বিয়ের রাতেই যে বর বউকে একা ফেলে রেখে পালিয়ে গিয়েছিল সে স্বামীকেই আজ চারবছর পর প্রথমবারের মতো নিজের সামনে দেখে থমকায় সুহা। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে দেখে ছেলেটার সাঁজ-পোশাক।সুহা আগেও দেখেছে এই মানুষটাকে তবে শুধু ছবিতেই! এমনকি বিয়ের দিনেও সে তার স্বামীর দিকে চোখ তুলে তাকায়নি লজ্জায়। আজ তাকাচ্ছে।
পরণে ব্লেজার, তাও ব্লেজারের ভেতরে শার্টের খোলা অংশটুকুতে উঁকি দিচ্ছে ফর্সা লোমবিহীন বুক। চেহারার দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারল এই ছেলের জন্য এত মেয়ে পাগল হওয়ার কারণ! শুধু চেহারাই কি পাগল হওয়ার কারণ? এই ছেলের গলা আর কথাগুলো ও তো দারুণ ছিল। যে কন্ঠের সাথে তার বহুদিন আগে পরিচয় হয়েছিল।
যে কন্ঠ আর কন্ঠ দ্বারা বলা কথা গুলো তাকে কাবু করেছিল বহুদিন আগে। আর তার দরুণই তো প্রথমে বিয়েটা নাকোচ করলেও পরবর্তীতে সুহা রাজি হয়েছিল বিয়েটা করতে। কিন্তু কে জানত তাকে দুর্বল করাটাও যে এই ছেলের একটা টোপ ছিল কেবল? সুহা ছোট্ট শ্বাস ফেলে। স্বচ্ছর চোখজোড়ায় তাকিয়ে বোধহয় সুহাও এই মুহুর্তে পাগল পাগল অনুভূতিটা টের পাচ্ছে। কেন পাচ্ছে?সে তো এই মানুষটার জন্য ঘৃণা জমিয়েছিল।
অথচ এতকাল এই পাড়ার মেয়েদের কাছে আর স্বচ্ছর কাজিনদের কাছে এই ছেলের রূপের প্রশংসা শুনতে শুনতে এতোটাই অভ্যস্ত ছিল যে আজ নিজেও মনে মনে এই ছেলের রূপ দেখে বাহ বাহ দিল! কিন্তু মনের ঘৃণা টুকু তো মুঁছে ফেলবার নয়।তাই তো এতকাল পর স্বামীকে কাছে থেকে দেখেও একপ্রকার এড়িয়েই চলে যেতে লাগল সে। অথচ পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে না যেতেই দেখতে পেল সুন্দরী এক মেয়েকেও।সাথে দুইজন ছেলেও । মেয়েটা স্বচ্ছের হাত জড়িয়েই এক প্রকার ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে উঠল,
“ স্বচ্ছ?মনে হচ্ছে তোর বাবা মা আজ বাসায় নেই। আমরা বরং আজকের দিনটা তোর ফ্ল্যাটেই কাঁটাতে পারি। বল?”
সুহা নিরবে মেয়েটার হাত ধরা দেখল। গা জ্বলে উঠল যেন। নিজে গিয়ে মেয়েটার গালে চড় বসাতে মন চাইল। অথচ পারল না। স্বচ্ছ ততক্ষনে তাকাল মেয়েটার দিকে। হাত ছাড়িয়ে বিরক্ত সুরে বলল,
“ ফ্ল্যাটে কাঁটালে আমি কষ্ট করে নিজের বাসায় আসলাম কেন? বাসায় এসেছি যখন বাসাতেই থাকব। ঐ মেয়েকে শায়েস্তা করতে তো হবেই আমার! ”
মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গেই বলল,
“ কে? তোর ক্ষ্যাত বউটা? যদি এতদিন পর হাজব্যান্ডকে দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে তোকে জড়িয়ে টড়িয়ে ধরে দোস্ত? তুই কি করবি তখন? ”
সুহার মেজাজ চিরচির করল। সে ক্ষ্যাত? তাকে ক্ষ্যাত বলল এই মেয়ে? সুহা দাঁতে দাঁত চিবিয়ে শুনল কেবল। সিঁড়ি পেরিয়ে যেতে যেতে স্বচ্ছ বলল,
“ গর্দভ! তোকে এনেছি কি করতে তাহলে? ”
সুহা বুঝল, স্বচ্ছ কথাটা ঐ মেয়েটাকেই বলেছে এবং কেন এনেছে তাও বুঝল। তবে নিজ স্বামীর সাথে এহেন সুন্দরী নারীর কথোপকোতন তার সহ্য হলো না। রাগে নাক ফুলে উঠল। আরেকবার, আরেকবার তাকিয়ে দেখল মেয়েটাকে। ইচ্ছে হলো ঘাড় মটকে দিতে। অথচ কিছুই করল না ও। সুন্দর ভাবে নজর সরিয়ে সিঁড়ি পেরিয়ে যেতে লাগল। আর ঠিক তখনই স্বচ্ছ তাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,
“ এই যে মিস? শুনছেন? এই বাসায় কেউ নেই আজ? তালা দেওয়া কেন বলতে পারেন?”
সুহার রাগে দাঁত কিড়মিড় করছিল। একটু হলেই যেন স্বচ্ছকে সে রাগে ঝলসে দেবে সে। অথচ সুহা সে রাগের ছিটেফোঁটাও প্রকাশ না করে শান্ত হয়ে দাঁড়াল। ভ্রু কঁচকে ঘাড় ঘুরিয়ে স্বচ্ছর দিকে তাকাল। তাকাল পাশের ছেলেমেয়ে গুলোর দিকেও। পরমুহুর্তেই টানটান স্বরে উত্তর দিল,
“ না, এই বাসার পুত্রবধূকে আজ দেখতে আসছে তো ছেলেপক্ষ। তাই সবাই রেস্টুরেন্টে গিয়েছে। ওখানেই দেখাদেখি হবে। বুঝেনই তো, আশপাশে পাড়াপ্রতিবেশী যদি পাত্রপক্ষের কান ভাঙ্গায় সে কারণেই.. ”
স্বচ্ছর টনক নড়ল। পুত্রবধূ?তার নিজেরই বউ? এই কারণেই মেয়েটা তাকে শেষ দুই সপ্তাহ জ্বালাচ্ছে কল করে করে?ডিভোর্সের হুশিয়ারি দিচ্ছিল? স্বচ্ছ বিস্ময় নিয়ে বলল,
“ এই বাসার পুত্রবধূ মানে? কোন পুত্রবধূ?”
সুহা উত্তর দিল,
“ একটাই তো পুত্রবধূ এই বাসার। জানেন না? ছেলে তো একটা অকর্মা! তাই ছেলের বাবা মা ভাবল ছেলের বউয়ের নতুন করে আরেকটা বিয়ে দিক। ”
স্বচ্ছর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুটাও বিস্ময় নিয়ে বলল,
” কত বড় সাহস মেয়েটার দেখেছিস? কত বড় সাহস! আমার এত সুন্দর বন্ধুকে ভুলে ওই মেয়ে নতুন সংসার বাঁধার স্বপ্ন দেখছে?ছলনাময়ী!”
স্বচ্ছর অপর বন্ধু স্বচ্ছর কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়াল। চাপা হেসে বলল,
“ বন্ধু? পাখি তো ফুড়ুৎ হয়ে যাচ্ছে ! এই তোর বউয়ের ভালোবাসা? আমরা ভাবলাম তোর বউ তোকে ভালোবেসে গলায় ঝুলে পড়বে আর এখন দেখি বউ নিজেই তোকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত!”
স্বচ্ছ বন্ধুদের সামনে এহেন অপমান মেনে নিতে পারল না। দাঁতে দাঁত চিবিয়ে বলে উঠল,
” মেরে গাল লাল করে দিব ঐ মেয়ের। আমায় না জানিয়ে বিয়ে করার শখই বা জাগল কি করে ঐ মেয়ের? ভাগ্যিস! এতকাল কোন এক গোপন গুপ্তচরের কাছে বউয়ের এসব অবাধ্যকতার খবর পেতাম। এখন তো দেখছি সত্যিই মেয়েটা অবাধ্য হয়ে গেছে। ”
সুহা মনে মনে হাসে। গোপণ গুপ্তচরটাও যে সে নিজেই এটা ভেবে পেট ফেটে হাসি পায়। অথচ সামনাসামনি হাসে না। কৌতুহল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ আপনার বউ নাকি ভাই? বাধ্যগত বউ ছিল আপনার?”
“ বাধ্যগত বউ ছিল না, তবে আমার জন্য পাগল ছিল ঐ মেয়ে। এক ঘন্টা কথা না হলেও পাগল পাগল ব্যবহার করত! ”
সত্যিই তো! সুহা পাগল পাগল আচরণ করত৷ বিয়ের আগে একটা মাস সময় দিয়েছিল কেবল স্বচ্ছ। আর তাতেই সুহা গলে জল হয়ে গিয়েছিল। নতুন নতুন প্রেমে পড়ে সে কি পাগলামি। অথচ দুঃখের বিষয় হলো তাদের সরাসরি একটাবারও দেখা হয়নি। প্রথমে তো সুহাই বিয়েটা নাকোচ করে ছেলের মুখ দেখতে চায়নি। পরবর্তীতে স্বচ্ছ ইগো নিয়ে মেয়েকে দেখেনি। শুধু একটা চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল যে মেয়েকে সে তার প্রেমে পাগল করে ছাড়বেই! অবশেষে পাগল করেছিলও। বিয়েও করল। তারপর সে নিজেই ছেড়ে দিয়ে বদলা নিল মেয়েটার উপর। সুহা ভেবে দুঃখ পেল। কঠিন স্বরে বলল,
“ কি করে বুঝলেন যে পাগল ছিল? ”
স্বচ্ছ হেসে উত্তর দিল,
“ কারণ আমি পাগল বানিয়েছিলাম তাকে। এখন বলুন, আমার বাসার সবাই কোথায় তা জানেন? জানলে ফটাফট বলুন। ”
সুহার মেজাজ খারাপ। তার উপর স্বচ্ছর এহেন প্রশ্ন পছন্দ হলো না। রূঢ় স্বরে বলল,
“ এই বাসায় কে কখন থাকবে তা জানার দায়িত্ব নিশ্চয় আমি নিয়ে রাখিনি বলুন?বাসায় কেউ আছে নাকি নেই না জেনে কোথায় থেকে টপকে এসেছেন? এসেছেনই যখন আগে থেকে বলে আসেননি কেন?দ্বিতীয় কথা, কারো কাছে কিছু জিজ্ঞেস করলে সুন্দরভাবে জিজ্ঞেস করবেন।”
এমন উত্তর পেয়ে স্বচ্ছর মুখটা বোধহয় চুপসে গেল। সুহার দিকে চেয়ে সরু চোখে চাইল এবারে। মেয়েটাকে আগে কখনো দেখেছে বলে মনে পড়ছে না তার। মনে মনে ভেবেই নিল যে হয়তো বাসার ভাড়াটিয়া হবে এই মেয়েটা।এবারে সুন্দর ভাবেই বলল,
“ আমি এই বাসার মালিকের ছেলে। আপনি কি জানেন উনারা কোথায় গেছেন? ”
সুহা আগের মতোই মেজাজ খারাপ দেখিয়ে বলল,
“ বাসার মালিকের ছেলে বললে কি আমি আপনাকে আলাদা সম্মান করব ভাবছেন? ”
স্বচ্ছ ভদ্রতা দেখিয়েও যখন ভদ্র উত্তর না পেল তখনই বিরক্ত হয়ে বলে উঠল,
“ না করলে আপনাকে বাসা থেকে বের করে দিব বেয়াদব মেয়ে। ”
সুহা ভয় পাওয়ার ভান ধরে বলল,
“বের করে দিবেন? বাবাহ! ভয় পেলাম আমি। ”
স্বচ্ছ দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ কি মনে হচ্ছে? বের করতে পারব না আপনাকে? ”
” আপনি বের করে দিলেই বা আমি বের হয়ে যাব কেন? টাকা দিয়ে আছি। এমনি এমনি তো আর থাকছি না ভাই। আজাইরা প্যাঁচাল বাদ দিন!”
কথাগুলো বলেই মুখ কেমন করে নিচে নেমে গেল সুহা। স্বচ্ছ আর ওর বন্ধুরা চেয়ে থাকল কেবল বোকার মতো। স্বচ্ছ তো বিড়বিড় করে বলল,
“ এই মেয়ে নির্ঘাত আমার বউয়ের থেকে ট্রেনিংপ্রাপ্ত বেয়াদব! ”
স্বচ্ছর পাশের বন্ধুটা তখন হেসে বলল,
”কিন্তু মেয়েটা সুন্দর দোস্ত! প্রোপোজ করলে দোষ হবে না নিশ্চয়? ”
ছেলেটা কথাটা বলার পরপরই স্বচ্ছর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা এবারে বলে উঠল,
” কাকে প্রোপোজ করবি? ঐ মেয়েরে?”
“ সমস্যা কি করলে? তোরে তো আর তোর আব্বায় আমার সাথে বিয়ে টিয়ে দিবে না তাই না? তার চেয়ে অন্য একটা জুটিয়ে নেওয়াই ভালো। ”
উত্তরটুকু দিয়ে ও ছেলেটা ফ্যালফ্যাল করে তাকায় মেয়েটার দিকে। মেয়েটা নিধি। বাকি দুইজন ছেলে হলো আবির আর সাদাফ। তিনজনই স্বচ্ছর বন্ধু। স্বচ্ছ কেমন করে তাকাতেই নিধি ক্ষেপে তাকাল সাদাফের দিকে। বলল,
“ আবার বল! ”
সাদাফ এই পর্যায়ে বিড়বিড় করেই বলল,
“ কিছু না, চল স্বচ্ছর বউকেই খুঁজি আপাতত। ”
স্বচ্ছ হতাশ। সে এসেছিল মেয়েটাকে শায়েস্তা করতে। আবার ও নিজের প্রেমে হাবুডাবু খাইয়ে মেয়েটাকে গোল দিতে। অথচ এখানে এসেই শুনছে মেয়ে ফুরুৎ হয়ে যাচ্ছে তার খাঁচা থেকে। স্বচ্ছ ঠোঁট ফুলিয়ে শ্বাস ফেলেই একটা নাম্বারে ম্যাসেজ করল। পরপরই ওই নাম্বার থেকে কল এল। স্বচ্ছও কল তুলল। ওপাশ থেকে মেয়েলি কন্ঠে ভেসে এল,
এই গল্পের মতোই কিছু ভালোবাসা গেঁথে রেখেছি এখানে facebook.com/SNHOfficial
“ এটা কি আপনার বাংলাদেশী সিম নাকি মিস্টার অস্বচ্ছ?যায় হোক, আমার টানে অবশেষে দেশে এসে পড়লেন দেখে খুশি হলাম।বিয়েতেও এবাবে চলে আসবেন হুহ? ”
স্বচ্ছর চাপা রাগ হলো। কেন জানি না মেয়েটাকে এখন কষে থাপ্পড় দিতে পারলে শান্তি লাগত তার।তবুও টানটান স্বরে শীতল রাগ দেখিয়ে বলে উঠল,
“ স্বচ্ছর দিকে সব মেয়েই আগ্রহ নিয়ে ঝুঁকে সুহাসিনী!অনাগ্রহ দেখানোর সাহস দেখায়নি এই পর্যন্ত কেউ। সে জায়গায় তুমি আমার বউ হয়ে আমায় ছেড়ে অন্য কাউতে ঝুঁকবে?আমার এই অপমান আমি চুপচাপ মেনে নিব ভাবলে কি করে সুহাসিনী? ”
সুহা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে উঠে,
“ খু্ব অহংকার না নিজের সৌন্দর্যের? আমি কিন্তু আগেও আপনার সৌন্দর্যের প্রেমে পড়িনি অস্বচ্ছ সাহেব!আপনার কন্ঠের আর কথার প্রেমে পরেছিলাম। ”
স্বচ্ছ বাঁকা হেসে শুধায়,
“ এবারে সৌন্দর্যের প্রেমেও পরবে। আপাদমস্ত সবকিছুরই প্রেমে পড়বে।এমনভাবে প্রেমে পরবে যে আমায় ছাড়া আর কিছুই বুঝবে না সুহাসিনী। ”
সুহা হাসে। উত্তরে বলে,
“ সুহা নিজের অপমানের শোধ নিজে নিতে পারে মিস্টার অস্বচ্ছ! সৌন্দর্য দেখেই গলে যাব, অতোটাও হ্যাংলা ভাববেন না আমাকে। তাহলে দেখবেন নিজের জালে নিজেই ফেঁসে যাবেন। ”
প্রতিশোধ বশত একটা মেয়েকে বিয়ে করে তারপর তাকে একা ফেলে চলে যাওয়াটা মেয়েটার জন্য কতোটা অপমানজনক তা স্বচ্ছ আজও বুঝেই উঠতে পারেনি।বরাবরই একটা বাউন্ডুলে ছেলে স্বচ্ছ! নিজের মর্জিমতো চলে এসেছে সবসময়। সে বাউন্ডুলে স্বচ্ছ নিজের বিয়ে করা বউকে যেখানে কোনদিন দেখেইনি সেখানে না দেখে না চিনে সে না দেখা বউকে খুঁজে বের করতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে এই প্রত্যাশা করাটাই বোধহয় ভুল। স্বচ্ছ নিজের অদেখা বউয়ের উপর একটা চাপা রাগ দমিয়ে রেখেই ছাদে গিয়ে দাঁড়াল।
সাথে সাথে আসল নিধি, সাদাফ আর আবিরও।বসার মতো তেমন কিছু না পেয়ে ছাদের দড়িতে শুকোতে দেওয়া একটা বিছানা ছাদর টেনে নিল। অথচ বিছানা ছাদরের মালিক কে তা তাদের কেউই জানে না। অজানা মালিকের সে বিছানা চাদর নিয়ে অনুমতি না নিয়েই ছাদের খসখসে ফ্লোরে বিছিয়ে নিল চারজনে। তারপর বসে পড়ে সেভাবেই বিশ্রাম করল অনেকটা ক্ষন। অবশেষে দুপুর হতেই ক্ষিধের জ্বালায় খাবার অর্ডার করল চারজনে মিলে। খাবার আধঘন্টার মধ্যে চলেও আসল। তারপর খাওয়া শেষে নিধি ছাদ দেখতে দেখতেই চুইংগাম চিবিয়ে বলল,,
“ বাহ বাহ!তোদের ছাদখানা দেখছি ফুলে ফুলে ঝকঝকা করছে দোস্ত। তোর বউয়ের বিয়ের ফুল বোধহয় এখান থেকেই কালেক্ট করা হয়ে যাবে বল? ”
বলতে বলতেই ছাদে লাগানো কালো গোলাপ গাছটা থেকে তিনটা ফুল ছিড়ল নিধি। ফুলগুলোও দেখতে দারুণ লাগছিল। পরপর সেগুলোকে কানে গুঁজে নিল নিধি। স্বচ্ছর ইচ্ছে হলো নিধির মুখটা এক চড়ে ভোতা বানিয়ে দিতে।খাবারের শেষ গ্রাসটা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“ ভাবছি তোর আর সাদাফের বাসরের ফুলগুলোও এখান থেকেই কালেক্ট করব। সুন্দর হবে না বল? ”
নিধি মুখ ভেঙ্গিয়ে বলল,
“ কি আশ্চর্য! এমন ভাবে রেগে যাচ্ছিস কেন? খারাপ কিছু তো বলিনি বল। ”
স্বচ্ছ তখন খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়িয়েছে। ছাদে মেলে দেওয়া কাপড়গুলো থেকে সাদা রংয়ের একটা ওড়না টেনে নিয়ে নিজের হাতটা মুঁছল আয়েশ করে। আর ঠিক তার পরমুহুর্তেই কেউ এসে ওড়নাটা ছোঁ মেরে টেনে নিল। তেজ নিয়ে তার সামনেই বলে উঠল,
“ কি আশ্চর্য! বাসার মালিক বলে কি যার তার কাপড়চোপড়কে নিজের হাত মোঁছার সামগ্রী বানাবেন ভাই? কি করলেন দেখেন তো! সাদা ওড়নাটা আমার! ”
স্বচ্ছ প্রথম দফায় চুপ থাকল। নিজের অজান্তেই ভুলটা করে বসেছে সে৷ ওড়নাটা কার ছিল সেটাও তো সে জানত না। তবে এই মুহুর্তে এই বেয়াদব মেয়ের ওড়নায় হাতের হলুদ হলুদ ছাপ দেখতে খারাপ লাগছে না তার। বরং আনন্দ হচ্ছে। ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,
“ আপনি যে তখন বেয়াদবি করলেন এর জন্য এটাই প্রাপ্য। কাজটা আমি অজান্তে করলেও এটা আপনার ওড়না শুনে এখন খুশি লাগছে। ”
সুহা এই পর্যায়ে ক্ষেপা বাঘিনীর মতো তাকাল যেন একটু হলেই গিলে ফেলবে স্বচ্ছকে। রাগে নাক ফুলে উঠছে মেয়েটার। রাগে কাঁপতে কাঁপতেই বলে উঠল,
“ ওটা আমার পছন্দের ওড়না ছিল! আপনাকে আমার ইচ্ছে করছে ছাদ থেকে ফেলে দিতে এখন! ”
স্বচ্ছ ঠিক সুহার মতো করে রাগ দেখাল না। তবে হেসে হেসেই বলল,
” আমার ও ইচ্ছে হচ্ছে। এদিকে আসুন। কোলে তুলে ছাদ থেকে ফেলে দিই আপনাকে।”
সুহা দ্বিগুণ তেতে গেল। হাত দিয়ে ঘুষি দেখিয়ে বলে উঠল,
“ এতই সহজ? মে'রে মুখ ভেঙ্গে দিব । ”
স্বচ্ছ এবারেও হাসে। দেখতে পাতলা- চিকন এইটুকু মেয়ে কিনা তার মুখ ভেঙ্গে দিবে? হেসেই শুধাল,
“ তাই নাকি?শক্তিতে পারবেন আমার সাথে?”
“ অতোটাও দুর্বল ভাবার কারণ নেই। ক্যারাটে পারি ক্যারাটে! ”
কথাটা বলেই স্বচ্ছর মুখের দিকে ধারালো দৃষ্টিতে তাকিয়েই সজোরে ঘুষি বসাল স্বচ্ছর পেটে। ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল,
”এবার বলুন? ঘুষিটা কেমন ছিল? ”
স্বচ্ছ না তো ব্যাথায় নাক মুখ কুঁচকাল না তো ব্যাথায় পেট চেপে ধরল। উল্টো সুহার কথা শুনে পেট ফাটা হাসিতে ফেটে পড়ল। সুহা তাকিয়ে দেখে। একটা ছেলে এতোটা সুন্দর হাসে কেন? নাকি তার কাছেই এতোটা সুন্দর বোধ হচ্ছে? সুহার বুক চিনচিন করে। সম্পূর্ণ গল্পটি পেয়ে যাবেন Sneh0 পেইজে বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন আন্দোলিত হয়ে শুধায়, ছেলেটা মারাত্মক হাসে৷ সাথে দৃশ্যমান ছেলেটার ট্যারাবাঁকা ঝকঝকে সাদা দাঁত গুলোও। সুহার বুকে হৃদস্পন্দন বাড়ছে। সামান্য একটা ছেলে তাকে তার সৌন্দর্য দিয়ে কাবু করে ফেলছে, নিজের এহেন অবনতি আর দুর্বলতা দেখে নিজেরই ঘৃণা হলো। পরমুহুর্তেই দাঁত মুখ শক্ত করে নজর সরাতেই কানে এল স্বচ্ছর হাস্যোজ্জল স্বর,
“এই পাটকাঠি ঘুষিতে আমি ভয় পেয়ে যাব মিস? যায় হোক, আপনার ক্যারাটে দেখে আমি বিস্মিত মিস ক্যারাটে পারা ম্যাম!”
সুহা আবারও রাগী চাহনিতে চাইল। হাত চালিয়ে স্বচ্ছর মুখ বরাবর একটা ঘুষি দিতে চাইতেই স্বচ্ছ সরে গেল। চাপা হেসে বলে উঠল,
“ থাক থাক, নিজের এনার্জি খরচ করবেন না ফোঁসফোস করে!আপনি মেয়ে। আমি তো আর মা'রামা'রিতে আপনার সাথে লাগতে যাব না বলুন?তার চেয়ে মনে মনে নিজেকে বিজয়ী ধরে সুখী হন। ”
সুহা ফোঁসফোঁস করছে তখনও ।রাগে নাক ফুলিয়ে নিয়ে স্বচ্ছর দিক থেকে নজর সরাতেই চোখে পড়ল নিধির কানে গোঁজা তিন তিনটে কালো গোলাপ। সুহার চোখ মুহুর্তেই গেল কালো গোলাপ গাছটায়। তার নিজের গাছ! অনুমতি না নিয়ে ফুল ছেড়াতে মেজাজ আরেক দফা খারাপ হলো। নিধির দিকে তেজ নিয়ে চেয়ে থেকে একদম নিধির সামনে গিয়েই দাঁড়াল। কানে গুঁজে থাকা তিন তিনটা গোলাপই এক টানে নিজের হাতে নিয়ে বলে উঠল,
“ এই যে হাসতে হাসতে ফেটে পড়া পাগলের প্রেমিকা, আমার গাছের ফুল ছিড়েছেন কেন? কয়টা ছিড়েছেন? ছেড়ার আগে অনুমতি নিয়েছেন হুহ?”
আচমকা নিধি এই মেয়ের কান্ড দেখে ভড়কে গেল। মনে মনে সুহাকে ভয়ও পেল সে। না জানি তাকেও স্বচ্ছর মতো করে ঘুষি বসিয়ে দেয় যদি? নিধি শুকনো ঢোক গিলল। অনুমতি যে নেয়নি তা না বলে উল্টো বলে বসল,
“ আমি? আমি ছিড়ি নি তো। স্বচ্ছ ছিড়ে দিয়েছে আমায়৷ এটা ওর নিজের বাসা না? তাই ও নিজেই ছিড়ে কানের গুঁজে দিয়েছে আমায়।”
সুহার মেজাজ চরম লেভেলে পৌঁছানোর জন্য বোধহয় এই কয়েকটা কথাই যথেষ্ট। স্বচ্ছর দিকে ক্ষেপা বাঘিনীর মতো এক নজর তাকিয়ে পরবর্তীতে আবার তাকাল নিধির দিকে।টানটান স্বরে বলে উঠল,
“ বাসা উনার হলেও ফুল তো উনার না। ফুল যেহেতু ছিড়েছেন ফুলের দাম দিন আপু। নাহলে ফুল আবার গাছে জোড়া লাগিয়ে দিন। ”
নিধি এবারে অসহায় স্বরেই বলল,
” কি করে লাগাব? ছিড়ে ফেললে লাগানো যায় নাকি?”
“ তাহলে টাকা পরিশোধ করুন। পার পিস পঞ্চাশ টাকা। ”
স্বচ্ছ এগিয়ে এল। কচকচে একটা নোট সুহার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে উঠল,
“ তিনটা ফুল ছেড়া হয়েছে। হাজার টাকা দিলাম। আশা করি স্যাটিসফাইড আপনি? ”
স্বচ্ছ ভাবল এই মেয়ে টাকা পেয়ে খুশি হয়ে ভৌ দৌড় দিবে। অথচ হলো না। উল্টো টাকা না নিয়েই বলল,
“ না, খুচরোই একশো পঞ্চাশ টাকা দিবেন। এখানে আপনার বড়লোকি পনা দেখতে দাঁড়িয়ে নেই ভাই। ”
সাদাফের এবারে হাসি আসল বন্ধুর এহেন অপমান আর সুহার হাবভাব দেখে। স্বচ্ছর কানে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
“ কি বেয়াদব মেয়ে দোস্ত! তোর একটুও সম্মান দিচ্ছে না দেখ! ”
সাদাফ কথাটা কানে কানে বললেও ঠিক কানে কানেই কথাটা আবদ্ধ থাকল না৷ এসে গেল সুহার কানেও। সুহা কটমট করে সাদাফের দিকে তাকাতেই সাদাফ ভয়ে আমতা আমতা করে বলে উঠল,
এই গল্পের সকল পর্ব এবং আপডেট জানতে "Sneh0" পেইজটাকে ফলো করতে পারেন।
“ শুনুন,আমার কাছে খুচরো আছে। দিচ্ছি দাঁড়ান। ”
কথাটুকু বলেই মুহুর্তেই একশো পঞ্চাশ টাকা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ নিন একশত পঞ্চাশ টাকাই আছে।”
সাদাফ এগিয়ে দিল টাকাটা। সুহা নিল। হুশিয়ারি দিয়ে বলে গেল,
“ গুড! নেক্সটবার আমার গাছে হাত দিলেও হাত কেঁটে ফেলব। মাইন্ড ইট! ”
কথাটুকু বলেই বলেই চলে যেতে যাচ্ছিল সুহা। নিধি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলল,
“ দোস্ত? টাকা নিল। ফুল গুলো দিল না তো!”
স্বচ্ছ গুরুত্ব না দিয়ে বলল,
“ ঐ ফুল এতোটা প্রয়োজনীয় ও না। বাদ দে। ”
সুহা শুনল। পা ঘুরিয়ে এসে স্বচ্ছদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ওড়নার সাথে সাথে মেঝে থেকে বিছানা চাদরটাও আকড়ে নিল৷ অপর হাতে ফুল গুলো এগিয়ে সাদাফকে, নিধিকে আর আবিরকে একটা করে গোলাপ দিয়ে বলল,
“ আপনাদের ফুল। নিন! টাকা গুলো ফুলের বিনিময়ে নিই নি, ফুল ছেড়ার বিনিময়ে জরিমানা নিয়েছি আপু। আর ফুলগুলো ফ্রি তেই দিলাম। আর হ্যাঁ, ওড়না বিছানা চাদর ময়লা করার শোধা তুলে রাখলাম। সুযোগ বুঝে নিয়ে নিব! ”
কথাগুলে টানটান স্বরে বলেই সুহা চলে গেল। আবির কালো গোলাপটার দিকে চেয়ে থেকেই মিনমিন স্বরে বলল,
“ দোস্ত? কি ডাকাত মেয়ে রে! এই মেয়ে কোন বাপের মেয়ে ? কোথায় থেকে উদয় হলো! বাপ্রে বাপ! ”
পরমুহুর্তেই আবার বলল,
“ তবে ভালো আছে! কি সুন্দর গোলাপ দিয়ে গেল আমাদের! শুধু স্বচ্ছকেই দিল না। একটু আগে অব্দি দেখলাম স্বচ্ছর বউই অবহেলা করছে স্বচ্ছকে, এখন দেখছি অন্য মেয়েরাও স্বচ্ছকে পাত্তা দিচ্ছে না। কাহিনী কি মামা? তোর সৌন্দর্য্য কমে যাচ্ছে নাকি বল তো?”
স্বচ্ছ আবিরের কথাটায় পাত্তা না দিয়েই বিড়বিড়িয়ে বলল,
“ পড়ে আছি এক ঝামেলায়, যোগ হয়েছে আরেক ঝামেলা। এই মেয়ের বিষয় পরে। আগে বাসার লোক আর আমার না দেখা বউ কবে আসবে তা ভাবি! ”
.
বিকাল অব্দি সময়টা স্বচ্ছদের ছাদেই কাঁটল। তারপর যখন শীতল হাওয়ায় চোখ বুঝে বুঝে আসবে ঠিক তখনই ছাদে এল পিনপিনে শরীরের অষ্টাদশী এক মেয়ে।সাদাফ সে মেয়েকে দেখেই স্বচ্ছকে ঠেলে দিল। ইশারায় বুঝাল এই মেয়ে কে?অথচ তার আগেই মেয়েটা তাদের দিকে ঝুঁকে স্বচ্ছকে বলে উঠল,
“ ভাইয়া? কতক্ষন হলো এসেছিস? ভাগ্যিস ভাবি বলল তুমি এসেছো নাহলে তো তোমায় আরো অপেক্ষা করতে হতো!”
স্বচ্ছ ভালো ভাবে তাকাল। মেয়েটা তার ছোটবোন সিয়া।এত বছরে দুইবার দেখেছে সে বোনকে। কাও বোনের জম্মদিনে লুকিয়ে উইশ করেছিল বলে! স্বচ্ছ ছোট বোনকে দেখে আনন্দে উচ্ছাসিত হবে নাকি দুঃখে কপাল চাপড়াবে বুঝে উঠল না।বলল,
“ তোর ভাবি বলেছে? বাহ বাহ! কবে থেকে এত ভালো হলো তোর ভাবি? ”
সিয়া ভাবির পক্ষ নিয়ে বলে উঠল,
“ ভাবি খারাপই বা কবে ছিল ভাইয়া? তুমিই তো রেখে চলে গেলে ভাবিকে! ”
স্বচ্ছ মানল না। অদৃশ্য রাগ নিয়ে বলল,
“ বিয়েতে প্রথম দফায় অপমান করেছিল তোর ভাবিই! একমুহুর্তেই বিয়েটা নাকোচ করে দিয়ে সবার সামনে আমার সম্মানের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল ঐ মেয়ে! ”
“ সেই জন্য তুমিও তো ভাবির সম্মানের বারোটা বাঁজালে তাই না? শোধবোধ তো হয়েই গেল বলো? ”
“ হয়নি, ঐ মেয়ে এখনও ত্যাড়ামি করে। বেশি ভাব দেখায়!এত ভাব পছন্দ হচ্ছে না আমার। ”
সিয়া হতাশ হয়ে বলে,
“ তোমার পছন্দ হয়ে কি হবে? ভাবি তো অন্য কারোর বউ হয়ে যাবে তাই না? তুমি কেবল এখন ডিভোর্সটা দিবে। ”
স্বচ্ছ তিড়িং করে উঠে দাঁড়াল। বলল,
“ বললেই হলো?”
“ তাহলে কি করবে? ”
“ ঐ মেয়ে যাতে সব এটিটিউড ড্রেনে ফেলে আমার প্রেমে ডুবে মরে সেই ব্যবস্থা করব। কৌশলে! ”
সিয়া সরু শ্বাস টেনে বলে,
“ তারপর আবার ছেড়ে যাবে? ”
স্বচ্ছ রাগে না বোনের উপর। তবে ফোন বের করে কতগুলো হাত ধরাধরি, এই সেই ছবি দেখাল। যেগুলোতে হাতের মালিকদের না দেখা গেলেও বুঝা যাচ্ছে একটা মেয়ের হাত একটা ছেলের হাত। দেখিয়ে বলল,
“ দেখ! তোর অতি ভালো ভাবির কাজকারবার! গত দুই মাস যাবৎ কোন ছেলের হাত ধরে ধরে ছবি পাঠিয়েছে আমায়।কোন ছেলের থেকে ফুলও নিয়েছে। কোন ছেলের সাথে ডেইটে গিয়ে কফি খাচ্ছে সব ছবি পাঠিয়েছে।এসব করে জ্বালানোর মানে কি? বল! ”
“ নিশ্চয় ভাবি তোমাকে ভুলে অন্য কারোর প্রেমে পড়েছে এটা বুঝাচ্ছে! ”
স্বচ্ছ রাগ ফুঁসে বলল,
“ ডিভোর্স দিবে বলেছে ঐ মেয়ে আমাকে। সাহস কত!”
সিয়া বলে,
“ খারাপ কি? তুমি তো আর সংসার করার জন্য বিয়েটা করোনি তখন তাই না? ”
“ তাই বলে আমায় প্রত্যাখান করবে? এত সাহস? ”
সিয়া ভাইয়ের পক্ষ নিল না। বরং উত্তরে বলল,
“ অতোটাও সাহস দেখায়নি ভাইয়া। নেহাৎই তুমি মানতে পারছো না বিষয়টা তাই! এখন বাসায় চলো। এই বিষয়ে আমরা পরে কথা বলব। ”
স্বচ্ছ কৌতুহল নিয়ে বলল,
“ বাসায় কি ঐ মেয়েও আছে? থাকলে আমি এক্ষুনি গিয়ে ঐ মেয়ের গালে চড় বসাব আর ওর সাহসের তারিফ জানাব। ”
“ ভাবি তো আমাদের সাথে একসাথে থাকে না ভাইয়া। ”
“তাহলে কোথায় পাব ঐ মেয়েকে আমি? ”
সিয়া মনে মনে হাসল। আজ তার ভাই-ভাবির সম্পর্কটা অন্য রকম থাকলে সেই সবচাইতে বেশি খুশি হতো। বলল,
“ ভাবির যখন ইচ্ছে হবে নিজেই তোমার সামনে আসবে ভাইয়া। এখন বাসায় চলো। ”
কথাটুকু বলেই আবার স্বচ্ছর বন্ধুদের উদ্দেশ্যে শুধাল,
“আর এই যে ভাইয়ার অপদার্থ বন্ধুরা? আপনারাও চলুন! ”
কথাটুকু বলেই সিয়া পা বাড়াল। পিছু বাকি চারজনও পা বাড়াল। আবির ফিসফিস করে বলল,
“ তোর বোন আমাদের অপদার্থ বলল দোস্ত?এইটুকুন মেয়ে আমাদের অপদার্থ বলল? ”
সিয়া শুনল কথাটা। পিছু ফিরে আবিরের দিকে চেয়ে বলল,
“ আছেনই তো অপদার্থের মতো? কি বলব আর বলুন? পদার্থ হলে তো বন্ধুকে এতদিনে একটু হলেও বুঝাতেন তাই না? ”
বয়সে নিজেদের চাইতে এত ছোট মেয়ের থেকে এমন অপমান জনিত কথা শুনে মুখ চুপসে গেল আবিরের। স্বচ্ছকে বিড়বিড়িয়ে বলে,
“ তোর জন্য আমাদেরও অপদার্থ বলল শা'লা!”
গল্পের মতোই সাজানো কিছু অনুভূতি রেখেছি এদিকেও একবার দেখে নিও facebook.com/SnehoGolp0
রাত প্রায় দুটো! স্বচ্ছ ঘুমোয়নি তখনও। নিজের বাকি দুইজন বন্ধুকে বেঘোরে ঘুমোতে দেখে বেলকনিতে গেল সে। একটা সিগারেটে আগুন ধরিয়ে ঠোঁটে গুঁজতে নিতেই কানে এল মেয়েলি মিহি স্বরে গান! সাথে গিটারের সুর। স্বচ্ছর কেন জানি না সিগারেটের নেশার থেকেও মেয়েলি কন্ঠে সে গানটা শুনতেই ভাল্লাগল। চোখ বুঝে শুনল,
ফুল যে গাছে ধরে সেদিকে তাকিয়ে
বিশাল উচ্চতা ডিঙিয়ে লাফ দিয়ে বল ছিরে
আনো নাহলে যাব ছেড়ে
কোনো সারা ছাড়া দরজার হাতল চেপে
চট করে মুচড়ে দিয়ে আমাকে দেখে বল যাবে?
নাকি নিয়ে যাব "তাকে" সাথে?
খপ করে আমার ঘাড়টা ধরে
নিজের কাছে টেনে নিতে
কি বাধা হয়ে দাড়িয়েছে?
না দেখেশুনে কিছু জানিয়ে
নিজে আড়ালে লুকালে
আমাকে তুমি ডুবালে
আমি কার পিছে
নিজের জন্য যাব খেটে?
তোকে বলেছে যেতে কে?
অন্যের জন্য মোমবাতি পানিতে না দিয়ে শুকাতে....
নিজের চোখের সামনেই নিজের বউয়ের হাতে চকচকে সোনার আংটি পরাচ্ছে পাত্রপক্ষ। এহেন দৃশ্য দেখে স্বচ্ছর দাঁত কিড়মিড় করল। কয়েক পা এগিয়েই লম্বা ঘোমটা টেনে বসে থাকা মেয়েটাকে টেনে দাঁড় করাল। হাত থেকে সোনার আংটি টা ছুড়ে ফেলতে নিয়েই বাবা মার উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
“ বউটা কার আব্বু? ”
স্বচ্ছর বাবা ছেলের এমন রূপ আশা না করলেও মনে মনে এমন কিছু হবে ভাবছিল বোধহয়। ছেলের এহেন কান্ড দেখে হাসিও এল তার। তবুও বলল,
“ বউটা তোমারই এমন করে আমি বলতে পারছি না স্বচ্ছ। কারণ তুমি তো আর তাকে বউয়ের কোন মর্যাদা দাও নি তাই না? কেবল বিয়েটাই করেছিলে।”
স্বচ্ছ রেগে আছে। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গেছে। অতিরিক্ত রাগের দরুণ ফর্সা, খাড়া নাকটার অগ্রভাগও লাল ঠেকছে।হিসহিস করতে করতে বলল,
“ সে যায় হোক, বিয়েটা যেহেতু হয়েছে বউটাও নিশ্চয় আমারই? আর সে বউকেই আমাকে না জানিয়ে, না শুনিয়ে, অনুমতি না নিয়ে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে কোন সাহসে আব্বু?”
স্বচ্ছর বাবা এবারে গম্ভীর স্বরে উত্তর করল,
“ এই ছাড়া কি সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত? তুমি যে বাসায় ফিরে সংসার করবেই তার তো কোন নিশ্চায়তা ছিল না স্বচ্ছ! এমনকি আজ যে বাসায় ফিরলে, কাল যে আবার হুট করে বাসা ছেড়ে চলে যাবে না এটারও নিশ্চায়তা নেই আমাদের কাছে। তুমি চিরকাল নিজের মন মতোই চলেছো। ”
স্বচ্ছ সরু শ্বাস ফেলে এবারে। যেখানে সেখানে সবাই হাতে ধরিয়ে তাকে নিজের দোষগুলো ধরিয়ে দিচ্ছে, বুঝিয়ে দিচ্ছে সে দোষী! অথচ তার বউ কিছু বলছে না?এতোটা শান্ত তার বউ? স্বচ্ছ তাকাল লাল শাড়ি পরা মেয়েটার দিকে যাকে সিয়া একটু আগেই তার বউ বলে জানিয়ে এসেছেে।স্বচ্ছ এক ধমকে বলল,
“ এই মেয়ে? ”
ধমকটা দিয়েই মেয়েটার ঘোমটা ফেলল।অথচ মেয়েটা ভয় পেয়ে আছে তার ধমক শুনে। মুখ চোখে তা স্পষ্ট! স্বচ্ছর কেন জানি বিশ্বাস হলো না এটাই তার বউ। দুই পা পিঁছিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ কে আপনি? ”
বিনিময়ে সে কোনভাবে উত্তর করল,
“ সুহা, মানে সুহাইবা! ”
স্বচ্ছ বিশ্বাস করল না।শক্ত স্বরে বলল,
“ আমি সুহাসিনীর কথার ধরণ চিনি। আপনি যেই হন, তবে সুহাসিনী যে নন তা বুঝা আমার জন্য খুব একটা কঠিন বিষয় নয়! ”
কথাটুকু বলেই হনহন করে চলে গেল নিজের রুমে। নিজের অপদার্থ বন্ধুদের রুমে চিৎ হয়ে মোবাইলে ডুবে থাকতে দেখে দ্রুত পায়ে বেলকনিতে গেল। সুহার নাম্বারটায় কল দিল তৎক্ষনাৎ। ওপাশ থেকে সুহাও কল তুলল। স্বচ্ছ সঙ্গে সঙ্গেই ডাকল,
“ সুহাসিনী? ”
সুহা চোখ বুঝে। এই ডাকটা তার অতি অপ্রিয় হয়েও ভীষণ রকমের প্রিয় রয়ে গেছে! প্রথম প্রথম সুহা নামটাকে টেনে সুহাসিনী ডাকত স্বচ্ছ। চার বছর পেরিয়ে গেলেও স্বচ্ছর মুখে ডাকটা এখনো আছে। তবে আগের মতো আনন্দ হয় না সুহার। আগে যেমন ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ডাকটা শুনলেই তার হৃদয় আন্দোলিত হতো এখন তেমন হয় না। তবুও নরম গলায় বলল,
“ একটা সময় সুহাসিনী নামটা আমি খুব আগ্রহ নিয়ে শুনার অপেক্ষায় থাকতাম অস্বচ্ছ সাহেব।অথচ আজকাল আর এই নাম শুনলে বিশেষ কোন অনুভূতি হয় না আমার! ”
স্বচ্ছ নাক লাল করে তখন বলল,
“ সে কারণে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাতে চাইছো আমায়? ”
সুহার হাসি এল। বলল,
“ কি বুঝে এই কথা?”
“ তোমার বদলে অন্য মেয়ে বসিয়ে আমার সামনে এইংগেইজমেন্ট করিয়ে কি বুঝাতে চাইলে?নিজে যখন আসবে না অন্যকে দিয়ে নাটক করাচ্ছো কেন? ”
সুহা উত্তর দেয়,
“ নাটকটা আমি অ্যারেঞ্জ করিনি। আপনার আব্বা আম্মা করেছে।আপনি বিষয়টায় ইন্টারেস্ট দেখাবেন কিনা তা দেখার জন্য। ”
“ তুমিই আসতে তাহলে!মে'রে মুখটা ভোঁতা করে দিতাম।”
সুহা তাচ্ছিল্য করে বলল,
“ আমি আপনার জন্য অতোটা মরিয়া নই যে ড্যাং ড্যাং করে আপনার সামনে হাজির হতাম মিঃ অস্বচ্ছ। ”
স্বচ্ছ এবারে চুপ থাকে। অনেকটা সময় পর শান্ত কন্ঠে বলে,
“ আমি তোমার গানের গলা চিনি সুহাসিনী। আগে প্রায়সই গান রেকর্ড করে পাঠাতে তুমি।”
সুহার এই মুহুর্তে টনক নড়ল। এতসব সতর্কতার মাঝেও একটা ভুল ইতোমধ্যে করে বসেছে বুঝতে পেরেই সন্দেহী স্বরে বলল,
“ তো? ”
স্বচ্ছ কপালে হাত দিয়ে স্লাইড করতে করতে বলল,
“রাতে গান গেয়েছিলে। নিচ থেকে আসছিল মেয়েলি গলাটা! আমি ভুল না হলে তুমি নিচের ফ্ল্যাটেই থাকো তাই না?”
সুহা এড়িয়ে গেল। বদলে বলল,
“হুট করে আমায় নিয়ে মস্তিষ্ককে এতোটা চাপ দিচ্ছেন? কারণ কি? ”
“দেখা করতে চাইছি। আমি বাসায় ফিরেছিই মূলত তোমাকে জব্দ করতে সুহাসিনী! তোমার অবাধ্যকতার শাস্তি দিতে!”
সুহার কন্ঠ নরম হলো। দীর্ঘশ্বাস টেনে বলে,
একটা ভুল কয় বার করব স্বচ্ছ? একবার তো জব্দ হয়েছিলামই! বাধ্যও হয়েছিলাম আপনার প্রেমে। এখন তো আমি আর সে বোকা মেয়েটি নেই। আপনি ভুলাতে চাইলেও এবারে ভুলব না আমি।”
স্বচ্ছ শক্ত স্বরে জানাল,
“আমার জেদ অনেক!আমি আমার সব জেদ পূরণ করেই ছাড়ি!”
সুহা কন্ঠ দ্বিগুণ শক্ত করে বলল,
“সাথে খুব ইগোও তাই না? এতোটাই ইগো যে একটা মেয়েকে অপমানে জর্জরিত করেও আপনার শান্তি মিলছে না।”

0 Comments