বাসে কুড়িয়ে পাওয়া একটি ব্যাগ ফিরিয়ে দিতে গিয়ে সেই বাসায় নিজের ১২ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মা কে দেখে আমি কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেললাম।
"এই ছেলে, কী হলো তোমার? এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?"
তার কথা শুনে বুঝতে পারলাম... সে আমাকে চিনতে পারেনি।
আমি নিজেকে সামলে নিয়ে কাঁপা গলায় বললাম,
"আসলে আন্টি... আমি এই ব্যাগটা আজ সকালে বাসে পেয়েছি। ব্যাগের ভেতরে এই বাসার ঠিকানা ছিল, তাই দিয়ে যেতে এলাম।"
মা ব্যাগটার দিকে তাকিয়েই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
"হায় আল্লাহ! এই ব্যাগটার জন্য তোমার আঙ্কেল কত টেনশন করছিল! আসো বাবা, ভেতরে আসো।"
তারপর ঘরের ভেতর চিৎকার করে ডাক দিল,
"এই লাবণ্য! তোর বাবাকে ডাক তো। বল, ব্যাগ পাওয়া গেছে!"
লাবণ্য? নামটা শুনে বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। তবে কি আমার পর আরও একজন এসেছে এই পৃথিবীতে, যাকে মা আদর করে আগলে রেখেছে?
"তুমি হয়তো জানো না বাবা, এই ব্যাগে আমার স্বামীর গ্রামের বাড়ির জমির দলিলসহ অনেক দরকারি কাগজপত্র ছিল। এগুলো হারিয়ে গেলে আমরা বড় বিপদে পড়তাম। আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখুক।"
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
আমার চোখ শুধু মায়ের মুখে আটকে ছিল।
বারো বছর...
একজন মানুষ বারো বছরে কতটা বদলে যায়!
কিন্তু মায়ের হাসিটা আজও একই রকম আছে। সেই হাসি, যা দেখে ছোটবেলায় আমার সব কষ্ট দূর হয়ে যেত।
শুধু সেই মানুষটাই আজ আমাকে চিনতে পারছে না।
আমার মা যখন হারিয়ে যায়, তখন আমার বয়স ছিল এগারো বছর।
বাবা শুধু বলেছিল,
"তোর মা আমাদের ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে। আর কোনোদিন ফিরবে না।"
আমি যতবার জিজ্ঞেস করেছি, "কেন?", বাবা ততবার চুপ করে থেকেছে।
মা হারিয়ে যাওয়ার কয়েক মাস পর এক রাতে খবর এল, বাবা গাড়িচা*পায় মা**রা গেছে।
কিন্তু গ্রামের মানুষ বলত, ওটা দুর্ঘ**টনা নয়।
কেউ ইচ্ছে করেই বাবাকে মে**রে ফেলেছে।
সত্যিটা আজও অজানা।
তারপর দুই বছর দাদির কাছে মানুষ হয়েছি। অভাব, অনাহার আর অপমা*নের জীবন সহ্য করতে না পেরে একদিন টিকিট ছাড়াই ট্রেনের ছাদে উঠে ঢাকায় চলে আসি।
সেই থেকে এই শহরই আমার ঠিকানা।
ঠিক তখনই একজন ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন।
বয়স পঞ্চাশের বেশি হবে।
তিনি ব্যাগটা খুলে সব কাগজপত্র দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
"আলহামদুলিল্লাহ! সব ঠিক আছে।"
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
"বাবা, তুমি না থাকলে আজ আমি বড় বিপদে পড়তাম।"
আমি কিছু বললাম না।
কারণ আমার চোখ তখনও মায়ের ওপরে ছিলো।
ভদ্রলোক সেটা খেয়াল করে হেসে বললেন,
"কী ব্যাপার? আমার স্ত্রীকে এভাবে দেখছ কেন?"
আমি তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে বললাম,
"না... কিছু না।"
ঠিক তখনই ছোট্ট পায়ের শব্দ শুনে তাকালাম।
দশ বছরের একটি মেয়ে দৌড়ে এসে মায়ের পাশে দাঁড়াল।
গোলগাল মুখ, দুটো বেণী করা চুল, পরনে গোলাপি ফ্রক।
মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
"এই হলো আমার মেয়ে, লাবণ্য।"
লাবণ্য মিষ্টি হেসে বলল,
"ভাইয়া, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আব্বু সকাল থেকে শুধু ব্যাগের কথাই বলছিল।"
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
শুধু তাকিয়ে রইলাম।
যদি সত্যিই ও আমার মায়ের মেয়ে হয়...
তাহলে ও আমার ছোট বোন।
হঠাৎ মনে হলো, এই পৃথিবীতে আমার মায়ের পেটে আরও একজন আছে।
আমি আড়চোখে তাকালাম মায়ের দিকে। মা দাড়িয়ে পরম মায়ায় সেই সোফায় বসা ভদ্রলোকের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। যে মায়া, যে অধিকার একদিন আমার বাবার ওপর ছিল, আজ তা অন্য কারো।
আমার বুকের ভেতর এক তীব্র ক্ষো*ভ, অভিমান আর এক ডজন অনুচ্চারিত প্রশ্ন মোচড় দিয়ে উঠতে লাগল
যে নিজের ১১ বছরের সন্তানকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে এখানে অন্য এক সংসার পেতে সুখে দিন কাটাচ্ছে?
আমি উঠে দাঁড়ালাম। এখানে আর এক মুহূর্ত থাকা মানে নিজের দম আটকে ম*রে যাওয়া। কিন্তু আমি এত সহজে হাল ছাড়ব না। আমার বাবার মৃ**ত্যু আর মায়ের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে যে রহস্য লুকিয়ে আছে, তার শেষ দেখে ছাড়ব।
"আমি আসি আন্টি, আমার ডিউটির সময় হয়ে যাচ্ছে," কোনোমতে কথা টি বলে দরজার দিকে পা বাড়ালাম।
"আরে বসো বাবা, একটু মিষ্টি মুখ করে যাও," মা পেছন থেকে ডাকল।
আমি আর পেছনে তাকালাম না। দরজার বাইরে এসে এক বিশাল দীর্ঘশ্বাস নিলাম। মনে মনে বললাম, 'দেখা হবে মা। খুব শিগগিরই আবার দেখা হবে।

0 Comments