আরিমান দরজায় হেলান দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ইমার এই নিষ্পাপ পাগলামি দেখছিল। ওর চোখের সেই চেনা কঠোরতা যেন এক লহমায় কর্পূরের মতো উড়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই ও নিজের গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের গম্ভীর রূপটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল।
"হুমহুম, বেশ ভালোই নাচ হচ্ছে। তবে কাল সকাল ৭টায় ফ্লাইট। মাঝরাতে এই ভূতুরে নাচ বন্ধ করে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলে খুশি হতাম," আরিমান কড়া কিন্তু ভেতরের এক প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় লুকিয়ে রেখে বলল।
আরিমানের গলা শুনে ইমা এক ঝটকায় থমকে গেল। ওর নাচের মাঝপথেই আটকে গেল। লজ্জায় আর সংকোচে ওর ফর্সা মুখটা মুহূর্তে লাল হয়ে উঠল। ও তাড়াতাড়ি নিজের ওড়নাটা টেনে নিয়ে ঘাড় নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। নিজের আঙুল মোচড়ানো ছাড়া আর কোনো কাজ খুঁজে পেল না ও।
"আমি... আমি আসলে... মানে রেডি হচ্ছি," ইমা তোতলাতে তোতলাতে বলল।
আরিমান আর কথা বাড়াল না। ওর ঠোঁটের কোণে শেষবারের মতো একটা আলতো হাসির রেখা ফুটিয়ে ও নিজের রুমের দিকে চলে গেল। কিন্তু ওর মনের ভেতরে তখন এক অজানা শান্ত সুর বাজছে। বিগত তিন বছরের জমে থাকা একরাশ অন্ধকার যেন একটু একটু করে কাটতে শুরু করেছে।
পরদিন ভোর ৪ টা।
মিলানের কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস আর কুয়াশা চিরে আরিমানের কালো মার্সিডিজ গাড়িটা যখন বিমানবন্দরের দিকে ছুটছিল, তখন ইমা জানালার বাইরে চেয়ে দেখছিল। ওর চেনা ইতালির ধুলোবালি, সুন্দর সুন্দর ভিলাগুলো আস্তে আস্তে পেছনে চলে যাচ্ছে। ওর মনের ভেতর তখন এক তীব্র ছটফটানি—ও নিজের দেশে ফিরে যাচ্ছে! নিজের চেনা সবুজ মাটি, চেনা গন্ধ, চেনা মানুষগুলোর কাছে!
আরিমান পুরোটা পথ নীরব ছিল। ও শুধু এক নজরে লক্ষ্য করছিল ইমার চোখে-মুখে খেলে যাওয়া সেই খুশির আলো। ইমার এই খুশিটুকুর সামনে ওর নিজের জেদ,ব্যস্ততা—সবকিছুই এক নিমেষে অর্থহীন মনে হচ্ছিল।
ফ্লাইট যখন ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে অবতরণ করল, তখন ইমার মনে হলো ও যেন এক নতুন জীবন ফিরে পেল। বাংলাদেশের চিরচেনা সেই আর্দ্র বাতাস, মানুষের কোলাহল ওকে এক মুহূর্তেই এক মায়াবী আবেশে জড়িয়ে নিল। এয়ারপোর্টে আরিমানের পার্সোনাল বডিগার্ড ও গাড়ি আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল।
গাড়ি যখন জ্যাম ঠেলে ইরফানের বাড়ির দিকে এগোতে লাগল, ইমার বুকটা ধকধক করে কাঁপছিল।
ইরফানের বাড়িটা তখন বিয়ের আলোয় ঝলমল করছে। পুরো বাড়ি ল্যাম্পপোস্ট আর চমৎকার ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। সানাইয়ের সুর ভেসে আসছে ভেতর থেকে। আরিমান ও ইমা যখন একসাথে সদর দরজা দিয়ে ভেতরে পা রাখল, তখন পুরো বিয়ের আসর যেন এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
সবাই অবাক চোখে আরিমানের দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ ভাবতেও পারেনি যে আরিমান সিকদার সত্যিই ইমার বড় ভাইয়ের বিয়েতে উপস্থিত হবে। ইরফান তখন সোফায় বসেছিল। আরিমানকে দেখামাত্রই সে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল। ওর চোখ দুটো আনন্দের অশ্রুতে ভিজে উঠল।
"তুই এসেছিস আরিমান!" ইরফান এগিয়ে এসে আরিমানকে জড়িয়ে ধরলেন। "আমি জানতাম তুই আমার কথা ফেলবি না।"
আরিমান মৃদু হেসে ইরফানের কাঁধে হাত রাখল। "বড় ভাইয়ের বিয়ে বলে কথা। না এসে উপায় আছে?"
এদিকে বাড়ির সবাই ইমাকে দেখেও ভীষণ খুশি হলো। ইমা সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলছিল, কিন্তু আরিমানের তীক্ষ্ণ চোখ দুটো এক সেকেন্ডের জন্যও ইমার ওপর থেকে সরছিল না। এই চেনা পরিবেশে এসে ইমা যেন আরও বেশি জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
আরিমান ও ইমা যখন বাংলাদেশে পৌঁছাল, তখন প্রায় দুপুর হয়ে গেছে। দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তি থাকলেও ইমার চোখে-মুখে ছিল এক অদ্ভুত উদ্দীপনা। হলুদের প্রোগ্রামে গিয়ে পৌঁছানোর সাথে সাথেই ইমার জন্য তৈরি রাখা ওর রুমে ওকে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে ওর জন্য সবকিছু আগে থেকেই সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা ছিল ইমার মা । ইমা আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে হলুদের জন্য আনা সেই বাসন্তী রঙের সুতি শাড়িটা পরে নিল। গলায় আর কানে পরল একদম সাধারণ, স্নিগ্ধ কিছু গয়না। হালকা একটু কাজল আর কপালে একটা ছোট্ট টিপ দিয়ে ও যখন আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল, তখন ও নিজেই নিজের দিকে তাকিয়ে আলতো করে হাসল। মিলানের সেই ফ্যাকাশে, ভয়ার্ত মেয়েটা যেন আজ এই চিরচেনা দেশের মাটিতে এসে এক চিলতে তাজা রোদের মতো ঝলমল করে উঠেছে।
ঠিক তখনই ইমার পেছনের দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল ওর কলেজ জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী হিয়া। আয়নায় ইমার প্রতিবিম্ব দেখেই হিয়া দুই হাত কোমরে দিয়ে ফোড়ন কাটল, "হয়েছে হয়েছে, অনেক হয়েছে! আরিমান ভাই এমনিতেই তোর জন্য পাগল, আর কত পাগল বানাবি শুনি? এবার একটু থাম!"
হিয়ার চেনা গলার আওয়াজ পেয়ে ইমা এক ঝটকায় পেছনে ফিরল। এতগুলো দিন পর নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষকে চোখের সামনে দেখে ইমার চোখের কোণটা ভিজে উঠল। ও কোনো কথা না বলে হিয়াকে জড়িয়ে ধরে এক শক্ত জাপটানি দিল।
"হিয়া! তুই সত্যি এসেছিস!" ইমার গলার স্বর কিছুটা বুজে এলো।
"আসব না মানে? আমার বান্ধবীর ভাইয়ের বিয়ে, আর তোর ওই খিটখিটে গম্ভীর বরের ভয়ে আমি আসব না ভেবেছিস?" হিয়া ইমার গাল টেনে দিয়ে হাসল।
ইমার মনে হচ্ছিল সবকিছু যেন কোনো এক রূপকথার স্বপ্নের মতো লাগছে। এতদিনের সেই মাফিয়া ভিলার বন্দিজীবন, সেই রক্তের দাগ, সেই ভয়ংকর একাকীত্ব সবকিছু যেন এই এক মুহূর্তে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল।
এদিকে বাড়ির বাইরের লনে ছেলেদের আড্ডার আসর বসেছিল। আরিমান, ইরফান এবং ওদের আর শাওন একসাথে বসে কড়া কফি খাচ্ছিল আর আড্ডা দিচ্ছিল। শাওন সোফায় একটু আরাম করে বসে ইরফানের দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপে বলল, "বুঝলি আরিমান ভাই, ইরফান ভাই কিন্তু প্রেম-ভালোবাসায় চরম ছ্যাঁকা খেয়ে শেষমেশ এই অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের খাতায় নাম লিখিয়েছে! এখন আর কোনো উপায় নেই।"
আরিমান ওর হাতের কফির কাপে একটা আলতো চুমুক দিল। ওর চোখে তখন সেই চেনা ডার্ক চশমাটা পরা। ও কিছুটা উদাসীন এবং হালকা হেসে বলল, "আজকালকার দিনে ওইসব প্রেম-ভালোবাসা বলতে আসলে কিছু নেই। সব ধোঁকা।"
ইরফান আরিমানের এই অনীহা দেখে মৃদু হাসল। ও এগিয়ে এসে আরিমানের চওড়া কাঁধের ওপর একটা হাত রেখে অত্যন্ত গভীর গলায় বলল,, "সবই আছে রে আরিমান... শুধু কপাল থাকা দরকার সেই ভালোবাসাকে চিনে নেওয়ার জন্য। সময় হলে তুইও বুঝবি।"
ওরা যখন নিজেদের মাঝে এই গভীর আলোচনা আর হালকা ঠাট্টায় মত্ত ছিল, ঠিক তখনই ভেতরের হলরুম থেকে মেয়েদের এক দলগত হাসাহাসি আর নূপুরের শব্দ ভেসে এলো। সিঁড়ি দিয়ে বেশ কয়েকজন মেয়ে নিচে নেমে আসছিল। হঠাৎ করেই আরিমান আর শাওনের চোখ চলে গেল সেই বিশাল কাঠের সিঁড়িটার দিকে।
সিঁড়ির একদম ওপরের ধাপে দাঁড়িয়ে ছিল ইমা। বাসন্তী রঙের শাড়িটা ওর শরীরের সাথে এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে আছে, খোলা চুলগুলো পিঠের ওপর অলসভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। ঘরের মৃদু আলোয় ওর ফর্সা ত্বক যেন এক স্বর্গীয় আভা ছড়াচ্ছিল।
ইমাকে এই রূপে দেখে আরিমানের বুকের ভেতরটা যেন এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। ওর নিশ্বাস আটকে এলো, হৃদপিণ্ডের স্পন্দন যেন একটা বড় ধাক্কা খেল। আরিমান শেষ কবে ইমাকে এভাবে কোনো উৎসবের সাজে সাজতে দেখেছে, তা ওর নিজেরও মনে নেই। মিলানের সেই চার দেয়ালে ও ইমাকে শুধু ফ্যাকাশে আর ভয়ার্ত মুখেই দেখে এসেছে। আজ এই সম্পূর্ণ অন্য এক ইমাকে দেখে আরিমান যেন নিজের অজান্তেই, আবারও একবার নতুন করে ওর প্রেমে পড়তে বাধ্য হলো।
ঠিক একই সময়ে শাওনের অবস্থাও বেশ করুণ। ও হা করে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল, কারণ ইমার ঠিক পেছনেই আসছিল হিয়া। হিয়ার পরনেও ছিল হলুদের সুন্দর একটি লেহেঙ্গা। হিয়া যখন দেখল শাওন ওর দিকে এভাবে বোকার মতো তাকিয়ে আছে, ও দুষ্টুমি করে শাওনকে লক্ষ্য করে একটা কড়া চোখ টিপ মারল।
চোখ টিপ মারতেই শাওনের এতক্ষণের জমে থাকা হুঁশ যেন এক ঝটকায় ফিরে এলো। ও আমতা আমতা করে নিজের চশমাটা ঠিক করল। এই পুরো দৃশ্যটা পাশে বসে খুব ভালো করেই লক্ষ্য করছিলেন বর সেজে থাকা ইরফান। একটুপর ইরফান আর শাওন দুজনে মিলে নিজেদের গালে হাত দিয়ে অত্যন্ত কৌতুকপূর্ণ চোখে আরিমানের দিকে তাকালেন। আরিমান তখনো চোখের একটা পলকও না ফেলে একদম চাতক পাখির মতো ইমার দিকে তাকিয়ে ছিল। ও যেন ভুলেই গেছে ও ওদের সাথে রয়েছে।
ইরফান একটা কৃত্রিম কড়া কাশি দিয়ে শাওনকে বলল, "বুঝলি শাওন, একটু আগেই কে যেন বলছিল—আজকালকার দিনে ভালোবাসা বলতে নাকি কিচ্ছু নেই!"
শাওনও সুযোগ পেয়ে ছাড়ল না। ও ইরফানের কথায় সুর মিলিয়ে বলল, "হ্যাঁ হ্যাঁ, একদম ঠিক কথা ভাই! ভালোবাসার কোনো অস্তিত্বই নেই এই দুনিয়ায়। সব নাকি ধোঁকা!"
ওদের এই খোঁচা মারা কথাবার্তা শুনে আরিমান কিছুটা বেকায়দায় পড়ে গেল। ও কিছুটা তড়িঘড়ি করে নিজের চশমাটা চোখের ওপর ঠিক করল। ওর মতো একজন কড়া মানুষকে এভাবে অপ্রস্তুত হতে দেখে ইরফান আর শাওন শব্দ করে হেসে উঠল।
আরিমান কিছুটা আমতা আমতা করে, নিজেকে সামলে নিয়ে কড়া গলায় বলল, "আমি... আমি আসছি।"
শাওন পেছন থেকে টিপ্পনী কেটে বলল, "হ্যাঁ দোস্ত যাও, তোমারই তো দিন এখন! বউয়ের কাছে না গেলে চলে?"
আরিমান ওদের এই রসিকতাকে আর কোনো পাত্তা দিল না। ও লম্বা লম্বা কদমে সোজা গিয়ে দাঁড়াল ইমার এক্কেবারে সামনে। ইমা তখন হিয়ার সাথে কথা বলছিল, হঠাৎ সামনে এক বিশাল ছায়ার মতো আরিমানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ও একটু থমকে গেল।
ইমা আরিমানের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে একটু অবাক হয়ে বলল, "আপনি এখনো নিজের ড্রেস চেঞ্জ করেননি কেন? সবাই তো হলুদের পাঞ্জাবি পরে ফেলেছে।"
আরিমান ইমার এত কাছে এসে ওর সেই নরম হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। ওর সেই কড়া, ধারালো চোখ দুটো দিয়ে ইমার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "কেন করব? বিয়েটা কি আমার? তোর কীসের এত সাজগোজ শুনি? তুই কেন এত সেজেছিস?"
আরিমানের এই কড়া আর অধিকারবোধে ভরা কথা শুনে ইমার ভেতরের সেই পুরনো জেদটা হঠাৎ করে চাড়া দিয়ে উঠল। ও আর মিলানের সেই ভীতু মেয়েটি নেই, এখন ও নিজের দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে। ইমা এক ঝটকায় আরিমানের হাত থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। ও একটু অহংকার আর সাহসের সাথে মাথা উঁচু করে বলল, "আমার বড় ভাইয়ের বিয়ে, আমি সাজব না তো কে সাজবে? আর আপনার তাতে কী? আমার থেকে একটু দূরে থাকুন তো! মনে রাখবেন, এটা আমার বাপের বাড়ি, আপনার ওই ইতালি না মিস্টার আরিমান সিকদার!"
কথাটা বলেই ইমা এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। ও গটগট করে আরিমানকে ওখানেই দাঁড় করিয়ে রেখে ভেতরের হলের দিকে চলে গেল।
আরিমান একদম চুপ হয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। ও এক অদ্ভুত বিস্ময় নিয়ে ইমার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর মাথার ভেতর শুধু একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছিল—কী হলো রে ভাই? এই মেয়েটা হুট করে এত সাহসী আর অবাধ্য হলো কী করে? মিলানে যে মেয়েটা ওর একটা ধমকে কম্বলের ভেতর লুকিয়ে কাঁদত, সে আজ ওর মুখের ওপর এভাবে জবাব দিয়ে চলে গেল! আরিমানের যেন আর কিছু বলার বা ওকে আটকানোর সাহসটুকুও হলো না। ও নিজের মনেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
দূর থেকে এই পুরো দৃশ্যটা দেখছিল তৃষ্ণা। ইমা আর আরিমানকে এভাবে একসাথে থাকতে দেখে ওর ভেতরের হিংসার আগুনটা যেন আরও তীব্র হয়ে জ্বলছিল। তৃষ্ণার পুরো গা জ্বলছিল ইমার এই সুখ দেখে। ও মনে মনে ভাবল, ও কত চেষ্টা করল এই তিন বছরে, কত চাল চালল, তাও ও এই দুজনকে একে অপরের থেকে আলাদা করতে পারল না।
তৃষ্ণা নিজের ভাগ্যকে মনে মনে কড়া গালি দিল। ওর নিজের কপালে জুটেছে একটা আস্ত নেশাখোর বর, যে দিনরাত জুয়া আর অশান্তি নিয়ে মেতে থাকে। আর এদিকে ইমা এত শান্তিতে আছে, আরিমানের মতো একজন ক্ষমতাশালী পুরুষ ওকে চোখের মণি করে আগলে রাখছে! এই বৈষম্য তৃষ্ণার মনটাকে আবারও এক তীব্র বিষাক্ত হিংসায় ভরিয়ে তুলল। ও মনে মনে ইমার ক্ষতি করার এক নতুন ছক কষতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই গায়ে হলুদের মূল অনুষ্ঠানটি শুরু হয়ে গেল। চারদিকে সাউন্ড সিস্টেমে কড়া ভলিউমে বাংলা হিন্দি হলুদের গান বাজছিল। স্টেজ পারফরম্যান্সের জন্য সবাই একে একে স্টেজে উঠছিল।
শাওন হুট করেই হিয়ার হাত ধরে এক তীব্র টানে ওকে স্টেজের মাঝখানে নিয়ে গেল। হিয়া প্রথমে বেশ লজ্জা পাচ্ছিল, এত মানুষের সামনে নাচতে ওর ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল, কিন্তু শাওনের অনুরোধ ও কিছুতেই ফেলতে পারল না। এতদিনের অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ ওদের সম্পর্কের একটা সুন্দর নাম এসেছে। ওরা দুজনেই একে অপরের প্রতি নিজেদের গভীর ভালোবাসা স্বীকার করে নিয়েছে।
হিয়া আর শাওন স্টেজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক চমৎকার রোমান্টিক গানে নাচতে শুরু করল।
Yeh bhi na jaane
Woh bhi na jaane
Naino ke rang naina jaane
Mila jo sang tera
Uda patang mera
Hawa mein hoke malang
Jag ki koi reet na jaane
Main toh bas teri hui deewani
Mila jo sang tera
Uda patang mera
Hawa mein hoke malang
Main chhod aayi ghar baar mera
O Makhna ve makhna
Ab tu hi hai sansaar mera
হলরুমের এক পাশে সোফায় বসে ইমা খুব মনোযোগ দিয়ে ওদের এই নাচ দেখছিল। ও নিজের ফোনটা বের করে পুরো নাচের ভিডিও করছিল, আর বাচ্চাদের মতো হাততালি দিয়ে চিল্লাচ্ছিল, "উহু! দারুণ হচ্ছে হিয়া! শাওন ভাই, সেই হচ্ছে, চালিয়ে যাও!"
আরিমান ইমার ঠিক পাশের সোফাটায় এসে বসেছিল। ও বেশ কয়েকবার ইমার দিকে এক তীব্র রাগী লুক বা চাউনি দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু প্রতিবারই ইমার ওই নিষ্পাপ, মিষ্টি আর হাসিখুশি মুখটার দিকে তাকাতেই ওর ভেতরের সমস্ত রাগ গলে জল হয়ে যাচ্ছিল। মেয়েটাকে আজ এতটাই মায়াবী লাগছিল যে আরিমান চাইলেও ওর ওপর চেঁচাতে পারছিল না।
কিন্তু ইমার এই ক্রমাগত চিৎকার আর চিল্লাচিল্লিতে আরিমান শেষমেশ নিজের কান দুটো চেপে ধরে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, "একটু চুপ করবি ইমা? আমার কানটা তো একদম গেল!"
ইমা যেন আরিমানের এই কড়া ধমকটা শুনতেই পেল না! ও আরিমানকে সম্পূর্ণ ইগনোর বা উপেক্ষা করে নিজের মতোই গানের তালে তালে সুর মেলাতে লাগল আর নাচ দেখে আনন্দ করতে লাগল। আরিমান শুধু এক বুক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের কপাল চাপড়াল, আর মনে মনে ভাবল এই মেয়ে সত্যিই ওর হৃদয়ের হরণ করে নিয়েছে, এখন আর ওর ওপর কোনো জোর খাটানো সম্ভব নয়।

0 Comments