পরদিন সকাল।
ঢাকার আদালত চত্বরে মানুষের ভিড়।
সাংবাদিক, আইনজীবী, কৌতূহলী মানুষ—সবাই একটাই মামলার কথা বলছে।
"গরম তেলে স্ত্রীকে পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা—শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে মামলা।"
মেঘলা বাবার হাত ধরে আদালতের ভেতরে ঢুকল।
তার পোড়া হাতের দাগ এখনও স্পষ্ট।
অন্যদিকে কাব্য মাথা নিচু করে আদালতের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল।
আজ সে আসামি নয়।
আবার পুরোপুরি নির্দোষও নয়।
কারণ তার নীরবতা আজও তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর বিচারক এজলাসে বসলেন।
রাষ্ট্রপক্ষ একে একে প্রমাণ উপস্থাপন করল।
প্রথমে ভয়েস রেকর্ডিং।
পুরো আদালত নীরব হয়ে শুনল—
> "এটা শুধু শুরু... এরপর কী হবে, সেটা তুই কল্পনাও করতে পারবি না।"
তারপর দেখানো হলো সিসিটিভির উদ্ধার হওয়া ফুটেজ।
ফুটেজে দেখা গেল, ননদ ইচ্ছে করেই মেঘলার পেছনে এগিয়ে যাচ্ছে।
যদিও ধাক্কার মুহূর্তটি পুরোপুরি দেখা যায়নি, তবু ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট ছিল।
এরপর কাব্যকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকা হলো।
সে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলল,
— "আমি সত্য লুকিয়ে বড় ভুল করেছি। আমি নিজের চোখে দেখেছি, আমার বোন মেঘলাকে ধাক্কা দিয়েছিল। আমি সঙ্গে সঙ্গে তাকে বাঁচানোর বদলে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেই ভুলের জন্য আমি নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারব না।"
আদালত কক্ষে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল।
এরপর মেঘলাকে ডাকা হলো।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার কণ্ঠে কোনো রাগ ছিল না।
শুধু ছিল দৃঢ়তা।
— "আমি প্রতিশোধ চাই না। আমি শুধু চাই, কেউ যেন আর পরিবারের সম্মানের নামে অন্যায় চাপা না দেয়।"
ঘরের সবাই চুপচাপ শুনছিল।
ঠিক তখনই তদন্ত কর্মকর্তা আদালতের অনুমতি নিয়ে নতুন সাক্ষীকে ভেতরে আনলেন।
তিনি ছিলেন সেই গৃহকর্মী, যিনি ঘটনার দিন রান্নাঘরের পাশের ঘরে কাজ করছিলেন।
তিনি বললেন,
— "আমি দেখেছি, ম্যাডাম রোস্ট নিয়ে বের হওয়ার পর আপা ইচ্ছে করে ধাক্কা দেন। আমি ভয়ে কিছু বলতে পারিনি।"
তার সাক্ষ্য আদালতে আগের প্রমাণগুলোকেই আরও শক্ত করল।
ননদ অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
অবশেষে বিচারক জিজ্ঞেস করলেন,
— "আপনি কি কিছু বলতে চান?"
ননদ কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— "আমি ওকে ভয় দেখাতে চেয়েছিলাম। এত বড় দুর্ঘটনা হয়ে যাবে, ভাবিনি। আমি অপরাধ করেছি।"
আদালত নীরব হয়ে গেল।
বিচারক বললেন,
— "অপরাধ ছোট বা বড় নয়। ইচ্ছাকৃত সহিংসতার ফল ভয়াবহ হতে পারে।"
এরপর তিনি মামলার রায় ঘোষণা করলেন।
ননদের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলো এবং আইনের বিধান অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হলো।
আদালত একই সঙ্গে মন্তব্য করল যে, পারিবারিক সহিংসতা বা নির্যাতনকে "ঘরের ব্যাপার" বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।
রায় ঘোষণার পর আদালতের বাইরে কাব্য মেঘলার সামনে এসে দাঁড়াল।
তার চোখ ভেজা।
— "আমি জানি, তোমাকে ফিরে পাওয়ার অধিকার আমি হারিয়েছি। তবু একটা কথা বলতে চাই... আমাকে ক্ষমা করতে পারবে?"
মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর শান্ত গলায় বলল,
— "ক্ষমা মানে অতীত মুছে ফেলা নয়। আমি তোমাকে ঘৃণা করে বাঁচতে চাই না। তাই ক্ষমা করছি। কিন্তু বিশ্বাস... সেটা নতুন করে অর্জন করতে হয়।"
কাব্য মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
সে জানত, এই উত্তরই তার প্রাপ্য।
কয়েক মাস পর—
মেঘলার পোড়া দাগ পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি।
কিন্তু তার মুখে আবার হাসি ফিরেছে।
সে নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য কাজ শুরু করল, যাতে কেউ অন্যায়ের মুখে একা না থাকে।
একদিন সে নিজের ডায়েরির শেষ পাতায় লিখল—
"যে আগুন একদিন আমাকে পুড়িয়ে দিয়েছিল, আজ সেই আগুনই আমাকে সাহসী হতে শিখিয়েছে। নীরবতা কখনো অন্যায় থামায় না। সত্য বলার সাহসই মানুষকে মুক্ত করে।"
ডায়েরির পাতা বন্ধ করে মেঘলা জানালার বাইরে তাকাল।
সূর্যের আলো ধীরে ধীরে পুরো ঘর ভরে দিচ্ছিল।
সে মৃদু হেসে মনে মনে বলল—
"এবার সত্যিই শেষ। এবার আমি নতুন করে বাঁচব।"
— সমাপ্ত —

0 Comments