**খাটের নিচে লুকানো সত্য**

**খাটের নিচে লুকানো সত্য**


আমার প্রতিবেশী আমার দিকে চিৎকার করে বলছিলেন যে প্রতিদিন নাকি আমার বাড়ি থেকে মানুষের কান্নার আওয়াজ আসে। অথচ আমি একা থাকি, আর সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা sechsটা (ছয়টা) পর্যন্ত চাকরি করি। পরের দিন আমি বাড়ি থেকে বের হওয়ার নাটক করলাম, আসলে নিজের খাটের নিচে লুকিয়ে থাকলাম। একটু পরেই শুনলাম কে যেন এমনভাবে ভেতরে ঢুকল, যেন এই পুরো সংসারটা তারই। ভয়ে চোখ বন্ধ করে আমি নিজের শ্বাস চেপে রাখলাম। আমার শোবার ঘরের দরজাটা খুলে গেল। আর এরপর স্পিকার থেকে যে কণ্ঠস্বরটা ভেসে এল, তা শুনে আমার রক্ত হিম হয়ে গেল।
আমার নাম লায়লা সুলতানা, বয়স ৩৯ বছর। আর এই বৃহস্পতিবারের আগ পর্যন্ত আমি বিশ্বাস করতাম যে মানুষ মারা গেলে আর কোনোদিন ফিরে আসে না। আমার স্বামী, আরিফ, দুই বছর আগে চট্টগ্রাম হাইওয়েতে একটা ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। রাত তিনটায় আসা একটা ফোন কল, একটা লাশ যা আমাকে ভালো করে দেখতেও দেওয়া হয়নি, সাদা কাফন আর গোলাপ জলে ঘেরা একটা জানাজা—যেখানে সবাই আমাকে এসে বলছিল যেন আমি শক্ত থাকি।
এরপর থেকে আমি ঢাকার এক নিরিবিলি উপশহরে এই একতলা বাড়িটায় একাই থাকতাম। আমি একটা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করি। সকাল আটটার আগেই বেরিয়ে যাই, আর ফিরতে ফিরতে প্রায় রাত হয়ে যায়। আমার জীবনটা ছিল একদম সাদামাটা।
সেদিন সন্ধ্যায় গাড়ি থেকে নামার পর, আমার পাশের বাড়ির রাবেয়া খালা সীমানার বেড়ার কাছে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি হাত দুটো বুকের ওপর বেঁধে বেশ কড়া চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "লায়লা, আর নেওয়া যাচ্ছে না। দিনের বেলা তোমার বাড়ি থেকে বড্ড বেশি আওয়াজ আসে।"
আমি একটা ক্লান্ত হাসি হেসে বললাম, "খালা, এটা তো অসম্ভব। বাড়িতে তো কেউই থাকে না।"
তিনি হাসলেন না। গম্ভীর গলায় বললেন, "তাহলে এই কান্নাকাটির আওয়াজ কোথা থেকে আসে? একটা মেয়ের গলা। মনে হয় কেউ ঝগড়া করছে কিংবা বাঁচার জন্য কাকুতি-মিনতি করছে। গতকালও হয়েছে, তার আগের দিনও হয়েছে। আমি কানে কম শুনি না, মা। আওয়াজটা তোমার বাড়ি থেকেই আসছিল।"
আমি ঘরে ঢুকে জানালা, রান্নাঘর, মেহমানদের ঘরের আলমারি—সব দেখলাম। কোথাও কিচ্ছু নেই। জোর করে ঢোকার কোনো চিহ্ন নেই। কিন্তু সেদিন রাতে আমার আর ঘুম এল না। ভোর চারটার দিকে যখন নিজে নিজে পানির মোটরটা কেঁপে উঠল, আমি ভয়ে কেঁপেই উঠলাম।
পরদিন ভোরে যখন চা বানাতে গেলাম, এমন একটা জিনিস দেখলাম যা আগের রাতে সেখানে ছিল না। সিঙ্কের পাশে বাসন শুকানোর র্যাকে একটা পরিষ্কার মগ রাখা। এটা ছিল আরিফের প্রিয় নীল রঙের মগ, যার হাতলের কাছে একটুখানি চটা ওঠা! আমার হাত থেকে চামচটা পড়ে গেল।
সেদিন আমি অফিসে যাওয়ার ভান করে ঠিক সকাল আটটায় দরজায় তালা দিয়ে বেরিয়ে গেলাম। কিন্তু দুই ব্লক দূরে গাড়িটা থামিয়ে পেছনের গলি দিয়ে হেঁটে আবার নিঃশব্দে বাড়িতে ঢুকলাম। সোজা শোবার ঘরে গিয়ে খাটের নিচে হামাগুড়ি দিয়ে লুকিয়ে পড়লাম। হাতের মুঠোয় ফোনটা শক্ত করে ধরা, যেকোনো মুহূর্তে জরুরি নাম্বারে কল করার জন্য।
ঠিক দুপুর বারোটার পর, সদর দরজার তালাটা ঘুরল। খুব ধীরে, চাবি দিয়ে!
ভয়ে আমার মুখটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। কেউ একজন ভেতরে ঢুকল। তারা কোনো জোর জবরদস্তি করেনি। বসার ঘর দিয়ে এমন এক ভয়ংকর আত্মবিশ্বাসের সাথে হেঁটে এল, যেন এই বাড়ির প্রতিটি কোণ তাদের চেনা। রান্নাঘরে কাচের গ্লাসের ঠুনঠুন শব্দ হলো। তারা নিজেদের জন্য পানি ঢালল।
পায়ের আওয়াজটা এবার করিডোর ধরে এগিয়ে আসতে লাগল। হিলের খটখট শব্দ। একজন নারী! সে ঠিক আমার শোবার ঘরের সামনে এসে থামল। দরজাটা সামান্য একটু ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করে খুলে গেল। খাটের নিচ থেকে আমি প্রথমে তার কালো পাম্প শু জোড়া দেখতে পেলাম।
নারীটি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার ফোনটা বের করল এবং একটা নাম্বারে ডায়াল করে স্পিকারে দিল। নরম গলায় বলল, "আমি ভেতরে এসেছি।"
ওপাশে একটু নীরবতা। তারপর স্পিকারের ওপার থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। এমন একটা কণ্ঠস্বর, যাকে আমি দুই বছর আগে নিজের হাতে কবর দিয়ে এসেছিলাম!
"লায়লা কি এখনো কিছু টের পেয়েছে?"
আমার মনে হলো শরীরের সমস্ত রক্ত জমে বরফ হয়ে গেছে। এটা আরিফ! আমার মৃত স্বামী!
নারীটি খাটের আরও কাছে এগিয়ে এল। তার জুতো জোড়া এসে থামল ঠিক আমার মুখের সামনে। সে ওপাশ থেকে উত্তর দিল, "হ্যাঁ, টের পেয়েছে। আর সবচেয়ে বড় সর্বনাশটা কী জানো? সে আজ অফিসে যায়নি, বাড়িতেই আছে।"

Post a Comment

0 Comments