“ নিজের বন্ধুর রক্ষিতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে যে নোংরা মেয়েটাকে সেদিন জম্মদিনের পার্টিতে এতগুলো মানুষের সামনে অপমান করলেন আজ তাকেই এভাবে জোরজবরদস্তি করে বিয়ে করার জন্য তুলে আনলেন আযরান ভাই? তাও আবার নিজেরই বন্ধুর বিয়ের আসর থেকে? লজ্জা করছে না একবারও? ”
কথাগুলো বলেই রোজ তার রক্তরাঙ্গা ঠোঁটজোড়া এলিয়ে হাসল তাচ্ছিল্যের হাসি।দেহাবরণে এখনো তার বিয়ের লাল টকটকে ভারী লেহেঙ্গা আর চোখ ধাঁধানো সাঁজ।চোখে গাঢ় কাজল! সেই গাঢ় কাজল আঁকা চোখজোড়ায় যেন মুহুর্তেই ফুটে উঠল এক সমুদ্র ঘৃণা! আযরান খান নামক লম্বা চওড়া পুরুষটা সেই ঘৃণার প্রলেপ খেয়াল করল কিনা কে জানে, তবে বরাবরের মতোই তীক্ষ্ণ এবং হিংস্র চাহনিতে চাইল যেন মেয়েটার দিকে।
বামহাতটা খুব সূক্ষ্মভাবেই গিয়ে ঠেকল রোজের কোমড়ে, অতঃপর খুব দ্রুতই মেয়েটাকে টেনে আনল নিজের দিকে।দূরত্ব মিটিয়ে ডানহাতের বৃদ্ধাআঙ্গুলিটা রোজের থুতনির কালচে তিলটার কাছে নিয়ে আঙ্গুল বুলাল আবেশিভাবে।আযরানের এক মুহুর্তের জন্য লোভ হলো। ইচ্ছে হলো থুতনির ঐ কালো তিলটা নিজের দাঁতের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করতে। অথচ আযরান তা করল না। রোজের সেই ভুবন ভুলানো চোখজোড়ায় চোখ রেখে সে বরাবরের মতো আবারও আবিষ্কার করল এই মেয়েটা তার রোজ না। কোনভাবেই না! তার রোজ কি করে বদলাল এতোটা? কি করে এতোটা পরিবর্তন?
আযরানের রাগে দিশেহারা লাগে যেন! থুতনির তিলে বুলাতে থাকা আঙ্গুলটা থামিয়ে এবারে হাত দিয়ে মেয়েটার থুতনি চেপে ধরে। দাঁতে দাঁত পিষিয়ে বলে উঠল সে,
“ বিশ্বাসঘাতকদের আমি কখনোই ক্ষমা করি না জান, তোকে সে জায়গায় কি করে ক্ষমা করতে পারি বল? কি করে ভাবলি তোকে শান্তিতে থাকতে দিব আমি? ”
এটুকু বলেই আযরান খেয়াল করল রোজের মাথায় থাকা লাল টকটকে ওড়নাটার দিকে। ভ্রু কুঁচকাল সে। ওড়নার চারধারে মোটা বর্ডানে স্পষ্ট ফুটে উঠছে রোজ এর নাম, সাথে আরেকটা নাম! সায়ান। সায়ান চৌধুরী! আযরান মুখচোখ শক্ত হয়ে এল মুহুর্তেই। দাঁতে দাঁত চেপে সে এক মুহুর্তেই ওড়নাটা টেনে ফেলল ফ্লোরের এককোণে। তীক্ষ্ণ চাহনিতে চেয়ে শুধাল,
” বাহ! রোজ আর সায়ানের নামের মাঝখানে আবার লাভ চিহ্ণও বসিয়েছিস? এত আহ্লাদ ছিল বিয়ে নিয়ে? কাস্টমাইজড করে ওড়নাও বানিয়েছিস? ভেরি গুড! এখন বল, এই ওড়নাটা কি করব?”
রোজ তাকায় নিচে। তখনও সে আযরানের বাহুবন্ধনে। রোজ আযরানের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিতে যাবে ঠিক তখনই আযরান ফের দমকে বলে উঠল,
“ কি হলো? চুপ কেন? কথা বল। কি করব এটা? ”
রোজ ছোট শ্বাস ফেলে কেবল৷ শক্তস্বরে কিছু একটা উত্তর দেওয়ার আগেই আযরান এগিয়ে ওর ওড়নাটায় আগুন ধরাল সযত্নে। অতঃপর বসে বসে ওড়নার আগুনটা জ্বলতে দেখল। আযরানের পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছে ওড়নাটা পোড়াতে পেরে। পোড়ানো শেষে সে হাসি হাসি মুখে ফের রোজের কাছে এল। পা থেকে মাথা অব্দি সাঁজটা পরখ করল। অতঃপর ঝুকে রোজের থুতনিটা ফের চেপে ধরে শুধাল,
“ ইচ্ছে হচ্ছে না, তোকেও এভাবে জ্বালিয়ে দেই রোজ। আমার জিনিস! আমার জান, অথচ সেঁজেছিস অন্যের জন্য? কি করে পারলি এই বেঈমানি করতে? ইচ্ছে হচ্ছে তোকে জানে মে'রে দেই! বাকি রইল তোর বাপের কথা।আযরানকে এখনো চিনে উঠেনি তোর বাপ! তোর বাপকে ওয়ার্ন করেছিলাম, শুনেনি তোর হা'রা'মি বাপ!এখন কেবল দেখবি সুদে আসলে কিভাবে এর মাশুল দিতে হয় তোর বাপকে। খান বাড়ির ছেলেদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তোর বাপ বারবার পার পেয়ে যাবে ভেবে থাকলে ভুল!”
রোজের চাহনি এতোটা সময় দৃঢ়, তাচ্ছিল্যে ভরা থাকলেও এই পর্যায়ে রাগে, ঘৃণায় তার কান্না চলে আসল।চোখ লাল টকটকে হয়ে এল। সামনের পুরুষটিকে এক সময় সে ভালোবেসেছিল এটা ভাবলেই তার গা গুলিয়ে আসছে। শরীরের প্রত্যেকটা রক্তকণিকায় বয়ে যাচ্ছে খুবই সূক্ষ্ম এক ঘৃণার রেশ।রোজের চাহনি জ্বলন্ত।দৃঢ় স্বরে আঙ্গুল দেখিয়ে শুধাল,
“ আমি তাহশিয়া কবির রোজ আযরান ভাই! ডেইজি নই যে নিজের প্রেমিককে নিজের বাবার থেকেও বেশি গুরুত্ব দিব। ফের বাপ নিয়ে কথা বললে রক্তা'রক্তি হয়ে যাবে এখানে! ”
আযরান ঠোঁট বাকাল। দৃষ্টিতে কি ভীষণ রসিকতা নিয়ে শুধাল,
“ তাই নাকি জান? তবে হোক রক্তারক্তি কান্ড! ”
এটুকু বলেই আযরান তর্জনি আঙ্গুল বুলাল রোজের আদুরে মুখে। রোজের চোখ টকটকে লাল তখনও। ফের দাঁতে দাঁত চেপে শুধাল,
” ভালোই ভালো বলছি আযরান,ছেড়ে দিন আমায়। মুক্তি দিন! ”
আযরান হাসে। আযরান ভাই থেকে আযরান নামটা শুনেই হাসল।যাক, তবুও পুরাতন কিছু বৈশিষ্ট্য তার রোজের মাঝে অবশিষ্ট আছে। আযরান খানিকটা ঝুুকে তাকাল। চোখে ফুটে উঠল অন্যরকম চাহনি। আযরান এবারে আঙ্গুল নিয়ে ঠেকাল রোজের ঠোঁটে। স্বরটা একটু গাঢ় করেই শুধাল,
“ কক্ষনো না জান! স্টিল এটা সম্ভব ও না। ইউ নো না? তুমি আযরানের জান! জান ছাড়া বাঁচা সম্ভব নয়৷ ”
রোজের চোখজোড়া এবার টলমল করে উঠে যেন। এই দুটো বছর সে শান্তিতে ঘুমোতে অব্দি পারেনি একটা রাত। এই দুটো বছর তার কি অসম্ভব যন্ত্রনায় কেঁটেছে সে জানে। অথচ আযরান? আযরানের কোন মায়া হলো না তার প্রতি? নিত্যনতুন ভাবে তাকে দোষী করে শুধু দুঃখ দিতেই জানে এই পুরুষ! রোজ শান্ত স্বরেই বলল,
“ আযরান ভাই? আমায় একটু শান্তি দিন না এবারে। প্লিজ! আমাদের দুই বোনের জীবন নরক হয়ে গেছে। নরক!আপনাকে ভালোবাসাটা কি আমার পাপ ছিল বলুন? যার জন্য জীবনের এই অবস্থা?আমার বোনটা,আমার বোনটাও সুখে নেই!আপনারা আমার বোনের জীবনটাও জাহান্নামে পরিণত করেছেন।”
আযরান গলল না। ভ্রু কুঁচকে শুধায়,
“ আর আয়জানের জীবনটা? পাগল বানিয়ে রেখেছিলি তোরা আমার ভাইটাকে। বেঈমান কতগুলো তোরা!”
আয়জান আযরানের চাচাতো ভাই। নিজ ভাই না থাকলেও সে বড় হয়েছে তার চাচাতো দুই ভাই এর সাথেই। দুইজনকেই ভাই এবং বন্ধু হিসেবে মানে সে। রোজের মনে আসে আয়জান, আযরান এবং আয়শান খানের বন্ধনের কথা। কান্না পায় তার কেমন। আয়জান মজা করলেএ আয়শান ভাই তাকে বোনের মতো স্নেহ করত সবসময়! রোজ চোখ বুঝে। ফের চোখ মেলে জ্বলন্ত কন্ঠে বলে উঠল,
“ জানি আমরা বেঈমান! আপনারা? আপনারা খুব ভালো হু? অতো ভালো হলে পারিবারিক ঝামেলা ক্রমশ বাড়াচ্ছেন কেন? মেটাননি কেন একবারও নিজ থেকে গিয়ে? মাঝখান দিয়ে আমরা দুইবোন শেষ হয়ে গেলাম।শেষ করে দিলেন। ”
আযরান এই পর্যায়ে খুব গাঢ়স্বরে বলল,
“তোর শেষটাও আমার হাতেই হোক, তবুও অন্য কারোর হবি এটা সহ্য করার মতো ভালো আমি নই রোজ। ”
আযরান উত্তর করতেই তার ফোনে কল এল। আযরান ভ্রু বাঁকায়। পকেট থেকে ফোন বের করেই স্ক্রিনে তাকিয়ে হাসল সে। এখন আপাতত তারা নিজ শহরের বাইরে একটা বাংলোতে আছে।
আযরানের মনে হয়েছিল এটাই সেইফ জায়গা। তাই তো এতদূরে রোজকে জোর করে তুলে এনেছিল। যদিও এতে তার বড়ভাই আজহারও মত দিয়েছিল। কিন্তু এখানেই এসে বাঁধল আরেক বিপত্তি। কাজী পাওয়া গেল না। আযরান উপায় না পেয়ে নিজের বড়ভাইকেই জানিয়েছিল বিষয়টা। আর সে অনুযায়ী তার বড়ভাই আয়শান ও রাত এগারোটায় কাজী, পাঞ্জাবী,ফুল সব নিয়ে হাজির হয়েছে অতদূর থেকে।আযরান ফোন কানে তুলে। ওপাশ থেকে আয়শান খান নামক পুরুষটা তখন ভাইকে শুধাল,
“ আযরান? বের হ।গাড়িতে যা যা আছে নিয়ে যা, আমি রাতের খাবার আনতে যাচ্ছি।”
আযরান মুহুর্তেই নাকোচ করে বলল,
“ বের হবো? রোজকে তুমি বিশ্বাস করলেও আমি করি না, পালিয়ে যাবে বেয়া'দবটা! ”
আয়শান চাপা হাসল বোধহয়।বয়সে আযরানের থেকে মাত্র বছর দুয়েকের বড়। অথচ খান বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে তাকে প্রত্যেকেই মানে। আযরান, আয়জান প্রত্যেকেই ভাইকে ভাই হিসেবে যেমন মানে তেমন নিজেদের সবকিছু শেয়ারও করে। আয়শান গম্ভীর হেসে ফের জানাল,
“তোরা কি দুপুরে খেয়েছিলি আযরান? সময় তো কম গেল না। রোজেরও নিশ্চয় ক্ষিধে পেয়েছে ? ”
আযরান ও হাসল। বউ নিয়ে বিয়েবাড়ি থেকে পালিয়েছে,ওহ হ্যাঁ, পালানো নয়! কিডন্যাপ! বউ কিডন্যাপ করে এনেছে প্রায় দশ এগারো ঘন্টা হতে চলল। এখানে এসে পৌঁছিয়েছে তারা সন্ধ্যার একটু পরই। অতঃপর এসেই খেয়েছিল সে, রোজকেও জোর করে খাইয়ে দিয়েছিল কয়েক গ্রাস।
আযরান মুহুর্তেই উত্তরে জানাল খেয়েছে তারা। না খেলেও সমস্যা নেই। খাওয়ার থেকে আপাতত এই রমণীকে বিয়ে করাটা ইম্পোর্টেন্ট! আয়শান কল রাখে। তার কিছু মুহুর্ত পরই কয়েকজনসহ, কাজিকে নিয়ে হাজির হলো। দুই হাতে শাড়ি, পাঞ্জাবীর প্যাকেট নিয়ে এগিয়ে এল। সাথে আয়শানের বন্ধু আবরারকেও দেখা গেল। যার হাতে খাবারের প্যাকেট।আয়শান এগিয়েই ওসব রেখে বলল,
“ পাঞ্জাবী আর শাড়ী আছেরোজ যদিও বিয়ের সাঁজেই আছে।তুই যা,পাঞ্জাবী পরে আয়। ”
আযরান ভাই এর দিকে ভ্রু বাঁকিয়ে বলে,
“ রিস্ক নিব? এই মেয়ে যদি সে সুযোগে পালিয়ে যায়? ”
আয়শান ফের গম্ভীর গলায় বলল,
“পালাবে না, আমি রোজকে বুঝাচ্ছি। ”
আযরান আশ্বস্ত হতে পারে না যেন। বলল,
“ বেঈমানদের বুঝিয়ে লাভ হয়? ”
“ তোকে যেতে বলেছি আযরান। ”
আযরান ভাই এর গম্ভীর আর দৃঢ় আওয়াজ শুনে ওয়াশরুমে গেল ঠিকই তবুও তার মনে একটা ক্ষুতক্ষুতে সন্দেহ তো অবশ্যই লাগছে। যে রোজ তাকে রেখে অন্য পুরুষকে বিয়ে করে ফেলতে যাচ্ছিল, অন্য পুরুষের সাথে মাস ছয় রিলেশনে যেতে পারে সে রোজ তার আড়ালে পালিয়েও যেতে পারে! আযরান দ্রুতই নিজের ড্রেস চেঞ্জ করতে লাগল যেন। অপর দিকে আয়শান চেয়ার নিয়ে বসল রোজের সামনে। সেই ছোট্ট রোজ! তার বোনের মতো ছিল আদুরে এই মেয়েটা!
শুধু রোজ নয়, রোজ, ডেইজি সহ তার বাড়ির প্রত্যেকটা মেয়েকেই সে বোনের দৃষ্টিতে দেখে। শুধু একজনকে বাদে। এই সবাইকেই আয়শান নিজের চোখের সামনে স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছে। সে বোনগুলোও তাকে পাহাড় সমান সমীহ করে চলে সবসময়। রোজও ব্যাতিক্রম নয়। আয়শান জানে, রোজ তার কথা ফেলবে না। তাই তো হেসে ডাকল,
“ রোজ? ”
রোজ তাকাল। এতক্ষনে যেন একটা বিশ্বাসযোগ্য লোক পেয়ে সে টলমলে চোখে তাকায়। ফ্যালফ্যাল চাহনি রেখে বলে,
“ আয়শান ভাই?আপনার ভাই আমায় তুলে এনেছে বিয়ে থেকে।অপহরণ করেছে। আপনি কিছু বললেন না কেন এখনো? এটা তো আপনার থেকে আশা করি না আয়শান ভাই।আপনি তো এমন নন বলুন? ”
আয়শান আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে শান্তস্বরে বলল,
“ তোকে তুলে আনার কথাটা আমার জানা রোজ।এবং এতে আমার মতও ছিল। তুই আমায় বড়ভাই মানিস তো রাইট? আমি যে কোন ভুল সিদ্ধান্ত নিব না এটুকু আস্থাও নিশ্চয় আছে বল?”
রোজ শান্ত হয়ে জানাল,
“ আছে। ”
“ গুড! এবার বল, তুই কি সায়ানকে ভালোবাসতি? ওকে ভালোবেসে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলি? দেখ, আমার জানামতে তুই অনেককাল আগে থেকেই আযরানকে ভালোবাসিস রোজ। আযরানের থেকেও তুই ওকে বেশি চাইতি। এবং তোদের বিয়েটা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল বল? ”
রোজ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ ছিল! ”
আয়শান ছোটশ্বাস ফেলল উত্তর শুনে। বলল,
“ আমি চাই না আয়জানের মতো অবস্থা আযরানের ও হোক। আমার ভাই ওরা, আমার বাচ্চার মতো দেখি আমি ওদের রোজ। আমার পরিবারটা এভাবে ছন্নছাড়া হতে পারে না বল? আয়জান আর আম্মু এখন বাহিরে, দুইবছর হলো আয়জান বাসায় আসে না, আম্মুও আসে না৷ তুই কি চাস আযরানও এমন করুক রোজ? পারিবারিক দ্বন্ধ বড়দের মাঝে। ওটাকে ছোটদের মাঝে না টানাই উচিত না বল? তুই যদি আজ সায়ানকে বিয়ে করে নিস তোর ফেমিলি হয়তো গর্ববোধ করত, কিন্তু তুই কি সুখী হবি? খুশি থাকবি রোজ?”
ততক্ষনে আযরান বেরিয়ে এসেছে। পরনে তার একটা সাদা পাঞ্জাবি, উপরে সাদা কোটি। দেখতে বিয়ে বিয়ে সাঁজ লাগছে। কিন্তু রোজ তাকাল না একবারও। আযরান নিজের চেঞ্জকৃত কাপড়গুলো হাতে নিয়ে এসে বলল,
“ থাকবে ভাইয়া! ওর আবার সায়ানকে খুবই পছন্দ হয়েছে। ছয়মাস তে দুইজনে ছুটিয়ে প্রেমও করেছে৷ কিন্তু ওকে বলে দাও, প্রেম করুক, পছন্দ করুক যায় হোক আমার ওকে লাগবে। এক্ষুনি যদি বিয়ে না করে তিড়িংবিড়িং করে তো সায়ান তো খু'ন হবে হবেই, ওর বাপ ভাইও খু'ন হবে আমার হাতে। আমাকে কিন্তু আয়জানের মতো চালাকি করে কেউ ভুলাতে পারবে না। ”
আয়শান শুধু শান্ত ভঙ্গিতে তাকায়।দৃষ্টি কি ভীষণ গভীর। রোজ ততক্ষনে ফুঁসে উঠে বলে,
“ আয়শান ভাই, আমার বাপ ভাইকে খু'ন করলে আমি তোমার ভাইকে ছেড়ে দিব? পুরো একশো একটা টুকরো করে কুকুরকে খাওয়াব আমি উনার মাংস। ”
আযরানও দ্রুত বলল,
“ ও কত বড় বেঈমান হলে এমন করতে পারে ভেবেছো তুমি ভাইয়া? শোনো, তবুও আমার কিন্তু ওকেই লাগবে। ওকেই! ও অন্য কারোর হলে আমি ওকেও খুন করতে দুই সেকেন্ড সময় নিব না। ”
আয়শান হাসল। এমন একটা কঠিন মুহুর্তে এই দুইজনের এমন কার্যকলাপ আসে কিভাবে? আয়শান রোজের দিকেই তাকাল। বলল,
“রোজ? বড়ভাই হয়ে বলছি। রাজি হয়ে যা বিয়েটায়। আমাকে আমার আরেকটা ভাইয়ের পাগলামো দেখতে যাতে না হয় হুহ?আর শোন, আমরা সত্যিই চাই তুই আমাদের বাড়ির বউ হও, তোর সাথে কোন দ্বন্ধ নেই ছায়ানীড়ের কারোরই। রাজি হয়ে যা রোজ!অনুরোধটা রাখ। আমি বাইরে যাচ্ছি হুহ? তুই আরেকটু সময় নিয়ে ভাব। আমরা তোকে জোর করছি না। ”
রোজ কেমন শান্ত ভঙ্গিতে তাকাল। এমন করে বললে সে রাজি না কি করেই বা বলবে? কি করেই বা জেনেবুঝে সে একটা পরিবার ভাঙ্গবে? আয়শান ভাই তো মাত্রই বলল,বিয়েটা না হলে পরিবারটা ভাঙ্গবে হয়তো। আযরানও হয়তো আয়জানের মতে পাগলামে করবে? হয়তো কেন,অবশ্যই করবে। রোজ জানে, আযরান শুধু ও বাড়িতেই নয়, তার বাবার বাড়িতেও তান্ডব চালাবে। আযরানকে চেনা আছে তার! রোজ ভাবে। এর মাঝে আযরান আয়শানকে বলে উঠল দ্রুত,
“ জোর করছি না মানে ভাইয়া? ও রাজি নাহলে তুমি ওকে সায়নের সাথে বিয়ে দিবে? আমি তা হতে দিব? ”
আয়শান যেতে যেতে শুধু এটুকু বলল,
“ ও বুঝবে। আমার বিশ্বাস ও রাজি হবে। ”
এটুকু বলেই আয়শান চলে গেল। আযরান ঘড়ি দেখতে লাগল! গুণে গুণে এক মিনিট হওয়ার পর সে রোজের সম্মুখে দাঁড়িয়ে ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
“ রাজি তুই? এক মিনিট তো পেরিয়ে গেল। ”
রোজ তাকাল। বলল,
“ রাজি না। ”
আযরান পাত্তাই দিল না। শাড়ির প্যাকেগুলো থেকে শাড়ি বের করতে করতে বলল,
“ নো প্রবলেম, রাজি নাহলেও তোকে আজ বিয়েটা করতে হবে। এখন বল কোন শাড়িটা পরবি? ”
রোজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“শাড়ি কেন পরব? ”
“ তুই কি করে ভাবলি যে যে সাঁজটা তুই সায়ানের জন্য সেঁজেছিস সে সাঁজেই আমি তোকে বিয়ে করব? আযরান খান এতোটাও পঁচে যায়নি। এখন তাড়াতাড়ি এই সাঁজ চেঞ্জ কর। ”
রোজ ত্যাড়ামি দেখিয়ে বলল,
“ করব না। ”
“ সমস্যা নেই, আমি এই সাঁজ নষ্ট করতে পারব। ”
রোজ মুহুর্তেই বলল,
“ কি?”
আযরান কানে নেয় না। সে শাড়ি চ্যুজ করতে লাগে। অতঃপর একটা সাদা জামদানি নিল হাতে। বিড়বিড় করে বলল,
“ উমমম! এটাই ঠিক আছে। আয়শান ভাই এর চয়েস ঠিক আছে। ”
এটুকু বিড়বিড় করে বলতে বলতেই সে গিয়ে দরজা আটকাল। শাড়িটা হাতে নিয়ে দরজা আটকাতেই রোজ তৎক্ষনাৎ বলে উঠল,
“ দরজা আটকালেন কেন? আযরান! আমার সাথে খারাপ কিছু করতে চাইলে আমি কিন্তু ছেড়ে দিব না। ”
আযরান বাঁকা হাসে। ঠোঁট বাঁকিয়ে আসতে আসতে বলে,
“ তো ছাড়তে কে বলেছে জান? ধরে রাখ না। ”
ফের শক্ত কন্ঠে বলল রোজ,
” দরজা খুলুন, আযরান! চিৎকার করব আমি। ”
আযরান কাছে এসে বলল,
“ ছিঃ! বাইরে তোর ভাসুর সম্পর্কীয় একজন আছে রোজ। বড়ভাই মানিস তাকে।তোর চিৎকার করতে লজ্জা হবে না একবারও? ভাববে কি বল ভাইয়া? ”
রোজ শুধাল,
“ আমার থেকে দূরে সরুন।”
আযরান সরল না। বরং ঝুঁকে গিয়ে বলল,
“ শেষবার বলছি, ভালোই ভালোই বিয়েতে রাজি হয়ে যা রোজ৷ এক্ষুনি গিয়ে লক্ষী মেয়ের মতো শাড়িটা পরে বউ সেঁজে এসে কবুল বলবি। ”
রোজ উত্তর করল না। তাকাল কেবল। আযরান ফের বলল,
“ কি হলো বল?”
রোজ এবারেও উত্তর দিল না। আযরান ছোটশ্বাস ফেলল এবারে। আচমকায় বামহাতটা রোজের কোমড়ে রেখে হেঁচকা টানে নিজের একেবারে কাছে আনল। অতঃপর কোমড়ের শাড়ির দিকটায় টান দিয়ে বলল,
“ ওকে ফাইন, আমিই পরাচ্ছি। ”

0 Comments