চাইছি_বলতে_ভালোবাসি

চাইছি_বলতে_ভালোবাসি

 "একজন মেজরের ব‌উ হয়ে ৪০ টাকা দামের গজ কাপড় পরে আছো!বর মনে হয় দেখভাল করে নাহ ,তাই না?"

আচানক একটা কর্কশ মন্তব্যে থেমে গেল কাঁক‌ইয়ের হাতের ঝাঁটা। সে একমনে উঠোন ঝাড় দিচ্ছিল। সহসা অপ্রীতিকর মেয়েলি কণ্ঠস্বর শুনে সে ঝাঁটা ধরা অবস্থাতেই স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। পরক্ষণেই ধীরপায়ে পিছনে তাকাল।যা ভেবেছিল তাই। দেখল পাশের বাড়ির লতিফা কাকিমা মুখে এক চিলতে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পাড়ার লোকেরা অবশ্য তাকে আড়ালে সিসি ক্যামেরা বলে ডাকে। পাড়ায় কোথায় কার হাঁড়িতে কী রান্না হচ্ছে, কার ছেলে কয়টায় বাড়ি ফিরছে, কার মেয়ে কার সাথে ফোনে কথা বলছে,কার মেয়ের কোথায় বিয়ে হচ্ছে, কার সাথে বিয়ে হচ্ছে, কবে বাচ্চা হচ্ছে, কবে ডিভোর্স হচ্ছে ,মোদ্দা কথা সব কিছুর চব্বিশ ঘণ্টার লাইভ তদারকি করাই তার প্রধান কাজ। ছোটখাটো যেকোনো ঘটনাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তিলকে বড় সাইজের কাঁঠাল বানিয়ে পরিবেশন করাতে ওনার জুড়ি মেলা ভার।
কাঁকইয়ের পরনের অতি সাধারণ, সস্তা গজ কাপড় দিয়ে বানানো জামাটার দিকে তাচ্ছিল্য মেশানো দৃষ্টিতে তাকালেন লতিফা কাকিমা। শ্লেষাত্মক গলায় বললেন, "কী হলো কাঁকই, কথা বলছো না যে?শুনেছি বিয়ের পর তোমার মেজর বর নাকি তোমাকে ফেলে চলে গেছে। শ্বশুর বাড়িতেও ঠাঁই মেলে নি তোমার।বিয়ের পরেও বুড়ো বাপের ঘাড়ে বোঝা হয়েই রয়ে গেছ।মেজর ব্যাটায় বিয়ে করতে পারল অথচ ভরণপোষণ দিবে না এটা কোনো কথা?যতোসব ছোটলোকের বংশধর!”
লতিফা কাকিমার কথাগুলো তপ্ত শেলের মতো এসে বিঁধল কাঁকইয়ের বুকে ।এতক্ষণের শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা ভেতরে ভেতরে কেমন যেন দুমড়ে-মুচড়ে গেল। হাতের ঝাঁটাটা আলগা হয়ে খসে পড়ল মাটির উঠোনে। লতিফা কাকিমার চিল্লানো গলার আওয়াজ, ওনার মুখের ওই কুৎসিত বাঁকা হাসি,সবকিছু কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল কাঁকইয়ের সামনে। ওনার প্রতিটি শব্দ মেয়েটার পুরনো, আধবোজা ক্ষতটাকে নতুন করে খুঁচিয়ে দগদগে করে তুলল।
লতিফা কাকিমার অবয়বটা চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে গিয়ে কাঁকইকে টেনে নিয়ে গেল ঠিক দুই মাস আগের সেই অভিশপ্ত রাতের অতল গহ্বরে।
সেদিন‌ও কাঁকইয়ের পরনে কাপড় ছিল। তবে এমন সস্তা গজ কাপড়ের জামা নয়,টকটকে লাল বেনারসি শাড়ি। আলোয় আলোকময় ছিল বিয়ের প্যান্ডেল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বরপক্ষ যখন একটা দামি বাইক দাবি করে বসল, আর কাঁকইয়ের বাবা আবু তাহের তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলেন, তখনই ভেঙে গেল বিয়েটা। বরযাত্রী কনের বাড়ি থেকে চলে যেতে উদ্যত হলেন। চারপাশের আত্মীয়-স্বজন আর পাড়াপড়শিদের উপহাস তীরের মতো বিঁধছিল কাঁকইয়ের গায়ে। কারণ, এর আগেও বারকয়েক কাঁকইয়ের বিয়ে ভাঙার রেকর্ড আছে। নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস! পুরো সমাজ আঙুল তুলছিল ওর দিকেই।
মেয়ের চরম অপমান , লোকজনের কটু কথা সহ্য করতে পারেননি বৃদ্ধ বাবা আবু তাহের। লোকলজ্জা আর বুকফাটা আর্তনাদে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে তিনি সোজা ছুটে গিয়েছিলেন গ্রামের নির্জন বটতলায়, গলায় ফাঁ'স দিয়ে আত্মহনন করতে।
ঠিক তখনই সেখানে হাজির হন এলাকার‌ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন। তাহেরকে ওভাবে গলায় ফাঁ'স দিতে দেখে তিনি চিৎকার করে ছুটে গিয়ে তাকে বাঁচান। বুক ভরে শ্বাস নিতে নিতে বেলায়েত হোসেন যখন এই আত্মহননের হেতু জানতে চাইলেন, আবু তাহের তখন কান্নায় ভেঙে পড়ে সবটা খুলে বলেন।
সব শুনে বেলায়েত হোসেনের চোখ-মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল। তিনি গর্জনে ফেটে পড়ে বললেন, "এই যুগে এসেও যৌতুকের জন্য বিয়ে ভেঙে যায়? কোন শা'লায় এমন করছে? চল, আজ তার কলিজাটা মেপে আসি।”
কিন্তু যখন তারা তড়িঘড়ি করে বাড়ি ফিরে এলেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।লোভী বরপক্ষ ততক্ষণে বিয়ের আসর ছেড়ে চলে গেছে। । কাঁকইয়ের বাবা-মা তখন নিরুপায় হয়ে চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেনের পা জড়িয়ে ধরলেন। ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, "আমার মেয়েটার জীবন শেষ হয়ে গেল ভাইজান ।এই পোড়াকপালি মেয়ের আর কোনোদিন বিয়ে হবে না। কে বিয়ে করবে আমার এই অপয়া মেয়েকে?”
আবু তাহেরের কান্না ছুঁয়ে গেল বেলায়েত হোসেনের বুক। তিনি শক্ত গলায়, সিংহবিক্রমে ঘোষণা করলেন, "কাঁকইয়ের বিয়ে হবে।এবং এক্ষুনি, এই মুহূর্তেই হবে।"
চেয়ারম্যানের অবিশ্বাস্য আশ্বাসে উপস্থিত সবার মুখ খুশিতে চকচক করে উঠল।মনে হলো যেন অন্ধকারের মাঝে হঠাৎ আলোর ঝলকানি দেখা দিল।
বেলায়েত হোসেন আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে পকেট থেকে ফোন বের করে কল করলেন তাঁর নাতি ওয়াসিক আহলানকে। আহলান তখন নানু বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। নানার আকস্মিক ফোনে, তাঁর কণ্ঠের টানটান উত্তেজনা শুনে সে ভাবল নানার বোধহয় বড় কোনো বিপদ হয়েছে! সে সব কাজ ফেলে একছুটে কনের বাড়িতে এসে হাজির হলো।
সেখানে আসতেই বেলায়েত হোসেন নাতিকে আদেশ দিলেন, "আহলান, তুই এক্ষুনি কাঁকইকে নিকাহ করবি।”
নানার মুখে বিয়ের কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ল আহলান। সে একজন নামকরা মেজর, নিজের একটা ব্যক্তিত্ব আছে। সে তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল, " আপনি এসব কী বলছেন নানাজান? আমি এই মেয়েকে চিনিই না।আর এভাবে হুট করে বিয়ে করা অসম্ভব! আমি পারব না নানাজান।আমাকে ক্ষমা করবেন।"
কিন্তু বেলায়েত হোসেনও ছাড়ার পাত্র নন। তিনি আহলানকে সমাজের দায়বদ্ধতা, একজন বীরের কর্তব্য আর নানার সম্মানের দোহাই দিয়ে অনেক চাপ দিলেন। নানাজানের সেই প্রবল জেদ আর নৈতিক চাপের কাছে শেষমেশ মাথা নত করতে বাধ্য হলো রাশভারী মেজর ওয়াসিক আহলান। সম্পূর্ণ অনিচ্ছাসত্ত্বেও, চোয়াল শক্ত করে সে বিয়েতে রাজি হলো।
কাজীর উপস্থিতিতে কোনোমতে কবুল বলে নিকাহ সম্পন্ন হলো ঠিকই, কিন্তু আহলানের মনে জমে রইল পাহাড়সম ক্ষোভ আর অবজ্ঞা। সে এতটাই ক্ষিপ্ত ছিল যে, বাসর ঘর তো দূর, বিয়ের পর এক নজর কাঁকইয়ের মুখ পর্যন্ত দেখল না। ঘোমটা খোলার কোনো চেষ্টাই করল না সে। নিকাহ শেষ হওয়ার পর পরই, কাঁকইকে ওভাবেই ফেলে রেখে, কাউকে কিছু না বলে ঝড়ের বেগে বিয়ের আসর ছেড়ে চলে গেল মেজর ওয়াসিক আহলান।
"কী হলো? কালা হয়ে গেলে নাকি? কথার উত্তর দিচ্ছো না যে ?”
লতিফা কাকিমার কথায় ভাবনার সুতা কাটা গেল কাঁক‌ইয়ের। নিজের অজান্তেই কখন যে জল এসে তার আঁখি পল্লব ভিজিয়ে দিয়ে গেছে ঠাহর করতে পারেনি কাঁক‌ই। লতিফা কাকিমার আড়ালে কাঁক‌ই চোখের জল মুছে নিলো।বুকের ভেতরের হাহাকারটাকে চেপে ধরে পাথরের মতো শক্ত করে ফেলল নিজের মুখাবয়ব।
কাঁকইকে চুপ থাকতে দেখে লতিফা কাকিমা আরও এক পা এগিয়ে এলেন। চারপাশটা একবার চোরের মতো দেখে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, " শোনো কাঁকই, তুমি চাইলে কিন্তু ওই অহংকারী ছোটলোকের চাকরিটা এক তুড়িতে খেয়ে দিতে পারো।”
কাঁকই ভ্রূ কুঁচকে তাকাল। লতিফা কাকিমা নিজের বুদ্ধির চোটে নিজেই উত্তেজিত হয়ে কোমরে হাত দিয়ে বলতে লাগলেন, "আরে, সেনাবাহিনীর অফিসারদের আইন খুব কড়া। তুমি সোজা ওনাদের হেডকোয়ার্টারে গিয়ে একটা লিখিত কমপ্লেন ঠুকে দাও। বলো যে, বিয়ের পর থেকে তোমার মেজর স্বামী তোমার কোনো ভরণপোষণ দেয় না। এক নজর দেখতেও আসে না, বাপের বাড়িতে ফেলে রেখেছে। ব্যাস, আর কিছু লাগবে না।দেখবে বড় বড় অফিসারেরা কেমন ওকে জাঁতাকলে ফেলে। চাকরি বাঁচানোর তাগিদে তখন তোমার বর বিড়ালের বাচ্চার মতো লেজ গুটিয়ে তোমার পায়ে এসে পড়বে। এই লতিফা কাকিমার বুদ্ধি কোনোদিন ফেল মারেনি আর ফেল মারবেও না, মিলিয়ে নিও।”
কাঁক‌ই স্মিত হেসে কিছু বলতে উদ্যত হলো।কিন্তু তার ঠোঁট ফুঁড়ে শব্দ বের হওয়ার আগেই উঠোনের সদর দরজার দিক থেকে এক জোড়া ভারী বুটের আওয়াজ এগিয়ে এল ধীরপায়ে।আর তার পরপরই বাতাস কাঁপিয়ে ভেসে এল এক রাশভারী, পুরুষালি গম্ভীর কণ্ঠস্বর—
"কাঁকই।”

Post a Comment

0 Comments