প্রিয়_জারুলফুল

প্রিয়_জারুলফুল


খান ভিলার বিশাল কালো গেটটি ধীরে ধীরে খুলে গেল।
গাড়ির চাকা সাদা পাথরে মোড়ানো পথ পেরিয়ে বাড়ির সামনে এসে থামতেই চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন আরও গভীর হয়ে উঠল। দু'পাশে সারি সারি বিদেশি ফুলের বাগান, মাঝখানে ফোয়ারা, আর তার পেছনে রাজপ্রাসাদের মতো দাঁড়িয়ে থাকা তিনতলা অট্টালিকা।
দিয়া বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
— "মা… এত বড় বাসা!"
জারুল মৃদু হেসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেও বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল।
এই বাড়ির প্রতিটি ইট, প্রতিটি সিঁড়ি, প্রতিটি দেয়াল তার জীবনের সবচেয়ে তিক্ত স্মৃতির সাক্ষী।
দিগন্ত গাড়ির দরজা খুলে প্রথমে দিয়াকে কোলে তুলে নিল।
দিয়া একবার মায়ের দিকে তাকাল, তারপর নিঃশব্দে দিগন্তের কাঁধে মাথা রাখল।
সেই ছোট্ট স্পর্শেই দিগন্তের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি জেগে উঠল।
এত বছর পর প্রথমবার নিজের সন্তানকে বুকের কাছে পাওয়ার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
সে মনে মনে বলল,
"আল্লাহ... এত বড় সুখের যোগ্য আমি ছিলাম না। তবুও যদি আরেকটা সুযোগ দিয়ে থাকো, আমি আর কখনো ওদের হারাতে দেব না।"
ঠিক তখনই দরজার সামনে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল বাড়ির কাজের লোকেরা।
সবার চোখ গিয়ে থামল দিগন্তের কোলে থাকা ছোট্ট মেয়েটির ওপর।
একজন বৃদ্ধ কর্মচারী ফিসফিস করে বললেন,
— "ছোট সাহেবের ছোটবেলার মতোই তো দেখতে..."
কথাটা জহুরা বেগমের কানে যেতেই তাঁর চোখ রাগে জ্বলে উঠল।
তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন।
আজ তাঁর মুখে আগের মতো আত্মবিশ্বাসী হাসি নেই।
দিয়ার দিকে তাকিয়ে তাঁর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
একই চোখ...
একই হাসি...
একই ভ্রু...
এ যেন ছোটবেলার দিগন্ত!
কিন্তু পরের মুহূর্তেই তিনি মুখ শক্ত করে ফেললেন।
— "এসেছো?"
দিগন্ত কোনো উত্তর দিল না।
সে শান্ত গলায় বলল,
— "এই বাড়ির সবাই শুনে রাখুন। আজ থেকে জারুল আর দিয়া এই বাড়ির অতিথি নয়, পরিবারের সদস্য হিসেবে থাকবে। কেউ তাদের অসম্মান করলে, সেটা আমাকে অসম্মান করার সমান হবে।"
এক মুহূর্তে পুরো ড্রয়িংরুম নীরব হয়ে গেল।
জিসা সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।
তার হাতের কাঁচের গ্লাসটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল।
জারুল নিচু স্বরে বলল,
— "আমি এখানে থাকতে চাই না।"
দিগন্ত তার দিকে তাকাল।
— "আমি জানি। কিন্তু দিয়ার চিকিৎসার জন্য অন্তত কয়েকটা দিন এখানে থাকো। তারপর যদি যেতে চাও, আমি নিজে তোমাদের পৌঁছে দেব।"
জারুল কোনো উত্তর দিল না।
তার নীরবতাকেই দিগন্ত সম্মতি ধরে নিল।
এদিকে দিয়া দিগন্তের টাই ধরে টান দিল।
— "পাপা..."
দিগন্ত নিচে তাকিয়ে হাসল।
— "হুম?"
— "আমাল ক্ষিদা পাইছে।"
এক মুহূর্তেই দিগন্তর মুখ নরম হয়ে গেল।
— "আচ্ছা, আমার রাজকন্যা কী খাবে?"
দিয়া আঙুল মুখে দিয়ে কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
— "আইসক্রিম!"
জারুল সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— "না। ডাক্তার ঠান্ডা খেতে মানা করেছে।"
দিয়া ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
— "মা সবসময় না বলে।"
দিগন্ত হেসে ফেলল।
— "তাহলে আইসক্রিম না, আমরা গরম গরম স্যুপ খাব। তারপর সুস্থ হলে আমি নিজে তোমাকে আইসক্রিম খাওয়াব। কথা দিলাম।"
দিয়া ছোট্ট আঙুল বাড়িয়ে দিল।
— "প্রমিজ?"
দিগন্ত নিজের আঙুল দিয়ে তার আঙুল জড়িয়ে ধরল।
— "প্রমিজ।"
দূরে দাঁড়িয়ে জারুল সেই দৃশ্য দেখছিল।
অদ্ভুতভাবে তার চোখ ভিজে উঠল।
এমন দৃশ্য দেখার অধিকার তো বহু বছর আগেই দিয়ার ছিল...
কিন্তু এই কোমল মুহূর্তটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
জহুরা বেগম ধীর গলায় বললেন,
— "দিগন্ত, তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।"
— "যা বলার এখানেই বলুন।"
— "সব কথা সবার সামনে বলা যায় না।"
দিগন্ত এবার কণ্ঠ শক্ত করল।
— "আজ থেকে আমার স্ত্রী আর মেয়ের সামনে লুকিয়ে বলার মতো কোনো কথা আমার নেই।"
'স্ত্রী' শব্দটা শুনে জারুল চমকে তাকাল।
সে প্রতিবাদ করতে গিয়েও থেমে গেল।
জহুরা বেগমের চোখ চিকচিক করে উঠল।
তিনি বুঝলেন—
দিগন্ত আর আগের মতো নেই।
ঠিক তখনই বাড়ির পুরনো ম্যানেজার রফিক দৌড়ে এসে বললেন,
— "ছোট সাহেব... আপনার নামে একটা পুরনো খাম এসেছে। যিনি দিয়েছেন, বলেছেন আজকেই খুলতে।"
দিগন্ত অবাক হয়ে খামটা হাতে নিল।
খামের ওপর কাঁপা হাতে লেখা—
"সত্য জানার সময় হয়েছে।"
ভেতরে মাত্র একটি পুরনো ছবি।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে—
অনেক বছর আগের জারুল...
তার পাশে তরুণ দিগন্ত...
আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেন এমন একজন ব্যক্তি, যার মুখ লাল কালি দিয়ে কেটে দেওয়া।
ছবির পেছনে লেখা—
"যে মানুষটাকে তুমি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করো, সেই মানুষটাই তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক।"
ছবিটা দেখে দিগন্তের মুখের রঙ বদলে গেল।
কারণ ওই হাতের লেখা...
সে খুব ভালো করেই চেনে।
তার বাবার!
*******
দিগন্তের হাতে ধরা পুরোনো ছবিটার দিকে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
ছবির পেছনে লেখা কয়েকটি শব্দ যেন মুহূর্তের মধ্যে তার ভেতরের সবকিছু ওলটপালট করে দিল।
"যে মানুষটাকে তুমি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করো, সেই মানুষটাই তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক।"
দিগন্তের আঙুল কেঁপে উঠল।
মনে হতে লাগল, বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা কোনো সত্য যেন ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে।
— "এই খাম কে দিয়েছে?"
রফিক মাথা নিচু করে বলল,
— "আমি চিনতে পারিনি ছোট সাহেব। একজন বৃদ্ধ লোক গেটে এসে দিয়ে গেছেন। শুধু বলেছেন, 'আজই যেন দিগন্ত সাহেবের হাতে পৌঁছায়।' তারপর চলে যান।"
দিগন্ত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
জারুল তার মুখের পরিবর্তিত অভিব্যক্তি লক্ষ্য করছিল।
এই মানুষটাকে সে অনেক রূপে দেখেছে—রাগে, অহংকারে, অবহেলায়। কিন্তু আজ তার চোখে যে অস্থিরতা, সেটা নতুন।
ঠিক তখনই ছোট্ট দিয়া দিগন্তের শার্ট টেনে বলল,
— "পাপা... তুমি কাঁদবা?"
দিগন্ত চমকে উঠে ছবিটা ভাঁজ করে পকেটে রাখল।
হাসার চেষ্টা করে বলল,
— "না মা। পাপারা কাঁদে না।"
দিয়া গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল।
— "মিছা কথা। তুমি হাসপাতালে কাঁদছিলা।"
ড্রয়িংরুমে চাপা হাসির ঢেউ উঠল।
জারুলও অনিচ্ছায় ঠোঁটের কোণে একফোঁটা হাসি লুকাতে পারল না।
দিগন্ত ভান করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "আচ্ছা, আমার মেয়ের কাছে তো কিছুই লুকানো যায় না।"
দিয়া খিলখিল করে হেসে উঠল।
সেই হাসির শব্দে ভারী পরিবেশটাও যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য হালকা হয়ে গেল।
কিন্তু দূরে দাঁড়িয়ে জহুরা বেগমের চোখে সেই হাসির কোনো প্রতিফলন নেই।
তিনি বুঝতে পারছেন—
দিগন্ত আর দিয়ার মধ্যে অদৃশ্য এক বন্ধন তৈরি হতে শুরু করেছে।
আর এই বন্ধন ভাঙা সহজ হবে না।
রাত নেমেছে।
খান ভিলার দ্বিতীয় তলার দক্ষিণ পাশের অতিথিকক্ষটি নতুন করে সাজানো হয়েছে।
দিয়াকে বিছানায় শুইয়ে ওষুধ খাইয়ে দিচ্ছে জারুল।
দিয়া আধো ঘুমে বলল,
— "মা..."
— "হুম?"
— "পাপা কি কালও থাকবো?"
জারুলের হাত থেমে গেল।
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে মৃদু গলায় বলল,
— "থাকতে পারে।"
— "তাহলে আমি কাল পাপার হাত ধরে হাঁটবো।"
কথাটা বলে দিয়া ঘুমিয়ে পড়ল।
জারুল অনেকক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
চোখের কোণে অশ্রু জমল।
সে ফিসফিস করে বলল,
— "যে মানুষটার জন্য এত কেঁদেছি, আজ আমার মেয়ে সেই মানুষটার হাত ধরতে চায়... জীবন সত্যিই অদ্ভুত।"
একই সময়ে নিজের স্টাডিরুমে বসে ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে দিগন্ত।
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।
— "ভেতরে আসুন।"
রফিক ঢুকল।
— "ছোট সাহেব, একটা কথা ছিল।"
— "বলুন।"
রফিক ইতস্তত করে বলল,
— "আপনার বাবা মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে আমাকে একটা ডায়েরি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, 'যেদিন দিগন্ত সত্য জানার জন্য প্রস্তুত হবে, সেদিন এটা ওকে দিও।' এতদিন সাহস পাইনি। আজ মনে হলো সময় এসেছে।"
সে আলমারির ভেতর থেকে কাপড়ে মোড়ানো একটি পুরোনো ডায়েরি বের করল।
দিগন্ত বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
ডায়েরির প্রথম পাতায় বাবার হাতের লেখা—
"যদি এই ডায়েরি তোমার হাতে পৌঁছায়, তার মানে আমি আর বেঁচে নেই। আর যদি তুমি এটা পড়ছো, তাহলে জেনে রেখো—তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা তুমি নিজের ইচ্ছায় করোনি।"
দিগন্তের বুক ধক করে উঠল।
সে ধীরে ধীরে পরের পাতা খুলল...
ঠিক তখনই বাইরে বজ্রপাত হলো।
এক ঝলক বিদ্যুৎ পুরো ঘর আলোকিত করে আবার অন্ধকারে ডুবিয়ে দিল।
দিগন্ত পড়তে শুরু করল...
আর সেই ডায়েরির প্রথম কয়েকটি লাইনই তার বিশ্বাসের ভিত্তি নাড়িয়ে দিল।

Post a Comment

0 Comments