সৌহার্দ্য_আবরার

 

সৌহার্দ্য_আবরার

ফ্রেশ হয়ে এসে মিহি দেখল ঘরে কেউ নেই। ঘর ফাঁকা। সে ধপ করে শুয়ে পড়ল বিছানায়। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে। বসে থেকে থেকে কোমর অবশ হয়ে গিয়েছে যেন। নড়নচড়নেও বেগ পোহাতে হচ্ছে। সে তপ্ত শ্বাস ফেলল। শোরীরের সমস্ত ক্লান্তি যেন একসাথে এসে তাকে জাপটে ধরল। চোখ দু'টো আপনা-আপনিই বুজে এল। কিন্তু ঘুম এলো না। বরং মনে হলো, বহু বছর আগের কিছু ধূসর স্মৃতি দরজায় কড়া নাড়ছে।
সাত বছর আগের সেই রাত। চারপাশ আলোয় ঝলমল করছিল। সাদা, সোনালি আর সবুজ ফুলে সাজানো উঠোন। বাতাসে আতরের মৃদু গন্ধ। কোথাও কেউ দুরুদ পড়ছিল, কোথাও হাসির রোল উঠছিল।
লালচে-মেরুন বেনারসিতে মাথা নিচু করে বসেছিল ষোল বছরের কিশোরী মিহি। তার আঙুল কাঁপছিল। কাঁপছিল শরীর। নাক বেয়ে ঘাম ছুটছিল। বারবার দোপাট্টার কিনারা মুঠোয় পেঁচিয়ে ফেলছিল সে। বুকের ভেতরটা কেমন অচেনা অনুভূতিতে ভরে ছিল। লজ্জা, ভয়, অজানা ভবিষ্যতের কৌতূহল...!
কাজি সাহেবের কণ্ঠ ভেসে এসেছিল,
-“মা, তুমি এই বিয়েতে রাজি থাকলে বলো, কবুল।”
মিহির গলা কেঁপে উঠেছিল। লজ্জা বুজে এসেছিল কন্ঠস্বর,
-“ক...কবুল।”
তিনবার উচ্চারণের পর চারপাশে "মাশাআল্লাহ" ধ্বনি উঠেছিল। সবাই খুশি হয়েছিল। শুধু সে একবারও বরের দিকে ঠিকমতো তাকাতে পারেনি। মনে আছে, এক ঝলক। শুধু এক ঝলক সাদা পাঞ্জাবির উপর গাঢ় রঙের শেরওয়ানি জড়ানো লম্বা একটা ছায়ামূর্তি দেখেছিল সে। তারপর আবার মাথা নিচু করে ফেলেছিল।
তাকে বাসর ঘরে বসিয়ে সকলে সেদিন বলছিল, ছেলেটা নাকি খুব মেধাবী। বিদেশে বড় ব্যবসা করবে। অনেক স্বপ্ন তার। অভাগী মিহি তখনও বুঝতে পারেনি, সেই স্বপ্নের তালিকায় সে ছিল না।
পরদিন সকালে ঘটে গেল অঘটন। ঘুম ভাঙতেই বাড়িটা কেমন অস্বাভাবিক নীরব লাগছিল মিহির। ফিসফাস, চাপা কান্নার আওয়াজ পেল। আর কিছু ভাঙা ভাঙা শব্দে আমেনার চাপা আর্তনাদ শুনল,
-“ছেলেটা চলে গেছে। কাউকে কিছু না বলেই চলে গিয়েছে!”
এরপরের দৃশ্যগুলো আর স্পষ্ট নয়। নিজের হাতের মেহেদির রঙের দিকে অনেকক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে ছিল মিহি। একদিন, দুইদিন, এক সপ্তাহ, তারপর এক মাস! অপেক্ষা ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। ফোন আসেনি। কোনো চিঠি আসেনি। একটা খবরও না।
অভিমান গাঢ় হয় মিহির। এত কিছুর পরেও আরমান আর আমেনা তাকে কখনো পর ভাবেননি। মেয়ের মতোই আগলে রেখেছিলেন। তাদের অপরাধবোধ, স্নেহ আর মমতা ধীরে ধীরে মিহির সমস্ত অভিমানকে ঢেকে দিয়েছিল। কিন্তু, যার জন্য এই সম্পর্ক, সে মানুষটা যেন ছিলই না।
সাত বছরে অসংখ্যবার মনে প্রশ্ন জেগেছে, লোকটা দেখতে কেমন? কেমন করে কথা বলে? হাসে কি? নাকি সবসময় এমনই কঠিন?
আজ, এত বছর পর, প্রথমবার তার চোখে চোখ পড়তেই মিহির বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা কাঁপন উঠেছিল। রাগ? অভিমান?নাকি অচেনা কোনো অনুভূতি? সে উত্তর জানা নেই। মিহি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পাশ ফিরে শুয়ে চোখ বন্ধ করল।
ওমনি দরজায় কড়াঘাতের শব্দে চোখ মেলে তাকাল। কোনোরকম শরীরটা টেনে তুলে দরজা খুলল। চোখে ভাসল সৌহার্দ্যের আদল। কপাল কুঁচকায় মিহি। সৌহার্দ্য বলে,
-“খাবার এসেছে। খেতে এসো।”
দু'টো বাক্য ব্যয় করে ফের চলে গেল। মিহি মুখ ভেঙাল। পিছু পিছু গেল।
—-----
সন্ধ্যার পর সৌহার্দ্যের ডাক পড়ল বাবা-মায়ের ঘরে। ভেতরে ঢুকতেই দেখল মিহিও সেখানে। কপাল কুঁচকে এল ওমনি। সতর্ক চোখে তাকাল বিছানায় বসা বাবা-মায়ের দিকে। সৌহার্দ্য এসেই বলল,
-“আম্মু, কি বলবে বলছিলে?”
-“এত তাড়া কেন তোর? আগে বস তো।”
সৌহার্দ্য বসল। আমেনা তাকালেন স্বামীর দিকে। তারপর ছেলে আর বৌমার দিকে চেয়ে সাবলীল স্বরে বললেন,
-“আমরা ক’দিন পরেই দেশে ফিরছি। আর মিহি এখানেই থাকবে।”
-“কি?”
একসঙ্গেই বলে উঠলো সৌহার্দ্য -মিহি। পরপর চমকে একে অপরের দিকে তাকাল। মিহি আমেনার দিকে চোখ ফিরিয়ে বলল,
-“এভাবে কি করে? মানে, আমি একা একা এখানে—”
মিহি থেমে গেল। কিছু বলতে পারল না আর। সৌহার্দ্য বলল,
-“এতো তাড়াহুড়ো কিসের? ক’টা দিন ঠিকমতো থেকে তারপর যাও।”
আমেনা ভ্রু বাঁকিয়ে তাকালেন। সৌহার্দ্য অস্বস্তি নিয়ে বলল,
-‘মি-মিহির ভালো লাগবে অন্তত। ও একা একা এখানে, তাই আর কি।’
আরমান সাহেব এবার বলে বসল,
-“তুমি এতো ওর জন্য ভাবছো কবে থেকে?”
মুখের উপর এমন করে বলে নিজেও অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। সৌহার্দ্য বিব্রত বোধ করল। মিহিও চমকেছে ঢের। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার আমেনা বললেন,
-“নিজের বাড়ি রেখে এখানে আমার মন টানবে না। তাছাড়া, শাফিনও ওখানে একা রহিমের কাছে। পরীক্ষা চলছে বিধায় আনতেও পারিনি ওকে। মিহির পড়াশোনার ব্যাপার-স্যাপার, ক্যারিয়ারের কথা; তাই এখানে এসেছি ওকে দিয়ে যেতে। আশা করি তুমি এমন কিছু করবে না যাতে আবারও আমাদের মান-ইজ্জত ক্ষুন্ন হয়।”
সৌহার্দ্য আশ্চর্য হলো,
-“আম্মু। কেমন কথা বলছ এসব? আমি কিছু এমন কেন করব?”
-“সেটাই। মনে থাকে যেন।”
সৌহার্দ্য শ্বাস ফেলতে নিল তখনই তার শ্বাস আটকে দেওয়ার মতো কথা বলে উঠলেন আরমান সাহেব,
-“মিহি এডমিশন নেওয়ার পর, তুমি ওকে আমাদের অফিসে ইন্টার্ন হিসেবে নিয়ে নাও। যদি চায় তবে এক্সপেরিয়েন্সের জন্য হলেও সে ফিউচারে ভালো জায়গায়, ভালো পজিশনে জব করতে পারবে।”
সৌহার্দ্য পানি-টানি ছাড়াই বিষমটা খেয়ে বসল। চরম আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-“হ্যাঁ? ইন্টার্ন?”
মিহিও বেশ চমকেছে। প্রথমে একই বাড়ি, তারপর একই ওয়ার্কপ্লেস! কক্ষনো না! মিহি মরে গেলেও এই সিদ্ধান্ত মানতে পারবে না। তবে থামাতে হবে তো। সে বলে উঠলো,
-“এখনই এসবের কি দরকার আঙ্কেল? এখন আগে ভালো করে পড়ায় ফোকাস করি, তারপর—”
তার কথা শেষ হওয়ার আগে আমেনা বলে উঠল,
-“তুমি থামো। না কোরো না। এখন থেকে ইন্টার্ন করলে কাজও শিখতে পারবে৷ পড়াশোনায়ও হেল্প হবে। ইজি হবে।”
মিহি পড়লো ফ্যাসাদে। সে পুরোপুরি না চেয়ে, আড়চোখে চাইল সৌহার্দ্যর দিকে। সৌহার্দ্য তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। চোখে চোখ পড়তেই মিহি চোখ সরিয়ে নিল। তীব্র অস্বস্তিতে যখন সে জর্জরিত তখন সৌহার্দ্য গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
-“ঠিক আছে৷ যা বলবে।”
মিহি তৃতীয় দফায় চমকে তাকায়। আরমান সাহেব হেসে উঠলেন। সৌহার্দ্য মিহির দিকে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকে নিরবে, নিভৃতে ক্ষত-বিক্ষত করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। মিহি চোখ খিঁচিয়ে নিল। এখন একে সহ্য করবে কি করে, সে মাবুদ জানে!

Post a Comment

0 Comments