অন্তর_সাক্ষী

 

অন্তর_সাক্ষী

মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমাদের এত বছরের সংসারের অসংখ্য স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠল। মনে পড়ল, কত কষ্ট করে টাকা জমিয়েছি, কতবার নিজের ইচ্ছেগুলো চাপা দিয়েছি। নিজের জন্য কিছু না কিনে সংসারের প্রয়োজনেই বেতনের প্রায় পুরো টাকাটা খরচ করেছি। কখনো কোনো হিসাব চাইনি, কখনো অভিযোগও করিনি।
আজ সেই মানুষটাই এমনভাবে কথা বলছে, যেন সংসারে আমার সব অবদান স্বাভাবিক, আর নিজের ছোট বোনকে একটা উপহার দেওয়ারও আমার কোনো অধিকার নেই।
গলায় কষ্টের একটা দলা এসে আটকে গেল। কিন্তু আশ্চর্যভাবে চোখে একফোঁটা পানিও এল না।
আমি শুধু শান্ত গলায় বললাম,
— আচ্ছা... তোমার যেমন ইচ্ছা।
আমার কথা শুনে নাঈম আর কিছু বলল না। দরজা জোরে বন্ধ করে ঘরে চলে গেল। ওর ধারণা ছিল, কিছুক্ষণ পর আমি নিশ্চয়ই গিয়ে ক্ষমা চাইব, বলব আর কখনো এমন করব না।
কিন্তু ও জানত না, আমার এই নীরবতার আড়ালেই অন্য একটা সিদ্ধান্ত জন্ম নিচ্ছে।
পরদিন সকাল।
নাঈম অফিসে বের হওয়ার পর আমি একে একে ফোন করলাম।
প্রথমে আমার বাবা-মা আর ভাই-বোনদের।
তারপর ফোন করলাম শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ—কাউকেই বাদ দিলাম না।
সবাইকে বললাম,
— একটা ছোট্ট পারিবারিক আয়োজন করেছি। দুপুরে সবাইকে আসতেই হবে।
সবাই খুশি মনে দাওয়াত গ্রহণ করলেন।
তারপর আমি বাজারে গেলাম।
সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো মাছ, মাংস, মুরগি, শাকসবজি কিনলাম।
বাড়িতে ফিরে রান্নাঘরে ঢুকে একের পর এক রান্না শুরু করলাম। যেন কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে।
সব রান্না শেষ করে পুরো বাসাটা গুছিয়ে নিলাম।
নিজেও পরিপাটি হয়ে তৈরি হলাম।
মাহিরকেও নতুন জামা পরিয়ে কোলে নিলাম।
দুপুর গড়িয়ে যেতে না যেতেই একে একে সবাই আসতে শুরু করলেন।
প্রথমে এল আমার পরিবারের সবাই।
তার কিছুক্ষণ পরই এল নাঈমের পরিবারের লোকজন।
ঠিক তখনই অফিস থেকে ফিরল নাঈম।
ঘরে ঢুকেই ও থমকে দাঁড়িয়ে গেল।
পুরো বাড়ি মানুষে ভরা।
ডাইনিং টেবিলে সাজানো কত রকমের খাবার।
আমি সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছি।
ও চুপচাপ আমাকে রান্নাঘরে ডেকে নিয়ে নিচু গলায় বলল,
— এসব কী হচ্ছে? এত মানুষকে কে ডাকতে বলেছে? এত খরচ করলে কীভাবে?
আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললাম,
— এখন এসব কথা বলার সময় নয়। তুমি তো বলেছিলে মাসের বাকি খরচ আমার দায়িত্ব। তাই কোনো চিন্তা কোরো না। সবাই অপেক্ষা করছে, চলো।
নাঈম আর কিছু বলতে পারল না।
আমরা বাইরে এসে সবার সঙ্গে বসলাম।
খাওয়া-দাওয়া শুরু হলো।
সবাই খুব আনন্দ করে খেলেন।
শাশুড়ি আমার রান্নার প্রশংসা করলেন।
আমার বাবা-মায়ের মুখেও আনন্দের হাসি।
শুধু নাঈমকেই অস্বস্তিতে দেখা যাচ্ছিল।
বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছিল।
হয়তো ভাবছিল, আমি আসলে কী করতে চাই।
হয়তো ওর মনে হচ্ছিল, এত আয়োজনের শেষে আমি ওর কাছে ক্ষমা চাইব, কিংবা সবাইকে সামনে রেখে ওকে সিদ্ধান্ত বদলানোর অনুরোধ করব।
কিন্তু আমার পরিকল্পনা ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম।
খাওয়া শেষ হলো।
সব প্লেট সরিয়ে রাখা হলো।
সবাই ভাবলেন এবার হয়তো চা আসবে।
নাঈমও নিশ্চিন্ত হয়ে বসে রইল।
কিন্তু আমি যখন রান্নাঘর থেকে ফিরে এলাম...
আমার হাতে ছিল একটা বড় ট্রে।
সেখানে চায়ের কাপ ছিল না।
ছিল শুধু কয়েকটা সাদা কাগজ, সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা। কাগজগুলো উড়ে না যায় বলে তার ওপর একটা পানিভর্তি গ্লাস চাপা দেওয়া ছিল।
আমি ট্রেটা দুই হাতে ধরে সবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
ঘরের ভেতর মুহূর্তেই নীরবতা নেমে এল।
সবাই অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কারও মুখে কোনো কথা নেই।
শাশুড়িও বিস্মিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন...
শাশুড়ি তখনও হাসতে হাসতে বলছিলেন,
— রান্না তো খুব ভালো হয়েছে মা। শুধু তরকারিতে আরেকটু লবণ হলে একদম জমে যেত। আচ্ছা, এবার এক কাপ গরম চা এনে দাও তো।
আমি শুধু হালকা করে হাসলাম।
সেই হাসিতে আর আগের মতো উষ্ণতা ছিল না।
ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মাঝখানের টেবিলের ওপর ট্রেটা রাখলাম।
ট্রে রাখার শব্দে সবাই চমকে আমার দিকে তাকাল।
ননদ সাদিয়া কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল,
— ভাবি, এগুলো কী?
আমি একটা চেয়ার টেনে বসলাম।
তারপর একে একে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললাম,
— এগুলো কোনো কাগজ না... এগুলো হিসাব।
প্রত্যেকের নামে আলাদা একটা কাগজ আছে। কে কী খেয়েছেন, কতজন এসেছেন, সবকিছুর হিসাব লেখা আছে। আজকের এই আয়োজনের মোট খরচও ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
কথাটা শেষ হতেই পুরো ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
নাঈম হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল।
রাগে ওর মুখ লাল হয়ে গেছে।
উঁচু গলায় বলল,
— নাদিয়া! তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? এসব কী শুরু করেছ? আমার পরিবারের সামনে আমাকে অপমান করছ?
আমি একটুও বিচলিত হলাম না।
শান্তভাবেই বললাম,
— অপমান কেন হবে? আমি তো শুধু হিসাব বুঝিয়ে দিচ্ছি।
এই আয়োজনটা করার সামর্থ্য আমার ছিল না।
তারপরও সবাইকে ডেকেছি।
তাই আজ যার যতটুকু খরচ হয়েছে, সেটুকুই ফেরত চাইছি।
শাশুড়ি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন।
রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
— এসব কী ধরনের কথা? আমরা ছেলের বাড়িতে এসেছি। সেখানে খাওয়ারও হিসাব দিতে হবে?
আমি এবার তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,
— ছেলে তো আপনারই।
কিন্তু এই সংসারের খরচ এখন আর শুধু আপনার ছেলে বহন করছে না।
আপনার ছেলে নিজেই আমাকে বলে দিয়েছে, মাসের বাকি অর্ধেক সংসার আমি আমার বেতনের টাকা দিয়ে চালাব।
তাই আজকের এই দাওয়াতের খরচও আমার একার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
নাঈম হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
হয়তো ভাবেনি আমি সবার সামনে এসব বলব।
ও দ্রুত আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে চাইল।
দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— চলো ভেতরে। এখনই।
আমি সঙ্গে সঙ্গে হাত ছাড়িয়ে নিলাম।
দৃঢ় গলায় বললাম,
— না।
আজ আমি কোথাও যাব না।
আজ এই কথাগুলো সবার সামনেই হবে।
আমি কারও কাছে হাত পাততে চাইনি।
আজকের এই আয়োজন করার জন্যও অফিসের এক সহকর্মীর কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয়েছে।
শুধু যেন কেউ বলতে না পারে, আমি অতিথি আপ্যায়ন করতে জানি না।
কিন্তু তার পরেও যদি আমাকে বলা হয়, নিজের বেতনের টাকায় কাকে কী উপহার দেব, সেটারও অধিকার আমার নেই...
তাহলে আজ এই হিসাব সবার জানার অধিকার আছে।
আমি শ্বশুরের দিকে তাকালাম।
তিনি মাথা নিচু করে নিশ্চুপ বসে ছিলেন।
তারপর ননদের দিকে তাকিয়ে বললাম,
— যার নামে যে কাগজ আছে, দয়া করে সেটা নিয়ে নিন।
যতটুকু খরচ হয়েছে, শুধু সেটুকুই দিয়ে দেবেন।
আমি ধার করা টাকা ফিরিয়ে দিতে চাই।
ননদ সাদিয়া অস্বস্তি নিয়ে ব্যাগটা হাতে তুলে নিল।
ধীরে ধীরে বলল,
— ভাবি... আমার হিসাবটা কোনটা?
আমি টেবিলের ওপর রাখা একটা কাগজের দিকে ইশারা করলাম।
— এই যে... তোমাদের পরিবারের হিসাব এই কাগজেই লেখা আছে।
আমি শুধু ধার করা টাকাটা ফেরত দিতে চাই।

Post a Comment

0 Comments