“দিনের বেলা রুমের দরজা জানালা বন্ধ করে। পুড়ো রুম অন্ধকার করে বসে আছে রোমান।
হাঁটুতে মুখ গুজে কিছুক্ষণ পর পর কেঁপে উঠছে।
হটাৎ কাঁধে কারো স্পর্শে কেঁপে উঠে রোমান।
নিজেকে কোনো রকম স্বাভাবিক করে পিছন ফিরে তাকায়। টলমল চোখে তাকিয়ে আছে রিনি। রোমান হাঁসার চেষ্টা করে বলল।
“রিনি তুই এখানে?
“ হ্যা আমি তোকে যে চেকাপ করতে হবে ভুলে গেলি।
“আমি কোনো চেকাপ করবো না রিনি।
“ মানে কি সব বলছিস?
“আমি ঠিক বলছি..!
“ আর কিছুদিন পর তোর অপারেশন আর এখন এই কথা বলছিস।
“আমি কোনো অপারেশন করবো না রিনি।
“ তোর মাথা ঠিক নেই রোমান? কি বলছিস এইগুলো।
“ ১০% বেঁচে থাকার চাঞ্জ মানুষ তো ৯০% চাঞ্জ বাঁচে না। সেখানে আমি মাত্র ১০% চাঞ্জে বেঁচে থাকবো।
“এইসব কথা বলিস না৷ আমি আমার সবটা দিয়ে চেষ্টা করবো তোকে সুস্থ করার। আমার উপর একটু ভরসা কর।
“বেঁচে থেকে আমি কি করবো? আমি আমার রুহিকে অনেক কষ্ট দিয়েছি রিনি। আমার রুহি আমাকে কখনো মাফ করতে পারবে না। আমার বোকানারী অনেক আঘাত পেয়েছে আমার থেকে। তুই বল আমার বেঁচে থাকার কি কোনো অধিকার আছে।
“রিনি রোমানের কথা শুনে কেঁদে উঠে৷ রিনি একজন ডক্টর তার পাশাপাশি রোমানের ভালো বন্ধু, বিদেশ থেকে ডাক্তারি শেষ করে। বাংলাদেশে এসেছে। সেদিন রোমানের কথায় রিনি রুহির সামনে এমন নাটক করতে বাধ্য হয়েছে। রোমানের এই কষ্ট যেনো রিনির সহ্য হচ্ছে না।
রোমান রিনিকে ডেকে উঠে বলল।
“রিনি….?
“হু…হুম বল?
“জানিস রিনি আমার অনেক স্বপ্ন ছিলো, আমি আমার বোকানারীকে লাল শাড়ি পড়িয়ে এই বাড়িতে বউ করে আনবো। আমার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেলো। স্বপ্ন আর সত্যি হলো না।
“............”
রিনি চুপচাপ রোমানের কথা শুনছে রোমান আবার বলল।
“আমার রুহিটা বড্ড বোকা, সামন্য একটু চোখের দেখাতেই আমাকে ভুল বুঝে চলে গেলো। বোকা রুহি বুঝলো না তার গায়ক সাহেব তাকে কতোটা ভালোবাসে। তার গায়ক সাহেব কখনো তার রুপ দেখেনি।
“ রোমান কথা গুলো বলেই পাগলের মতো হাঁসতে হাঁসতে বলল।
“সব স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেলো, আমি আমার রুহিকে বউ সাজে দেখতে পারলাম না। আমার বোকানারী আমার বোকানারী আমাকে ভুল বুঝে চলে গেছে।
“ রোমান শব্দ করে কেঁদে উঠে। রিনি রোমানকে গিয়ে দুই হাতে ঝাঁপটে ধরে। রোমান কাঁদতে কাঁদতে বলল।
“রিনি আমার যে খুব কষ্ট হচ্ছে আমার কপালে কেনো আল্লাহ একটু সুখ লিখলো না। কেনো রুহির থেকে আমাকে আলাদা করল। আমার রুহি অনেক কষ্ট আছে রিনি খুব কষ্ট আছে।
“রোমান কাঁদতে কাঁদতে সেন্সলেস হয়ে যায়।
রিনি চিৎকার করে বাহিরে নার্সদের ডাকে। তাদের সাহায্য নিয়ে রোমানকে বিছানায় শুয়ে দেয়।
রোমানের ব্রেন টিউমার হয়েছে। সপ্তাহ খানেক মধ্যে অপারেশন না করলে। রোমানের জীবনের ঝুঁকি আছে। রোমান আপন বলতে কেউ নেই। চৌধুরী বাড়ির কেউ জানেনা রোমানের অসুস্থতার খবর। আগের থেকে অনেকটাই ভেঙে পড়েছে রোমান। ভালো করেই জানে রোমান রুহি যে রোমানের অসুস্থতার খবর শুনে পাগলের মতো ছুঁটে আসবে। কিন্তু রোমান চায় তার জন্য রুহির পুড়ো জীবন’টা নষ্ট হোক। তার জন্যই তোকে রিনিকে দিয়ে রুহিকে ভুল বুঝিয়েছে। না চাইতেও রুহিকে বাজে বাজে কথা শুনিয়েছে। রুহির সাথে জামেলা হওয়ার পর থেকেই রোমান আরো অসুস্থ হয়ে পড়ে। তারপর থেকে জেদ ধরে, অপারেশন করবে না। রিনি কোনো ভাবেই রোমানকে বুঝিয়ে রাজি করাতে পারেনা। তার এক কথা রোমান অপারেশন করবে না মানে করবে না।
“বিকাল ৪ টা
“রোমান আগের থেকে কিছুটা সুস্থ, শুভ্র আসে রোমানের বাসায়। বাড়িতে এসে গলা ছেড়ে রোমানকে ডাকতে থাকে। শুভ্রের ডাক শুনে রোমান ওয়াশরুমে গিয়ে কোনো রকম ফ্রেশ হয়ে বের হয়। যথা সম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে। শুভ্র উপরে উঠে আসতে নিলেই রোমান রিনিকে নিয়ে দরজা খুলে। রিনিকে শুভ্র ভালো করেই চিনে৷ তবে এর আগে রোমানের একা রুমে রিনিকে কখনো দেখেনি। তাও আবার এতোটা ঘনিষ্ঠ অবস্থায়, রিনির এক বাহু ধরে, শুভ্রের দিকে এগিয়ে আসে হাঁসি মুখে। শুভ্র কিছুটা অবাক হয়ে বলল।
“ রোমান তুই? রিনি তুই এখানে?
“রিনি মাথা নিচু করে আছে। রোমান হাঁসার চেষ্টা করে বলল।
“ আয় দোস্ত তোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। মিট মাই ওয়াইফ রিনি চৌধুরী।
“রোমানের কথা শুনে শুভ্র বাক রুদ্র হয়ে যায়। অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছায়।
“কি সব বলছিস? রিনি তোর বউ মানে?
“ বউ মানে কি জানিস না। রিনিকে আমি বিয়ে করেছি। কিরে রিনি বল শুভ্রকে তোকে আমি বিয়ে করেছি। দুই তিন আগে,
“মাথা নিচু করে রিনি নরম স্বরে বলল।
“ জ্বি ভাইয়া আমি বিয়ে করেছি।
“হোয়াট? কিসের বিয়ে কি সব বলছিস। রুহির সাথে তোর বিয়ে ঠিক করা। সেখানে অন্য কাউকে কিকরে বিয়ে করতে পারিস?
“ রোমান শব্দ করে হাঁসতে হাঁসতে বলল।
“বিয়ে তাও আবার তোর ওই পাতিলের তলা কালো বোনকে?
“শুভ্র দাঁতে দাত পিষে বলল।
“মুখ সামনে কথা বল?
“ কি মুখ সামলাবো,কিছুদিন আগে তোর বোন এসে নাটক করে গেলো! এখন আবার তুই এসেছিস। ভাই যা তো চোখের সামনে থেকে। আমি বিয়ে করেছি আমার বউকে নিয়ে শান্তিতে থাকতে দে।
“শুভ্র রাগে রোমানের শার্টের কর্লাট চেঁপে ধরে বলল।
“বন্ধু হয়ে কেমন পারলি নিকৃষ্ট এই কাজটা করতে। তোর জন্য আমার ফুলের মতো বোনটা কষ্ট পাচ্ছে।
“ রোমান শুভ্রের দিকে তাকিয়ে বলল।
“করেছি তো কি করবি?
“ মুখে লাগাম দে রোমান?
“দিব না কি করবি তুই?
“ শুভ্র রোমানকে ছেড়ে ভাঙা গলায় বলল।
“মারবো না তোকে তবে এইটা বলবো তোর মতো বেইমান বন্ধু যেনো কারো না হয়।
“শুভ্র কিছু না বলেই, রোমানের বাসা থেকে বেড়িয়ে যায়। শুভ্র যেতেই রোমান ঠাসস করে ফ্লোরে বসে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে।
রিনি দৌড়ে যায় রোমানের দিকে। রিনিকে জড়িয়ে ধরে রোমান কাঁদতে কাঁদতে বলল।
“ আমার বন্ধুটাও আমাকে ভুল বুঝে চলে গেলো রিনি। আমার আর নিজের বলতে কেউ রইলো না রিনি। কেউ না।
“প্লিজ তুই শান্ত হ।
“রোমান কাঁদতে কাঁদতে এক সময় শান্ত হয়ে যায়।
“ এইদিকে শুভ্র কাঁদতে কাঁদতে বাড়িতে ফিরে, রোমানের থেকে এমন কিছু আশা করনি শুভ্র।
এতো বছরের বন্ধুতে ফাটল ধরেছে আজ।
অসহায় মতো এক হাত দিয়ে চোখের পানি মুছছে, আর ড্ররাইভ করছে। শুভ্রের চোখের সামনে ভাসছে রোমানের সাথে কাটানো পুরানো স্মৃতি। সে কোনো ভাবেই মানতে পারিনি রোমান এমন কিছু করবে। তার ফুলের মতো বোনটাকে ঠকাবে। রোমানি তো বাচ্চাদের মতো আবদার করেছিল তার বোনটাকে পাওয়ার জন্য।
তাহলে রোমান এমন কেনো করলো।
গাড়ি এসে থামে চৌধুরী বাড়ির সামনে, হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির ভিতরে ডুকে শুভ্র। রুহি রুহি বলে চিৎকার করে ডাকে শুভ্র, সিঁড়ি বেয়ে রুহির রুমে যায়৷ রুহি বিছানায় শুয়ে ছিল। শুভ্র রুহিকে বিছানা থেকে হাত ধরে টেনে তুলে৷ রুহি শুভ্রের এমন আচরণে হতভম্ব হয়ে যায়। শুভ্রকে রুহির সামনে দাঁড় করিয়ে শুভ্রের মাথায় রুহির হাত রেখে বলল।
“এইদিনের জন্য যদি আমাকে ভাই হিসেবে মেনে থাকিস। তাহলে আমি যা বলবো সেটা শুনবি।
“রুহি শুভ্রের কথায় মাথা দুলায়, শুভ্র বলে।
“আমি যেই ছেলেকে বলবো সেই ছেলেকে বিয়ে করবি সেটাও এই সপ্তাহে মধ্যে।
“ শুভ্রের কথা শুনে রুহি হাত সরিয়ে নিতে নেয়। শুভ্র হাত শক্ত করে মাথায় চেঁপে ধরে বলল।
“আমি চাইনা আমার বেইমান বন্ধুর জন্য আমার ফুলের মতো বোনটা কষ্ট পাক। তাই আমি যা বলবো সেইটা তোকে শুনতে হবে।
“রুহি কিছু না বলে মাথা নিচু করে ফেলে।
“কি হলো মাথা নিচু করে আছিস কেনো? রাখবি না আমার কথা।
“রুহি কাঁদতে কাঁদতে বলল।
“ গায়ক সাহেবকে ছাড়া আমি অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবো না ভাইয়া। এর থেকে আমায় গলা টিঁপে মেরে ফেলো।
“রুহি…….?
“ভাইয়া আমি পারবোনা অন্য কাউকে বিয়ে করতে।
“ তোর গায়ক সাহেব অন্য কাউকে বিয়ে করে দিব্যি শান্তিতে সংসার করছে।
“মা….মানে?
“মানে হলো রোমান বিয়ে করেছে। আমি যদি আমার বোন হোস। তাহলে তুই আমার সিদ্বান্তকে সম্মান জানাবি। কোনো বেইমানের জন্য কষ্ট না পেয়ে আমার দেখানো ছেলেকে বিয়ে করবি। তা না হলে আমি ভুলে যাবো আমার কোনো বোন নেই।
“শুভ্র রুহির রুম থেকে বেড়িয়ে যায়। এইদিকে বাড়ির সবাই এসে রুমের সামনে জড় হয়েছে। শুভ্র যেতেই রুহি ঠাসস করে ফ্লোরে বসে পরে কাঁদতে কাঁদতে।
“কি করে পারলেন এমনটা করতে গায়ক সাহেব।
একটা বার কি আমার কথা মনে পড়েনি। এইভাবে ঠকালেন আমায়।

0 Comments