আদিবা খেয়াল করলো হানি তাকে বেশ এড়িয়ে চলছে। চোখে পড়লেই সে কেমন পালাই পালাই করছে। হানিকে হাতের নাগালে না পেয়ে আদিবা মেঝো কাকীদের ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করলো " কাকী হানিকে দেখছি না, ও বাড়ি নেই?"
খাদিজা বললো " বাড়িতেই তো, দেখো রুমেই পড়ছে হয়তো।"
" কবে থেকে এতো পড়ুয়া হয়ে গেলো" কথাটা বিরবির করে বলতে বলতে আদিবা হানির রুমে উঁকি দিলো। সে রুমেই আছে। আদিবাকে দেখে বেশ চমকে উঠে আমতা আমতা করে আওড়ালো " আদিবা আপু! তুমি কোনো দরকারে এসেছিলে?"
" কেনো কোনো দরকার ছাড়া আসতে পারি না?" ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো আদিবা।
" হ্যাঁ পারো, অবশ্যই পারো। পারবে না কেনো? বসো না" ফাঁকা চেয়ারের দিকে ঈঙ্গিত করলো হানি।
আদিবা পড়ার টেবিলে ঝুঁকে এসে বললো " খুব পড়াশোনা করছো দেখছি।"
" হ্যাঁ সামনে পরিক্ষা তো আপু। রেজাল্ট ভালো না হলে জানোই তো বাবা ধরে বিয়ে দিয়ে দিবে।"
আদিবা সেসব কথা সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে সরাসরি হানির চোখের দিকে তাকিয়ে বললো " তুমি সিরাজকে আমার নাম্বার কেনো দিয়েছো হানি?"
হানি এবার ভয়ে চুপসে গেলো। আমতাআমতা করে বললো " তুমি কি করে বুঝলে আপু? হয়তো অন্য কেউ দিয়েছে।"
" মিথ্যা বলো না হানি। তুমিই দিয়েছো সেটা আমি জানি। সে নিশ্চয়ই তোমার কলেজে এসেছিল।"
হানি কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো " ক্ষমা করে দাও আপু। আমি বুঝতে পারিনি।"
আদিবা খাটের কোণে বসলো, হাত কচলাতে কচলাতে নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো " আমি ইদানীং কাউকে ক্ষমা করতে পারছি না হানি দুঃখিত।"
হানি হন্তদন্ত হয়ে আদিবার হাতদুটো ধরে বললো " ভুলে হয়ে গেছে তো আপু। প্লিজ বাড়ির কাউকে বলো না একথা। ছোট কাকা শুনলে আমাকে মেরেই ফেলবে।"
" এ চিন্তা তোমার কি আগেই করার দরকার ছিল না?"
" করেছি তো আপু। ওই লোক আমার সব বন্ধুদের সামনে এসে জোড়াজুড়ি করছিল। আমি কি ভাবে তাকে না করতাম বলো তো?"
আদিবা হানির হাত দুটো নিজ হাত থেকে আলতো করে সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে হানির দিকে তাকিয়ে বললো " ভুল ভুলই হয় হানি। আমি ভুল মেনে নিতে শিখিনি। আর ভুল ক্ষমা করার মতো ওতো মহৎকর্মও আমার দ্বারা খুব একটা হয়না। তুমি জানতে আমি ওই লোকের সাথে কোনো ভাবেই কানেক্ট থাকতে চাইনা বলে কত কিছু চেঞ্জ করে ফেলছি।"
আদিবার কথাবার্তা শুনে হানি কেঁদেই দিবে এমন অবস্থা হলো। আদিবা এতোটা রেগে যাবে কে জানতো? আর যেই বোনটা তাকে এতো আদর করে আজ সে-ই এ ভাবে কথা শুনাচ্ছে। লজ্জায় হানির মরে যেতে ইচ্ছে করলো। আদিবা স্থান ত্যাগ করার উদ্দেশ্য পা বাড়ালো। একটু থেমে বললো "আবার নতুন সিম নিব। এবার আর সেই নতুন নাম্বার তোমাকেও দিব না।"
আদিবা চলে গেলো, হানি ভীষণ আপসেট হয়ে পড়লো। হয়তো বয়সের একটা তফাৎ তাদের মধ্যে আছে কিন্তু প্রতিটা কাজিনদের মধ্যে বন্ধুত্বতের সম্পর্ক। একজন আরেকজনকে ছাড়া যেন অপূর্ণ, সব-কয়টাই যেন আপন মায়ের পেটের বোন ঠিক সে রকমই তাদের মিলামেশা ছিল। আদিবা এমন অভিমান করেছে এতে হানির চারদিক অন্ধকার লাগবে এটাই তো স্বাভাবিক। তাছাড়া বড়দের কানে এ কথা গেলে বাড়িতে বিচার বসবে যে! এ বাড়িতে ছোটখাটো ভুলের জন্যও সভা বসে। আদিবা কি সত্যি বিচার বসাবে? এই চিন্তায় হানির চোখের ঘুম উড়ে গেলো।
______
অ্যাটেনশন শিকার মানুষ গুলো ঠিকঠাক অ্যাটেনশন না পেলে পাগল হয়ে যায়। সিরাজেরও হয়েছে তাই। যে মেয়েটা একটা সময় তাকে মাথায় করে রাখতো সেই মেয়েই কিনা তার দিকে এখন ফিরেও দেখছে না?
এদিকে জেনিফার কাছ থেকেও রিজেক্ট হতে হয়েছে। সব মিলিয়ে সিরাজ পাগল হয়ে গেলো। বাড়ি ফিরে রাত করে, কোথায় কোথায় যেন ঘুরে বেড়ায়। মনোয়ারা কিছু জানতে চাইলে মুখের উপর ধমক দিয়ে তাকে থামিয়ে দেয়। ঠিকঠাক নিজের যত্ন নিচ্ছে না। মনোয়ারা খেয়াল করলো ছেলেটা ইদানীং নেশাও করছে হয়তো। আগে তো কখনো বাড়িতে কারো সামনে সিগারেটও খেতো না। খেলে সেটাও লুকিয়ে খেতো।
একবার বোধহয় বেশ রাত করেই একটা সিগারেট ধরিয়েছিল আদিবাকে লুকিয়ে। তখন রাত প্রায় এগারোটা। গরমের রাত, তীব্র গরমে বাহিরে এসে বসে ছিল। পাশে আদিবা নেই সে বিছানায় এপাশ ওপাশ করছে। সিরাজের ফোনের ওপাশে দুষ্ট মিষ্টি বার্তা আলাপ করা মেয়েটা ছিল জেনিফা।
আদিবার ঘুম আসছিলো না। ভাবলো সিরাজ যেহেতু বাহিরে সে-ও না হয় বাহিরে একটু চন্দ্র বিলাস করে আসবে। কতদিন হলো দুজন মিলে চাঁদ দেখে না। বিয়ের আগে সিরাজ আদিবাকে টেক্সট করে বলতো " এই তোমাকে দেখা যাচ্ছে, দেখছি আমি তোমাকে।"
আদিবা অবাক হয়ে ফোন থেকে চোখ সরিয়ে চারপাশে তাকাতো। লোকটা আবার বাড়িতে চলে আসলো না তো? ভয়ের চোটে গলা শুকিয়ে আসতো।এরপর আশেপাশে তাকিয়ে কাউকেই দেখতে না পেয়ে টেক্সটের রিপ্লাই করতো " কোথায় দেখছো? এতো রাতে আবার আমাদের বাড়ি চলে আসছো না তো?"
" আমি যাইনি, তুমিই তো চলে এসেছো আমার বাড়িতে। ওই যে আকাশে দেখা যাচ্ছে তোমাকে।"
সিরাজের কথা বুঝতে পেরে আদিবা লজ্জায় ঠোঁট টিপে হাসতো। আকাশে চাঁদ উঠেছে আর সে কি-না এই চাঁদ নিয়ে মজা করছে। ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়? তবে যে ভালোবাসা আজীবনের জন্য নয়, সেটাকে বোধ ভালোবাসা বলে না, খুব সম্ভবত মোহ কিংবা ভালো লাগা। তা না হলে বিয়ের পর সিরাজ আর কখনো মুগ্ধতা নিয়ে সেই চাঁদ মুখখানায় দৃষ্টি রাখেনি কেনো? তবে কি মোহও কেটে গিয়েছিল? নাকি ভালোবাসা কমে গিয়েছিল?
সে রাতে আদিবা বাহিরে বের হয়ে দেখলো চাঁদ ডুবে গিয়েছে। উঠানের একপাশে অন্ধকারে একটা অবয়ব দেখা যাচ্ছে। যার ঠোঁটে একটা জ্বলন্ত সিগারেট, মুখের উপর ফোন স্ক্রীনের আলো এসে পড়তেই বুঝা যাচ্ছে সে অন্য কারোতে মগ্ন। আদিবার কলিজায় মুচড়ে উঠলো। বুঝতে পেরেছিল মানুষটা বোধহয় আর তার নেই। সে রাতে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে ছলছল নয়নে আকাশের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিল " মানুষ কেনো বদলে যায়?" সেই প্রশ্নের জবাব আকাশ দেয়নি।
" আপনি সিগারেট খাচ্ছেন?"
ভূত দেখার মতো চমকে উঠে সিরাজ বিরক্তিকর কন্ঠে বললো " ওপস! ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে। এ ভাবে হুট করে কেউ চলে আসে?"
" চারপাশে তো কোনো দেয়াল বা দরজা নেই যে নক করে আসবো।"
" তুমি মজা করছো আমার সাথে?"
আদিবা সিরাজের গা ঘেঁষে বসলো। একটু আন্তরিকতার সাথেই বলেছিল " হ্যাঁ করছি। কেনো মজা করতে বারণ?"
সিরাজ একটু সরে গিয়ে বিরক্তির সাথেই বলছিল " আহা কি করছো আদিবা সরে বসো, দেখছো না কত গরম।"
আদিবা সরে বসেনি বরং সেখান থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল এবং সেইদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যদি এরকম চলতেই থাকে তবে ওই পুরুষের জীবন থেকেও নিজেকে সরিয়ে নিবে। আজ আদিবা সেটাই করেছে।
_________
এক সপ্তাহ চলে গেলো বাড়িতে কোনো বিচার বসেনি। বিচার বসবে কিনা সেটা নিয়ে হানি যেমন চিন্তিত ছিল তেমনি আদিবা এতোটা রেগে যাবে এবং কথা শুনাবে সেটা নিয়ে মনের মধ্যে একটু হলেও রাগ হয়েছিল। তবে আদিবা যে বিষয়টা আর কাউকে জানিয়ে দেয়নি সেটা টের পাওয়ার পরেই হানির মনের সমস্ত রাগ অভিমান মুছে গেলো। তবে আর কতদিন দুজন কথা না বলে থাকবে?
বাড়ির উঠানে যে বেলীফুল গাছটা ছিল সেটা থেকে এক ঝুড়ি বেলী নিয়ে আদিবার কাছে হাজির হলো হানি। আদিবা বোধহয় ইদানীং খুবই বিজি, পড়াশোনার পাশাপাশি কিসের জন্য একটা বিজনেস করবে সেটা নিয়েই সারাক্ষণ রিসার্চ করে বেড়াচ্ছে।
হানিকে দরজায় আবিষ্কার করতেই আদিবা ডেকে বললো "ভেতরে আসো।"
হানি এক দৌড়ে ভেতরে এসে খুশী মনে প্রশ্ন করলো " তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছো তাহলে?"
" কি মনে হয় তোমার?"
" মনে হচ্ছে ক্ষমা করেছো।"
" তবে তাই হোক।
হানি খুশীতে দু'হাতে আদিবাকে জাপ্টে ধরে বললো " তুমি খুব ভালো আদিবা আপু। জানো আমি তোমাকে খুব মিস করছিলাম।"
" তবে আরও আগেই আসলে না কেনো?"
" অভিমান হয়েছিল।"
" ওমা সেকি! কিসের জন্য অভিমান হলো?'
" তুমি কতগুলো কথা শুনালে তো তাই।"
আদিবা মুচকি হেঁসে বললো " আর কতগুলো আদর করি যে সে বেলায়?"
হানি মিটিমিটিয়ে হাসতে লাগলো। আদিবা বসা থেকে উঠে ফুলগুলোর দিকে ইশারা করে জানতে চাইলো " এগুলো আমার জন্য?"
হানি ঘাড় নাড়িয়ে বললো " হ্যাঁ তোমার জন্য।"
" অনেক ধন্যবাদ মধু।"
হানি খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠলো। আদিবা প্রায় আদর করে তাকে মধু বলে ডাকে। হানির তখন ভারী মজা লাগে।
রুমা ইদানীং কেমন যেন করছে। হামিদাও যুক্ত হয়েছে তার সাথে। সুযোগে আদিবাকে খোঁচা মারতে ভুলে না। আজ দুপুরেই আদিবাকে ফোনে কারো সাথে আলাপ করছে দেখতে পেয়ে রুমা এসে জিজ্ঞেস করলো " কার সাথে কথা বলছিলে?"
আদিবা ফোনটা হাতে নিয়ে এপাশ ওপাশ করতে করতে জবাব দিলো " একটা জরুরি কল ছিল ভাবি।"
রুমার বিশেষ পছন্দ হলো না উত্তরটা। এরপর জানতে চাইলো " বিজনেসের সব ঠিকঠাক হলো?"
" হ্যাঁ প্রায় সব ঠিকঠাক এখন শুধু ওপেনিং এর পালা।"
রুমা ভ্রু কুঁচকে বললো " এ বাড়িতে থেকেই করবে নাকি?"
আদিবা একটু দম নিয়ে বললো " তোমাদের সমস্যা হলে এ বাড়ি ছেড়ে দিয়ে অন্য কোথাও উঠতে হবে কি আর করার!"
কথাটা বলে রুমার উত্তর শুনার জন্য আর অপেক্ষা করলো না সে চলে গেলো। কয়েকজন যে ইদানীং তাকে আড় চোখে দেখছে সেটা আদিবা বেশ ভালোই টের পাচ্ছে। একটা বিবাহ উপযোগী মেয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর বিয়ে না হলে এবং ডিভোর্সের পর একটা মেয়ে বাপের বাড়িতে থাকলে সেসব মেয়েদের জন্য বাবার বাড়িটা আর রাজমহল থাকে না, জেলখানা হয়ে যায়। যেখানে তিনবেলা খাওয়ালেও শাস্তি ভোগ করতেই হয়।

0 Comments