হৃদয়_পাঁজরে_বসন্ত

গাড়ির ব্যাকসিটে শ্রাবন্তীকে আগলে ধরে বসে আছে ফাইয়ান। এসি-র ঠান্ডা বাতাসও তার কপালের ঘাম থামাতে পারছে না। তার সাদা শার্টের হাতা আর বুক ততক্ষণে শ্রাবন্তীর রক্তে ভিজে গেছে। ফাইয়ানের এক হাত শক্ত করে চেপে ধরে আছে শ্রাবন্তীর মাথায় বাঁধা ওড়নাটার ওপর, যাতে রক্তক্ষরণ আর না বাড়ে।
ড্রাইভার ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সর্বোচ্চ গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে।
ফাইয়ান নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল শ্রাবন্তীর চোখের পাতা দুটো সামান্য কাঁপছে। সে শ্রাবন্তীর গালে আলতো চাপড় দিয়ে কিছুটা কর্কশ কিন্তু উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
— “হেই! চোখ খোলো। একদম চোখ বন্ধ করবে না। শুনতে পাচ্ছো আমার কথা?”
শ্রাবন্তীর ঠোঁট দুটো অবশ হয়ে আসছে। মাথায় তীব্র যন্ত্রণার মাঝেও ফাইয়ানের গলার আওয়াজটা তার কানের পর্দায় খুব অস্পষ্টভাবে এসে আঘাত করল। সে অনেক চেষ্টা করে চোখের পাতা দুটো সামান্য ফাঁক করল। ফাইয়ানের আবছা অবয়বটা তার চোখে ভেসে উঠলেও সে চিনতে পারল না।
শ্রাবন্তীর বুকটা খুব ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে। প্রতিটা শ্বাস নিতে তার বুক ফেটে যাচ্ছে। সে অত্যন্ত ক্ষীণ, প্রায় ফিসফিসানি কণ্ঠে বলল,
— “মা… বাবা… আমাকে… বের… করে… দিয়ো না…”
তার কণ্ঠস্বর এতটাই দুর্বল ছিল যে ফাইয়ানকে তার মুখের একদম কাছে কান নিয়ে যেতে হলো। শ্রাবন্তীর চোখ দিয়ে আবার জল গড়িয়ে পড়তে দেখে ফাইয়ানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। এই মেয়েটা হাইওয়ের মাঝখানে মরার মতো কেন দৌড়াচ্ছিল, আর এখন অবচেতন মনেই বা কাকে এত অনুনয় করছে—তা ফাইয়ানের মাথায় ঢুকছে না।
ফাইয়ান তার গলার স্বর কিছুটা শক্ত করে বলল,
— “এখানে কোনো মা-বাবা নেই। আমি আছি। জাস্ট ফোকাস অন মাই ভয়েস! চোখ বন্ধ করলেই কিন্তু তুমি শেষ। ফাইট করো, ইডিয়ট মেয়ে!”
শ্রাবন্তী ফাইয়ানের শার্টের হাতাটা তার রক্তভেজা দুর্বল আঙুল দিয়ে ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু হাতটা অবশ হয়ে মাঝপথেই সিটের ওপর পড়ে গেল। তার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি আরও ধীর, আরও ক্ষীণ হয়ে আসছে। হৃদস্পন্দন যেন ক্রমশ স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে।সে খুব কষ্ট করে শেষবারের মতো ঠোঁট নাড়িয়ে বলল,
— “আমি… মুক্ত… হয়েছি… ইফান…”
কথাটা শেষ হতেই শ্রাবন্তীর চোখের পাতা দুটো পুরোপুরি বুজে গেল। তার মাথাটা ফাইয়ানের বুকের ওপর একপাশে ঢলে পড়ল।
শ্রাবন্তীর বুকের ওঠানামা প্রায় বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম দেখে ফাইয়ান এবার সত্যিই আতঙ্কিত হয়ে উঠল। সে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,
— “স্পিড বাড়াও! আর কত দূর? শিট, শিট! সি ইজ লুজিং হার ব্রেথ! কুইক!”
হাসপাতালের ইমার্জেন্সি গেটের সামনে গাড়ি থামতেই ফাইয়ান শ্রাবন্তীকে কোলে নিয়ে ভেতরে দৌড়ে গেল, তার ভীষণ অস্বস্তি হলো জীবনের প্রথম এই কোনো মেয়েকে সে কোলে নিয়েছে,,চিৎকার শুনে দ্রুত ট্রলি নিয়ে ছুটে এলেন কয়েকজন নার্স ও ওয়ার্ড বয়। তারা ধরাধরি করে শ্রাবন্তীকে ট্রলিতে শুইয়ে দিয়ে দ্রুত আইসিইউ-এর দিকে নিয়ে যেতে লাগলেন।
ঠিক তখনই ইমার্জেন্সি ডিউটিতে থাকা ডাক্তার এগিয়ে এলেন। শ্রাবন্তীর রক্তাক্ত অবস্থা এবং মাথার ক্ষত দেখে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। ফাইয়ানের রক্তভেজা শার্ট দিকে তাকিয়ে ডাক্তারের চোখ দুটো সরু হয়ে গেল। তিনি গম্ভীর ও সন্দেহী গলায় বললেন,
— “এটা তো পুরো মার্ডার কেস মনে হচ্ছে! পেশেন্টের এই অবস্থা কে করেছে? পুলিশ কোথায়? পুলিশ কেস ছাড়া আমরা এই পেশেন্ট টাচ করতে পারবো না।”
‘মার্ডার কেস’ আর ‘পুলিশ’ শব্দ দুটো শোনামাত্র ফাইয়ানের মাথার রগ দপদপ করে উঠল। এমনিতে সারা দিনের ধকলের জন্য মাথাটা ধরে আছে, তার ওপর একটা মেয়ের জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার উপক্রম, এই অবস্থায় ডাক্তারের মুখে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা শুনে তার মেজাজ চট করে বিগড়ে গেল।ফাইয়ান এক পা এগিয়ে গিয়ে ডাক্তারের কলার ধরার মতো ভঙ্গিতে অত্যন্ত রাগী ও চড়া গলায় বলল,
— “হোয়াট ডিড ইউ জাস্ট সে? মার্ডার কেস? ডু আই লুক লাইক আ মার্ডারার টু ইউ? রাস্তায় এক্সিডেন্ট হয়েছে মেয়েটার, আর আমি তাকে মরার হাত থেকে বাঁচাতে এখানে নিয়ে এসেছি। আপনার কাজ আগে পেশেন্টের লাইফ সেভ করা, নাকি পুলিশের খোঁজ করা? যদি ফরমালিটির দোহাই দিয়ে চিকিৎসা শুরু করতে এক মিনিটও দেরি হয়, আর এই মেয়ের কিছু হয়ে যায়—তাহলে এই হাসপাতালের লাইসেন্স আমি বাতিল করে ছাড়বো! জাস্ট ডু ইয়োর জব!”
ফাইয়ানের এমন রুদ্রমূর্তি আর গলার তীব্র আওয়াজ দেখে ডাক্তার কিছুটা ভড়কে গেলেন। হাসপাতালের বাকি স্টাফরাও ভয়ে পিছিয়ে গেল। ফাইয়ানের ব্যক্তিত্ব আর ধমকের সামনে দাঁড়িয়ে ডাক্তার আর কথা বাড়ানোর সাহস পেলেন না। তিনি দ্রুত নার্সদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “ওকে, ওকে! কুইক, ওটি-তে নিয়ে চলো! ব্লাড অ্যারেঞ্জ করো জলদি!”
শ্রাবন্তীকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো, আর ফাইয়ান বাইরের করিডোরে ক্ষোভে ফুসতে ফুসতে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ফাইয়ানের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নাভিদ হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে আসছে। ড্রাইভারের কাছ থেকে ফোনে এক্সিডেন্টের খবর পেয়ে সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সোজা হাসপাতালে ছুটে এসেছে।
নাভিদের চোখে-মুখে তখন তীব্র আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তার ছাপ। ফাইয়ানের কাছাকাছি আসতেই সে প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠল:— “বস! বস, আপনার কিছু হয়েছে? এসব কীভাবে হলো?”
নাভিদ ফাইয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে তার গায়ের রক্তভেজা শার্ট আর হাতের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে ফেলল। সে এতটাই ঘাবড়ে গিয়েছিল যে ফাইয়ানের শরীরের কোথাও চোট লেগেছে কি না, তা দেখার জন্য প্রায় হাত বাড়িয়ে দিতে যাচ্ছিল।
ফাইয়ান নাভিদের এই অতি-উদ্বেগ দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। তার মেজাজ তখনও পুরোপুরি শান্ত হয়নি। সে দেয়াল থেকে পিঠ ঠেকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিচু কিন্তু গম্ভীর গলায় বলল— “শান্ত হও, নাভিদ। আমার কিচ্ছু হয়নি। এই ব্লাড আমার না।”
নাভিদ একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও তার কৌতূহল আর ভয় কমল না। সে অপারেশন থিয়েটারের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল:
— “তাহলে ভেতরে কে, বস? ড্রাইভার তো বলল হাইওয়েতে নাকি কার ধাক্কা লেগেছে...”
ফাইয়ান ওটি-র ওপর জ্বলতে থাকা লাল লাইটটার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল:— “একটা মেয়ে। হঠাৎ করে মাঝরাস্তায় গাড়ির সামনে চলে এসেছিল। অবস্থা খুব খারাপ, অতিরিক্ত ব্লাড লস হয়েছে। ডাক্তাররা ভেতরে অপারেশন করছে।”
নাভিদ কপালে হাত দিয়ে বলল, “হায় খোদা! পুলিশ-থানার কোনো ঝামেলা হয়নি তো বস? ডাক্তাররা ঝামেলা করেনি?”
ফাইয়ান বাঁকা চোখে নাভিদ এর দিকে তাকিয়ে জবাব দিল, “করার চেষ্টা করেছিল, বাট আই হ্যান্ডেলড ইট। এখন তোমার কাজ হলো ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে সমস্ত ফর্মালিটিজ আর বিল ক্লিয়ার করা। আর হ্যাঁ, এই এক্সিডেন্টের খবর যেন মিডিয়া বা ফ্যামিলি পর্যন্ত না পৌঁছায়, দ্যাট শুড বি টপ সিক্রেট। ক্লিয়ার?”
নাভিদ দ্রুত মাথা নেড়ে বলল, “ইয়েস বস, আমি এখনই সব ব্যবস্থা করছি।” বলেই সে দ্রুত রিসেপশনের দিকে এগিয়ে গেল, আর ফাইয়ান আবার ওটি-র দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
_____________
ইফান আর অনামিকা তখন ড্রইংরুমে বসে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুখের আলাপে মগ্ন। শ্রাবন্তী চিরতরে জীবন থেকে বিদায় নিয়েছে—এই স্বস্তি ইফানের চোখে-মুখে। অনামিকা ইফানের খুব কাছাকাছি এসে বসে তার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
অনামিকা মুখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে আদুরে গলায় বলল,
— “জানো ইফান, আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে শেষ পর্যন্ত সব বাধা কেটে গেল। এখন আর আমাদের মাঝে কেউ নেই।”
ইফান অনামিকার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল। তবে তার মনের কোণে কোথাও যেন একটা সূক্ষ্ম অস্বস্তি উঁকি দিচ্ছিল, যা সে অনামিকার সামনে প্রকাশ করতে চাইল না। সে অনামিকার হাতটা একটু চেপে ধরে বলল,
— “হুম, যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। এখন শুধু সামনের দিনগুলোর কথা ভাবো। মা তো অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন কবে এই বাড়িতে সুখবর আসবে।”
অনামিকা লজ্জায় চোখ নিচু করে ইফানের বুকে মাথা রাখল। সে মনে মনে ভাবল, এতদিনে তার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। এই বিশাল বাড়ি, ইফানের সম্পত্তি আর এই বংশের একমাত্র বউয়ের মর্যাদা—সব এখন তারই হতে চলেছে।
সে ইফানের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আমি মা-বাবাকে কখনো কোনো কথা সুযোগ দেব না, ইফান। খুব তাড়াতাড়ি এই বাড়িতে নাতি-নাতনির কলরব শোনা যাবে। মা তখন কত খুশি হবেন, ভাবতেই আমার ভালো লাগছে।”
ঠিক তখনই ড্রইংরুমে এসে হাজির হলেন সালমা বেগম। তার মুখে তখন এক পরম তৃপ্তির হাসি। তিনি অনামিকার দিকে তাকিয়ে বেশ স্নেহের সুরে বললেন,
— “বউমা, আজ রাতটা তো অনেক হয়ে গেছে। বিয়ের প্রথম রাত তো তাই আজ রাতটা তুমি বরং আমার সাথেই ঘুমাতে চলো।”
সালমা বেগমের কথা শুনে অনামিকা একটু ইতস্তত করতে লাগল। সে ইফানের দিকে তাকিয়ে কিছুটা চপল আর আদুরে গলায় বলল,
— “না, মা… আমি ইফানের সাথেই থাকতে চাই। এখন তো আর কোনো বাধা নেই
অনামিকার এমন সোজাসাপ্টা কথা শুনে সালমা বেগম মুচকি হাসলেন। তিনি ইফানের দিকে তাকিয়ে রসিকতা করে বললেন,
— “দেখেছিস ইফান, তোর বউ এখনই তোকে ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না! আচ্ছা ঠিক আছে, তোরা গল্প কর। তবে রাত যেন বেশি না হয়, কাল অনেক কাজ আছে।”
এই বলে সালমা বেগম নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। আর ইফান অনামিকার হাত ধরে হেসে উঠে বলল, “মা একদম ঠিকই বলেছে, তুমি আসলেই খুব একগুঁয়ে!”
_____________
শ্রাবন্তীর ভাবি ফারহানা ড্রইংরুমে এসে সবার থমথমে মুখের দিকে তাকালেন। এত রাতে একটা মেয়েকে এভাবে ঘর থেকে বের করে দেওয়াটা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। নিজের ভেতরের অস্থিরতা চেপে রাখতে না পেরে তিনি শ্রাবন্তীর মা সিতারা বেগমের দিকে এগিয়ে গেলেন।
ফারহানা কিছুটা আমতা আমতা করে নিচু গলায় বললেন,
— “আম্মু, রাত তো অনেক হলো… মেয়েটা একা একা কোথায় গেল? অন্তত একটা খোঁজ নেওয়া তো দরকার ছিল।”
বউমার মুখ থেকে শ্রাবন্তীর কথা শুনতেই সিতারা বেগমের মুখটা রাগে ও ক্ষোভে রি রি করে উঠল। তিনি হাতের কাজটা দড়াম করে টেবিলের ওপর রেখে তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন,
— “থামো তো ফারহানা! আর একটা বারও ওই মেয়ের নাম এই মুখে আনবে না। চার বছর আগে যখন আমাদের মুখে চুনকালি দিয়ে চলে গিয়েছিল, তখন কোথায় ছিল তোমার এই দরদ? নিজের কৃতকর্মের ফল ভোগ করছে ও। আজ এই বাড়িতে এসে আবার নাটক শুরু করেছিল!”
সিতারা বেগমের চড়া গলা শুনে ড্রইংরুমের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠল। তিনি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন,
— “যে মেয়ে নিজের বাবা-ভাইয়ের সম্মান বোঝে না, সে মরুক আর বাঁচুক—তাতে আমাদের কিচ্ছু যায় আসে না! এই বাড়িতে তার অধ্যায় চিরতরে শেষ।”
ফারহানা আর কিছু বলার সাহস পেলেন না। তিনি কেবল এক বুক কষ্ট নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন।
অতীতের কথা মনে পড়তেই ফারহানার চোখের সামনে ভেসে উঠল শ্রাবন্তীর হাসিখুশি মুখটা। সারাদিন তার সাথে কত খুনসুটি, দুষ্টুমি আর হাসি-মজা করত মেয়েটা। কখনো তার উপর রাগ করতো অভিমান করতো, আবার কখনো রান্নাঘরে এসে ফারহানাকে বিরক্ত করত। সেই চঞ্চল মেয়েটাকেই আজ সবাই এত সহজে দূরে ঠেলে দিল—ভাবতেই ফারহানার বুকটা হুহু করে উঠল।
__________
নাভিদ ক্যাশ কাউন্টারের কাজ শেষ করে সবেমাত্র ফাইয়ানের দিকে এগিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই ওটি (OT) থেকে একজন নার্স দ্রুত পায়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। তার চোখে-মুখে চরম উত্তেজনা আর তাড়া।
নার্স কাউন্টারের দিকে তাকিয়ে চড়া গলায় ডাকলেন, "শুনুন! পেশেন্টের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। ইন্টারনাল ব্লিডিং কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। এখনই মেজর সার্জারি লাগবে। বন্ড পেপারে সাইন করার জন্য রোগীর স্বামী, বাবা বা বড় ভাইকে ডাকুন। ইমিডিয়েটলি!"
নার্সের কথা শেষ হতে না হতেই নাভিদ ফাইয়ানের দিকে তাকাল। ফাইয়ান এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে শক্ত পায়ে এগিয়ে গেল নার্সের দিকে। ফাইয়ান গম্ভীর গলায় বলল
— "আমি সাইন করব। পেপারস দিন।"
নার্স ফাইয়ানের রক্তভেজা শার্ট আর তার তীক্ষ্ণ চাউনি দেখে কিছুটা থমকে গেলেন। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, — "কিন্তু স্যার, আপনি ওনার কে হন? ফরমালিটি অনুযায়ী লিগ্যাল গার্ডিয়ান বা ফ্যামিলির কেউ না হলে তো—"
— "আমি ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি, সো আপাতত আমিই ওনার লোক।"
নার্স ফাইয়ানের কথার ওপর জোর দিয়ে বললেন, — "দুঃখিত স্যার, হাসপাতালের কড়া নিয়ম অনুযায়ী লিগ্যাল গার্ডিয়ান বা ফ্যামিলির লোক ছাড়া এই বন্ড পেপারে সাইন নেওয়া সম্ভব না। আমাদের রোগীর স্বামী বা পরিবারের কাউকে লাগবে।"
নার্সের মুখে নিয়মের কথা শুনে ফাইয়ানের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। ওটি-র ভেতরে মেয়েটার জীবন আলো নিভে যাচ্ছে, আর এখানে ফর্মালিটি নিয়ে সময় নষ্ট করা হচ্ছে— সে নিজের দাঁতে দাঁত চেপে, গলার স্বর যতটা সম্ভব নিচু অথচ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও গম্ভীর করে বলল:— "আমি ওনার হাজবেন্ড! আর কিছু শুনতে চান আপনি? যান এবার ওনার ট্রিটমেন্ট শুরু করুন!"
ফাইয়ানের এই আকস্মিক ও মিথ্যা দাবির সামনে নার্স পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার গলার আওয়াজ আর চোখের ভেতরের তীব্রতা দেখে নার্সের আর কোনো প্রশ্ন করার সাহস হলো না। তিনি দ্রুত বন্ড পেপারটি ফাইয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।ফাইয়ান এক মুহূর্ত দেরি না করে খসখস করে কাগজে সই করে দিয়ে ফাইলটা নার্সের হাতে ফেরত দিল। তার চোখ তখনো ওটি-র দরজার দিকে। সে নার্সকে উদ্দেশ্য করে বলল, — "সাইন করে দিয়েছি। এবার এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে ভেতরে যান।"
নার্স ফাইলটা বুকে চেপে ধরে দ্রুত ওটি-র ভেতরে ছুটে গেলেন।
ঠিক তখনই ফাইয়ানের পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে বাড়ির নম্বর দেখে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কলটা রিসিভ করল। ওপাশ থেকে মায়ের উদ্বিগ্ন গলা ভেসে আসতেই ফাইয়ান সংক্ষেপে শুধু বলল, "আমি আসছি, মা।"
ফোনটা পকেটে রেখে সে নাভিদের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠস্বর আগের মতোই গম্ভীর, "নাভিদ, তুমি এখানে থাকো। ওটি-র ডাক্তার বা নার্স বাইরে এলেই আমাকে আপডেট জানাবে। কোনো সমস্যা হলে ইমিডিয়েটলি ফোন করবে।"
নাভিদ বাধ্য ছেলের মতো মাথা নেড়ে বলল, "জি বস, আপনি যান। আমি এখানে সব সামলে নিচ্ছি।"
ফাইয়ান আর এক মুহূর্ত দেরি না করে হাসপাতালের করিডোর পেরিয়ে পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে গেল। গাড়ি নিয়ে বাড়ি উদ্দেশ্য বের হয়ে পড়লো পুরোটা রাস্তা তার মাথায় কেবল মেয়েটার বলা শেষ কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল।
গাড়ি এসে যখন ফাইয়ানদের বাড়ির সামনে থামল, তখন মাঝরাত পার হয়ে গেছে। ফাইয়ান ধীর পায়ে সদর দরজা পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।
ড্রইংরুমে পা রাখতেই সে কিছুটা অবাক হলো। এত রাতে পুরো বাড়ির থমথমে পরিবেশ আর ড্রইংরুমের আলো জ্বলতে দেখে সে থমকে দাঁড়াল। বাড়ির প্রায় সব সদস্যই সেখানে গম্ভীর মুখে বসে আছেন। ফাইয়ানের বাবা তৌসিফ খন্দকার সোফায় বসে চিন্তিত মুখে কপালে হাত দিয়ে আছেন, আর তার মা জিনাত ও সোফার এক কোণে বসে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিলেন। ফাইয়ানের বড় ভাই আর ভাবিও সেখানে উপস্থিত।
ফাইয়ানের গায়ের রক্তভেজা শার্ট আর ক্লান্ত বিধ্বস্ত চেহারাটা ড্রইংরুমে ঢুকতেই সবার চোখ সেদিকে আটকে গেল। জিনাত সোফা ছেড়ে প্রায় চিৎকার করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, "ফাইয়ান! একি অবস্থা তোমার? শার্টে এত রক্ত কেন? কী হয়েছে তোমার আব্বু?"
পুরো ড্রইংরুমের সবার দৃষ্টি তখন ফাইয়ানের ওপর, যেন তারা কোনো এক ঝড়ো উত্তরের অপেক্ষা করছে।
ফাইয়ানের এমনিতে সারা দিনের ধকল আর হাসপাতালের ওই ঘটনার পর মেজাজ সপ্তমে চড়ে ছিল। ড্রইংরুমে ঢুকে নিজের মা-বাবার পাশাপাশি চাচা, চাচি আর চাচাতো বোনকে এভাবে মাঝরাতে বসে থাকতে দেখে তার ভেতরের রাগটা যেন এক ধাক্কায় দ্বিগুণ হয়ে গেল।
এই অসময়ে পুরো বংশের লোক এখানে কী সালিশ বসাতে এসেছে, তা তার মাথায় ঢুকল না। চাচা আর চাচির চোখে স্পষ্ট দেখে ফাইয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
সে জিনাত বেগমের ব্যাকুল প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে, সবার দিকে একদলা বরফশীতল আর রাগী দৃষ্টি ছুড়ে দিল। ড্রইংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে অত্যন্ত রুক্ষ ও গম্ভীর গলায় বলল:— "এত রাতে আপনারা সবাই এখানে কী করছেন? কোনো তামাশা চলছে?"
ফাইয়ানের গলার এমন চড়া আর কর্কশ আওয়াজ শুনে চাচা-চাচি কিছুটা ভড়কে গিয়ে সোফায় সোজা হয়ে বসলেন। পুরো ড্রইংরুমের থমথমে ভাবটা যেন নিমেষেই এক তীব্র শান্তিতে রূপ নিল, যেখানে ফাইয়ানের রাগের সামনে কেউ হুট করে কিছু বলার সাহস পাচ্ছিল না।
এর মধ্যেই হঠাৎ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সৃষ্টি। তার চোখ-মুখ আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। এক দৌড়ে ফাইয়ানের সামনে এসে সে প্রায় কাঁপা গলায় বলে উঠল,
— "ফাইয়ান… এতো রক্ত কেন? তোমার কোথাও লেগেছে? তুমি ঠিক আছো তো?"
কথাগুলো বলতে বলতেই সে স্বভাবসুলভ আবেগে ফাইয়ানের হাত আঁকড়ে ধরে আরও কাছে এগিয়ে এল, যেন তাকে ভালো করে দেখে নিশ্চিত হতে চায়। এমনকি একপর্যায়ে প্রায় জড়িয়ে ধরতেই যাচ্ছিল।
ফাইয়ানের ধৈর্যের বাঁধটা তখন এমনিতেই ভাঙনের মুখে ছিল। হঠাৎ এই অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে তার ভ্রু কুঁচকে গেল। সে বিরক্তিতে এক ঝটকায় নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে কঠিন গলায় বলল,
— "সৃষ্টি, স্টপ ইট। আমি ঠিক আছি। এই নাটক করার দরকার নেই।"
ফাইয়ানের এমন ঠান্ডা অথচ ধারালো ব্যবহারে সৃষ্টি থমকে গেল। তার মুখটা সঙ্গে সঙ্গে মলিন হয়ে এলো। হাত দুটো ধীরে ধীরে নিচে নামিয়ে সে কিছুটা অপমানিত চোখে ফাইয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল।
আর ঠিক তখনই সোফার অন্য পাশ থেকে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ভেসে এলো ফারাহর কথা,
— "উফ! যত সব আদিখ্যেতা। মানুষটা বাসায় ঢুকেছে মাত্র, আর শুরু হয়ে গেছে ঢং!"
ফারাহর কটাক্ষভরা কথায় পুরো ড্রইংরুম আবার থমথমে হয়ে উঠল। সৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে ফারাহর দিকে তাকাল। তার চোখে তখন স্পষ্ট অপমানের ছাপ।
সৃষ্টি মা সাইমা বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন,
— "ফারাহ! কীসব বলছো তুমি? সৃষ্টি ওর বাগদত্তা একটু প্রশ্ন করার রাইট আছে"
কিন্তু ফারাহ থামার পাত্রী নয়। ঠোঁট বাঁকিয়ে সে আবার বলল,
— "আমি কি ভুল কিছু বলেছি চাচি মা? কেউ আহত হয়েছে কিনা সেটা দেখার চাইতে নাটকীয়ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়াটাই যেন বেশি জরুরি হয়ে গেছে!"
সৃষ্টির চোখ সঙ্গে সঙ্গে ছলছল করে উঠল। সে কষ্ট চেপে নিচু গলায় বলল,
— "আমি শুধু ফাইয়ান জন্য চিন্তা করছিলাম…"
— "ওহ প্লিজ!" ফারাহ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, "এই চিন্তার অভিনয় অন্য কাউকে দেখিও।"
হঠাৎ বজ্রপাতের মতো গর্জে উঠল ফাইয়ানের কণ্ঠ"Enough!"
ফাইয়ানের চোখদুটো তখন ভয়ংকর রকম ঠান্ডা। সে ধীরে ধীরে সবার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— "আমি বাসায় এসেছি শান্তি চাইতে, সার্কাস দেখতে না। কারও যদি ঝগড়া করার এতই শখ থাকে, তাহলে এখনই এই বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে পারেন,,আর ফারহা ছোট মানুষ ছোট মানুষের মতো থাকবি।
বড় ভাইয়ের কথা শুনে ফারাহ ঠোঁট কামড়ে চুপ করে গেল। সৃষ্টি অপমানিত মুখে ধীরে ধীরে পেছনে সরে দাঁড়াল। আর ড্রইংরুমে উপস্থিত বাকিরা নিঃশব্দে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলেন।