সোনার_গয়না

সোনার_গয়না




​সেদিন রাতের অন্ধকারটা যেন অন্য যেকোনো রাতের চেয়ে অনেক বেশি ভারী ছিল। বিছানায় পিঠ ঠেকাতেই বুকের ভেতর একটা তীব্র য*ন্ত্রণা মোচড় দিয়ে উঠল। একপাশে নীলা ফুঁপিয়ে কাঁদছে, আর দেয়ালের ওপাশে আমার মা আর বোনের ঘর। যে মা নিজের প্লেটের ভাত নিজে মুখে না তুলে আমাদের খাইয়ে বড় করেছেন, আজ তাকে চো*র অপ*বাদ সইতে হলো! আর নীলা? সে-ও তো আমার স্ত্রী, চার বছরের সংসার আমাদের। সে কেন মিছেমিছা এত বড় নাটক করবে?
​মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। সারাদিনের ঘটনাগুলো সিনেমার মতো চোখের সামনে ভাসতে লাগল।
​হঠাৎ একটা খটকা লাগল। নীলা বলেছিল গয়নাগুলো সে আগের রাতেও দেখেছে। শুক্রবার সকালে নীলার মা এলেন, দুপুরে খাওয়া-দাওয়া হলো, আর বিকেলে আমি বাজারে গেলাম। এই চার-পাঁচ ঘণ্টার ব্যবধানে গয়না গায়েব! যদি মা বা বোন নিত, তবে বাড়ি তল্লাশির সময় কোথাও না কোথাও তো পাওয়া যেত। তারা তো আর গয়না গিলে ফেলেনি! আর যদি বাইরে কোথাও সরিয়ে দিয়ে থাকে, তবে সেটা কখন করল? বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তো তারা বাড়ির ভেতরেই ছিল।
​চিন্তা করতে করতে কখন যে চোখ লেগে এসেছিল জানি না। হঠাৎ একটা মৃদু খসখস শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত তখন আনুমানিক ৩টে বেজে ২০ মিনিট।
​পাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম নীলা বিছানায় নেই। ঘরের দরজাটা সামান্য খোলা। আমি খুব সাবধানে, কোনো শব্দ না করে খাট থেকে নামলাম। দরজার ফাঁক দিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে তাকাতেই আমার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল।
​হালকা অন্ধকারে আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে, নীলা আর শাশুড়ি আম্মা ফিসফিস করে কথা বলছেন। আমি দেওয়ালের আড়ালে এসে কান পাতলাম।
​শাশুড়ি আম্মা চাপা গলায় বলছেন, "তুই ব্যাগটা ঠিকঠাক জায়গায় লুকিয়েছিস তো নীলা? তোর শাশুড়ি আর ননদ যেভাবে আলমারি দেখাল, আমার তো বুক কাঁপছিল।"
​নীলা ফিসফিস করে জবাব দিল, "মা, তুমি পা*গল হয়েছ? আমি কি এত বোকা? ওগুলো শ্বাশুড়ির আলমারিতে রাখব কেন? ওনার বিছানার তোশকের তলা কে*টে গয়না গুলো রেখে ওভাবে সেলাই করে তারপর ওপর থেকে চাদর টেনে দিয়েছি। চো*র সাজাতে হলে একটু বুদ্ধি খাটাতে হয়।"
​শাশুড়ি আম্মা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, "বাঁচালি! এবার দেখবি তোর বর কীভাবে অতিষ্ঠ হয়ে এই বাড়ি থেকে তোর শ্বাশুড়ি আর ননদকে বের করে দেয়। এই বুড়ি আর ধাড়ি ধেড়ে ওড়নাটার ছায়া থেকেও মুক্তি পাবি, আর ৯ ভরি সোনাও তোর কাছেই থাকবে। এক ঢিলে দুই পাখি!"
​কথাগুলো শোনামাত্রই আমার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। আমার চোখের সামনে যেন চারপাশের পৃথিবীটা দুলতে লাগল। যে মেয়েটাকে আমি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করেছি, যে মা-বোনের অপবা*দে আমি বিকেলেও ছটফট করেছি, সেই নীলা নিজের মায়ের সাথে মিলে এই জঘন্য ষ*ড়যন্ত্র করেছে! শুধু আমার মা আর বোনকে বাড়ি থেকে তাড়ানোর জন্য, আমাকে আলাদা করার জন্য?
​আমার রা*গ, ক্ষো*ভ আর ঘৃণা যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়তে চাইল। কিন্তু আমি নিজেকে সামলালাম। এই মুহূর্তে চিৎকার-চেঁচামেচি করলে ওরা সুযোগ পেয়ে যাবে। প্রমাণ হাতে না নিয়ে কিছু করা যাবে না।
​আমি পা টিপে টিপে নিজের ঘরে ফিরে এলাম। বিছানায় শুয়ে রইলাম, মা-বোনের মুখের সেই মলিন, অপমা*নিত চেহারাটা মনে পড়ে বুকটা ফে*টে যাচ্ছিল।
​সকাল হলো। আলো ফোটার সাথে সাথেই শাশুড়ি আম্মা আবার ড্রয়িংরুমে এসে চড়া গলায় পার্ট পার্ট করে ডায়লগ দেওয়া শুরু করলেন, "কী বাবা জামাই? সকাল তো হলো। আজ কি পুলিশে খবর দেবে, নাকি চো*রদের এভাবেই মাথায় তুলে রাখবে?"
​আমার মা আর বোন রান্নাঘরের কোণে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের চোখের নিচে কালচে দাগ, রাতে যে এক ফোঁটাও ঘুমাননি তা স্পষ্ট।
​আমি শান্ত মুখে ড্রয়িংরুমে এসে বসলাম। নীলাও চোখ মুছে আমার পাশে এসে বসল, যেন কত বড় ভুক্তভোগী সে।
​আমি বললাম, "হ্যাঁ আম্মা, পুলিশে খবর দেব
এমন বড় চু*রি এই বাড়িতে মেনে নেওয়া যায় না। আমি এখনই থানায় ফোন করছি।"
​আমার কথা শুনে শাশুড়ি আম্মার মুখে একটা বিজয়ী হাসি ফুটে উঠল। নীলাও আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে মাথা নাড়ল। ওরা ভাবছে, ওদের চাল একদম সফল। কিন্তু ওরা জানত না, ওদের পায়ের নিচের মাটি আমি আগেই কে*টে রেখেছি।
​সকালে সবাই যখন যে যার মতো ব্যস্ত, আমি তখন চুপিচুপি মায়ের ঘরে ঢুকলাম। মা আর বোন তখন রান্নাঘরে। ফিসফিসানি শুনে আগেই জেনেছিলাম নীলা ঠিক কোন জায়গায় গয়নাগুলো রেখেছে। মায়ের বিছানার তোশকের এক কোণে তাকাতেই দেখলাম, মোটা সুতো দিয়ে কাঁচা হাতে সেলাই করা। বুকটা রা*গে ফে*টে যাচ্ছিল আমার নিস্পাপ মা-বোনের বিরুদ্ধে এই জঘন্য ষ*ড়যন্ত্র দেখে।
​আমি পকেট থেকে একটা ব্লেড বের করে খুব সাবধানে সেলাইটা কাটলাম। ভেতরে হাত দিতেই কাপড়ের সেই চেনা পুটলিটা পেয়ে গেলাম। ৯ ভরি সোনার গয়নাগুলো বের করে আমি সোজা আমার পকেটে পুরলাম। এরপর সুচ-সুতো বের করে তোশকের সেই কা*টা জায়গাটা ঠিক আগের মতোই নিখুঁতভাবে সেলাই করে দিলাম, যাতে বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনো উপায় না থাকে যে এর ভেতর থেকে কিছু বের করা হয়েছে।
​সব গুছিয়ে আমি ড্রয়িংরুমে এসে সোফায় বসলাম। ঠিক আধ ঘণ্টার মধ্যে আমার ডেকে পাঠানো পুলিশ অফিসার আর দুজন কনস্টেবল বাড়িতে এসে হাজির হলেন।
​পুলিশ আসতেই শাশুড়ি আম্মা একেবারে মা*রমুখী হয়ে উঠলেন। অফিসারকে লক্ষ্য করে বললেন, "আসুন স্যার, আসুন! এই বাড়িতে দিনের আলোয় ডা*কাতি হয়ে গেছে। আমার মেয়ের ৯ ভরি সোনা গায়েব! আমি তো জামাইকে বললাম বাড়ির মানুষ ছাড়া আর কেউ এই কাজ করতেই পারে না।"
​পুলিশ অফিসার গম্ভীর গলায় বললেন, "কাউকে কি আপনাদের সন্দেহ হয়?"
​শাশুড়ি আম্মা সরাসরি আমার মায়ের ঘরের দিকে আঙুল তুলে বললেন, "সন্দেহ আবার কী স্যার? ওই ঘরে যান। ভালো করে তল্লাশি চালান। চো*র ওখানেই লুকিয়ে আছে।"
​অফিসার আমার দিকে তাকালেন। আমি মাথা নেড়ে বললাম, "আইন তার নিজের গতিতে চলবে স্যার। আপনারা ঘর চেক করতে পারেন।"
​পুলিশ মায়ের ঘরে ঢুকল। পেছনে পেছনে শাশুড়ি আম্মা, নীলা এবং আমি গেলাম। রান্নাঘর থেকে আমার মা আর বোনও এসে দরজার সামনে ভ*য়ে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়াল। মায়ের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। আমার বোনটা ভ*য়ে মায়ের আঁচল খামচে ধরে আছে। ওরা ভাবছে, পুলিশ যদি কিছু না পেয়েও ওদের ধরে নিয়ে যায়, তবে সমাজে মুখ দেখাবে কীভাবে!
​পুলিশ পুরো ঘরের আলমারি, ট্রাঙ্ক, ড্রয়ার সব তন্নতন্ন করে খুঁজল। স্বাভাবিকভাবেই কিছুই পাওয়া গেল না।
​কনস্টেবল যখন বলল, "স্যার, এখানে তো সন্দেহজনক কিছুই দেখছি না।"
​ঠিক তখনই শাশুড়ি আম্মা একধাপ এগিয়ে এসে বললেন, "আরে স্যার! চো*র কি এত বোকা যে আলমারিতে রাখবে? ওই বিছানাটা দেখছেন না? তোশকটা ভালো করে চেক করেন। ওখানেই গয়না আছে!"
​পুলিশ অফিসার খাটের দিকে এগিয়ে গেলেন। চাদরটা সরাতেই তোশকের সেই সদ্য সেলাই করা অংশটা সবার চোখে পড়ল।
​সেলাইটা দেখেই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা আমার মা আর বোন আঁতকে উঠল। মা কপালে হাত দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "খোদা, এটা কী! আমি তো তোশকে কোনোদিন সেলাই করিনি!" আমার বোন কান্নায় ভেঙে পড়ল।
​অন্যদিকে, শাশুড়ি আম্মা আর নীলার মুখ খুশিতে চকচক করে উঠল। নীলা তার মায়ের দিকে তাকিয়ে একটা চতুর হাসির বিনিময় করল। ওরা নিশ্চিত, এবার বুড়ি আর ধাড়ি ধেড়ে মেয়েটা জে*লের ভাত খাবে।
​পুলিশ অফিসার ভুরু কুঁচকে বললেন, "হুম, তোশকের ভেতরে কিছু একটা লুকানো হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। কাঁচিটা দাও তো।"
​কনস্টেবল তোশকের সেই সেলাই করা সুতোগুলো এক এক করে কাটতে লাগল। শাশুড়ি আম্মা তখন বিজয়ের হাসিতে গদগদ হয়ে বলছেন, "দেখলেন তো স্যার? আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া এত সহজ না! এবার এই চো*রদের ধরে নিয়ে যান!"
​সেলাইটা পুরোপুরি কাটা হলো। পুলিশ অফিসার তোশকের ভেতরে হাত ঢোকালেন। তিনি ভেতরে হাত দিয়ে এদিক-ওদিক খুঁজলেন, কিন্তু তার হাত খালি অবস্থায় বেরিয়ে এলো। ভেতরে কোনো সোনা নেই—পুরো ফাঁকা!
​অফিসার বিরক্ত হয়ে বললেন, "কই, এখানে তো কিচ্ছু নেই! শুধু তুলো ছাড়া আর কিচ্ছু পাওয়া যায়নি।"
​মুহূর্তের মধ্যে শাশুড়ি আম্মা আর নীলার মুখের চতুর হাসিটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। ওদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
​নীলা নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। সে আর থাকতে না পেরে হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠল, "না! এটা অসম্ভব! গয়না তো এখানেই আছে! ভালো করে খুঁজে দেখেন! আমি নিজে ওটার ভেতর..."
​কথাটা অর্ধেক বলেই নীলা নিজের জিব কামড়ে ধরল।

Post a Comment

0 Comments