নিয়তি

 

নিয়তি

একদিন ডাইনিং এ খাওয়ার সময় হোস্টেলের বড় আপুরা কি যেন বলাবলি করছিলো, আমি তখন খাওয়ায় ব্যাস্ত। পাশের চেয়ারের মৌমি আমাকে ধাক্কা দিয়ে ইশারা করলো তারা কি বলছে শুনতে। খাবার মুখে আমি পানি গ্লাসে ঢালতে ঢালতে তাদের দিকে লক্ষ্য করলাম। দেখলাম সবাই আমার দিকে মিটিমিটি করে হাসছে। মনে মনে বললাম কি ব্যাপার!?

তখন সিমরান আপু বললো – একটা মজার কথা শোন, ঐ বড় ভাই বলেছেন এই হোস্টেলের সবাই নাকি ওর বোন,শুধু একজন ছাড়া।
আমি কথাটা গুরুত্ব না দিয়ে আবার খাওয়ায় মনোযোগ দিলাম। তারা খুবই উৎসাহী ছিলো কে সেই একজন? কারন ঐ ছেলেটা সবারই খুব পছন্দের একজন। এসব নিয়ে আমার কোন মাথাব্যাথা ছিলো না৷ তবে বাকীদের মতো আমিও কৃত্রিম উৎসাহ দেখিয়েছিলাম যে- "কে সেই মেয়ে?"
তখন প্রতিদিন যাওয়া আসার সময় ঐ বড়-ভাই লোকটার সাথে কম করে হলেও ৩-৪ বার দেখা হতো। এটা একটা রুটিন ওয়ার্ক ছিলো ছেলেটার। দুপুর সাড়ে ১২ টা বিকাল ৪ টা, সন্ধ্যে ৬ টা....এই ৩ টা,সময় দেখা হতোই হতো। যতই ঝড়, তুফান হোক । ওনার এমনি দাঁড়িয়ে থাকাটা আমাকে ঐ মেয়েটাকে দেখার উৎসাহ বাড়িয়ে দিয়েছিলো, যে কে সেই একজন, যার জন্য এমন ভাবওয়ালা ছেলে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।
আমরা চলতে পথে খুব হাসাহাসি করতাম, যখনি তার সমনে আসতাম চুপ হয়ে যেতাম সবাই, এটা তাকে সম্মান দেখাতেই করতাম আমরা৷ তাকে ক্রস করা হলেই আবার হি...হি.. হা…হা..
হোস্টেলে তখন একটাই হট টপিক, বড় ভাই কাকে বোনের চোখে দেখেন না, প্রত্যেকটি মেয়ে তাকে মনে মনে পছন্দ করতো, এমনকি প্রত্যেকেই যে নিজেকে ঐ মেয়ে ভাবতো না তা বলা মুশকিল।
রংহীন এই বন্দী জীবনটাতে এসব টুকটাক ঘটনা সবাইকে উৎসুক করে দিতো।
কার ছেলে বন্ধু কি গিফট দিলো?
কে কোথায় ঘুরতে গেলো?
কে পরের দিন দেখা করতে যাবে?
কি পরে যাবে?
এমন আরো অনেক অনেক ঘটনা।
বড় ভাই লোকটার ঐ ঘোষণায় সবাই মিসির আলী হওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু কোন ক্লু না থাকায় এ রহস্যের কুল-কিনারা করতে পারছে না।
এর বেশ কিছুদিন পর হোস্টেলে কেমন যেন কানাঘুষা হচ্ছে, একদিন হঠাৎ আরেক বড় আপু আমাকে বললো বড় ভাইয়ের পছন্দের মেয়েটাকে নাকি পাওয়া গেছে। কথাটা শুনে আমার হঠাৎ কেন যেন সেই মেয়েটাকে দেখার ইচ্ছে হলো। মনে মনে ভাবছিলাম সারা হোস্টেলের মেয়েরা যাকে পছন্দ করে, তার পছন্দের যে সে কত লাকি মেয়ে!
একটা ছেলের সুন্দর হওয়ার চেয়ে ব্যাক্তিত্ববান হওয়া বেশী জরুরী। আর বড় ভাই ছেলেটা অসাধারণ ব্যাক্তিত্বের অধিকারী। কিন্তু ছেলেটার কিছু বিষয় আমার কেন জানি বিরক্ত লাগতো। সবাই ওকে বড় ভাই হিসেবে মানতো, তার গুরুত্ব দেখলে মনে হয় অসীম কোন ক্ষমতার অধিকারী যেন তিনি।
বিকালে আমি আমার রুমমেইটকে জিজ্ঞেস করলাম ও সেই সৌভাগ্যবতী মেয়েটার ব্যাপারে কিছু জানে কি না? আমার দিকে তাকিয়ে ও মৃদু হেসে বললো- “জানি, কিন্তু বলবো না”
আমি বিরক্ত হলাম ওর এমন আচরণে।
রাতে ডাইনিং এ খাওয়ার সময় গিয়ে দেখি সকলে ফিস ফাস করছে। আমি যাওয়া মাত্রই কোলাহল থেমে গেলো যেন। দু-একজনকে দেখলাম মুখ টিপে হাসলো আমার দিকে চেয়ে। কেউ আবার চোরা চোখে দেখলো আমাকে। আমি স্বাভাবিক ভাবেই খেতে বসলাম। পাশে বসা ত্বন্বীকে জিজ্ঞেস করলাম-
: “ ব্যাপার কি-রে? সবাই এমন ফিসফাস করছে কেন?”
ত্বন্বী বললো-
: “ সবাই ঐ মেয়েটার বিষয়ে কথা বলছে”
: “ওহ্! আমাকে দেখে সবার ফিসফাস বন্ধ হয়ে গেলো কেন?”
এর উত্তরে ত্বন্বী যা বললো তা শুনে মনে হলো উঁচু কোন বিল্ডিং থেকে কেউ ধাক্কা দিলো আমাকে। কারন ত্বন্বীর কথায় আমি জানতে পারলাম ঐ মেয়ে আর কেও না "আমি নিজে ‌!!!!!"
হ্যা আমিই!
হোস্টেলসুদ্ধ মেয়ের একমাত্র ক্রাশ যাকে বোনের চোখে দেখে না সে আমি-ই। তিনি নাকি আমাকেই পছন্দ করে।
তিনি এ বিষয়ে আমার মত জানতে চেয়েছেন। আপুর আমাকে বলা কথাটা শুনে কেনো যেন ভয় পেয়েছিলাম। মনে হচ্ছিলো আপু আমাকে মৃত্যু দন্ড দিয়ে শেষ ইচ্ছার কথা জানতে চেয়েছে।
আমি কথাটা বিশ্বাসই করি নি। কারন তিনি এখন অবধি আমাকে দেখেনই নি। আমি দৌড়ে গেলাম সিমরান আপুর রুমে। তাকে বললাম এই ব্যাপারে উনি কিছু জানেন কি না। উনি আমাকে বসিয়ে এরপর সব বললো- বড় ভাইয়ের নাম তুষার। ক্লাস নাইনে থাকতে কোন একদিন বিকালে ফুসকা খাওয়ার সময় প্রথম আমাকে দেখেছিলো। এরপর থেকেই তার ভালো লাগে আমাকে।

Post a Comment

0 Comments