পুলিশের গাড়ি যখন সাইরেন বাজিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের গেটের সামনে এসে থামল, তখন জাহিদ রহমানের মুখের সমস্ত র*ক্ত শু*ষে নেওয়া হয়েছে। যে মানুষটা একটু আগেও ক্ষমতার দম্ভ দেখাচ্ছিলেন, অহং*কারে পা মাটিতে ফেলছিলেন না, তিনি এখন ভেজা বিড়ালের মতো কাঁপছেন।
পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর গাড়ি থেকে নেমে সোজা এগিয়ে এলেন আমার দিকে। "ডা. মেহজাবিন, ফোনে আপনিই কমপ্লেইন করেছিলেন?"
"হ্যাঁ, অফিসার," আমি শান্ত গলায় বললাম। তারপর বাবার দিকে আঙুল উঁচিয়ে দলিল জালি*য়াতির মাধ্যমে টাকা আ*ত্মসাৎ এবং সুরাইয়া বেগমের ওপর মা*নসিক ও শা*রীরিক নি*র্যা*তনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিলাম। আসাদুল সাহেবও ওনার কাছে থাকা ২৫ লাখ টাকা আ*ত্মসাতের আইনি প্রমাণাদি অফিসারের হাতে তুলে দিলেন।
অফিসার কাগজগুলো দেখেই বাবার দিকে ফিরলেন, "চলুন জাহিদ সাহেব, থানায় গিয়ে বাকি কথা হবে। হাতকড়াটা কি পরাতেই হবে, নাকি ভদ্রলোকের মতো উঠবেন?"
জাহিদ রহমান শেষবারের মতো আমার দিকে তাকালেন। ওনার চোখে তখন আর রা'গ নেই, আছে কেবল ভিক্ষুকের মতো বাঁ'চার আ কুতি। "মেহজাবিন, আমি তোর জন্মদাতা বাবা রে... তুই আমাকে পুলিশে দিস না! তোর মায়ের পা'য়ে পড়ি, আমাকে মা'ফ করে দে!"
এতক্ষণ চুপ করে থাকা আমার মা এবার এক পা এগিয়ে এলেন। বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে মা অত্যন্ত শ*ক্ত গলায় বললেন, "ছয় বছর আগে যখন তুমি আমাকে আর আমার মেয়েকে মাঝরাস্তায় ফেলে অন্য নারীর হাত ধরেছিলে, তখন তোমার এই 'বাবা' আর 'স্বামী' পরিচয়টা কোথায় ছিল? তুমি শুধু আমাদের ঠকাওনি, টাকার লোভে এই মহিলার জীবন ধ্বং স করেছ। তোমার মতো প্রতা**রকের জায়গা ঘরে নয়, জে লে।"
পুলিশ যখন জাহিদ রহমানের শার্টের ক*লার ধরে গাড়িতে তুলছিল, তখন চারপাশের উৎসুক জনতার ধি*ক্কার আর তালি একসাথে বাজি উঠল। বাবার কোটি টাকার অহং কার, বিলাসী জীবনের স্বপ্ন—সব এক নিমেষে ধুলোয় মিশে গেল। জাহিদ রহমানের পত*নের অধ্যায় এভাবেই রচিত হলো।
গাড়িটা চলে যাওয়ার পর চারপাশটা হঠাৎ শান্ত হয়ে এলো। মাটিতে তখনো বসে কাঁদছিলেন সুরাইয়া বেগম। ওনার দিকে তাকিয়ে এবার আমার মনে কোনো রা*গ কিংবা ঘৃ'ণা হলো না, কেবল এক অদ্ভুত করুণা হলো। অতিরিক্ত লো*ভ কীভাবে একজন মানুষকে পথের ভি*খারি বানিয়ে দেয়, ওনি তার জীবন্ত উদাহরণ।
আসাদুল সাহেব ওনার ছেলের হাত ধরে সুরাইয়া বেগমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। সুরাইয়া বেগম চোখের পানি মুছতে মুছতে আসাদুল সাহেবের পা জড়িয়ে ধরতে গেলেন, "আমাকে মাফ করে দেন। আমি লো*ভে অন্ধ হয়ে আপনার মতো হীরা ফেলে কাচ কুড়াতে গিয়েছিলাম। আমার পাপের শাস্তি আমি পেয়েছি। কিন্তু আমার এই অনাগত সন্তান... এর কী হবে?"
আসাদুল সাহেব আলতো করে নিজের পা টা সরিয়ে নিলেন। ওনার চোখে কোনো প্রতি*শোধের আ*গুন ছিল না, ছিল এক রাশ ক্লান্তি। ওনি বললেন, "সুরাইয়া, তুমি যে ভুলটা করেছ, তার কোনো ক্ষমা হয় না। তুমি আমার ভালোবাসা আর এই ছেলেটার মায়াকে টাকার কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলে। তবে আমি মানুষ, পি**শাচ নই। তোমার আইনি লড়াইয়ে আমি তোমাকে সাহায্য করব, যাতে জাহিদের কাছ থেকে তোমার হকের ২৫ লাখ টাকা তুমি ফেরত পাও। কিন্তু আমার সংসারে, কিংবা আদিবের মায়ের জায়গায় তোমার আর কোনোদিন ফেরা হবে না। তুমি তোমার ভুলের খে*সারত একাই দেবে।"
আদিব ওনার মায়ের দিকে শেষবারের মতো তাকাল। ওনার চোখের সেই ঘৃ'ণা কিছুটা কমে এখন সেখানে করুণা জমেছে। ও বলল, "ভালো থেকো, আম্মু।"
আসাদুল সাহেব আর আদিব আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। তারা দ্রুত গাড়িতে উঠে চলে গেল। সুরাইয়া বেগম শূন্য দৃষ্টিতে তাদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আমি সুরাইয়া বেগমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওনার কাঁপতে থাকা কাঁধে হাত রেখে বললাম, "উঠুন মাটিতে বসে কেঁদে আর লাভ নেই।"
সুরাইয়া বেগম চমকে আমার দিকে তাকালেন। ওনার চোখে তীব্র অপ**রাধবোধ। "ম্যাডাম, আপনি আমার ওপর রা'গ করেননি? আমি তো আপনার বাবার অপ*রাধের সঙ্গী ছিলাম।"
"আপনি অপরা*ধের সঙ্গী ছিলেন না, আপনি ছিলেন ওনার ফাঁ*দে পড়া এক শিকার," আমি ওনাকে টেনে তুললাম। "আপনি আজ আমার চেম্বারে এসেছিলেন একজন রোগী হিসেবে। আর একজন ডাক্তারের কাছে রোগীর চেয়ে বড় কোনো পরিচয় নেই। আপনার এই অনাগত সন্তান সম্পূর্ণ নিষ্পাপ। জাহিদ রহমানের পা*পের ছায়া যেন এই বাচ্চার ওপর না পড়ে, সেটা আমি দেখব। আপনার এই গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে সন্তান জন্মদান পর্যন্ত সমস্ত চিকিৎসার দায়িত্ব আমার হাসপাতাল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নেবে। আপনি ওখানেই ভর্তি থাকবেন।"
সুরাইয়া বেগম আমার কথা শুনে অঝোরে কাঁদতে লাগলেন, তবে এবার সেই কান্না কষ্টের ছিল না, ছিল কৃতজ্ঞতার। ওনি ফিসফিস করে বললেন, "আপনি সত্যিই ওনার মেয়ে... কিন্তু ওনার মতো মানুষ নন, আপনি একজন ভালো মানুষ ।"
ঠিক তখনই একটা সাদা রঙের গাড়ি এসে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে ব্রেক কষল। গাড়ি থেকে তাড়াহুড়ো করে নেমে এলেন আমার স্বামী, ডা. আরিয়ান। ও নামকরা সার্জন। চেম্বার শেষ করে ও আমার মায়ের ফোন পেয়ে সব রোগীকে অন্য ডাক্তারকে হ্যান্ডওভার করে পাগ*লের মতো ছুটে এসেছে।
আরিয়ান হন্তদন্ত হয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এসে আমার হাতটা শক্ত করে ধরল। "মেহজাবিন! মা! তোমরা ঠিক আছো তো? বাসায় নাকি কি ঝামেলা হয়েছে? কী হয়েছে এখানে?"
আমি আরিয়ানের চোখের দিকে তাকালাম। ওনার সেই ব্যাকুলতা আর ভালোবাসা আমার সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষে দূর করে দিল। মা এগিয়ে এসে আরিয়ানের মাথায় হাত রেখে বললেন, "আমরা ঠিক আছি বাবা। সব ঝড় কে*টে গেছে। তোর বউ আজ একাই সব অন্যায় আর অহং কার গুঁ*ড়িয়ে দিয়েছে।"
আরিয়ান সুরাইয়া বেগমের দিকে তাকাল, তারপর পুরো ঘটনাটা সংক্ষেপে শুনে আমার দিকে এক গভীর শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে তাকাল। ও আমার কাঁধ জড়িয়ে ধরে বলল, "আমি জানতাম মেহজাবিন, তুমি শুধু একজন ভালো মেয়ে বা স্ত্রী নও, তুমি একজন অসাধারণ ডাক্তার। সুরাইয়া বেগমের অনাগত সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত তুমি নিয়েছ, তাতে আমি তোমার পাশে আছি। আমাদের হাসপাতালেই ওনার সব টেককেয়ার হবে।"
মা আমাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসলেন—সেই হাসিতে ছিল দীর্ঘ ছয় বছরের গ্লানি থেকে মুক্তির এক পরম তৃপ্তি।
আমরা সবাই মিলে এবার আমাদের ফ্ল্যাটের দিকে পা বাড়ালাম। ড্রয়িংরুমে এসে আমি বারান্দার দরজাটা খুলে দিলাম। বিকেলের ম্লান আলো মুছে গিয়ে রাতের প্রথম তারাটা ফুটছিল।
জাহিদ রহমান আর সুরাইয়া বেগম ভেবেছিলেন এক ছাদের নিচে লো ভ আর জা*লিয়াতির নতুন সংসার পাতবেন, কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে আজ তারা দুজনেই সেই ছাদের বাইরে, যার যার কর্মের ফল ভোগ করতে একা। আর আমরা মা, মেয়ে আর জামাই—এক ছাদের নিচে, এক নতুন এবং ক লঙ্কমুক্ত জীবনের দিকে ডানা মেললাম।
সমাপ্ত

0 Comments