অন্তরাত্মা

অন্তরাত্মা

 মির্জা বাড়ির পরিবেশ থমথমে।সানাইয়ের সুরে মেতে উঠা বাড়ি এখন গভীর শোকে পরিনত হয়েছে।মির্জা বাড়ির মেজো কর্তা আজমল সিকদারের এক মাত্র কন্যার নিথর দেহখানা পড়ে আছে মেঝেতে।বিয়ের আর ঘন্টা খানিক বাকি।এরই মধ্যে লাল বেনারসি পরিহিত নববধূ রুপি কন্যার মৃত্যু যেনো কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা মালিনী বেগম।তবে পারছে না হাউমাউ করে কান্না করতে।বাড়ির মেয়ে বিয়ের দিন ফাঁসি নিয়ে আত্মহত্যা করেছে এমন খবর বাইরে পৌঁছালে বাড়ির মান সম্মান ধূলোয় মিশবে।বাড়ির বড়ো কর্তার কড়া আদেশ কারো মুখ দিয়ে এক বিন্দু কান্নার আওয়াজ আসলে তাকেও স্নেহার লাশের সাথে জিন্দা দাফন করা হবে।

মালীনি বেগমের ঠোঁট কাঁপছে। ভিতরে আর্তনাদ বাইরে প্রকাশ পাওয়ার প্রয়াস।কোনো বাঁধাই হয়তো থামাতে পারেনা মায়ের শোক।
আজমল মির্জার অবস্থান দরজার পাশে।চোখে মুখে বিষাদ। তবে বড়ো ভাইজানের ভয়ে নিজেকে শক্ত রাখার প্রচেষ্টা।
বাড়ির বড়ো কর্তা আহাদ মির্জার স্ত্রী সীমা মির্জা এসে দাড়ালো মালিনী বেগমের পাশে।কাধে হাত রেখে বললো,
" মেজো উঠ স্নেহাকে অন্দরমহলের ভিতরেই গোসল করানোর ব্যবস্থা করতে হবে।বাইরের কাউকে এই মূহুর্তে অন্দরমহলের ভিতরে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবেনা।আমরা চার বউ মিলে গোসল করাবো।"
মালিনী বেগম চোখ তুলে তাকালো বড়ো জায়ের দিকে।ভাঙা গলায় তুতলিয়ে বললো,"আ......আরহাম আসা অব্দি অপেক্ষা করি না বড়ো আপা?"
" না তোর বড়ো ভাসুর জানিয়েছে, আরহাম বাসায় আসার আগে যেভাবেই হোক স্নেহার লাশ দাফন করে ফেলতে।"
মালিনী বেগম মেয়ের লাশ জড়িয়ে ধরলো।বাধা দিয়ে বললো," না না আরহাম আসার আগে আমি আমার মেয়েকে কিছুতেই দাফন করতে দিবোনা।"
আহাদ মির্জা পাঞ্জাবির পকেটে দুই হাত গুজে দাড়ালো এসে রুমের ভিতরে। চোখে মুখে কাঠিন্যতা। বাড়ির বাকি তিন বউয়ের দিকে তাকিয়ে কড়া কন্ঠে বললো," তোমরা কি তামাশা দেখতে এ ঘরে এসেছো?মেজো বউকে সরাতে পারছোনা এখান থেকে?"
মালিনী বেগমের বুক কাঁপছে। তাকে টেনে তুললে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে।যুদ্ধ বেধে যাবে এই মির্জা বাড়িতে।মেয়ের লেখা শেষ চিঠিখানা গোপন করতে হাটুর নিচে লুকিয়ে রেখেছিলো।কিন্তু এখন কি আর শেষ রক্ষা করা যাবে না?চিঠি সামনে আসলে খুনাখুনি রক্তারক্তির খেলায় মেতে উঠবে এই মির্জা বাড়ি কর্তারা।
তার ভাবনার মাঝেই সীমা মির্জা বাহু ধরে টেনে তুললো। আলগা হলো চিঠিখানা।মালিনী বেগম পা দিয়ে চেপে ধরে আড়াল করার আগেই চিঠি চোখে পড়লো সোহেলী মির্জার ।ব্যস্ত কন্ঠে বললো,
" তোমার পায়ের নিচে কি লুকালে মেজো আপা? দেখি পা সরাও।"
মালিনী মির্জা কম্পিত কন্ঠে বললো," ক.....কই কিছুনা তো।"
শুনলো না সোহেলী মির্জা। মালিনী বেগমকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিয়ে চিঠি খানা হাতে তুলে নিলো।ভাজ খুলে কয়েক লাইন পড়তেই চক্ষু চড়কগাছ।
আহাদ মির্জা ব্যস্ত কন্ঠে বললো," আমার কাছে দাও। দেখি কি আছে ভিতরে।"
সোহেলী মির্জা আলগোছে চিঠি খানা এগিয়ে দিলো আহাদ মির্জার হাতে।চিঠি হাতে নিয়ে আহাদ মির্জা পড়া শুরু করলেন।
প্রিয় বড়োআব্বা,
আপনার আদর ভালোবাসায় বড়ো হয়েছি।আপনার অবাধ্য কখনো হইনাই।কিন্তু নারী মন আমার ভিতরে লুকায়িত ভালোবাসা নিজের ভিতরে লুকিয়ে রাখতে পারিনাই।সিকদার বাড়ির মেজো ছেলে সাইমন সিকদারের সাথে আমার প্রণয় ঘটে দুই বছর আগে।বিয়ে নামক প্রলোভন দেখিয়ে দিনের পর দিন কেড়ে নেয় আমার সতীত্ব। দুই মাস আগে জানতে পারি আমি অন্তঃসত্ত্বা। বিয়ের দাবী নিয়ে সাইমন সিকদারের সামনে দাঁড়ালে আমাকে অস্বীকার করে।অস্বীকার করে আমার অনাগত সন্তানকে।এই নষ্ট শরীর নিয়ে অন্য কারো সংসারে গিয়ে আপনাদের সম্মান কলুষিত করতে পারবোনা আমি।তাই স্বইচ্ছায় নিজের প্রান বিসর্জন দিলাম।আমাকে যে সুস্থ ভাবে বাঁচতে দিলো না।তাকে ছাড়বেন না বড়ো আব্বা।আমার লাশ দাফনের আগে শেষ করে ফেলবেন ওই নরপশুকে।আর পারলে মাফ করে দিবেন আমায়।
চক্ষুদ্বয় অনলের ন্যায় জ্বলে উঠলো আহাদ মির্জার।লুঙ্গি চেপে ধরে খানিক উচু করলো।হুংকার ছেড়ে বললো,"আজমল বন্দুক নিয়ে বের হো।সিকদার বাড়ির জানোয়ারকে বলি দিতে হবে।"
ধূলো জড়ানো রাস্তায় ছুটে চলেছে তাগড়া যুবক। পিছনে জিপ নিয়ে ধাওয়া করেছে সিকদার বাড়ির ছোট কর্তা সীমান্ত মির্জা। জিপের মধ্যে অবস্থান আরো দুজনের।সাইমন সিকদার হাঁপাচ্ছে। হাত পা কেমন ভেঙে আসছে।তাকে এভাবে তাড়া করার বিষয়টা যেনো বোধগম্য হচ্ছেনা।নিজেকে বাঁচাতে রাস্তা ছেড়ে পা রাখলো ফসলি জমিতে।সেখানে জিপ ঢুকানো সম্ভব না।দৌড়ে কোনো ভাবে নিজেকে বাঁচাতে পারলেই পরে দেখে নিবে সবটা।ধান ক্ষেতের আইল দিয়ে এলোমেলো ভাবে দৌড়াচ্ছে সাইমন।জিপ ছেড়ে সাইমনের পিছু নিয়েছে সীমান্ত মির্জা।পাশেই মির্জা বাড়ির সাঙ্গপাঙ্গরা।
সাইমন দৌঁড়ানো ফাকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিলো শত্রুদের অবস্থান।বেশ কিছু দূরে আছে তারা।জঙ্গলে গা ঢাকা দিতে পারলে হয়তো এ যাত্রায় প্রানে বেঁচে যাবে।মাঠ পেরিয়ে ঢুকলো এবার জঙ্গলের ভিতরে।বাঁশের আগাছা বিশিষ্ট জায়গায় নিজেকে আড়াল করলো।শত্রুর দল ভিতরে এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে নিলো।সাইমনের দেখা নেই।
গর্জন ছাড়লো এবার সীমান্ত মির্জা।হাতের চা পাতি ছুড়ে ফেলে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
"খা/ন/কির ছেলে নিজেকে আড়াল করে রাখবি কতো সময়? তোকে খুন করে সেই রক্ত দিয়ে গোসল করবো আমি।"
শুকনো বাঁশের পাতার খচখচ শব্দ।সাইমন পা ফেলতেই শব্দ কানে পৌছালো সীমান্ত মির্জার।লুঙ্গি উঁচু করে তুলে হাঁটুতে গিট দিয়ে নিলো।আগাছা হাত দিয়ে সরাতেই দৃশ্যমান হলো সাইমনের ভয়ার্ত মুখশ্রী।
সীমান্ত মির্জা এবার হো হো করে হেসে উঠলো।আদেশ ছুড়লো সবার দিকে তাকিয়ে।
" ধর খা/ন/কির ছেলের।"
সাইমন পালানোর পায়তারা করছে।উল্টো দিকে দৌড়াতে গেলেই ধাক্কা খেলো শক্তপোক্ত কারো বুকের সাথে।ছিটকে পড়লো নিচে।উপরের দিকে চোখ পড়তেই ঢোক গিলে নিলো বারংবার। অস্পষ্ট স্বরে আওড়ালো, "কে!কে?"
মুখে পেঁচানো কালো চাদর খানা হাত দিয়ে সরিয়ে রামদা শক্ত করে চেপে ধরে সাইমনের একদম সংস্পর্শে এসে দাড়ালো আরহাম তালাত মির্জা।শ্যামলা মুখশ্রী রোদের তাপে তামাটে রুপ ধারন করেছে।কপালে চিকচিক করছে বিন্দু বিন্দু ঘাম।বাম হাত থেকে রামদা ডান হাতে তুলে নিলো আরহাম।শুকনো পাতায় শব্দ তুলে বাম পা দিয়ে সজোরে লাথি দিলো সাইমনের বুক বরাবর।ততক্ষণে পাশে এসে দাড়িয়েছে সীমান্ত মির্জা ও বাকি লোকজন।সীমান্ত মির্জা আদেশ করলো বাকিদের। কঠিন স্বরে বললো,
" ওর শরীরে হাড় মাংস আলাদা করে বস্তায় ভড়। বাসার কুত্তাকে খাওয়াবো।"
সাইমনের দিকে সবাই ঝাপিয়ে পড়তে নিলে আরহাম হাত তুলে বাঁধা দিলো সবাইকে।মুখের আভায় নেই কোনো কোমলতা।সুরমা পড়া চোখে কড়া দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সীমান্ত মির্জার দিকে।কন্ঠে গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে বললো,
"স্নেহার খুনের শাস্তি আমি নিজ হাতে নিতে চাই।এখান থেকে বিদায় হোও তোমরা।"
সীমান্ত মির্জা তাকালো আরহামের দিকে।কড়া গলায় বলল," কিন্তু তুই একা থাকলে বিপদে পড়বি।আমরা জেনেশুনে তোকে বিপদে ফেলে চলে যেতে পারিনা।"
"আমি এক কথা একবারই বলি।দুবার বলতে হলে আমার হাত উঠে যাবে।বাপ চাচা গোনার সময় থাকবেনা।যাবে নাকি এই মা/দা/রচোদের সাথে এখানেই ইন্না-লিল্লাহ করে দিবো?"
সীমান্ত মির্জা ঢোক গিললো কয়েকবার। এ ছেলেকে বিশ্বাস নেই।দশজনকে একসাথে পরাস্ত করার ক্ষমতা রাখে সে।ঠোঁট কাঁপছে জিহ্বা ভাড়ি হয়ে উঠেছে।একপা দুপা পিছিয়ে ফের সামনের দিকে পা বাড়ালো।
আরহাম এগোলো এবার সাইমনের পাশে।পায়ের কালো রঙের লোফার দিয়ে সাইমনের বুকে স্বজোরে লাথি বসালো।করুন আর্তনাদ সাইমনের।দুইহাত তুলে অনুরোধস্বরে বললো,"ভাইজান মেরে ফেলো আমারে! আমার কোনো আফসোস থাকবেনা শুধু একবার বলো আমার অপরাধটা কি?"
আরহাম বসলো এবার সাইমনের পাশে।চুলের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরে বললো,
" তোর কোন অপরাধের কথা শুনতে চাস?আমার বোনকে মিথ্যা প্রেমের ফাঁদে ফাসানো।আমার বোনকে বিয়ের মিথ্যা প্লোভন দেখিয়ে তার সতীত্ব কেড়ে নেওয়া।তাকে অন্তঃসত্ত্বা বানিয়ে সন্তানকে অস্বীকার করা।তাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা।"
আরহামের বলা প্রতিটা শব্দ বুকে ফলার মতো বিদ্ধ হচ্ছে সাইমনের।মাথার উপড় যেনো আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। কি সব বলছে বোধগম্য হচ্ছে না যেনো।কম্পিত কন্ঠে বললো,
"আ...আমি এসবের কিচ্ছু জানিনা ভাইজান।খোদারকসম আমি স্নেহাকে নিজের বোনের চোখে দেখে এসেছি সব সময়।আমি এসব করিনাই ভাইজান।আপনার দোহায় লাগে এমন অপবাদ দিবেন না আমায়।"
আরহামের মুখশ্রী এবার কঠিন থেকে আরো কঠিনতম হলো।তীর্যক চাহনী সিংহের ন্যায় গর্জন ছাড়লো।সাইমনের গলা শক্ত করে টিপে ধরে বললো,"আমার বোন মৃত্যুর আগে মিথ্যা বলে গেছে বলতে চাচ্ছিস তুই?আর একটা মিথ্যা বললে তোর কথা কেড়ে নিবো এক সেকেন্ডে।"
সাইমন থেমে থেমে বললো," স্নেহা নিজে বলে গেছে আমি এসব করেছি ভাইজান?"
"না চিঠি লিখেছে।"
" তুমি দেখেছো চিঠিখানা?"
আরহামের হুশ ফিরলো এবার।সে নিজে স্বচক্ষে চিঠি খানা দেখে নাই।ছোটবউ সোহেলী মির্জা পড়ে শুনিয়েছে।হুশ ফিরতেই চিঠিখানা বের করলো কালো কুর্তাশার্টের পকেটের ভিতর থেকে।চিঠির ভাজ খুললো দ্রুত।চিঠির কথা গুলো মিল থাকলে লেখায় মিল নাই স্নেহার সাথে।এ হাতের লেখা স্নেহার না।অন্য কেউ লিখেছে।আরহাম এবার দমলো।
শীরদ্বারা সোজা করে দাড় করালো।সাইমনের দিকে তাকিয়ে কড়াকন্ঠে জবাব দিলো,
"আরহাম তালাত মির্জা নিরাপরাধ কাউকে হত্যা করেনা।এ যাত্রায় ছেড়ে দিলাম।তবে কোনো ভাবে যদি প্রমান হয় আমার বোনের মৃত্যুর জন্য তুই দ্বায়ী খোদারকসম স্বয়ং আল্লাহ ছাড়া তোকে কেউ বাঁচাতে পারবেনা আমার হাত থেকে।তোর আজরাইল হয়ে ফিরবো আমি।"
________
মন মোর মেঘের সঙ্গী,
উড়ে চলে দিগ্‌দিগন্তের পানে
নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণবর্ষণসঙ্গীতে
রিমিঝিম রিমিঝিম রিমিঝিম॥
গ্রীষ্মের আকাশে মেঘ গুড়গুড় আকাশ তেপান্তরে।মেঘাচ্ছন্ন চারিপাশ।গানের শব্দে নুপুরের আওয়াজ তুলে ক্লাসিকাল নাচের মুদ্রায় মগ্ন লাজুক।চোখের চশমাখানা ডান হাত দিয়ে উপরের দিকে তুলে নাচের প্রতিটা মুদ্রা স্বচ্ছ হচ্ছেনা কি দিকে পর্যবেক্ষণ করছে চারুলতা।অলস বোনকে এইটুকু অনুশীলন করাতে নিজেরই দম বেড়িয়ে গেছে প্রায়।মেঘের আভা ছড়িয়ে পড়লেও সারাদিনের কাঠফাটা রোদের তেজ এখনো কমে নাই।ঘামযুক্ত মুখখানায় পানি ছিটা দিতে ছাদের কার্নিশ এসে দাড়ালো। চশমা খুলে চোখেমুখে ছিটা দিয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুখ মুছে নিলো যথাযথ।চশমা চোখে পড়ে নিয়ে সরে আসার জন্য পা বাড়াতেই চোখ পড়লো মির্জা বাড়ির প্রাচীরের দিকে।অন্দরমহলের পাশেই মসজিদের পর্দা টানানো।যে পর্দা টানিয়ে মৃতুদেহ শেষ গোসল করানো হয়।পাশেই রাখা খাটিয়া।চারুলতার বুকের মধ্যে তোলপাড়। মির্জা বাড়ির কার কি হলো?কেউ মারা গেলে আশপাশের লোকজনের জানার কথা তাহলে ওখানে হচ্ছেটা কি?সিকদার বাড়ির কারো ও বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি নেই।এই ভয় সংশয় দূর করার উপায় খুঁজছে চারুলতা।পায়ের ভাড়ি সোনার নুপুরখানা খুলে বোনের পাশে এসে দাড়ালো লাজুক।গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
" তুমি আজো লুকিয়ে লুকিয়ে আরহাম ভাইকে দেখছো?"
চারুলতা বোনের কথা কানে নিলো তবে কোনো রাগ দেখালো না।নিঃশব্দে লাজুককে কাছে টেনে এনে হাত দিয়ে প্রাচীরের ওপাশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করালো।লাজুকে বুক কাঁপছে অস্থিরতা ক্রমশ বাড়ছে।জিহ্বা আটকে যাচ্ছে। করুন দৃষ্টিতে তাকালো চারুলতার পানে।ভেজা কন্ঠে বললো,
"বুবুজান ও বাড়িতে কার কি হলো?"
"আমি জানিনা তো।এরা কেনো সব লুকিয়ে রাখে বলতো?"
"চলো না গিয়ে দেখে আসি।"
" পাগল হয়েছিস? বাবা চাচারা জানলে আমাদের লাশ গুম করে দিবে।"
" কেউ জানবে না।আমরা লুকিয়ে যাবো।"
"যাবি!যদি ধরা খাস? কঠিন শাস্তি দিবে তোকে লাজুক।তোর গায়ে হাত তুললে আমি যে নিজেকে শান্ত রাখতে পারবোনা।"
" তুমি চিন্তা করোনা বুবুজান।কেউ কিছু টের পাবে না।এসো
আমার সাথে।"
চারুলতা,লাজুক নিচে নামলো এবার।সিকদার ভিলার গিন্নি সুলতানা বেগম চাবির গোছা কাধে তুলে কর্কশ কন্ঠে বললো,
" দাঁড়াও।এই ভর সন্ধ্যা বেলায় যুবতী মাইয়ারা বাড়ি ছেড়ে কই যাইতাছো?"
চারুলতা ঢোক গিললো ভয়ে।চঞ্চল লাজুক থেমে থাকলো না কন্ঠস্বর জোরে রেখে বললো,
"বাগানে কাঁচামিঠা আম পইড়া আছে অনেক গুলা।বাগানে কেউ আইলে ওইগুলা আর থাকবো না।আমি আর বুবুজান কুইড়া আনতে যাচ্ছি। তুমি একটু মসলা বানিয়ে দাও মেজোআম্মা। আম মেখে খাবো।"
" একদম ভড় সন্ধ্যা বেলা খোলা চুলে বের হবেনা।চুল বাঁধো লাজুক।আর কতোদিন বলছি তোমারে এতো বড়ো মাইয়া পেট খোলা ঘাগড়া পড়বা না?ওড়না দিয়ে পেট ঢেকে তবেই বের হবে।"
কেশবতী লাজুক পড়লো এবার বিপাকে।এই চুল সে খোঁপা করতে জানেনা।চারুলতা আর মা ছাড়া কারো খোপাই দীর্ঘস্থায়ী হয়না বেশি সময়।চারুলতার বুড়ো আঙুল কেটেছে সবজি কাটতে গিয়ে। বাইরে বের হওয়া জরুরি কোনো উপায় না পেয়ে ঘনো কালো চুল নিজেই কোনো রকম গিট পাকিয়ে নিলো।ওড়না দিয়ে পেট ঢেকে বেড়িয়ে গেলো সিকদার ভেলা থেকে।গেটে পাহারাদার হিসেবে নিযুক্ত কাশেম।লাজুক অনুরোধ করলো কাশেমকে তাদের যেনো কিছু সময়ের জন্য বাইরে যেতে দেয়।এই মেয়ের করুন অনুরোধ ফেলার মতো সাহস নেই কাশেমের। মৃদু হেসে বললো,
"যাও তবে মেজো কর্তা বাড়ি ফেরার আগে চইলা আইসো কিন্তু।"
লাজুক চারুরহাত শক্ত করে চেপে ধরে সিকদার বাড়ির অন্দরমহলের প্রাচীরে সামনে এসে দাড়ালো। ছ'ফুট প্রাচীর টপকানোর সাধ্যি নেই পাঁচ ফুটের লাজুকের।
চারুলতা হতাশ কন্ঠে বললো," পারবি নারে লাজুক।এ প্রাচীর অনেক উঁচু আমরা টপকাতে পারবোনা।"
" চুপ করো বুবুজান।তুমি চিন্তা করোনা যেভাবেই হোক লাজুকলতা ভিতরে প্রবেশ করেই ছাড়বে।"
প্রাচীরের কোল ঘেষে বেড়ে উঠেছে কাঁটাযুক্ত বরুই গাছ।লাজুকের চোখ আটকালো সেথায়।দ্রুত গিয়ে দাড়ালো গাছের পাশে।এক পা তুলে দিতেই চারুলতা হাত চেপে ধরলো লাজুকের। কড়া কন্ঠে বললো," না লাজুক।
এ গাছের কাটা অতিরিক্ত। গায়ে ফুটবে। তোকে এভাবে যেতে হবেনা।আমরা প্রয়োজনে অন্য ভাবে যাবো।"
" তুমি সব সময় বাঁধা দিও না বুবুজান কিচ্ছু হবেনা আমার।"
লাজুক অনায়সে হাত ছাড়িয়ে নিলো।গাছ বেয়ে উঠে গেলো উপরে। মগডালে পা রাখতেই শুকনো ডাল ছিটকে এসে পড়লো চারুলতার পেটে।পেটে কাটা ফুটেছে বেশ কয়েকটা। চারুলতা নিচ থেকে চিৎকার দিতে নিলে লাজুক শব্দ করতে বারন করলো।আলগোছে ডাল সরাতে গিয়ে পেটের জায়গায় জায়গায় কেটে ছিড়ে রক্তাক্ত হলো।তবুও দমলো না লাজুক।লোকসমাগমের বাইরে লাফিয়ে পড়লো সিকদার বাড়ির জমিনে।মুখ দিয়ে বের হলো মৃদু আর্তনাদ। ভাঙা মাটির হাড়ি পায়ের তালুতে গভীর ভাবে ফুটেছে।লাজুক চোখমুখ খিচে একটানে বের করে ফেললো ভাঙা হাঁড়িরঅংশ।রক্ত তীর ছুটেছে। লাজুকের সর্বমুখে রক্তের দাগ।তবুও দমলো না হেটে চলে আসলো খাটিয়ার পাশে।বড়ো মেহেগুনি গাছের আবডালে নিজেকে আড়াল করলো।কিছুটা মুখ বের করে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো খাটিয়ার উপর।
খাটিয়া পাশে এসে বসলো এবার মালিনী বেগম।স্নেহার শরীর খানা সাদা থানে মুড়ানো।মালিনী বেগম হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়লো।ভেজা কন্ঠে অস্পষ্ট স্বরে বলছে,
" আমার সন্তান।আমার বাচ্চা।কেনো চলে গেলি আমাকে ছেড়ে? কেনো করলি এমন কাজ।আমি এখন বাঁচবো কি নিয়ে? "
চারুলতার হাতপা অবস হয়ে আসছে।মালিনি বেগমের সন্তান কানে যাওয়ার পর সর্ব প্রথম মাথায় এসেছে আরহামের নাম।ঠোট কাপছে। বিরবির করে বললো," আ....আরহাম ভাই!"
লাজুকের শরীর ভেঙে আসছে।শক্ত করে চেপে ধরলো গাছের গুড়ি।হাড় মানার মেয়ে লাজুক না।সত্যি যদি আরহামের কিছু হয়ে যায় তাহলে চারলতাকে গিয়ে কি বলবে? তার বোন যে মরে যাবে।চিন্তায় দম বেড়িয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে নিলো লাজুক।দৃষ্টি পুরোপুরি নিক্ষেপ করলো খাটিয়ার পাশে।বাতাসে আলগা হলো নিথর দেহের মুখ খানা।লাজুকের কথা হারিয়েছে।এ কাকে দেখছে?স্নেহা বুবুর বিয়ে আজ।তাহলে কি হলো এটা? নিজেকে সামলাতে পারলো না আর গাছ শক্ত করে চেপে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো।এ বাড়িতে সব চেয়ে প্রিয় মানুষটা ছিলো স্নেহা।বিকেল হলেই চুপিচুপি ছাদে গিয়ে নানা গল্প করতো তার সাথে।লাজুক কাঁদছে ভিশন কাঁদছে। গাছের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে শব্দ করে কাঁদছে।তৎক্ষনাৎ হাতে তীব্র ব্যথা অনুভব করলো।চোখ তুলে তাকলো সেদিকে।গায়ের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে লাজুকের হাত শক্ত করে চেপে ধরেছে আরহাম।ছন্নছাড়া আরহাম লাজুককে ঠেলে নিয়ে গেলো প্রাচীরের পাশে।তীব্র ধমকে বললো,
" এখানে কি?"
তুতলাচ্ছে লাজুক।ভয়ে আত্মা বের হওয়ার উপক্রম। কম্পিত গলায় বললো," স্নেহা বুবু!"
এ বাড়িতে কার কি হলো সে দিকে নজরদারি করতে বলেছে কে তোকে?এখানে ঢুকলি কি করে তুই?"
লাজুক তুতলিয়ে বললো,"প্রাচীর টপকে।"
আরহাম চোখ বুলিয়ে নিলো আশেপাশে। কড়া কন্ঠে বললো, "দুই মিনিটের মধ্যে এখান থেকে বের হয়ে যাবি।"
" কিন্তু স্নেহা বুবু?
আরহাম সিংহের গর্জন ছেড়ে বললো,
"লাজুকলতা আরহাম দুইবার কোনো কিছু বলা পছন্দ করেনা।সিকদার বাড়ির গোরস্থানে জিন্দা পুতে দিবো আর একটা কথা বাড়ালে।"
লাজুক চলে যাওয়ার জন্য তাকালো প্রাচীরে দিকে।আসার সময় গাছ বেয়ে নেমেছে।এখন তো গাছ ওপাশে।পাড় হবে কি করে?ভয়ে শুকনো ঢোক গিললো আরহামের দিকে চেয়ে। আরহাম যেনো বুঝলো লাজুকের চোখের ভাষা। উচ্চতা শারীরিক গঠন অনুযায়ী লাজুককে অনায়াসে প্রাচীরের উপর তুলে দিতে পারবে আরহাম।কোন কিছু না ভেবে লাজুককে শক্ত করে চেপে ধরে প্রাচীরের উপর তুলে দিলো।ফের কড়া কন্ঠে বললো,
"বাড়ি যা।এ বাড়িতে আর কখনো দেখলে ঠ্যাং খোড়া করে দিবো।"
লাজুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাফ দিলো নিচে।হাতে ভড় দিয়ে উঠতে নিলেই চোখ পড়লো মাটিতে। ঢোক গিলে নিলো কয়েকবার। আজ বুঝি আর রক্ষা নেই তার।

Post a Comment

0 Comments