ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত আবরার যখন নিজের ঘরে এসে ঢুকল, তখন তার সারা শরীর আর মনে এক তীব্র অবসাদ। আজকের দিনটা যেন ঝড়ের বেগে ধুয়ে নিয়ে গেছে জীবনের চেনা ছন্দগুলোকে। শার্টের বোতামটা আলগা করে সে বিছানার এক কোণে বসে পড়ল। বুক পকেট থেকে ফোনটা বের করে ডায়াল করল সৌহার্দ্য কে। সৌহার্দ কিছুক্ষণ আগেই নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। ফোনটা রিসিভ হতেই আবরার আর নিজের মধ্যে কিছু চেপে রাখতে পারল না। একনাগাড়ে, সবিস্তারে আজ ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি অবিচার আর নিজের ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ সৌহার্দ্যর কাছে খুলে বলল।
ওপাশ থেকে সৌহার্দ্য মন দিয়ে বন্ধুর সব কথা শুনল। আবরারের উত্তেজিত কণ্ঠ শান্ত হওয়ার পর সৌহার্দ্য খুব ঠাণ্ডা মাথায়, বিচক্ষণ বন্ধুর মতো কিছু পরামর্শ দিল। বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে আবেগের চেয়ে যে কৌশলের বেশি প্রয়োজন, সৌহার্দ্য সেটাই আবরারকে বুঝিয়ে বলল। বন্ধুর কথাগুলো আবরারের মগজে গিয়ে লাগল। সে গভীর মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনল, নিজের মনের ভেতর এক অদৃশ্য শক্তি সঞ্চয় করল।
ফোনটা রেখে আবরার আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। দৃঢ় পায়ে সে ঘর থেকে বের হয়ে নিচে নেমে এলো।
নিচে নামতেই তার চোখে পড়ল এক অপ্রীতিকর দৃশ্য। সুপ্তির মামা আর মামী দাঁড়িয়ে সুপ্তিকে তীব্র ভাষায় ধমকে যাচ্ছেন। তাদের চোখে-মুখে লোভ আর স্বার্থপরতার নোংরা ছাপ। আর সুপ্তি? সে সোফায় এক কোণে হতাশা নিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। কোনো প্রতিবাদ নেই, কোনো অশ্রুপাত নেই; সে যেন এক জীবন্ত পাথর, চুপচাপ শুধু কথাগুলো সয়ে যাচ্ছে।জবাব দেওয়ার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে নেই।এমন স্বার্থপর দের সাথে কথা বলার রুচি নেই।আহনাফ এগিয়ে এলো।বললো,"আপনাদের সাহস তো কম না! আমাদের বাড়ীতে দাড়িয়ে আমাদের বউ কে এসব বলছেন? আমাদের ভদ্রতা কে দূর্বলতা ভাববেন না !"
আবরার সোজা গিয়ে সুপ্তির মামা-মামীর সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত, চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে। আবরারের আকস্মিক উপস্থিতিতে মামা-মামীর কণ্ঠ আচমকা দমে গেল। আবরার তাদের দিকে তাকিয়ে বরফশীতল কণ্ঠে প্রচণ্ড ধমকের সুরে বলল, “আজ, এই মুহূর্তে, এক্ষুনি আপনারা এখান থেকে বের হয়ে যান! তবে মনে রাখবেন, হিসাব কিন্তু বাকি রইল। সুপ্তি যদি কখনো চায়, তবে আপনাদের করা প্রতিটি অন্যায়ের হিসাব আপনাদের কাছ থেকেই কড়ায়-গণ্ডায় নেওয়া হবে। প্রস্তুত থাকুন !"
আবরারের এই আকস্মিক রুদ্রমূর্তি আর গর্জনে মামা-মামী রীতিমতো কেঁপে উঠলেন। তাদের আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস হলো না। কোনো কথা না বাড়িয়ে, অপমানে আর ভয়ে লেজ গুটিয়ে তারা তড়িঘড়ি করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। সুপ্তি যেখানে বসে ছিল, সেখানেই ঠায় বসে রইল। তার চোখ শুধু মেঝের দিকে নিবদ্ধ।কেমন লজ্জা সংসয় পেয়ে বসেছে সুপ্তি কে ! অপমানিত বোধ হচ্ছে। কিভাবে থাকবে এই বাড়ির তালাক প্রাপ্ত বউ হয়ে ! কি অধিকারে? তবে বাস্তবতা যে বড় কঠিন ! সুপ্তির তো যাওয়ার জায়গা নেই !
সে সময় ড্রয়িংরুমের অন্য পাশে আহনাফ, সায়মা আর মলিও উপস্থিত ছিল। তারা পুরো ঘটনাটা দেখছিল। মামা-মামী চলে যাওয়ার পর আহনাফ কিছুটা এগিয়ে আবরারের কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। আবরার আহনাফের চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে অত্যন্ত জরুরি কিছু কথা বলল। আহনাফ গভীর মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনল এবং সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল।
সবাই মিলে বসে এবার একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে, যতই হোক না কেন, ডিভোর্সের পর সুপ্তির আর এই বাড়িতে থাকা কোনোভাবেই উচিত হবে না। আইনত বা সামাজিকভাবে এই বাড়িতে এখন তার আর কোনো অধিকার নেই। সবচেয়ে বড় কথা, সুপ্তির কারণেই এই বাড়ির ছেলে আদিল আজ বাড়িছাড়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শাশুড়ি রেহানা বেগম যে তাকে আর ভালো চোখে দেখবেন না, সেটা তো দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। তাছাড়া বাইরের মানুষজনও নানারকম নোংরা কথা বলতে ছাড়বে না। সব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত হলো, সুপ্তিকে এখানকার একটা ভালো লেডিস হোস্টেলে ভর্তি করে দেওয়া হবে।
কাকতালীয়ভাবে, সৌহার্দ্যর বোনের একটা অত্যন্ত ভালো মানের লেডিস হোস্টেল আছে এই শহরেই। তাছাড়া আর মাত্র তিন মাস পরেই সুপ্তির এসএসসি পরীক্ষা। যখন সুপ্তির বিয়ে হয়েছিল, তখন সে অলরেডি ক্লাস টেনে পড়ত। ঝড়ের ঝাপটায় পড়াশোনা লাটে উঠলেও পরীক্ষাটা দেওয়া খুব দরকার। সোহাগের বোন পেশায় একজন শিক্ষিকা, তাই হোস্টেলে সুপ্তির পড়াশোনা থেকে শুরু করে পরীক্ষার যাবতীয় ফর্ম ফিলাপ ও নিয়মকানুন—সবকিছু তিনিই যত্নসহকারে ম্যানেজ করে দিতে পারবেন।
সিদ্ধান্ত আরও হলো যে, তিন মাস পর পরীক্ষার ঠিক আগের সময়টাতে সুপ্তিকে গ্রামে পাঠানো হবে। এখানে স্কুলের কাছাকাছি কোনো বাড়ি ভাড়া করে তাকে আর সেই লোভী মামা-মামীর আশ্রয়ে রাখা হবে না। সায়মা অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই প্রস্তাবে রাজি হলো। সে নিজে থেকে এগিয়ে এসে বলল, “গ্রামের ওই একটা মাস আমি সুপ্তির সাথে থাকব। ওর পড়াশোনায় সাহায্য করব, কোনো সমস্যা হবে না।”
চারপাশের মানুষগুলোর এই নিঃস্বার্থ ব্যস্ততা, তার জন্য এত আয়োজন দেখে সুপ্তির চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সুপ্তি তো ভেবেছিল আজ সে সত্যি সত্যিই এতিম হয়ে যাবে, এই বিশাল পৃথিবীতে মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই তার থাকবে না। কিন্তু না, সে তো আজ এতিম নয়! এই যে আহনাফ ভাই নিজের বোনের মতো করে তার থাকার, সুরক্ষার সমস্ত ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন; সায়মা আপু, যিনি নিজের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা মাস সুপ্তির নামে লিখে দিতে চাচ্ছেন, গ্রামে গিয়ে তার পাশে থাকার অঙ্গীকার করছেন—এ তো পরম পাওয়া।
আর এই সবকিছুর নেপথ্যে আছেন যিনি? ওই লোকটা—আবরার মির্জা। যার প্রতি কৃতজ্ঞতায় সুপ্তির মাথাটা আজ শ্রদ্ধায় নত হয়ে আসতে চাইছে।
অশ্রুসজল চোখে সুপ্তি একে একে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির বাইরে পা বাড়াল।
যাওয়ার আগে তীব্র লজ্জা, অপরাধবোধ আর এক বুক সংশয় নিয়ে সুপ্তি আবরার মির্জার মুখোমুখি হওয়ার সাহস পেল না। তার চোখের দিকে তাকানোর মতো শক্তি তার ছিল না। দূর থেকে শুধু অবনত মস্তকে, মনে মনে এক পৃথিবী কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। তার সাথে ছায়ার মতো চলল সায়মা ও আহনাফ মলি।
হোস্টেলটি সৌহার্দ্য দের বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয়। সৌহার্দ্যের বোন নিজে এই প্রতিষ্ঠানের মালিক হওয়ায় সমস্ত ব্যবস্থার তদারকি তিনি নিজেই করলেন। সুপ্তির থাকার জন্য একটি সুন্দর ঘর নির্দিষ্ট হলো। আগামী তিনমাস সে এখানেই থাকবে, মন দিয়ে লেখাপড়া করবে। শুধু তাই নয়, হোস্টেলে তার জন্য একজন দক্ষ গৃহশিক্ষকেরও ব্যবস্থা করে দেওয়া হলো।
তবে যাওয়ার আগে আবরার একটা কঠোর নিয়ম বেঁধে দিয়েছিল—সুপ্তি এই হোস্টেল থেকে একা একা কখনো বাইরে বের হবে না। তার নিত্যপ্রয়োজনীয় যা কিছু লাগবে, সায়মা নিজে এসে সেসবের ব্যবস্থা করে দেবে। কারণ, এই মুহূর্তে সুপ্তির একা বাইরে বের হওয়াটা মোটেও নিরাপদ নয়। আদিল মির্জা যেভাবে ক্ষেপে আছে, সে কখন কী অঘটন ঘটিয়ে বসে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিংবা আদিলের স্ত্রী নাদিয়াও যদি প্রতিহিংসার বশে সুপ্তির কোনো ক্ষতি করতে চায়—সেই ভয়টাও থেকে যায়। সুপ্তির নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই কড়া সিদ্ধান্ত।
এদিকে সবাইকে হোস্টেলের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিয়ে আবরার মির্জা ধীর পায়ে হেঁটে আসলো তার বাবা-মায়ের ঘরের দিকে। দরজাটা আধা-ভেজানো ছিল। সে দেখল, বিছানায় রেহানা বেগম শুয়ে আছেন। তাঁর চোখ দুটো ছলোছলো, কান্নায় ভারী হয়ে আছে। ছেলের প্রতি, পরিস্থিতির প্রতি এক বুক অভিমানের পাহাড় জমেছে তাঁর মনে।
আবরার দরজায় আলতো করে নক করল। ভেতর থেকে জামান মির্জা গম্ভীর কিন্তু শান্ত গলায় বললেন, “কে? ভেতরে এসো।”
আবরার লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে ঘরের ভেতরে পা বাড়াল। এক নতুন অধ্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে সে নিজেকে প্রস্তুত করে নিল।
আবরার ঘরের ভেতরে পা রাখতেই রেহানা বেগম বিছানায় একটু নড়েচড়ে শুলেন, তবে উঠে বসলেন না। তাঁর মুখমণ্ডল জুড়ে এক গভীর উদাসীনতা আর অভিমানের ছাপ। জামান মির্জা ছেলের ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন, “তুই নিজের ঘরে গিয়ে একটু রেস্ট নে আবরার। এখানে কেন আসলি? এতটা পথ জার্নি করে এসেছিস, এসেই তোকে এমন একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখোমুখি হতে হলো। শরীর-মন দুটোর ওপর দিয়েই তো ধকল গেছে।”
আবরার বাবার কথার জবাবে মৃদু হাসার চেষ্টা করে বলল, “আমি ঠিক আছি বাবা, আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি একদম সুস্থ আছি।” এরপর সে মায়ের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, “তোমার শরীর কেমন লাগছে এখন, আম্মা?”
রেহানা বেগম কিছুক্ষণ চুপ থেকে, অত্যন্ত ধীমে ধীমে, ভাঙা গলায় উত্তর দিলেন, “যেমন লাগা উচিত, তেমনই লাগছে। এত বছরের তিল তিল করে গড়া সংসারটা চোখের সামনে এভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে গেলে একটা মায়ের ঠিক যেমন লাগা উচিত, আমার ঠিক সেইরকমই লাগছে।” তাঁর কণ্ঠে সুপ্ত এক হাহাকার লুকিয়ে ছিল।
মায়ের মনের কষ্টটা বুঝতে পেরে আবরার শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “সংসার তো ভাঙ্গেনি আম্মা। একটা বড় ভুল হয়েছিল, আজ সেই ভুলটাকেই শুধু সংশোধন করা হলো।”
ছেলের এই যুক্তি রেহানা বেগমের মনঃপুত হলো না। তিনি কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গেই বললেন, “মানলাম ছেলেটা ভুল করেছে, অপরাধ করেছে। তাই বলে এভাবে সংশোধন করতে হবে? আর ও তো ওর স্ত্রীকে ছাড়তে চায়নি। সমাজে এরকম তো কত জায়গায় হয়, কত মানুষেরই তো দুটো স্ত্রী থাকে। তাতে সমস্যা কী হতো? ও তো ধর্মের বাইরে গিয়ে কিছু করেনি!”
মায়ের এই অন্ধ পুত্রস্নেহ দেখে আবরার মনে মনে কিছুটা ব্যথিত হলো। সে বলল, “ধর্মের বাইরে ও কী করেছে আর কী করেনি, আম্মা, সেসব আপনাকে আজ নয়, সময় সুযোগ বুঝে পরে কোনো একদিন বিস্তারিত বলব। তবে একটা কথা মনে রাখবেন, আমি সশরীরে অস্ট্রেলিয়ায় থাকলেও, বাংলাদেশে আমার ভাইয়েরা, আমার পরিবার কোথায়, কে, কী করছে—তার প্রত্যেকটি খবর নিয়মিত আমার কাছে যেত।
আমি দূরে ছিলাম ঠিকই, কিন্তু অন্ধ ছিলাম না আম্মা। তাই আদিল মির্জা কোথায়, কার সাথে, কী নোংরামি করেছে, তার সব খবরই আমার কাছে জমা আছে।”
ছেলের মুখ থেকে এই কথা শুনে রেহানা বেগম কিছুটা থমকে গেলেন, তবে নিজের ভেতরের ক্ষোভ চেপে রেখে বললেন, “তুই বাংলাদেশ থাকলে হয়তো ও এতোটা উগ্র হয়েছে।দায় তোরও।"
মায়ের মুখে এমন কথা শুনে আবরারের বুকটা অভিমানে ভরে উঠল। সে অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলল, “আমি নিশ্চয়ই কোনো কারনেই অস্ট্রেলিয়া ছিলাম আম্মা? আপনি এই কথা বলছেন ! আহনাফ ও তো ছিলো।কই ও তো উগ্র হলো না !আমি তো ওকে কখনো নিজের থেকে আলাদা করে দেখিনি। যেদিন ও এই পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল, সেদিন নিজের এই ছোট্ট দুই হাত বাড়িয়ে ওকে কোলে তুলে নিয়েছিলাম আমি। ছয় বছরের ছিলাম আম্মা !সেই ভাইবোনের দাবি থেকেই আজ ওকে আমি শাস্তি দিয়েছি। বড় ভাই হয়ে ছোট ভাই ভুল করলে তাকে শাসন করা, শাস্তি দেওয়াটা তো আমার কর্তব্য, আম্মা। এখন সেই দায়িতব পালন করলাম।"
একটু দমে, কন্ঠস্বর আরও গম্ভীর করে আবরার আবার বলল, “কিন্তু ওর ভুলগুলো এখন আর শুধু ভুলের পর্যায়ে নেই আম্মা। ও একের পর এক অনেক বড় বড় পাপ করেছে, অপরাধ করেছে। আর সেই পাপের জন্য ওকে এই শাস্তিটুকু দেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি ছিল। না দিলে ও আরও ধ্বংস হয়ে যেত।”
ছেলের এই অকাট্য যুক্তির পর রেহানা বেগম আর কোনো কথা বললেন না। তিনি মুখ ফিরিয়ে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আবরারও মায়ের মনের অবস্থা বুঝতে পারল। সে জানত, এই মুহূর্তে আম্মা আর কোনো কথা শুনবেন না বা বুঝবেন না। তাই সে আর কথা না বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থেকেই নরম সুরে বলল, “সময়মতো ওষুধটা খেয়ে নিয়ো আম্মা। তোমার প্রেসারের সমস্যা আছে, রাগ করলে শরীর আরও খারাপ হবে।”
এই বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবরার ঘর থেকে বিদায় নিয়ে বাইরের দিকে চলে গেল। তার বুকের ভেতরটা তখন এক অদ্ভুত শূন্যতায় ভারী হয়ে আছে।
আবরার ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই রেহানা বেগম বিছানায় উঠে বসলেন। স্বামীর দিকে তাকিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় নিয়ে বললেন, “ঠিক আছে, মেনে নিলাম ভাই অন্যায় করেছে বলে ভাই ভাইকে শাস্তি দিবে। তাই বলে ভাইয়ের বউকে নিজে বিয়ে করবে? এটা কেমন বিচার?”
এতক্ষণ চুপ করে থাকা জামান মির্জা এবার স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তিনি অত্যন্ত শান্ত, বিচক্ষণ ও গম্ভীর গলায় স্ত্রীকে বুঝিয়ে বললেন, “আদিল যেভাবে মেয়েটার সাথে অন্যায় করেছিলো মেয়েটি তাহলে কোথায় যেত রেহানা? ওর তো কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না। আবরার যদি সমস্ত ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে, সামাজিকভাবে বিয়ে করে একটা অসহায় মেয়েকে আশ্রয় দেয়, তার মাথায় হাত রেখে তার অভিভাবক হয়, তবে তাতে সমস্যাটা কোথায়? ও তো কোনো পাপ করেনি, কোনো ঘৃণিত কাজও করেনি। বরং একটা মেয়ের জীবন বাঁচিয়েছে। এর চেয়ে বড় পুণ্য আর কী হতে পারে?”
স্বামীর এই শান্ত ও যুক্তিপূর্ণ কথার পর রেহানা বেগম আর কোনো পাল্টা উত্তর খুঁজে পেলেন না। চুপচাপ শুয়ে পড়লো।
কিচেনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় জলির দিকে তাকাল আবরার। জলি সেখানে ব্যস্ত ছিল। আবরারকে দেখে সে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “ভাইজান, ভালো আছেন?”
আবরার একটা ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ। জলি, উপরে দুটো প্লেটে করে খাবার পাঠাও তো। ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে আমার। ছেলেটাও এতক্ষণ ধরে কিছু খায়নি।রাইসা কই?
জলি জানাল যে ছোট রাইসা কিছুক্ষণ আগেই ঘুম থেকে উঠেছে। সে বলল, “হ্যাঁ ভাইজান, আরাবের সাথেই উপরে আছে। রাইসাও খাবে !"
আবরার কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল। তারপর বলল, “আচ্ছা, রাইসা যা খায়, ওর জন্য সেই খাবারটা তৈরি করে একবারে উপরে আমার রুমে নিয়ে এসো।”
কথাটা বলে আবরার নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। উপরে এসে রুমে ঢুকতেই তার ক্লান্ত মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে দেখল, আরাব পরম আদরে ছোট বোন রাইসাকে কোলে নিয়ে খেলা করছে। সে রাইসার গালে চু*মু খাচ্ছে আর বারবার শেখানোর চেষ্টা করছে, “বল ভাইজান, বল ভাইজান...” কিন্তু ছোট্ট রাইসা তো এখনো স্পষ্ট করে কথা বলতে শেখেনি; সে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বড় বড় চোখে কোনোমতে আধো-আধো স্বরে বলল, “ভা... ভা...।”
আরাব ধমকে বললো," কি ভা ভা করছিস? বল ভাইজান !"
রুমে এসেই ওদের এই মিষ্টি খুনসুটির দিকে একবার তাকাল আবরার। এরপর আর দেরি না করে লাগেজ থেকে নিজের জন্য একটা আরামদায়ক ট্রাউজার আর একটা টি-শার্ট বের করে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল ফ্রেশ হওয়ার জন্য। প্রায় দশ মিনিটের মধ্যে গোসল শেষ করে যখন সে বের হয়ে এলো, তখন তার শরীরটা কিছুটা হালকা ঠেকল। এসে দেখল, বিছানায় ঠিক আগের মতোই দুই ভাইবোন মনের আনন্দে খেলা করে চলেছে।
আবরার টেবিল থেকে টিস্যু বক্সটা এগিয়ে নিল। একটি টিস্যু পেপার বের করে সে অত্যন্ত যত্নে রাইসার চোখ আর নাকটা ভালো করে মুছিয়ে দিল। তারপর আরাবের দিকে তাকিয়ে একটু স্নেহের ধমক দিয়ে বলল, “তোমার কি ক্ষুধা পায়নি আরাব? জলিকে বলে খাবার চেয়ে নাওনি কেন এতক্ষণ?”
আরাব বাবার দিকে তাকিয়ে নিষ্পাপ গলায় উত্তর দিল, “তুমি এলে একসাথে খাব, তাই খাইনি ছোট আব্বু।”
ছেলের এই অবুঝ ভালোবাসা আবরারের বুকটা ছুঁয়ে গেল। আরাব এদিক-ওদিক তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, “ছোট আব্বু, ছোট আম্মু আর ফুপি কোথায় গেল?”
আবরার শান্ত স্বরে বলল, “তোমার মেজ আম্মুকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দিতে গেছে।”
আরাব ভীষণ অবাক হয়ে বড় বড় চোখ করে বলল, “কেন? উনি এখানে থাকবেন না?”
আবরার ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সংক্ষেপে বলল, “থাকবেন, তবে এখন না, পরে।” এই নিয়ে সে আর কোনো কথা বাড়াল না।
ঠিক তখনই জলি একটা বড় ট্রেতে করে তিনজনের জন্য খাবার নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। আবরার জলদি হাত ধুয়ে এসে বিছানায় বসল। প্লেটে ভাত মেখে সে পরম মমতায় প্রথম লোকমাটা আরাবের মুখে তুলে দিল, তারপর আরেক লোকমা নিজের মুখে দিল। পাশেই একটা ছোট্ট বাটিতে রাইসার জন্য জলি সবজি খিচুড়ি নিয়ে এসেছিল। আবরার একটা ছোট চামচ দিয়ে সেই খিচুড়ি একটু একটু করে রাইসার মুখেও তুলে দিতে লাগল। এভাবেই পরম যত্নে দুই সন্তানকে খাইয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নিজেও অল্প কিছু খেয়ে নিল আবরার।
খাওয়ানো শেষ হলে আবরার আবার হাত ধুয়ে এসে বাচ্চাদের মুখ হাত সুন্দর করে ধুয়ে দিল, তারপর টিস্যু দিয়ে মুছিয়ে দিয়ে বলল, “তোমরা এবার এখানে ঘুমিয়ে যাও। ওদের ফিরতে আজকে বেশ দেরি হবে। আমিও খুব ক্লান্ত, একটু শোব। তোমরা আমার দুই পাশে শুয়ে পড়ো।”
বাবার কথা মতো বাধ্য ছেলের মতো রাইসাকে মাঝখানে শুইয়ে দিয়ে আরাব একপাশে আর আবরার অন্যপাশে শুয়ে পড়ল। এই মুহূর্তে সবারই এক টুকরো নিটোল ঘুমের খুব প্রয়োজন ছিল। আজকের দিনটা যেন সাধারণ কোনো দিন ছিল না, এটা ছিল এক চরম বিভীষিকাময় ও ক্লান্তিকর দিন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শরীরে তীব্র ক্লান্তি থাকার কারণে আরাব আর রাইসা গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। রাইসার শরীরটা একটু ম্যাজম্যাজ করছিল, হালকা জ্বর জ্বর ভাব। পেটে খাবার পড়তেই সে আরাবের বুকের সাথে লেপটে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে রইল।
আবরার বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করল ঠিকই, কিন্তু ঘুম যেন কিছুতেই তার চোখের পাতায় আসতে চাইল না। বন্ধ চোখের অন্তরালে বারবার আদিলের বলা সেই নির্মম শব্দটি প্রতিধ্বনিত হতে লাগল—“সৎ ভাই”।
মনে মনে এক চরম হাহাকার নিয়ে আবরার নিজেকেই নিজে বলল, ‘আমি আমার তরফ থেকে কখনো ওকে সৎ ভাই ভাবিনি। নিজের আপন ভাইয়ের চেয়েও বেশি করে আগলে রাখার চেষ্টা করেছি আজীবন। কিন্তু জানিনা কেন, আজ এত বছর পরও ভাইয়ের মন থেকে এই সৎ ভাইয়ের বদনামটি আমি ঘোচাতে পারলাম না। হয়তো জীবনের কিছু কিছু বদনাম কোনোদিনই মেটানোর জন্য তৈরি হয় না।’
এক বুক কষ্ট নিয়ে আবরার উপলব্ধি করল, এটাই হয়তো এই সমাজের এক চিরন্তন নিষ্ঠুর সত্য। দিনশেষে একজন মানুষ যতই উজাড় করে দিক না কেন, দিনশেষে তাকে ওই একটা শব্দ ঠিকই শুনতে হয়—“সৎ ভাই”। আমার ভাগ্য আমার ছেলেটা ও পেলো। কিন্তু যা আমার সাথে হয়েছে তা আরাবের সাথে হবে না।আরাব কখোনো শুনবে না সে সৎ।কখোনো না।এই একাকীত্ব আর মনের ভেতরের ক্ষত নিয়েই আবরার একসময় ক্লান্তিতে চোখ জোড়া বুজল।
সকালের মিষ্টি রোদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আজ আবহাওয়াটা বেশ ফুরফুরে। বাগানের সবুজ ঘাসের ওপর মেতে উঠেছে এক আনন্দময় কোলাহল। আহনাফ, সায়মা, মলি আর ছোট্ট আরাব—সবাই মিলে মেতে উঠেছে জমজমাট ক্রিকেট খেলায়। দেখতে দেখতে ইতিমধ্যে জীবনের খাতা থেকে কেটে গিয়েছে দীর্ঘ চারটি মাস।
এই চার মাসে অনেক কিছুই বদলে গেছে। সুপ্তি এখনো সৌহার্দ্যের বোনের সেই লেডিস হোস্টেলেই আছে। গত মাসেই তার জীবনের বড় একটা অধ্যায়, অর্থাৎ এসএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। পরীক্ষার আগের পুরো একটি মাস সায়মা গ্রামে সুপ্তির সাথে কাটিয়ে এসেছে। একই ছাদের নিচে থাকা, একসাথে রাত জেগে পড়াশোনার তদারকি করা—এসবের মধ্য দিয়ে দুজনের ভেতরের বন্ডিংটা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মজবুত, শক্ত আর মিষ্টি মধুর হয়ে উঠেছে। আহনাফও তার দায়িত্ব ভোলেনি; প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে হোস্টেলে গিয়ে সুপ্তির খোঁজখবর নিয়ে এসেছে—তার কিছু লাগবে কিনা, সে ঠিক আছে কিনা। ফোনেও মলি আর সায়মা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছে সুপ্তির সাথে।
তবে সবচেয়ে বড় ছায়া হয়ে দূর থেকে যে মানুষটি আগলে রেখেছিল, সে আবরার মির্জা। সে তার কথা রেখেছে। এই চার মাসে লোভী মামা-মামী তো দূর, এমনকি আদিল মির্জার ছায়াটুকুও যেন সুপ্তির ওপর না পড়তে পারে, সেই নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা সে করে রেখেছিল। অন্যদিকে, বিয়ের পর প্রায় পনেরো দিন হানিমুনে কাটিয়ে এসে আদিল মির্জা এখন নিয়মিত অফিসে বসছে। তবে আবরার এখনো সরাসরি অফিস জয়েন করেনি; মাঝেমধ্যে শুধু দূর থেকে সবকিছুর খোঁজখবর নিয়েছে।
আবরার ইতিমধ্যেই অস্ট্রেলিয়ায় জানিয়ে দিয়েছে যে সে আর সেখানে ফিরে যাবে না। তার এই স্থায়ীভাবে দেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তে পরিবারের সবাই ভীষণ খুশি, বিশেষ করে আরাব। আরাব তো বরাবরই এই যৌথ পরিবারটার সবার সাথে মিলেমিশে থাকতে চায়। ছেলের এই অনাবিল খুশি আর নিজের জীবনের সাথে জড়িয়ে যাওয়া নতুন এক দায়িত্বের কথা চিন্তা করে আবরার প্রশাসন ক্যাডারে তার পুরনো পেশায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে একটি চলমান প্রজেক্টের কাজ শেষ হতে আরও প্রায় ছয় মাস লাগবে, সেটি শেষ করেই সে আবার তার পুরনো চেয়ারে জয়েন করবে। এভাবেই শান্তিতে কাটছিল দিনকাল।
খেলার মাঠের হইচইয়ে হঠাৎ ছেদ পড়ল। আম্পায়ারের ভূমিকায় আবরার।মলির বলে আহনাফ আউট হয়ে যেতেই সে বাচ্চাদের মতো বায়না ধরে বলল, “না মলি, তুমি চিটিং করেছ! এটা পরিষ্কার নো বল ছিল। এই দেখো, তুমি যখন বল করেছ, তোমার পা দাগের এই পাশে ছিল।”
কিন্তু আরাব তো কিছুতেই মানতে নারাজ। সে হাত নেড়ে বলল, “না ছোট আব্বু, খবরদার চিটিং করবে না! ছোট আম্মু একদম ঠিকঠাকভাবে বল করেছে। তুমি আউট!”
সায়মাও আহনাফের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠে বলল, “খবরদার আরাব, মিথ্যা বলবি না! গোলুমোলু, তুই তোর ছোট আম্মুর সাথে মিলে চিটিং করছিস। আমাকে আর ভাইকে একা পেয়ে তোরা দুজনে মিলে এরকম করছিস, তাই না?”
তাদের এই খুনসুটির মধ্যে পাশে বসে থাকা ছোট্ট রাইসা মাথায় একটা সুন্দর ক্যাপ পরে, খেলার কিছু না বুঝেই খিলখিল করে হেসে হাততালি দিচ্ছে। এই চার মাসে রাইসা অনেকটাই বড় হয়েছে। সে এখন স্পষ্ট ‘ভাইজান’ বলে ডাকতে পারে। মা, বাবা, আব্বু, আম্মু, আম্মা—সবকিছুই এখন তার ঠোঁটের ডগায়। ভাঙা ভাঙা, টুকরো টুকরো দুই একটি কথাও বলতে পারে সে। বাগানের চেয়ারে বসে থাকা আবরারের কোলে বসেই সে হাত নেড়ে ‘ভাইজান, ভাইজান’ বলে চিৎকার করছে আর আরাবের দিকে ইশারা করছে।
এই দীর্ঘ চার মাসে আবরার নিজে কখনো সুপ্তিকে ফোন করেনি, কিংবা সামনাসামনি দেখাও করেনি। কিন্তু এখন সময় এসেছে নিজের দেওয়া কথা রাখার। আগামী দুই দিন পরেই তাদের বিয়ের ডেট ঠিক হয়েছে। তাই আবরার মনে মনে ঠিক করেছে, আগামীকাল সে নিজে গিয়ে সুপ্তির সাথে দেখা করবে। বিয়ের আগে অন্তত একটিবার মেয়েটির সাথে মুখোমুখি বসে সব কথা ঠিকঠাক করে নেওয়াটা ভীষণ জরুরি।
আবরার যখন এই গভীর ভাবনায় মগ্ন, তখনই আরাব দৌড়ে এসে তার হাঁটু জড়িয়ে ধরে বলল, “আব্বু! তুমি তো সব দেখেছ। তুমিই বলো, কে জিতেছে আর কে হেরেছে? ছোট আম্মুর বলটা নো ছিল না, তাই না?”
আবরারের মন তো তখন খেলায় ছিল না, সে ভাবছিল আগামীকালকের সেই অবশ্যম্ভাবী সাক্ষাতের কথা।
তাই ছেলের মুখের দিকে না তাকিয়েই সে আনমনে বলে দিল, “আরাব যা বলছে, সেটাই রাইট।”
একথা বলতেই মলি আর আরাব খুশিতে লাফিয়ে উঠল। এদিকে আহনাফ আকাশ থেকে পড়ার মতো ভঙ্গি করে বলল, “নো ভাইজান, দিস ইজ চিটিং! তুমি ঠিকঠাক মতো দেখোইনি। আচ্ছা নো প্রবলেম, এর পরের ম্যাচে আমরাই জিতব।” এই বলে হন্তদন্ত হয়ে হাসাহাসি করতে করতে সবাই ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। আবরার শুধু দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
পরের দিন। সৌহার্দ্যের সাথে আগে থেকেই কথা বলে রেখেছিল আবরার। সেই অনুযায়ী হোস্টেলের নিচের নিরিবিলি ওয়েটিং রুমে সুপ্তির সাথে দেখা করার ব্যবস্থা করা হলো। সৌহার্দ নিচে এসে আবরারকে বসিয়ে দিয়ে বাইরে চলে গেল; সে চায় না দুজনের এই ব্যক্তিগত কথার মাঝখানে কেউ থাকুক।
উপর থেকে সুপ্তিকে ডেকে পাঠানো হলো। সুপ্তি যখন ধীর পায়ে ওয়েটিং রুমে এসে প্রবেশ করল, তার চোখ গিয়ে পড়ল আবরার মির্জার ওপর। দীর্ঘ চার মাস পর আজ এই প্রথম সে লোকটিকে দেখল। লোকটা যেন একটুও বদলায়নি। সেই চেনা গম্ভীর অবয়ব, গালভর্তি দাড়ি-গোঁফগুলো চার মাস পর আরেকটু ঘন আর বড় দেখাচ্ছে।মাথার চুলগুলোও সামান্য বড়। তাকে দেখে সুপ্তির বুকের ভেতরটা অজানা এক সংসয় জেঁকে বসেছে।
সুপ্তি ধীর পায়ে আরও কিছুটা এগিয়ে এসে মৃদু, কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলল, “আসসালামু আলাইকুম।”
আবরার ফ্লোর থেকে চোখ না তুলেই শান্ত গলায় জবাব দিল, “ওয়ালাইকুম আসসালাম।” তবে সে সুপ্তির চোখের দিকে সরাসরি তাকাল না। ওইভাবেই বসে থেকে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল, “কিছু কথা বলতে চাই তোমাকে। মনোযোগ দিয়ে শুনবে।”
সুপ্তি তার ডাগর চোখ দুটো তুলে লোকটার দিকে তাকাল। তার ভেতরে তখন এক অদ্ভুত সমীহ আর কৌতূহল। সে বলল, “জি বলুন।”
আবরার এবার সোজা সুপ্তির চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো চপলতা নেই, আছে এক সমুদ্র দায়িত্ববোধ। সে প্রশ্ন করল, “বিয়েটা কেন হচ্ছে, বলতে পারবে?”
সুপ্তি মাথা নিচু করে বলল, “আপনার কারণ তো আমি জানি না।”
আবরার হালকা একটু হাসল, যাতে মিশে ছিল এক টুকরো বিষাদ। সে বলল, “তোমার কারণ কি প্রতিশোধ? স্বাভাবিক। বয়সটাই এমন। এই বয়সে ক্ষোভ আর প্রতিশোধের আগুনটাই বেশি থাকে।”
সুপ্তি এবার সাহস সঞ্চয় করে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, “আর আপনার কারণ?”
আবরার দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। ঘরের ভেতরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল। তারপর সে বলতে শুরু করল, “যেদিন আমি আদিল কে কল দিয়েছিলাম... তুমি কল ধরে কেঁদেছিলে। দীর্ঘ সময় ধরে ওপাশে শুধু তোমার কান্নার শব্দ পাচ্ছিলাম। সেই দিন, সেই মুহূর্তেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমার ভাই, আমার পরিবার তোমাকে কতটা গভীর কষ্ট দিয়েছে। একটা নিষ্পাপ মেয়ের সাথে সত্য গোপন করে বিয়ে করিয়ে তারা তোমার জীবনের ওপর কতটা বড় অবিচার করেছে, তা আমি সেদিন অনুভব করেছিলাম।”
সুপ্তি নিচু স্বরে বলল, “তাহলে আপনি প্রায়শ্চিত্ত করতে চাইছেন?”
“না সুপ্তি,” আবরার মাথা নাড়ল। “আমি তোমাকে একটি সুন্দর, সম্মানজনক ও নিরাপদ জীবন দিতে চাইছি—যা তুমি সত্যিকার অর্থেই ডিজার্ভ করো। তবে মনে রেখো, স্বামী হয়ে নয়, একজন অভিভাবক হয়ে আমি তোমার মাথায় হাত রাখলাম, যা এই মুহূর্তে তোমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। শুধু এতটুকুই। তোমার আর আমার মধ্যে ২০ বছরের বয়সের পার্থক্য। এটা একটা বিশাল জেনারেশন গ্যাপ। তাই আমাকে স্বামী নয়, নিজের একজন আজীবনের শুভাকাঙ্ক্ষী ভাবতে পারো। আমার তোমার কাছে কোনো বৈবাহিক প্রত্যাশা নেই।”
আবরার একটু থামল, তারপর আরাবের কথা মনে পড়তেই তার গলাটা কিছুটা নরম হয়ে এলো, “আমি তোমাকে জোর করে আরবের মা হতেও বলব না। শুধু একটাই অনুরোধ, ও যেন কোনো কষ্ট না পায়। ওর মা নেই। মা-বাবা না থাকার কষ্টটা কী, তা তোমার চেয়ে ভালো আর কে বুঝবে? তাই বেশি কিছু বলব না। শুধু এটা মনে রেখো, আরাব আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। শুধু ওকে একটু ভালোবেসো, একটু বুঝো। যদি ভালবাসা দিতে না ও পারো অবহেলা করো না।ছেলে টা আমার অবহেলা সইতে পারে না।ও খুব ভদ্র।তোমাকে জ্বালাবে না।আমি আর কিছু চাই না তোমার থেকে। তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা করো, জীবনে অনেক বড় হও, নিজের পায়ে দাড়াও প্রতিষ্ঠিত হও।”
সুপ্তি মন্ত্রমুগ্ধের মতো লোকটার প্রতিটি শব্দ গিলছিল। আবরারের কণ্ঠস্বর এবার আরও গম্ভীর ও আবেগঘন হলো, “মেহনাজ ছিল আমার প্রথম স্ত্রী, আমার একমাত্র ভালোবাসা। তোমাকে আমি বিয়ে করছি ঠিকই, কিন্তু কখনো তুমি আমাদের এই সম্পর্ককে কোনো বন্ধন বা বোঝা মনে করো না। আমি আমার কোনো সিদ্ধান্ত বা অধিকার তোমার ওপর জোর করে চাপিয়ে দেব না, তা কখনোই হবে না।যদি মনে হয় কখনো মুক্তি চাও শুধু জানাবে।আমি বাঁধা হবো না।"
সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সুপ্তির মাথার ওপর এক অদৃশ্য সুরক্ষার দেয়াল তুলে দিয়ে বলল, “একটা কথা আজ স্পষ্ট শুনে রাখো—যতদিন আমি বেঁচে আছি, ততদিন তুমি এই পৃথিবীতে সম্পূর্ণ নিরাপদেই থাকবে। বুক খুলে স্বাধীনভাবে শ্বাস নেবে। কেউ তোমার দিকে আঙুল তোলার সাহস করবে না।”
আবরার সুপ্তির মুখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “কিছু বলার আছে তোমার?”
সুপ্তি তখনো লোকটির কথার মায়াজালে আচ্ছন্ন হয়ে অবশ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ যেন তার ঘোর কাটল। সে কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু মাথাটা দুদিকে নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিল যে তার কিছু বলার নেই।
আবরার তার হাতঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর বলল, “তাহলে আগামীকাল অত্যন্ত ঘরোয়াভাবে আমাদের বিয়ে হবে। ভালো থেকো।”
আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে, নিজের দীর্ঘ অবয়ব নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল আবরার মির্জা। আর সুপ্তি সেই শূন্য ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে রইল, যার চোখের কোণে তখন কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ শুধু।

0 Comments