আমার ছোট ভাইদের যেন না খেয়ে থাকতে না হয়, অন্তত, তাই আমার পরিবার আমাকে এক ধনী লোকের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল।
আমি কাঁপতে কাঁপতে ধীরে তার শোবার ঘরে ঢুকেছিলাম।
কিন্তু দরজা বন্ধ করার পর সে আমার পোশাকে হাত দেয়নি, বরং আমার হাতে একটা চাবি তুলে দিয়েছিল।
আমার বয়স ছিল মাত্র বিশ।
তার বয়স ছিল প্রায় পঁয়তাল্লিশ।
আমার বাবা তখনই নীরবে টাকা গুনে ফেলেছিলেন।
আমার নাম নীলা। ১৯৮৮ সালে আমার পরিবার আমাকে নগদ পঁচিশ হাজার টাকার বিনিময়ে বেচে দিয়েছিল।
আমরা উত্তরবঙ্গের এক দূরবর্তী, প্রত্যন্ত, খরাপ্রবণ গ্রামে থাকতাম।
যেখানে চৈত্র মাসে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যেত ঠোঁটের মতো, আর ধানের চারা মাথা তুলবার আগেই প্রখর রোদে পুড়ে ছাই হয়ে যেত।
খরা হঠাৎ করে আসেনি।
প্রথমে মাঠের সবুজ ধীরে হারিয়ে গেল।
তারপর গোয়ালের গরু-ছাগলগুলো একে-একে বিক্রি হয়ে গেল।
তারপর রান্নাঘরের চালের ড্রামগুলো একেবারে খালি হয়ে গেল।
তারপর এমন সময় এলো, যখন চারদিকের নীরবতাও নীরবে ক্ষুধার মতো হাহাকার করে উঠত।
আমার বাবা, আনোয়ার আলী, ছিলেন ভীষণ কঠিন মানুষ।
"খারাপ নন," মা বলতেন, "আসলে কপালপোড়া, তাই মেজাজটা সবসময় খিটখিটে।"
কিন্তু আমি কখনো বুঝিনি দুটোর মধ্যে পার্থক্য কোথায়।
বাবার একটা কড়া দৃষ্টিই আমাকে সঙ্গে-সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেলতে বাধ্য করত।
.
আমাদের বাড়িতে মেয়েদের পর্দা আর নিয়মের কোনো যেন শেষ ছিল না।
ভদ্র বাড়ির মেয়েরা জোরে হাসে না, পরপুরুষের দিকে তাকায় না, একা বাইরে হাঁটে না, আর নিজের মুখে "আমি এটা চাই" বলার তো কোনোই প্রশ্নই ওঠে না।
আর বাবার মুখের ওপর "না" বলা? সেটা ছিল একেবারেই কল্পনারও বাইরে।
আমি শিখেছিলাম কীভাবে ভোরবেলা প্রতিদিন উঠে উঠান ঝাড়ু দিতে হয়, ঢেঁকিতে ধান ভানতে হয়, ছেঁড়া কাঁথা সেলাই করতে হয়, মাগরিবের আজান দিলে ঘরে প্রদীপ জ্বালতে হয়, আর বুকের ভেতর উঠে আসা সব না-বলা কথা নীরবে এক নিমেষে গিলে ফেলতে হয়।
অন্য মেয়েরা কাঁচের চুড়ি পরে, রঙিন সালোয়ার-কামিজ পরে বৈশাখী মেলায় যেত।
আমি জানালার ওপাশ থেকে চুপচাপ পর্দার আড়াল টেনে দেখতাম।
আমি কোনোদিন কোনো পুরুষের হাত কখনো ধরিনি।
কখনো কোনো পরপুরুষের সঙ্গে একা বসার সাহস একবারও পাইনি।
আমি দেখতে সুন্দর কি না, সেটাও কোনোদিন জানতাম না।
কারণ আমাদের রক্ষণশীল বাড়িতে আয়না ব্যবহার করা হতো শুধু এটা দেখার জন্য যে, মাথায় কাপড়টা ঠিকমতো আছে কি না, নাকি দেখতে খুব লজ্জাজনক লাগছে।
আমার মা, আমেনা বেগম, খুব একটা কম কথা বলতেন।
কিন্তু তার ভেজা চোখ দুটো এমন সব নির্মম ঘটনার জন্য নীরবে সবসময় আমার কাছে ক্ষমা চাইত, যেগুলো তখনো আমাদের জীবনে ঘটেনি।
.
ক্ষুধার গ্রাস
সেই বছর তীব্র খরা আর অনাহার আমাদের সবাইকে ভেতরে-বাইরে পুরোপুরি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল।
আমার ছোট ভাই আরাফ রাতে খালি পেটে নীরবে যন্ত্রণায় কাঁদত।
সবচেয়ে ছোটটা খিদে সহ্য করতে না পেরে নিজের আঙুল চুষতে চুষতে চামড়া তুলে এমনকি রক্ত বের করে ফেলত।
মা শুধু পাতিল ভর্তি পানিতে সামান্য লবণ আর হলুদের গুঁড়ো মিশিয়ে ফুটিয়ে সেটাকেই "স্যুপ" বলে চুপচাপ বাচ্চাদের মুখে তুলে দিতেন।
বাবা আমাদের চেয়ে অনেক আগে থেকেই খাওয়া প্রায়ই বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
কিন্তু প্রতিটা না-খাওয়া দিনের সঙ্গে সঙ্গে তার রাগ আর ভেতরের হিংস্রতা যেন আরও বেশি ধারালো হয়ে উঠছিল।
নিজের সন্তানদের এই কষ্ট তিনি আর কোনোমতেই সহ্য করতে পারছিলেন না, আবার কোনো উপায়ও ছিল না।
তারপর এক নীরব সন্ধ্যায়, একটা কালো রঙের চকচকে রাজকীয় অ্যাম্বাসাডর গাড়ি এসে আমাদের জরাজীর্ণ মাটির বাড়ির সামনে থামল...

0 Comments