অক্টোবরের পঁচিশ তারিখ আজকে। সাপ্তাহিক ছুটির পর প্রথম দিন আজ। আলো কলেজ ড্রেস পরে "শশুর বাড়ির দোয়া মুদির দোকানের" সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আজ সে সাইকেল আনেনি, হেঁটেই কলেজে যাবে। আলো অপেক্ষা করছে তার দুই বান্ধবী মিন্নাত আর চৈতির জন্য। তবে সে আরও একজনের জন্য অপেক্ষা করছে সেটা নিয়াযের জন্য। ওই দিনের পর আর একবারের জন্যও তার সঙ্গে নিয়াযের দেখা হয়নি। আলো ভেবেছিল, নিয়ায ভাই নিশ্চয়ই তার সঙ্গে দেখা করার জন্য নানা রকম ছলচাতুরী করবে। কিন্তু তার কিছুই হলো না। আলো 'চ' সূচক শব্দ উচ্চারণ করে বিড়বিড় করে বলল।
"একটু বেশিই ভেবে ফেলেছিলাম।"
বলে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল। কথায় আছে নারী চরিত্র বেজায় জটিল আর তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হলো আলো নিজেই। মুখে বলে নিয়ায ভাইকে চোখের সামনে দেখতে চায় না, অথচ মনে মনে ঠিকই চায়, নিয়ায ভাই তার সামনে আসুক, তাকে একটু তোষামোদ করুক। কিন্তু তার কিছুই হলো না।
আলোর নজর পড়ে সোহানের দিক। সোহান সাদা দাঁত বের করে হাসতে হাসতে তার দিকে এগিয়ে আসছে। তার হাতে দুটো মোরগ। পরনে লুঙ্গি আর শার্ট। ধারণা করা যাচ্ছে সোহান মোরগ দুটো বাজারে বিক্রি করতে নিয়ে যাচ্ছে। আলোকে দেখে সোহান বলল, "কি মিষ্টি আলু, এইনে কি করো?"
আলো বিরস কণ্ঠে বলল, "মিন্নাত আর চৈতির জন্য অপেক্ষা করছি।"
সোহান রহস্যময় কণ্ঠে বলল, "আর কারো জন্য অপেক্ষা করছো না?"
আলো জোরে বলল, "আর কার জন্য অপেক্ষা করব? অদ্ভুত!"
সোহান হেসে বলল, "ও, আর কারো জন্য অপেক্ষা করছো না! আমি ভাবলাম হয়তো আরও কারো জন্যও অপেক্ষা করছো।"
আলো বিরক্ত হয়ে বলল, "সোহান ভাই, এত না বলে কোথায় যাবা যাও তো। উল্টাপাল্টা কথা বলে আমার মাথা খেয়ো না।"
সোহান কাঁধ নাচিয়ে বলল, "ঠিক আছে। যাওয়ার আগে একটা কথা জানার ছিল।"
আলো ভ্রু কুঁচকে বলল,"কি কথা?"
সোহান একটু এগিয়ে এসে কণ্ঠ নিচু করে বলল, "বলছিলাম, তোমার বান্ধবীরা কি প্রেম-ট্রেম করে নাকি? যদি না করে থাকে, তাহলে আমার সঙ্গে একটু সেটিং করে দেও না।"
আলো চিৎকার করে উঠল, "কি বললা তুমি? তোমার মতো ভণ্ড ছেলের সঙ্গে আমার বান্ধবীরা প্রেম করবে, তুমি ভাবলে কি করে?"
আলোর চিৎকার শুনে মোরগ দুটোও ডেকে উঠল। সোহান বলল,
"আরে আস্তে! তোমার চিৎকার শুনে আমার নিরীহ অবুঝ বালক মোরগগুলো ভয় পেয়ে গেছে।"
আলো গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "তুমি যাও এখান থেকে, সোহান ভাই। মেজাজ গরম কইরো না।"
সোহান বিড়বিড় করে বলল, "এই কোনো সাধারণ মেয়ে নয়, পুরো আইটেম বোম! নিয়াযের কপালে দুর্গতি আছে বোঝাই যাচ্ছে।"
আলো ভ্রু কুঁচকে বলল, "কি বললে তুমি?"
সোহান তাড়াতাড়ি বলল, "কিছু না। আমি যাই, বাজারে যাই।"
সোহান চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই মিন্নাত আর চৈতি এসে পৌঁছাল। আলো রেগেমেগে বলল, "এতক্ষণ লাগল আসতে তোদের?"
চৈতি বলল, "আর বলিস না, এই মিন্নাত দেরি করছে। আর নীলা কই?"
আলো বলল, "ফোন করেছিল। বলেছে ওর দেরি হবে। আমাদের চলে যেতে বলেছে কলেজে।"
মিন্নাত নরম গলায় ইতস্তত করে বলল, "বলছিলাম আলো... তোর সঙ্গে কি সোহান ভাই ছিল এতক্ষণ?"
আলো রিনরিনে গলায় বলল, "হু, কেন?"
মিন্নাত লাজুক কণ্ঠে বলল, "না... এমনি।"
আলো ভ্রু কুঁচকে বলল, "কি রে, তুই এমন লাজুক কণ্ঠে কথা বলছিস কেন কাহিণী কি?"
মিন্নাত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, "কই, লাজুক কণ্ঠে কথা বললাম? আমি তো এমনিই কথা বলি। চল, দেরি হয়ে যাচ্ছে কলেজ যেতে?"
মিন্নাত চলে যেতে নিলে আলো বলল, "এই দাঁড়া। তোর বডি স্ট্রাকচার তো অন্য কিছু বলছে। কোনোভাবে কি তুই ওই ভণ্ড সোহান ভাইরে পছন্দ করিস?"
মিন্নাত তাড়াতাড়ি বলল, "যাহ! এভাবে বলিস না তো। ভণ্ড হতে যাবে কেন সোহান ভাই? মাস্টার্স কমপ্লিট করা একটা ছেলেকে কি করে ভণ্ড বলিস তুই?"
আলো বিরস কণ্ঠে বলল, "হইছে, থাম। আর বেশি কিছু বলিস না। সোহান ভাই শুনলে ফেটে যাবে। আর তোর ভাবসাব দেখে যা বোঝার বুঝে গেছি।"
চৈতি হেসে বলল, "আমাদের মিন্নাত প্রেমে পড়ছে! তাও আবার সোহান ভাইয়ের! ভাবা যায়!"
মিন্নাত মুখ ফুলিয়ে বলল, "উফ! তোরা না শুধু উল্টাপাল্টা চিন্তা করিস। কারো বিষয়ে ভালো কথা বললেই তোরা এক লাইন বেশি বুঝে ফেলিস। আমি গেলাম।"
বলেই মিন্নাত হাঁটা ধরল। চৈতি চিৎকার করে বলল, "আরে মিন্নাত, দাঁড়া! রাগ করিস না!"
_______
তিন বান্ধবী মিলে হেসেখেলে কলেজে এলো। কলেজে এসে ঢুকতেই আলো অবাক হয়। কলেজের মাঠে স্টেজ করা হয়েছে। স্টেজটা নানা রঙের ফুল দিয়ে সুন্দর করে সাজানো। স্টেজে রাখা দুটি টেবিলও ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। মাইকও সেট করা হয়েছে । আলো চৈতিকে প্রশ্ন করল, "কি রে, কলেজে হচ্ছেটা কি?"
চৈতি চারপাশে তাকিয়ে বলল, "তুই যেখানে, আমিও সেখানে। তাই বলতে পারলাম না। তবে এতটুকু বুঝতে পারছি, কোনো অনুষ্ঠান আছে।"
মিন্নাত বলল, "আচ্ছা, ক্লাসে চল তো। অনুষ্ঠান হলে তো দেখতেই পাবো কিসের অনুষ্ঠান।"
আলো বিরক্ত হয়ে বলল, "এই, তুই সুন্দর করে কথা বল তো। এমন নাকে লাগিয়ে কথা বলবি না, কানে ধরে।"
মিন্নাত আলোর বাহু ধরে বলল, "আচ্ছা, বলব না। চল তো।"
ক্লাস শুরু হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে নীলা এলো। আজ শুধু প্রথম ক্লাসটাই হবে, সংবর্ধনা অনুষ্ঠান থাকার কারণে। তবে স্যার কারা সংবর্ধনা পাবে কিংবা কোন ব্যাচের জন্য এই আয়োজন করা হয়েছে সেই বিষয়ে কিছুই বলেননি। শুধু বলেছেন, সবাইকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে হবে। আলো নীলাকে প্রশ্ন করল।
"এই নীলা তুই কি কিছু জানিস কোন ব্যাচদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে?"
নীলা চুপ করে রইল। যদি বলে নিয়ায ভাইদের ব্যাচের যারা মেডিকেলে চান্স পেয়েছিল আর ডাক্তার হয়েছে, তাদেরও সংবর্ধনা দেওয়া হবে, তাহলে নিশ্চিত আলো এই অনুষ্ঠানে থাকবে না। অথচ নিয়ায ভাই তাকে পইপই করে বলে দিয়েছে, আলো যেন এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকে। নীলাকে এমন চুপচাপ বসে থাকতে দেখে আলো বলল।
"কি রে, কথা বলছিস না কেন?"
নীলা আমতা আমতা করে বলল, "কি জানি! আমি কি জানি! অনুষ্ঠান শুরু হলেই তো দেখতেই পাবো।"
এগারোটার দিকে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শুরু হলো। অতিথিরা আর কলেজের সাবেক ছাত্রছাত্রীরা আসতে শুরু করেছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রথমে ভেবেছিল শুধু নিয়াযদের ব্যাচের যারা মেডিকেলে চান্স পেয়েছিল, তাদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে। কিন্তু ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কম হওয়ায় সিদ্ধান্ত বদলানো হলো। নতুন-পুরাতন মিলিয়ে যারা মেডিকেলে চান্স পেয়েছে, তাদের সবাইকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। এদের মধ্যে অনেকেরই আবার না আসার সম্ভাবনা বেশি।
মাইকের আওয়াজ শুনে নীলা বলল, "চল চল, অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে। দেখি গিয়ে কারা কারা সংবর্ধনা পায়।"
কলেজ আজ পুরো জমজমাট। নতুন-পুরাতন মিলিয়ে মোট উনিশজন মেডিকেলের ছাত্রছাত্রী এসেছে। কেউ কেউ এখনও পড়াশোনা করছে, আবার কেউ এমবিবিএস শেষ করে পূর্ণাঙ্গ ডাক্তার হয়ে বেরিয়েছে। প্রধান অতিথি হিসেবে এসেছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অচিন্ত সরকার। তিনি সবার হাতে সংবর্ধনা স্মারক তুলে দেবেন। এছাড়াও আরও অনেক বিশিষ্ট অতিথিরাও উপস্থিত হয়েছেন।
আলো, চৈতি, মিন্নাত আর নীলা গিয়ে চেয়ারে বসল। অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। স্যার-ম্যাডাম থেকে শুরু করে অতিথিরা একে একে বক্তব্য রাখছেন। সবার বক্তব্য শেষ হলে এবার ছাত্রছাত্রীদের হাতে সংবর্ধনা তুলে দেওয়ার পালা শুরু হলো। একজন একজন করে তাদের বরণ করে হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হচ্ছে। আলো বুঝতে পারল, এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ইশতিয়াক শিকদার নিয়াযও আমন্ত্রিত, আর তাকেও সংবর্ধনা দেওয়া হবে। আলো কাঠকাঠ কণ্ঠে বলল।
"তোর ভাইকে যে সংবর্ধনা দেওয়া হবে, কই আমাদের তো জানালি না!"
নীলা আমতা আমতা করে বলল, "আসলে হয়েছে কি... আমার না... মনে ছিল না।"
আলো মাথা নেড়ে বলল, "ও...।"
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলল, "ঠিক আছে, আমি তাহলে গেলাম।"
নীলা তাড়াতাড়ি আলোর হাত ধরে বলল, "আরে, কই যাস? অনুষ্ঠানটা শেষ হোক, তারপর সবাই একসঙ্গে যাই।"
চৈতিও বলল, "হ্যাঁ আলো, বস তো। দেখি আর কে কে সংবর্ধনা পায়।"
ঠিক তখনই উপস্থাপক স্যারের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "এবার স্টেজে ডেকে নেব ডক্টর ইশতিয়াক শিকদার নিয়াযকে আর তার সঙ্গে ডেকে নেব সাইন্স সেকশনের অধ্যায়নরত আশফিয়া হাওলাদার আলোকে।"
স্যারের মুখে নিজের নাম শুনে আলো চমকে উঠল। তাকে ডাকছে কেন? নিয়ায ততক্ষণে স্টেজে উঠে গেছে। তার চোখেমুখে উচ্ছ্বাসের ছাপ স্পষ্ট। স্যার আবার বললেন,"আলো, তুমি যেখানেই থাকো, দ্রুত স্টেজে এসে উপস্থিত হও।"
আলো হতভম্ব হয়ে বলল, "স্যার আমাকে ডাকছে কেন?"
নীলা তাড়াতাড়ি বলল, "আলো, জলদি যা। স্যার ডাকছে তোকে।"
"আরে, অদ্ভুত! আমায় কেন ডাকবে? আমি তো এর কিছুই জানি না।"
স্যার আবার বললেন, "আলো, সময় নষ্ট না করে দ্রুত স্টেজে আসো।"
আলোকে দেখে তাদের সেকশনেরই একজন ভলান্টিয়ার বলল, "এই তুমি, তুমিই তো আলো? স্যার কখন থেকে তোমার নাম ধরে ডাকছেন আর তুমি বসে আছো যাও তাড়াতাড়ি স্টেজে যাও।"
আলো না পেরে স্টেজে গিয়ে উঠল। একজন ভলান্টিয়ার তার হাতে একটি ব্যাচ ধরিয়ে দিয়ে বলল, "যাও, ব্যাচটা পরিয়ে দিয়ে এসো।"
আলো পথে পথে অবাক হচ্ছে। কী হচ্ছে এসব তার সাথে? আলো নাকের পাটা ফুলিয়ে নিয়াযের দিকে তাকাল। নিয়ায স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। নিয়ায একদম শান্ত, স্থির যেন আগে থেকেই জানত এমন কিছু্ ঘটতে চলেছে। স্যার বললেন, "আলো, দাঁড়িয়ে আছো কেন? যাও, নিয়াযকে ব্যাচটা পরিয়ে দাও।"
আলো নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে নিয়াযের সামনে এসে দাঁড়াল। নিয়ায হাত দুটো পেছনে বেঁধে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি স্পষ্ট। এই হাসির পেছনে ছোট্ট একটা গল্প আছে।
চার দিন আগের ঘটনা। বহু বছর পর নিয়ায কলেজে এসেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিরচেনা কলেজটাও অনেকটা বদলে গেছে। নিয়ায প্রিন্সিপাল স্যারের কক্ষের সামনে এসে দাঁড়াল বলল, "স্যার, আসব?"
প্রিন্সিপাল স্যার দরজার দিকে তাকিয়ে নিয়াযকে দেখে বললেন, "আরে নিয়ায! এসো, ভেতরে এসো।"
নিয়ায কক্ষে ঢুকল। প্রিন্সিপাল স্যার বললেন, "বসো।"
নিয়ায চেয়ার টেনে বসল। প্রিন্সিপাল স্যার বললেন, "কেমন আছো?"
"আলহামদুলিল্লাহ, স্যার, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?"
প্রিন্সিপাল স্যার গর্বভরা কণ্ঠে বললেন, "যে কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা এত ভালো ফলাফল করে, সেই কলেজের প্রিন্সিপাল সব সময়ই ভালো থাকে। এখন বলো, কী খাবে?"
নিয়ায মুচকি হেসে বলল, "না স্যার, আমি কিছু খাব না। আমি একটা কাজে আপনার কাছে এসেছি।"
প্রিন্সিপাল স্যার দু হাত টেবিলের ওপর রেখে বললেন, "কী কাজ? শুনি।"
নিয়ায ঠোঁট ভিজিয়ে বলল, "স্যার, আমি চাই আমাকে সংবর্ধনা দেওয়ার আগে যে আমাকে বরণ করবে এবং ব্যাচ পরিয়ে দেবে, সে যেন সাইন্স সেকশনের আশফিয়া হাওলাদার আলো হয়। আর এটা যেন আলো শুরুতেই জানতে না পারে সরাসরি অনুষ্টানের দিন আলোর নাম ঘোষণা করার পরেই যেন জানতে পারে।"
প্রিন্সিপাল স্যার ভ্রু কুঁচকে বললেন, "মানে?"
নিয়ায অনুনয়ের সুরে বলল, "প্লিজ স্যার, এই ছোট্ট অনুরোধটা রাখুন।"
প্রিন্সিপাল স্যার হেসে বললেন, "ঠিক আছে, তাই হবে।"
নিয়ায এসব ভেবে তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ল। অবশেষে আলো তার প্রিয় আলু তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটাকে তার সামনে এনে দাঁড় করাতে কতই না ছলচাতুরী করতে হলো। আলোর চোখ-মুখ দেখে মনে হচ্ছে, এই বুঝি নিয়াযকে গিলে খাবে। নিয়ায ঘাড় বাঁকিয়ে অন্যদিকে ফিরে মুচকি হেসে নিজেকে সামলে নিয়ে আলোর দিকে তাকাল। আলো দাঁতে দাঁত চেপে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিয়ায নিচু কণ্ঠে বলল।
"কী হলো? ব্যাচটা পরা, সবাই অপেক্ষা করছে তো।"
আলো নাকের পাটা ফুলিয়ে ব্যাচটা নিয়াযের সাদা শার্টের বুকপকেটে পরাতে শুরু করল। নিয়ায এক দৃষ্টিতে আলোর নিচু করে রাখা থমথমে মুখটার দিকে তাকিয়ে আছে। আলোকে দেখে মনে হচ্ছে, এই ব্যাচ পরানোর কাজটা তার জন্য ভীষণ কষ্টের একটা কাজ। আলো দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বলল, "ইচ্ছে তো করছে সেফটিপিনটা এই শয়তান লোকটার বুকেই গেঁথে দিই।"
আলোর অজান্তেই হুট করে সেফটিপিনের পিনটা তার তর্জনী আঙুলে ফুটে যায়, "আহ!"
ব্যথায় চমকে উঠে আলো তৎক্ষণাৎ হাতটা সরিয়ে নিল। নিয়াযও চমকে তাকাল আলোর হাতের দিকে। তর্জনী আঙুলের ডগায় লাল রক্তের বিন্দু জমেছে। নিয়ায উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল, "দেখি।"
কথাটা বলেই কোনো কিছু না ভেবেই আলোর হাতটা ধরে আলোর তর্জনী আঙুলটা মুখে নিয়ে নিল। আলো বড় বড় চোখ করে তাকায়। আশপাশের সবার দিকে এক পলক তাকিয়ে আলো দ্রুত হাতটা সরিয়ে নিল। নিয়ায অবাক চোখে আলোর দিকে তাকাল। আলো ঢোক গিলে তর্জনী আঙুলটা অন্য হাতের মুঠোয় নিয়ে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে স্টেজ থেকে নেমে গেল। আলো চলে যেতেই স্যার নিয়াযকে প্রশ্ন করলেন।
"নিয়ায তুমি ঠিক আছো?"
নিয়ায মৃদু হেসে বলল, "জি স্যার।"
স্যার বললেন, "তোমার শার্টে রক্ত লেগে আছে।"
নিয়ায নিজের বুকের দিকে তাকাল। সাদা শার্টে রক্তের দাগ বসে গেছে। নিয়ায হাত বাড়িয়ে দাগটা ছুঁয়ে দিল। আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীরা অবাক চোখে একবার নিয়াযের দিকে, আরেকবার স্টেজ থেকে নেমে যাওয়া আলোর দিকে অবাক চোখে তাকাতে লাগল। কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কী যেন বলতে শুরু করল। প্রিন্সিপাল স্যারও কিছুটা বিস্মিত হলেন। তবে তিনি কিছু বললেন না। আর নিয়ায... সে স্থির চোখে আলোর চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তবে এখানে উপস্থিত প্রায় সবাই আলো আর নিয়াযের সম্পর্কের বিষয়ে অবগত আছে।
________
আলো দৌড়ে ওয়াশরুমে এলো। বেসিনের কল ছেড়ে হাত ধুতে শুরু করল। তর্জনী আঙুলটা এমনভাবে ঘষছে, যেন চামড়াই তুলে ফেলবে। অতিরিক্ত চাপ পড়ার কারণে পিনের খোঁচা লাগা জায়গা থেকে আবারও রক্ত বের হতে শুরু করল। ঠিক তখনই নীলা, মিন্নাত আর চৈতি এলো। আলোকে এমন করতে দেখে নীলা বলল।
"এই আলো, কী করছিস তুই? রক্ত বের হচ্ছে তো!"
আলো থামল না বরং সে রিনরিনে কণ্ঠে বলল, "হোক।"
নীলা আলোর বাহু ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে বলল, "নিজেকে এভাবে শুধু শুধু কষ্ট দিচ্ছিস কেন?"
আলো রাগী গলায় বলল, "তোর ভাইয়ের সাহস কী করে হলো এমনটা করার?"
নীলা নরম গলায় বলল, "আরে, এতে এতো রাগারাগি করার কী আছে? ভাইয়া তো তোর ভালোর জন্যই করেছে।"
আলো রিনরিনে গলায় বলল, "আমার এত ভালো করতে হবে না তোর ভাইকে, বুঝলি!"
নীলা ধীর কণ্ঠে বলল, "আচ্ছা ভাইয়া তোর ভালো করবে না কিন্তু ভাইয়া ডাক্তার হওয়ার সুবাধে তো তোর ভালো করতেই পারে। একজন ডাক্তার কখনও কারও ব্যথা-যন্ত্রণা দেখে নির্লিপ্ত হয়ে থাকতে পারে না।"
আলো মেজাজ দেখিয়ে বলল, "ডাক্তার মাই ফুট।"
কথাটা বলেই আলো ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে গেল। নীলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মিন্নাত আর চৈতি দ্রুত আলোর পেছন পেছন ছুটল।
________
নিয়ায অচিন্ত সরকারের হাত থেকে সংবর্ধনা গ্রহণ করে স্টেজ থেকে নেমে যায়। ঠিক তখনই অচিন্ত সরকার তাকে ডেকে উঠল, "নিয়ায!"
নিয়ায থেমে পেছন ফিরে তাকাতেই অচিন্ত সরকার এগিয়ে এসে বললেন, "শুনলাম তোমার বাপ নাকি আবার নির্বাচনে দাঁড়াইতাছে? আর তোমার বাপ-চাচারে তো দেখলাম না। ছেলেকে এত বড় সম্মাননা দেওয়া হইতাছে, অথচ তোমার পরিবারের কাউরে দেখতাছি না কেরে?"
নিয়ায শান্ত কণ্ঠে বলল, "বাবা আর চাচ্চু এসেছিল কিন্তু ইম্পর্টেন্ট কিছু কাজের জন্য তাড়াতাড়ি চলে যেতে হয়েছে। আর দাদাভাই অসুস্থ, তাই আসতে পারেন নি। দাদাভাইয়ের জন্য বাড়ির অন্যরাও আসতে পারে নি। তবে তাদের দোয়া সবসময় আমার সঙ্গে আছে।"
অচিন্ত সরকার মাথা নেড়ে বললেন, "আইচ্ছা, বুঝলাম। কিন্তু এইটা বুঝলাম না, শুধু শুধু কেরে তোমার বাপ এত টাকা-পইসা খরচ করার জন্য এই নির্বাচনের দাঁড়াইতাছে? সেই তো হারবই। তার চেয়ে ভালা, তুমি তোমার বাপরে বুঝাও যেন নির্বাচনে না দাঁড়ায়।"
নিয়ায মুচকি হেসে বলল, "কেন কাকা? আমার বাবা নির্বাচনে দাঁড়ালে আপনার সমস্যা কোথায়? আর টাকা-পয়সা নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। নাকি আপনার এই চিন্তার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে?"
অচিন্ত সরকারের ভ্রু কুঁচকে গেল, "অন্য কোনো কারণ মানে? কী কইতে চাও তুমি স্পষ্ট কইরা কও?"
নিয়ায ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল, "এই যে, এবার যদি আপনি বাবার কাছে হেরে যান, সেই চিন্তা কারণ।"
অচিন্ত সরকার বিস্মিত হয়ে বললেন, "কি কইলা তুমি? আমি... "
নিয়ায আর কথা বাড়াল না। শান্ত গলায় বলল, "কাকা, আমি আসি। আমার একটু কাজ আছে। আপনার সাথে অন্য সময় কথা হবে।"
কথাটা বলে নিয়ায চলে যায়। অচিন্ত সরকার চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলেন। চোখেমুখে রাগের ছাপ স্পষ্ট। তাঁর হাঁটুর বয়সী একটা ছেলে তাকে কত কিছু বলে গেল! কত বড় স্পর্ধা এই ছেলের!

0 Comments