এক_ছাদের_বাইরে

এক_ছাদের_বাইরে


​বিকেলের দিকে চারপাশটা কেমন যেন থমথমে হয়ে এলো। চেম্বারের এসিটা সচল থাকা সত্ত্বেও আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছিল। টেবিলের ওপর রাখা রিপোর্টের খামটার দিকে আমি তাকিয়ে আছি। ল্যাবের টেকনিশিয়ান একটু আগেই রিপোর্টটা দিয়ে গেছে।
​রিপোর্টে যা এসেছে, তা এক কথায় মিরাকল। ৪৩ বছর বয়সে প্রাকৃতিকভাবে কনসিভ করা কঠিন হলেও, বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী—যার পুরো নাম সুরাইয়া বেগম—তিনি সত্যি সত্যিই গর্ভবতী। পজিটিভ রেজাল্টটা জ্বলজ্বল করছে।
​আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিপোর্টের কাগজটা ফাইলবন্দি করলাম। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আমি সুরাইয়া বেগমের পেছনের গল্পটাও জেনে ফেলেছি। আমার চেনা এক কলিগ, যে সুরাইয়ার আগের শ্বশুরবাড়ির এলাকার, তার মাধ্যমেই জানতে পারলাম—
সুরাইয়া বেগম আসলে একজন ডিভো*র্সি নারী। দেখতে সুন্দরী, মার্জিত। আগের সংসারে তার ১৬ বছরের একটা ছেলেও আছে, যে এখন তার বাবার কাছে থাকে। সন্তানকে নিজের কাছে রাখার অনেক চেষ্টা করেও পারেননি সুরাইয়া, সমাজ আর আইনের মা*রপ্যাঁচে হেরে গেছেন। আর এখন, আমার ছাপ্পান্ন বছর বয়সী বাবার সংসারে এসে তিনি মরিয়া হয়ে একটা বাচ্চা চাইছেন। হয়তো একাকীত্ব ঘোচাতে, কিংবা এই নতুন সংসারে নিজের জায়গাটা আজীবনের জন্য পাকা করতে।
​কিন্তু তিনি জানেন না, যে পুরুষটাকে আঁকড়ে ধরে তিনি নতুন স্বপ্ন বুনছেন, সেই পুরুষটা অলরেডি একটা জ্যান্ত অতীত আর বৈধ স্ত্রীকে মাঝরাস্তায় ফেলে এসেছে।
​বিকেল ঠিক চারটায় সুরাইয়া বেগম আবার চেম্বারে ঢুকলেন। এবার তার চোখে উৎকণ্ঠা আর আশা একাকার হয়ে আছে।
​আমি রিপোর্টটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে অত্যন্ত পেশাদার গলায় বললাম, "অভিনন্দন। আপনার টেস্ট পজিটিভ। ইউ আর প্রেগন্যান্ট।"
​মুহূর্তের মধ্যে সুরাইয়া বেগমের চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠল। তিনি দুই হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেললেন। সেই কান্না আনন্দের, সেই কান্না স্বস্তির। টেবিলের ওপাশ থেকে তার এই আবেগ দেখে আমার ভেতরটা মুচড়ে উঠল। এই মহিলাকে আমি কী করব? ঘৃণা করব? নাকি করুণা? তিনি তো হয়তো জানেনও না আমার মায়ের কষ্ঠ ও অস্তিত্বের কথা!
​"সত্যি বলছেন ম্যাডাম? আল্লাহর অশেষ রহমত!" সুরাইয়া বেগম চোখ মুছে বললেন, "ওনাকে (আমার বাবাকে) এখনই ফোন করে জানাই। উনি শুনলে যে কী খুশি হবেন! এই বয়সে এসে আবার বাবা হওয়ার স্বাদ পাবেন, ভাবতেই পারেননি।"
​আমার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। হাত কাঁপছিল, কিন্তু টেবিলে হাতটা চেপে ধরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলাম। সুরাইয়া বেগম ব্যাগ থেকে ফোন বের করতে যাবেন, ঠিক তখনই ওনার ফোনটা বেজে উঠল।
​স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। সেখানে লেখা—'Husband'। অর্থাৎ আমার জন্মদাতা পিতা!
​সুরাইয়া বেগম হাসিমুখে ফোনটা রিসিভ করে স্পিকার অন করে দিলেন। হয়তো তিনি চাইলেন এই খুশির খবরটা ডাক্তারের সামনেই ওনাকে দিতে।
​ওপাশ থেকে বাবার চেনা, গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "হ্যালো, কোথায় তুমি? টেস্ট করানো হয়েছে? ডাক্তার কী বলল?"
​বাবার গলাটা ছয় বছর পর শুনলাম। একটুও বদলায়নি। ঠিক এই গলাই একসময় আমাকে 'মা' বলে ডাকত। আজ অন্য এক নারীর জন্য সেই গলায় কতটা ব্যাকুলতা!
​সুরাইয়া বেগম লাজুক হেসে বললেন, "হ্যাঁ, চেম্বারেই আছি। ডাক্তার ম্যাডাম বললেন পজিটিভ। আমি মা হতে চলেছি!"
​ওপাশ থেকে বাবা যেন আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন, "সত্যি বলছ সুরাইয়া? ওহ খোদা! আমি এখনই আসছি। তোমার চেম্বারের ঠিকানাটা বলো, আমি নিচে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, উপরে আসছি।"
​সুরাইয়া বেগম আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "ম্যাডাম, আপনার চেম্বারের নাম আর ফ্লোরটা ওনাকে একটু বুঝিয়ে বলুন না, উনি ঠিক চিনতে পারছেন না।"
​সুরাইয়া বেগম ফোনটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। আমার নিজের বাবার সাথে কথা বলতে হবে! স্ক্রিনের ওপাশে আমার সেই বাবা, যে আমার মাকে ডিভো*র্স না দিয়েই এই মহিলার সাথে ঘর বাঁধছে।
​আমি ফোনটা হাতে নিলাম। ফোনের ওপার থেকে বাবার উত্তেজিত কণ্ঠ শোনা গেল, "হ্যালো ডাক্তার সাহেব? শুনলাম সুরাইয়া কনসিভ করেছে। অনেক ধন্যবাদ আপনাদের। চেম্বারটা কত তলায়?"
​আমি গভীর একটা শ্বাস নিলাম। আমার গলার স্বর কাঁপল না, বরং এক অদ্ভুত শীতলতায় রূপ নিল।
​আমি ফোনের স্পিকারে মুখ রেখে অত্যন্ত স্পষ্ট এবং চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম, "ল্যাব এইড ডায়াগনস্টিক, লিফটের চারতলা, রুম নম্বর ৪০৫। চলে আসুন... 'বাবা'!"
​'বাবা' শব্দটা উচ্চারণ করার সাথে সাথে ওপাশ থেকে এক মুহূর্তের জন্য নিখাদ নীরবতা নেমে এলো। বাবার ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
​"কে... কে কথা বলছেন?" বাবার কণ্ঠস্বর এবার ভ''য়ে আর অবিশ্বাসে কাঁপতে শুরু করল। তিনি কি আমার গলা চিনতে পেরেছেন?
​আমি ফোনটা সুরাইয়া বেগমের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে ওনার দিকে তাকালাম। ওনার মুখে তখনো হাসির রেখা, কিন্তু আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ওনার হাসিটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। ওনি বুঝতে পারছেন না এখানে কী ঘটছে।
​আমি রিপোর্ট টা বন্ধ করে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালাম। সুরাইয়া বেগমের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বললাম, "রিপোর্টের নিচে সইটা ভালো করে দেখে নেবেন। ওখানে আমার নাম লেখা আছে—ডা. মেহজাবিন রহমান।

Post a Comment

0 Comments