সৌহার্দ্য_আবরার

সৌহার্দ্য_আবরার

 সাত বছর আগে বিয়ের আসরে ফেলে আসা নিজের স্ত্রীকে সাত বছর পর নিজের সামনে দেখে চমকালো সৌহার্দ্য। বিস্ময়ে হতবাক সে। বাবা-মায়ের জেদে বিয়ে করলেও বিয়ের পর বাড়ি ছাড়তে সময় নেয়নি সে। বিয়ের পরেই ফ্লাইটে করে দেশ ছেড়েছিলো। মেয়েটার মুখটুকুও ঠিক করে দেখেনি। আজ এতবছর পরে নিজের সামনে স্বীয় স্ত্রীকে দেখে যারপরনাই বিস্ময়ে থ মেরে গিয়েছে সে। তাকে এভাবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে তীব্র অস্বস্তি এসে জড়ো হলো মিহির মাঝে। মেয়েটার মুখ এইটুকুন হয়ে এলো। সে চোখ সরিয়ে নিলো। পাশ থেকে সৌহার্দ্যর বাবা আরমান বললেন,

-“কি রে? সর? যাব না ভেতরে?”
সৌহার্দ্য হুশ পেল। দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়ালো। আমেনা মিহির কাঁধে হাত রাখলেন। মৃদু হেসে বললেন,
-“ভেতরে চল, মা?”
শুকনো হেসে মাথা দোলায় মিহি। আড় চোখে তাকায় সৌহার্দ্যের দিকে। যে তখনও তার দিকে চেয়ে। মিহি অস্বস্তিতে গাঁট হয়ে চোখ সরাল। গুটি গুটি পায়ে ভেতরে গেল আমেনা আর আরমানের সাথে। তাদের বসতে বলে সৌহার্দ্য গেল তাদের লাগেজ রেখে আসতে। ফিরে এসে হন্তদন্ত করে খাবার অর্ডার করল। আমেনা তাকে নিজের কাছে ডাকলেন। সৌহার্দ্য গেল। বসল মায়ের পাশে। আমেনা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতেই কেঁদে ফেললেন ঝরঝর করে। অভিমানী স্বরে আওড়ে গেলেন,
-“হ্যাঁ রে? এতদিনে তোর রাগ পড়ল? এতগুলো বছর একটুও খোঁজ নিলি না? একবারও জানতো চাইলি না এই বুড়ো মা টা কেমন আছে? এত রাগ তোর?”
সৌহার্দ্য মায়ের হাত টেনে ঠোঁট ছোঁয়ায়। চুমু খেয়ে বলে,
-“দোষ কি তোমাদের একদমই ছিল না?”
-“দোষ? তোকে বিয়ে দেওয়াটা দোষ ছিল? মানলাম করেছিলাম ভুল। তাই বলে এত বড় শাস্তি দিবি? টানা সাতটে বছর ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেলি? তোর একটুও বুক পুড়ল না?”
সৌহার্দ্য জবাব দেয় না। বরং হাসে। চোখ পড়ে মিহির উপর। মিহি নড়ছেও না, চড়ছেও না। শক্ত হয়ে বসে। চোখও তুলছে না। এদিকও তাকাল না, ওদিকও না। সৌহার্দ্য আশ্চর্য হয়। এসব কেমন আচরণ? কি হয়েছে মেয়েটার? পাগল পাগল আচরণ করছে কেন? আরমান ডাকে তখনই। সৌহার্দ্য তাকায়। বাবা বললেন,
-“ব্যবসা কেমন যাচ্ছে?”
-“ভালোই। রেংকিংয়ে বলতে গেলো আমাদের কোম্পানিই টপে এখন। সকলেই প্রোডাক্ট পছন্দ করছে।”
আরমান গর্ব করে হাসলেন। ছেলে ছোট থেকে বড় মেধাবী। পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসায়িক কর্মকান্ডের প্রতি ছিল তীব্র ঝোঁক। সবসময় নিজ থেকে কিছু করতে চেয়েছে। সেবার বাড়ি ছাড়ল, সুদূর এই জাপানে এসে ব্যবসা শুরু করল। একটু একটু করে তা ছড়িয়ে পড়তে লাগল। প্রসার হতে লাগল। এই ব্যবসার ছুঁতোয় আর কখনো বাড়িমুখোও হলো না সে। আমেনা - আরমান চিন্তিত ছিলেন মিহিকে নিয়ে। পরের মেয়ে। স্বামীর এমন আচরণে কষ্ট কি পাচ্ছে কম? এতদিনে যখন ছেলেকে বাড়িমুখো করতে পারেননি, বৌমার কাছে ফেরাতে পারেননি; এবার তারা বৌমাকেই ছেলের কাছে নিয়ে এলেন।
মিহি তখন থেকে সমানে হাত কচলে যাচ্ছে। অস্থিরতা, অস্বস্তির চূড়ান্তে পৌঁছে কি করবে বুঝেই উঠতে পারছে না। এই লোকটার সাতে একই বারিতে থাকতে হবে ভেবেই সে মনে মনে দুবার জ্ঞান হারাল। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে এলেও নড়ল না। টু শব্দও করল না।
মিহি স্কলারশিপ পেয়েছিল জাপানের একটা ভার্সিটিতে। তারাই তার সকল খরচ বহন করত, হোস্টেলও দিয়েছিল। তবে আমেনার কথায় তা ক্যান্সেল করতে হলো। এরপর জানল, জাপানে সৌহার্দ্য থাকে। এবং তাকেও তার সাথে একই বাড়িতে থেকে পড়তে হবে জাপানে। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল তার। এমন বিশ্রী লোকের সঙ্গে কি করে থাকবে সে?, তখন হাতে আর কোনো উপায়ও নেই। কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে শেষমেশ তাকে হার মানতে হলো আমেনার জোরজবরদস্তির কাছে। রাজি হলো সে।
তবে, সে কি করে থাকবে এখানে? আমেনা-আরমান তো তাকে রেখেই চলে যাবেন। তারপর? তারপর কি করবে সে? এই খাটাশ লোকটার সাথে এখানে থাকবে? কেমন করে? আমেনা আর আরমান চলে গেলে এই লোক তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলে? তখন? তখন মিহি কোথায় যাবে? সে তো এই ভীনদেশী জাপানের কিচ্ছুটি চেনে না। অবশ্য তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেও সে বিশেষ অবাক হবে না। যে লোক এত সুন্দর, মিষ্টি বউকে বিয়ের আসরে ফেলে আসতে পারে, তার দ্বারা এ অসম্ভব ব্যাপার নয়। সে সবই পারে। এরা পাষাণ প্রকৃতির লোক। মিহির বুক চিঁড়ে ক্ষণে ক্ষণে তপ্ত শ্বাস বেরিয়ে এল।
-“মিহি?”
মিহি চমকাল। তাকাল আমেনার দিকে,
-“জ্বি, আন্টি?”
-“কি হয়েছে তোর? এতক্ষণ ধরে ডাকছি, কোথায় হারিয়ে গিয়েছিস? কি ভাবছিস?”
-“এমনিই, ঐ জার্নির জন্য ক্লান্ত আরকি।”
আমেনা মাথা দুলিয়ে হাসলেন। তাকালেন দুপাশে বসা মিহি আর সৌহার্দ্যের দিকে। বললেন,
-“তোরা তো কথাও বলিসনি! সৌহার্দ্য চিনেছিস ওকে? মিহি ও।”
সৌহার্দ্য চোখ তুলল। কি বলবে খুঁজে পেল না। সে শুধু মাথা দোলায়,
-“আচ্ছা।”
মিহির কপাল কুঁচকে আসে। আচ্ছা? কি আচ্ছা? অপমানে, রাগে ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠল মিহি। খাটাশ, অসভ্য, বদমাশ লোক কোথাকার! বলে কি না আচ্ছা। দেখিস, এই জন্মে তুই বউ পাবি না। বউয়ের জন্য তড়পাতে তড়পাতে ম র বি। দেখিস তুই! শা লা বদ!
গালিগালাজের বন্যা বইয়ে দিল মিহি। আমেনা ছেলের হাবভাবে মনঃক্ষুণ্ন হলেন। চোখ রাঙালেন। বউকে দেখে এমন কেউ করে? কেন যে মিহির সাথে ছেলেটার বিয়ে দিয়েছিল! মেয়েটার জীবন পুরো নষ্ট কটে ফেলেছেন!
সৌহার্দ্য বলল,
-“তোমরা ফ্রেশ হও? অনেকদূর থেকে এলে তো!”
তারা মাথা দোলান। উঠে দাঁড়িয়ে আমেনা তাকান আরমানের দিকে। আরমান স্ত্রীর ইশারা বুঝলেন। হেসে সৌহার্দ্যকে বললেন,
-“ঘর ওদিকে না? আমরা যাই হ্যাঁ? তুই মিহি মাকে ঘর দেখিয়ে দে একটু। মেয়েটা ক্লান্ত। দু'বার বমিও করেছে।”
মিহি, সৌহার্দ্য দু'জনেই চমকাল। সমস্বরে বলে উঠল,
-“জ্বি?”
ফের চমকাল। তাকাল দু'জন দু'জনের দিকে। চোখে চোখ পড়তেই চোখ সরাল। আমেনা স্বামীকে নিয়ে চলে গেলেন। আড়ালে চোখ রাঙালেন ছেলেকে।
তারা যেতেই ড্রয়িংরুমে বসে রইল মিহি-সৌহার্দ্য। মিহি অস্বস্তিতে গুটিয়ে গেল। মনে মনে রাগল স্বল্প শাশুড়ির উপর। সৌহার্দ্য সময় নষ্ট করে না। উঠে দাঁড়ালো। গটগট করে হেঁটে চলে গেল। মিহি হা করে তাকাল। মেজাজ চটে গেল। সে পিছু পিছু ছুটল তার। ঘরের ভেতর যেতেই সৌহার্দ্য দাঁড়িয়ে পড়লো। একদম হুট করে দাঁড়িয়ে পড়ায় সৌহার্দ্য কে অনুসরণ করে আসা মিহি তাল মেলাতে পারল না। ফলস্বরূপ বেচারির কপালসহ নাক ঠুকে গেল সৌহার্দ্যর শক্তপোক্ত পিঠে। মিহি নাক ঘষতে ঘষতে দাঁড়িয়ে পড়লো। সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে পিছে তাকিয়ে মিহিকে দেখেই কেমন দূরে ছিটকে সরে গেল। আঙুল তুলে দ্রুত বলে উঠলো,
-“পিছে পিছে পিছে।”
মিহি ভ্রু কুঁচকে তাকায়। দু’কদম পিছে গিয়ে দাঁড়ায়। সৌহার্দ্য র দিকে তখনও তাকিয়ে আছে সে। সৌহার্দ্য গিয়ে একটা তোয়ালে নিয়ে এসে মিহির হাতে ধরিয়ে বলল,
-“আমার থেকে দূরে দূরে থাকবে তুমি। পাঁচ হাত দূরে তো মাস্টই।”
মিহি এবার ভ্রু যুগল আরো কয়েক ডিগ্রি বেঁকে এলো এই পর্যায়ে। চটে গিয়ে বলল,
-“কেন ভাই? কিসের জন্য দূরে দূরে থাকব? সমস্যা কি আপনার?”
সৌহার্দ্য হতবাক বনে তাকাল,
-“ভাই?”

Post a Comment

0 Comments