্ক। এটি কাজলা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। তাছাড়া পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার জন্য জনপ্রিয় একটি স্থান। থেকে শহীদ এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার দূরত্ব আনুমানিক ৪-৫ কিলোমিটার ।রোদেলাদের গাড়ি এখন সেই পথেই যাচ্ছে।প্রায় পনেরো থেকে বিশ মিনিটের ব্যবধানে রোদেলাদের গাড়িটা সেখানে এসে পৌঁছালো।রোদেলা গাড়ি থেকে নেমে আশেপাশে চোখ বুলালো। এখানে ছোট বেলায় দুই একবার এসেছিল বাবার হাত ধরে। কাছাকাছি এতো সুন্দর পার্ক থাকতেও বড় হওয়ার পর এই প্রথম এখানে আসা হলো তার। মাশরিফা গাড়ি থেকে নেমে মেয়ের হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে সামনে এগোতে লাগলো। দেখে মনে হচ্ছে মা তার ছোট পাঁচ বছরের অবুঝ শিশুটাকে আগলে রেখেছে, যেন কোথায় হারিয়ে না যায়। মাশরিফা আর রোদেলার পিছুপিছু আসছে জাবির আহমেদ। জাবির সাহেবের হাত দুইটা প্যান্টের পকটে গোজা,তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি যেন নিজের ছত্র-ছায়ায় আগলে রেখেছে নিজের স্ত্রী আর কন্যা রূপী পুত্রবধূকে।
শহীদ এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানাতে হাটাহাটি করার জন্য সবুজ উদ্যান ও হাঁটার পথ রইয়েছে। রোদেলা শ্বশুর শাশুড়ির হাত করে মুক্ত বাতাসে হাটাহাটি করল। তারপর মাশরিফা রোদেলাকে চিড়িয়াখানার দিকে নিয়ে গেল, যেখানে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী ও পাখি আছে।চিড়িয়াখানায় হাটাহাটি শেষে জাবির সাহেব পুত্রবধূ আর স্ত্রীকে নৌকাভ্রমনের জন্য নিয়ে এলো। রোদেলা প্রথমে নৌকায় উঠতে ভয় পাচ্ছিল।রোদেলার দুই হাত মাশরিফা আর জাবির সাহেব ধরে নৌকায় উঠিয়ে দিল।
-
প্রথম নৌকা ভ্রমণ বলে কথা । নৌকায় পা রাখার মুহূর্তে রোদেলার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উত্তেজনা আর সামান্য ভয় কাজ করতে লাগলো। নৌকাটি যখন ধীরে ধীরে তীর ছেড়ে পানির বুকে এগিয়ে যেতে লাগল, তখন চারপাশের দৃশ্য দেখে রোদেলা মনের ভয়টুকু ভুলে, মুগ্ধতা নিয়ে দেখতে লাগলো। শীতল বাতাস রোদেলার চোখে মুখে এসে লাগছিল, আর পানির ঢেউয়ের মৃদু শব্দ তারষমনটাকে এক অপার শান্তিতে ভরিয়ে দিতে লাগলো।
তখনি নৌকাটা হালকা দুলে উঠলো। রোদেলা কাত হয়ে পড়তেই মাশরিফা আর জাবির সাহেব রোদেলার দুইটা হাত দুইজনে আঁকড়ে ধরল। রোদেলা তার আম্মু আব্ব্বুর দিকে তাকিয়ে চোখ পিটপিট করে বোকা হাসি দিল।জাবির সাহেবে মেয়েকে ঠিক করে বসতে ইশারা করলো। তিনি এক হাতে মাশরিফার হাত, অপর হাতে পুত্রবধূর হাত ধরে বসে আছেন।
রোদেলা নিজের ভয়টুকু মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে নৌকাভ্রমনটুকু উপভোগ করতে লাগলো। রোদেলার মনে হচ্ছে সে যেন,প্রকৃতির কোলে ভেসে চলেছে। চারদিকে পানি, আকাশ আর নীরবতার মাঝে কাটানো সেই সময়টুকু ভীষণ ভালো লাগছে তার। প্রথম নৌকা ভ্রমণ রোদেলাকে নতুন এক অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে যেন, যা রোদেলারর কাছে আজীবন একটি সুন্দর ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে হয়তো।রোদেলা প্রাণ খুলে নিশ্বাস টেনে আবার ছাড়তে লাগলো।
বিকেল পাঁচটায় রোদেলাদের ঘুরাঘুরি শেষ হলে তারা কাজলায় তাদের বাসায় ফিরলো। মাশরিফা রোদেলাকে রুমে যেয়ে ফ্রেশ হয়ে নিতে বলে নিজেও নিজের রুমে গেল। রোদেলা শাশুড়ি কথা মতো আহিয়ানের রুমে আসলো।রোদেলা দুই মাস হলো এই রুমেই থাকছে। মাশরিফার কড়া আদেশ বলে কথা।
রোদেলা গোসল করে এসে ভেঁজা চুলগুলো কোনো রকম মুঁছে বালিশে মাথা রেখে শুয়ে পরলো। তারপর আর চিৎ হয়ে শুয়ে বালিশে মুখ ডুবিয়ে বালিশ থেকে আহিয়ানের শরীরের ঘ্রাণটুকু টেনে নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। ঠিক সেই সময়েই রোদেলার স্মার্ট ফোনটা বেজে উঠলো। এই ফোনটা জাবির সাহেব রোদেলাকে এক মাস আগে কিনে দিয়েছিল। রোদেলা বিছানা হাতরে ফোন না পেয়ে একটা বালিশের নিচে হাত দিলেই ফোনটা পেল।ফোনে একটা অপরিচিত নাম্বার দেখতেই রোদেলার ভ্রু যুগল কুঁচকে এলো। আগে এই আননোন নাম্বার থেকে রোজ রাত তিনটায় ফোন আসতো। তবে কখনও দিনের বেলায় ফোন আসেনি।তবে আজ হঠাৎ সময়ের নড়চড় করে ফোন আসায় রোদেলা একটু বিষ্মিত হলোই বটে।
রোদেলা ফোনে অপরিচত এই নাম্বার খানা দেখেই এক মাস আগের ঘটনায় ডুব দিল।.......
রোদেলা যখন প্রথম ফোনটা হাতে পেল,সেদিনই অপরিচিত একটা নাম্বার থেকে রাত তিনটায় দুইবার ফোন এসেছিল।রোদেলা ঘুমে থাকায় ফোন রিসিভ করতে পারেনি। তৃতীয়বার যখন ফোন আসলো তখন রোদেল অপরিচিত নাম্বার দেখে দোনামনা করতে করতে কল কেটে গিয়েছিল। চতুর্থ বার কল আসলে রোদেলা সাহস করে ফোনটা রিসিভ করলো।রোদেলা আগেই ভেবে রেখেছিল ফোন রিসিভ করেও সে কথা বলবে না, শুধু শুনবে বিপরীত পাশের মানুষ কি বলতে চাইছে। রোদেলে তার প্ল্যান মাফিক ফোন রিসিভ করে হ্যালো টুকুও বলল না। এভাবেই কেটে গেল এক মিনিট। তবে রোদেলা সবচেয়ে আশ্চর্যিত হলো যখন এক মিনিট পাড় হওয়ার পরও ফোনের বিপরীত পাশের মানুষকে ঠিক তার মতোই নীরব থাকতে দেখলো। রোদেলার মনে হলো হয়তো কলে কেটে দিয়েছে। তাই রোদেলা ফোন চেক করতে গিয়ে আরও ভেবাচেকা খেয়ে গেল,যখন দেখলো ফোনের কল টাইম দেখাচ্ছে ১ মিনিট ৪৫ সেকেন্ড। অথচ বিপরীত পাশ থেকে কোনো আওয়াজ ভেসে আসছে না।রোদেলার ভয় হলো। ছোট মস্তিষ্কে উল্টাপাল্টা চিন্তা আসতে লাগলো। গতবার কোচিং এর অর্ণব স্যারের কান্ড গুলো মনে হতেই রোদেলার রাগে শরীরটা রি রি করে উঠলো।রোদেলা কোনো কিছু না ভেবেই নাম্বারটাক ব্লক লিস্টে ফেলে দিল।
রোদেলা অপরিচিত নাম্বারটা ব্লক লিস্টে ফেলে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিল। আগামী দুই দিন রোদেলার পরিক্ষা নেই। কই ভাবলো একটু শান্তিতে ঘুমাবে,তাতেও যেন কার বাগড়া দিতে মন চাইছে।রোদেলা বিরক্তিতে ঠোঁট উল্টে বালিশ ঠিক করে শুয়ে পরলো।ঠিক সেই সময়ে অন্য একটা নাম্বার থেকে তার ফোনে আবার কল আসে।
রোদেলা ফোন হাতে নিয়ে অপরিচিত আরেকটা নাম্বার দেখে পুনরায় বিরক্ত হলো। এবারও ফোন রিসিভ করার পর কানে ধরতেই অপর পাশের মানুষটা সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করলো। রোদেলা বুঝতে পারলো কেউ তার সাথে ইচ্ছে করেই এমনটা করছে। রোদেলা বিরক্ত হয়ে এই নাম্বারটাও ব্লক করে দিল। তারপর রোদেলা ফোনটা একবারে বন্ধ করে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
এই বিষয়টা এখানে থেমে গেলেও পারতো।কিন্তু না এর পরেরদিন লোকটা রীতিমতো রোদেলাকে পাগল করে ছাড়লো।পরেরদিন রাত বারোটায় রোদেলার ফোনে প্রথম কল আসে নতুন আরেকটা নাম্বার থেকে। রোদেলা ভয়ে ভয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা কানে তুলতেই, সেই একই ভাবে আগের দিনের মতো বিপরীত পাশের লোকটিও নীরবতা বজায় রাখে।রোদেলা চরম বিরক্ত হয়ে লোকটাকে কয়েকটা গালি ছুড়লো,
---- " কোন মগারে আমায় ফোন করে বিরক্তি করিস। এমন হাল করবো একদম সব ফাতরামি ইতরামি একদিনেই ছুটিয়ে দিব।শা'লার চিনিস না তো আমায়। আমি মেজর সাহেবের এক মাত্র স্ত্রী মানে মিসেস মেজরনি বলছি। "
রোদেলার কথায় বিপরীত পাশের নীরবতা কাটিয়ে অল্প বিস্তর হাসির শব্দ শোনা গেল যেন। রোদেলা ভালো করে কান পাততেই, রোদেলাকে অবাক করে বিপরীত পাশ থেকে টুটটুট শব্দে লাইনটা কেটে গেল। রোদেলা আহমকের মতো কিছুক্ষণ ফোনটার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর খিল খিল শব্দে হাসতে হাসতে বলল,
---- " যাক বাবা,এই দম নিয়ে মিসেস মেজরনিকে বিরক্ত করতে আসছিলা চান্দু? তুই তো আমার এক শাসানিতেই লেজ গুটিয়ে নিলি দেখি। দেখতে হবে না বউটা কার?মেজর অভ্র সাহেবের বাঘিনী বলে কথা। নিজের উপর খুব প্রাউড হচ্ছে হি হি হি। "
তবে রোদেলার প্রাউডন্যাসে জল ঢেলে দিতে সেই নাম্বার থেকে পুনরায় কল এলো। রোদেলা এবার কল রিসিভ না করেই সোজাসুজি ব্লক করে দিল। ঠিক এই ভাবে এক
এক রাতে একশো একটা সিম থেকে কল করে রোদেলার ঘুম হারাম করে ফেলেছিল।শেষে একটা হুমকি মূলক মেসেজেও পাঠিয়েছিল।সেটা পাঠিয়েই রোদেলাকে আর নাম্বার ব্লক করতে মানা করেছিল।
রোদেলা সেই দিনটার কথা মনে করে। হাতের ফোনের দিকে তাকিয়ে পরপর দুই তিনবার ঢোক গিলল।

Post a Comment

0 Comments