প্রথম যেদিন পাত্রপক্ষ আমাকে দেখতে এলো, সেদিনই তারা আমার জায়গায় আপুকে পছন্দ করে বসল। বলার অপেক্ষা রাখে না, আপু দেখতে সত্যিই খুব সুন্দরী। লম্বা, ফর্সা, আর মুখের গঠন এমন যে চোখ সরানো মুশকিল। আমাদের বয়সের পার্থক্য মাত্র দুই বছর। তাই দেখে কেউই বুঝতে পারে না কে বড় আর কে ছোট। বরং অনেকেই ভুল করে ভাবে, আমিই যেন বড়। পাত্রপক্ষ জানত না যে আপু বিবাহিত; তখনো তার সঙ্গে তাদের পরিচয় করানো হয়নি। তবে মুখের মিল এমন ছিল যে, আমাদের তিন ভাইবোনকে দেখলে যে কেউ সহজেই বুঝে নিতে পারত আমরা এক রক্তেরই সম্পর্ক।
সোফায় পাত্রী হিসেবে বসে থাকা আমার দিকে তাদের নজর তেমন একটা ছিল না। নাস্তা এগিয়ে দেয়া আমার আপুর দিকে তাদের দৃষ্টি ঘোরাফেরা করছিলো। শেষমেশ ভদ্রতার ধার না ধেরে পাত্রের মা সরাসরি আপুকেই পছন্দ জানিয়ে বসলেন। বলেন--- তাদের আর্মিতে জব করা লম্বা চওড়া ছেলের জন্য অমনই একটা মেয়ে খুঁজছেন। ছেলের সাথে ভালো মানাবে।
আমাকে ইঙ্গিত করে এ-ও বলেন-- মেয়েটা সুন্দর আছে। খারাপ না। তবে হাইট একটু কম। আমার বাবুর পাশে একটু বেশিই চোখে লাগবে।
বাবার মুখ থমথমে হয়ে যায়। ভদ্রমহিলা কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে একাই গালগল্প শুরু করলেন, তাও আবার একনাগাড়ে,
-" আমার বাবুর জন্য ম্যালা বিয়ের প্রস্তাব আসছে ভাই। কেউ মোটরসাইকেল দিতে চায়, কেউ আবার ঘর সাজিয়ে, অনেকে তো সরাসরি পাঁচ-ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত অফার করেছে। কিন্তু আমি একটাও প্রস্তাবে রাজি হইনি। আমি এসব কিছুই চাই না। আমার একটাই চাওয়া আমার বাবুর জন্য একটা সুন্দরী মেয়ে ঘরের বউ করা। সুন্দরী হলে পা থেকে মাথা পর্যন্ত সোনায় মুড়িয়ে আমরাই নেবো। একমাত্র ছেলে আমার, বউমাটা যেন সেরা হয়। লোকে তাকিয়ে দেখে বলে বাহ, কী সুন্দর মানিয়েছে!"
একগাল হেসে বললেন,
-" এখন তো সরকারী চাকুরী সোনার হরিণ। আর আমার বাবুর মতো ছেলে তো লাখে একটা। কোনো বাজে অভ্যাস নেই ছেলের আমার। একটা বিড়ি সিগারেট কিচ্ছু খায় না। বড়দের খুব মান্য করে। খুবই ভদ্র ছেলে আমার। নিজের ছেলে বলে ঢাকঢোল পিটাচ্ছি না। একটু খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন। আপনার ওই মেয়েটাকে আমার পছন্দ হয়েছে। আপনারা রাজি থাকলে, নতুন সম্পর্কের সূচনা করতে পারি।"
বাবুর মায়ের কথা শুনে কার কী প্রতিক্রিয়া হলো জানি না। তবে বাবুর মায়ের নিম্ন মন মানসিকতা দেখে সাথে সাথেই কল্পনাতেই আমি লাল সালাম ঠুকলাম। মা পইপই করে বলেছিল, চুপচাপ থাকি যেন। যা জিজ্ঞেস করবে তার উত্তর ছাড়া এক বর্ণও যেন উচ্চারণ না করি। অগত্যা মায়ের কথা রাখতে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রইলাম। সোফায় বসা সে বাবুর দিকেও একপল চাইলাম। বাবু যে মাম্মাস বয়, তাতে আর সন্দেহ কী! একজনকে দেখতে এসে তার সামনেই আরেকজনকে পছন্দের ঘোষণা দেওয়া যায়? বাবু নীরব থেকে মায়ের কথায় সম্মতি দিয়ে যাচ্ছে। আমার প্রচন্ড ঘৃ*ণা হলো। ভদ্রমহিলাকে আমার বলতে ইচ্ছে করল,
-" খালাম্মা, বাবুর জন্য বউ না খুঁজে একটা ফিডার আর একটা ন্যাপি কিনে বাড়ি যান, তাতেই কাজ চলবে। মেরুদণ্ডহীন পুরুষ একটা! বিয়ে নয়, ওর দরকার ডে-কেয়ার।"
মনেমনে এসব ভেবে মাথা ঝাড়া দিলাম। হতভম্ব হয়েই বসার ঘরে সবার মুখের দিকে একপল তাকালাম। মা যেন কিছু বলার জন্য উসখুস করছে। বাবা চোখের ইশারায় থামিয়ে দিল মা'কে। বাবা মুখটা গম্ভীর করে গুরুগম্ভীর স্বরে বলল,
-" আপনারা আগে নাস্তা করুন, এ নিয়ে পরে কথা হবে।"
তারপর আপুর দিকে তাকিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল,
-" মিছরি মা, মিষ্টিকে রুমে নিয়ে যাও।"
বাবু বাবুর মা আর এক খালা এসেছেন। আমি উঠে যাওয়ার সময় সবার অলক্ষ্যে বাবুর দিকে তাকিয়ে জিভ বের করে ভেংচি কাটলাম। নাদান বাবুর দৃষ্টি আপুর দিকে থাকায় আমার সাথে চোখাচোখিও হলো তার। কারন আমি আর আপু একসাথে চলে যাচ্ছি। বাবু একটু ভড়কাল বোধকরি।
বসার ঘর থেকে বেরিয়েই সব রাগ একসাথে উগড়ে দিতে থাকলাম,
-" অভদ্র মহিলা একটা। মহিলার মন মানসিকতা কত নিম্ন দেখেছিস আপু। একজনকে দেখতে এসে আরেকজনকে চেয়ে বসে। আর কে কী কী যৌতুক দিতে চাইছে সেই গীত শোনাচ্ছে। আর কী বালের এক চাকরি করে। ইন্টার পাশ করে ঢুকেছে তো সৈনিকে। এমন ভাব যেন ছেলে তার মেজর।"
আপু বলল,
-" মন মানসিকতা যদি উন্নত না হয়, মেজর হলেই কী? আচ্ছা রাগ করিস না, এসব খোল। বাবা কী বলে শুনি আগে।"
আচমকা হো হো করে হেসে উঠলাম। আমার হাসি দেখে আপু ঘাবড়ে যায়। ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
-" ওই এমন পাগলের মতো হাসছিস যে!"
একহাতে মুখ চেপে হাসি সামলে বললাম,
-" বাবা কী বলে এটা শোনার সাথে সাথে হাসি পেল। বাবা কী এখন তার বিবাহিত মেয়েকে আবার বিয়ে দিবে নাকি! তাও আবার মাম্মাস বয় ওই বাবুর সাথে। এক মুরগির কয়বার গলা কা*টে?"
হাসতে হাসতে আরো বললাম
-" পাত্র পক্ষ এমন বলেছে এই খবর দুলাভাইয়ের কানে পৌঁছলে, বেচারা সুন্দরী বউ হারানোর খবরে স্ট্রোক করে না বসে।"
আমার কাঁধে থা*প্পড় দিয়ে চোখ রাঙাল আপু। বলল,
-" ফা'জিল একটা। আচ্ছা তুই থাক। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে শুনে আসি। বাবা কী বলে।"
-" আমিও যাব।"
বলেই এক লাফে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম।
বসার ঘরের ওপাশে আড়াল থেকে দু-বোন কান পেতে শোনার চেষ্টা করি। খাওয়া-দাওয়া পর্ব শেষ হয়েছে। বাবা এবারে গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
-" আপনারা এবার আসতে পারেন।"
মহিলার গলার স্বর এল,
-" আপনারা কবে যাচ্ছেন তাই বলেন ভাই সাব। একটা দিন দেন। বাড়িঘর দেখে আসবেন। তারপর দিনক্ষণ পাকা করবেন। বাড়িঘর দেখে অপছন্দ হবে না। বাবুর বাবা আজ ত্রিশ বছর সৌদি আরব থাকে। দোতলা দালান করেছি।"
বাবা বলল,
-" দেখুন সম্পর্ক মানে শুধু চেহারা বা গায়ের রঙ নয়। সম্পর্ক মানে দুইটা পরিবারের মানসিকতা, সম্মান আর মূল্যবোধের মিল। আপনি আজ একজনকে দেখতে এসে তার সামনেই আরেকজনকে পছন্দের কথা বলেছেন। এটা শোভনীয় নয়। মেয়েরা পণ্য নয় যে বাজারে রেখে বেছে নেওয়া যাবে। এতে যে মেয়েটিকে দেখতে এসেছেন, তার যেমন অপমান হয়, তেমনি আপনাদের মানসিকতাও ফুটে ওঠে।"
এক মূহুর্ত থেমে,
-" আপনি বললেন ছেলের কোনো খারাপ অভ্যাস নেই। সেটা নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। কিন্তু ভালো মানুষ কেবল ধূমপান না করা বা ভদ্রভাবে বসে থাকা নয়। ভালো মানুষ সেই, যে অন্যকে সম্মান দিতে জানে। আজ আপনাদের কথাবার্তায় সেই সম্মানটা আমি খুঁজে পাইনি। আর সবশেষে আমাদের বড় মেয়ে বিবাহিত। তার নিজের সংসার আছে। আর ছোট মেয়েকে আমি এমন জায়গায় দিতে পারব না, যেখানে মানুষকে রূপ, উচ্চতা বা গায়ের রঙ দিয়ে বিচার করা হয়।"
দৃঢ় কণ্ঠে ভদ্র চিত্তে আরো বলল,
-" দোতলা বাড়ি, অর্থকড়ি, সোনার গয়না দেখে আমি মেয়ে দিতে পারব না। আমরা মেয়েকে বিয়ে দিই চরিত্র, সম্মান আর ভদ্রতার বিচার করে। দুঃখিত আসতে পারেন। আপনাদের জন্য শুভকামনা রইল।"
অভদ্র মহিলার মুখটা একটু দেখার শখ জাগলো আমার। বাবা একদম ঠিক বলেছে। তবে আমার ইচ্ছে করছে একটু কড়া করে কিছু শুনিয়ে দিতে। কিন্তু বাবা তো বাবাই। এলাকা ছাড়া আশেপাশের পাঁচ গ্রামের মানুষ বাবাকে একজন আদর্শ হেড মাস্টার বলে জানে। যেমন ভদ্র তেমনই নম্র আমার বাবা।
______________
কয়েকদিন পর....
আপু স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে, আর আমি ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। আপুর বিয়ে মোটে তিন মাসখানেক হবে। আপুর পরীক্ষা চলছিল বিধায় আপু প্রায় মাসখানেকের মতো হবে এখানে আসছে। আপুর বিয়ের বেশিদিন না হতেই, এত তাড়াতাড়ি আমার বিয়ের জন্য তোড়জোড় কেনো? সমস্যা হলো বাবা আপুর বিয়ের পরপরই স্ট্রোক করেছেন। যার ফলে এক সাইড অনেকটাই অকেজো হয়ে যায়। কথা বলতে প্রথম প্রথম অসুবিধা হলেও এখন আর তেমন হয় না। তবে দ্বিতীয়বার স্ট্রোক হলে বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই বাবা চান আমাকেও বিয়ে দিয়ে নিজের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে। তবে বাবা কি সত্যিই দায়মুক্ত হতে চান? নাকি নিজের চোখে আমার সুখটা দেখতে চান? বিয়ে দিয়ে দায় শেষ করা যায় বোধহয়, কিন্তু মেয়ের প্রতি বাবার চিন্তা কি কখনো শেষ হয়? উঁহু, কখনোই চিন্তা শেষ হয় না। আমার তো মনেহয় বরং চিন্তা বাড়ে।
ভাইয়া এমপিভুক্ত হাই স্কুলে চাকরি করে। ভাবীকে নিয়ে বাসায় থাকে সে। ভাবী দু'দিন হলো বাড়িতে এসেছে। আজকে দুলাভাই আসবে। দুলাভাই কাজী ফার্মে চাকরী করে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোল্ট্রি সায়েন্সে মাস্টার্স করেছেন। কাজীতে হ্যান্ডসাম স্যালারিই পায় সে।
রান্নাঘর থেকে মশলার ঘ্রাণ ভুরভুর করে আসছে। হরেক রকমের পদ রান্না হচ্ছে। জামাই আসছে বলে কথা। আমার মা জননী খুব ব্যস্ত। রান্নাঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে খোলা চুলে হাত খোঁপা করতে করতে উঁকি দিলাম। আমাকে দেখেই মা আদেশ ফরমালেন,
-" মিষ্টি টেবিলটা ঝকঝকে করে মুছে রাখ তো। আর দ্যাখ তো মিছরি কী করে? রুম গোছানো হয়নি ওর।"
এক পা করে ধীরেধীরে ভেতরে গেলাম। ইলিশ মাছ ভাজির ঘ্রাণটা নাক টেনে নিয়ে বললাম,
-" এত কিছু রান্না করছো। তোমার জামাই একসাথে খেতে পারবে তো। ভাইয়া তো আর এসেই চলে যাচ্ছে না মা। তাহলে কিছু পদ কালকে রাঁধতেই পারতে।"
ফ্রাইপ্যানে ইলিশ মাছ উল্টে দিতে দিতে বলল ভাবী,
-" আম্মার জামাই তো আর একাই আসছে না। সাথে হবু জামাইও আসছে।"
মুখটা ভোঁতা করে ভাবীর কথা অনুধাবন করার চেষ্টা করলাম। আরেক চুলোয় রোস্টে মশলা দিতে দিতে বলল মা,
-" দেখতে আসলেই কী হবু জামাই হয় ঝিনুক? দেখতে কেবল আসছে, পছন্দ হওয়ার ব্যাপার আছে।"
-" আরে পছন্দ হবে মা। এত টেনশন কীসের।"
মা বোধহয় এখানে আমার থাকা পছন্দ করল না। একটু ঝারি মে*রে বলল,
-" দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? যা টেবিলটা মুছে, শ্যাম্পু করে গোসল করে নে।"
.
টেবিল মুছতে গিয়ে ঘটল এক বিপত্তি। চিনামাটির একটা প্লেট ধাক্কা লেগে মেঝেতে পড়তেই শব্দ তুলে তিনখান হলো। শব্দ রান্নাঘরে যেতেই মা চেঁচিয়ে ওঠে জিজ্ঞাসা করল,
-" মিষ্টি কী ভাঙলি রে?"
দ্রুত ভাঙা অংশ হাতে তুলে নিলাম। কণ্ঠে দৃঢ়তা নিয়ে বললাম,
-" কই কিছু না তো।"
-" শব্দ হলো যে কিছু ভাঙার।"
-" আরে না, এখানে না অন্য কোথাও।"
প্রেশার কুকার সিটি দিচ্ছিল। তাই শব্দটা অতটাও জোড়াল হয় না। এদিকে মিথ্যে বলে বুক ভরে শ্বাস টেনে নিলাম। তক্ষুনি কাঁধে কারো হাতের স্পর্শে চমকে উঠলাম। আপু ঠোঁটে হাসি টেনে ফিসফিসিয়ে বলল,
-" যা দ্রুত ভাঙা অংশ ফেলে দিয়ে আয়। মা দেখলে বকবে। এই প্লেটগুলো মায়ের খুব শখের। শোকেসে সাজিয়ে রাখে। আমাদের পর্যন্ত খেতে দেয় না। আজ মেহমান আসছে বলেই বের করেছে।"
আমি ভীতু স্বরে শুধালাম,
-" মা পরে খোঁজ করলে?"
-" এতগুলোর মধ্যে টের পাবে না। আর পরে কিছু বলা যাবে। এখন এমনিতেই কাজ করছে মা। মেজাজ হাই আছে। সবে বের করে রেখেছে। সাধের প্লেটের এই দশা দেখলে একচোট বকবে নিশ্চয়।"
আপুকে আলিঙ্গন করে গালে চুমু দিয়ে বললাম,
-" থ্যাংকিউ। ইয়্যু আর দ্য বেস্ট আপু ইন দ্য ওয়াল্ড।"
চুমু খাওয়ায় আপু রাগি দৃষ্টি ছুঁড়ল। আমি তোয়াক্কা না করে ছাদে গিয়ে যেপাশটায় গাছপালায় একটু জঙ্গলের মতো ঝোপঝাড় হয়ে আছে ওখানে ফেলে হাত দু'টো ঝেড়ে নিলাম।
__________
ঘড়ির কাঁটা বিকাল চারটা পনেরোর কাছে। দুলাভাই দুপুরে এসেছেন। শুনলাম ওনার এক বন্ধু আসবে। বিকেলে। একসাথেই জব করে। আপুর মারফত শুনেছি সেই ভদ্রলোক নাকি বলেছেন-- বন্ধুর শ্বশুরবাড়িতে ঘুরতে যাবে। বিশেষ কোনো আয়োজন না করতে। এটা যে মেয়ে দেখতে যাচ্ছে এমন যেন বোঝা না যায়। যাবেন এক কাপ চা খেয়ে এক ঝলক মেয়েকে দেখবেন। বিশেষ কোনো আয়োজনের ঝামেলা করার দরকার নেই।
তবে বাঙালী পরিবার কী আর তাই বোঝে? হাজারটা আয়োজন করে বসে। অবশেষে পজিটিভ কিছু না হলে মন খারাপ করে। মনেহয় মেয়ের যেনো আর বিয়ে হবে না। এটা আমার আশেপাশের দেখা অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি।
মা ডেকে বলল---- আপুকে একটু ডাকতে। আপু বোধহয় রুমে আছে। ওড়নার কোণা উড়িয়ে আপুর দরজার সামনে গিয়ে হাক ছেড়ে ডাকলাম। দরজা আটকানো।
-" আপু, মা ডাকছে। একটু শুনে আসো তো। কী যেনো খুঁজে পাচ্ছে না বলল।"
বলেই আমি বসার ঘরের দিকে যাই। মা রান্নাঘরে গুটুর গুটুর করছে আর কী যেন প্যাঁচাল ধরেছে। কানে আসলো,
-" খুঁজলে পরে একটা জিনিস হাতের কাছে পাই না। কই রাখে ওরা সব।"
আমি ওঠে রুমে যাচ্ছিলাম। এরমধ্যে আপু রুম থেকে বেরোতেই আমার সামনাসামনি পরে। হঠাৎ আমার নজর আপুর দিকে আটকায়। আপুকে থামিয়ে দিয়ে বললাম ঝট করে,
-" এই আপু, দাঁড়া, দাঁড়া।"
আপু বিরক্ত মুখে দাঁড়াল। আমি ভ্রু কুঁচকে আপুর কামিজের দিকে ইশারা করে দেখিয়ে বললাম,
-" জামাটা উল্টো করে পড়েছিস যে।"
আপু ভড়কে যায়। দ্রুত আমতা আমতা করে বলে উঠল,
-" ও-ওহো খেয়াল করিনি, উল্টো করে পড়েছিলাম দেখছি।"
-" দুপুরে খাওয়ার সময়ও তো ঠিকই দেখেছিলাম মনেহয়।"
আপু মিছেমিছে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল,
-" তুই বললেই হলো নাকি। সবসময় খেয়াল করেছিস নাকি। আগেই উল্টো ছিলো, তখন কেউ খেয়াল করেনি।"
বলতে বলতে আপু উল্টো ঘুরে টানা কদমে রুমে চলে গেল। ভাবি এদিকে আসতে গিয়ে সবটা শুনল বোধহয়। তাই তো হাসতে হাসতে বলল,
-" তোমার বিয়ের পরে আমরা এভাবে ডিস্টার্ব করব। জামাই নিয়ে রুমে শুয়ে আছে। সেটা দেখেও তুমি হাক ছেড়ে ডাকছো। আবার বেচারি তাড়াহুড়োয় একটা ভুল করেছে সেটাও তোমার নজর এড়ায়নি।"
সবটা বুঝতেই লজ্জা পেলাম। দ্রুত রুমে চলে এলাম। অদৃশ্য হাতে দুই গালে দু'টো চড় দিলাম।
একটু পর মা শাড়ি এনে বিছানায় রাখতে রাখতে বলল,
-" ব্লাউজ আর পেটিকোট পড়ে আয়। ঝিনুক আসছে শাড়ি পড়িয়ে, সাজগোজ করিয়ে দিবে। আর শোন, উঁচু হিল পড়বি। তোর ভাবীর একটা উঁচু হিল আছে না, ওটাই পড়বি।"
ভাবী আসতেই মা বলল,
-" ঝিনুক, শাড়িটা নামিয়ে দিয়ে পড়াবে হ্যাঁ।"
আমি বিরোধীতা করে উঠলাম,
-" মা আমি উঁচু হিল পড়তে পারব না। আমি যতটুকু ওনারা সেটা জেনে, দেখে পছন্দ করলে করবে। না করলে নাই।"
মা ধ'ম'কিয়ে উঠল,
-" বেশি বুঝিস তুই? বাপের মতো এক কাঠি বেশি বুঝোস তোরা তিন ভাইবোন। এইজন্য আমার হয়েছে যত জ্বা*লা।"

0 Comments