দায়িত্ব

দায়িত্ব

 আমার বাবার ফোনে একটা পিচ্চি মেয়ে কল দিয়ে বললো,

"হ্যালো... আমার ডেরি মিল্ক চকলেট শেষ, বিস্কুটও শেষ। এগুলো দিয়ে যাইয়ো।"
আমি পিচ্চি মেয়েটার কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
"কে তুমি বাবু? কার ফোনে কল দিছো?"
মেয়েটা আমাকে উল্টো জিজ্ঞেস করলো,
"তুমি কে?"
আর কিছু জিজ্ঞেস করতে যাব, এমন সময় একজন মহিলার কণ্ঠ শুনতে পেলাম।
"ফোনটা দাও তো।"
পরের মুহূর্তেই কল কেটে গেল।
বাবা ড্রয়িংরুমে টেবিলের ওপর ফোনটা রেখে ওয়াশরুমে গিয়েছিলেন। ঠিক তখনই কলটা এসেছিল।
প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো ছোট্ট মেয়েটা ভুল করে বাবার নম্বরে ফোন দিয়েছে। সেই ভেবেই ফোনটা আবার টেবিলের ওপর রাখতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু কী মনে করে যেন কল লিস্টে ঢুকে নম্বরটার ডিটেইলসে চাপ দিলাম।
আমার চোখ যেন বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
এই নম্বর থেকেই তো প্রতিদিন দুই-তিনবার করে কল আসে! শুধু আজ না, অনেক দিন ধরেই।
ঠিক তখনই বাবা ওয়াশরুম থেকে বের হলেন। আমি তাড়াতাড়ি ফোনটা আগের জায়গায় রেখে দিলাম। যেন কিছুই হয়নি।
কিন্তু আমার মাথার ভেতর তখন হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
আমি কি এখনই বাবার সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলব?
নাকি আগে মাকে সব জানাব?
আমার নাম মিথিলা। আমি এবার ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। আমার বাবা একজন হাইস্কুলের শিক্ষক।
আমাদের পরিবারটা খুব সাধারণ। বাবা স্কুলে পড়ান, মা সংসার সামলান। ছোটবেলা থেকে বাবাকে আমি সৎ, ভদ্র আর দায়িত্ববান মানুষ হিসেবেই দেখে এসেছি। পুরো এলাকায় বাবার অনেক সম্মান। সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করে।
তাই আজকের ঘটনাটা যেন কিছুতেই মাথা থেকে সরাতে পারছিলাম না।
একটা ছোট্ট মেয়ে কেন বাবাকে চকলেট আর বিস্কুট এনে দিতে বলবে?
আর সেই মহিলাই বা কে?
রাতের খাবারের সময় আমি চুপচাপ ছিলাম। মা কয়েকবার জিজ্ঞেস করলেন,
"কী রে, শরীর খারাপ নাকি?"
আমি শুধু মাথা নেড়ে বললাম,
"না।"
বাবা তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই খবর দেখছিলেন। মাঝেমধ্যে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
"পড়াশোনা ঠিকমতো হচ্ছে তো? সামনে কিন্তু পরীক্ষা।"
আমি শুধু "হ্যাঁ" বললাম। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছিলাম, মানুষটা কি সত্যিই কিছু লুকিয়ে রেখেছেন? নাকি আমি অকারণেই সন্দেহ করছি?
খাওয়া শেষে নিজের ঘরে চলে এলাম। বই খুলে বসেছিলাম, কিন্তু এক লাইনও পড়তে পারছিলাম না। বারবার সেই ছোট্ট মেয়েটার কণ্ঠ কানে ভেসে আসছিল।
"আমার ডেরি মিল্ক চকলেট শেষ..."
পরদিন সকালে বাবা যথারীতি স্কুলে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে মাকে বললেন,
"আজ ফিরতে একটু দেরি হবে। স্টাফ মিটিং আছে।"
কথাটা শুনে হঠাৎ আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল।
সত্যিই কি স্টাফ মিটিং?
নাকি অন্য কোথাও যাবেন?
সারাদিন অস্থির লাগছিল। অবশেষে একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। কাউকে কিছু বলার আগে আমাকে সত্যিটা জানতে হবে।
বিকেলে বাবা স্কুলে যাওয়ার পর আমি আবার বাবার ফোনের কথাটা ভাবতে লাগলাম। সেই নম্বরটা আমার মাথায় গেঁথে গেছে। সুযোগ পেলেই নম্বরটা নিজের ফোনে তুলে রাখব। তারপর জানতে চেষ্টা করব নম্বরটার মালিক কে।
সত্যি যদি সবকিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি খুশি আমিই হব।
কিন্তু যদি ভুল না হয়...
তাহলে আমাদের পরিবারের সামনে এমন এক সত্য অপেক্ষা করছে, যেটা হয়তো আমাদের জীবনটাই বদলে দিতে পারে।
আর সেই সত্য জানার প্রথম পদক্ষেপটা আমাকে আজই নিতে হবে...

Post a Comment

0 Comments