তিন বছর ধরে যাকে পা’গলের মতো খুঁজে বেরাচ্ছে। যার কথা ভেবে দিন ও রাতের সেকেন্ড মিনিট ঘন্টা পার করেছে। আজ সেই মানুষটা আয়াজ আবরার মির্জার বাম বাহুতে নিস্তেজ হয়ে ঢলে পরেছে। মাত্রই মেয়েটি জ্ঞান হারিয়েছে। আনুমানিক একুশ কি বাইসের অপ্সরা নারী সে। তিন বছর আগে এক নজর শুধু মাত্র এক নজর দেখেই আয়াজ আবরার মির্জার দুনিয়া উলোট পালোট হয়ে গিয়েছিলো। যার জন্য শক্ত পোক্ত পাথর মনটা তুলের মতো নরম হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু কি লাভ হলো তাতে? তার মনের রাজ্যে সদ্য আগমনী অপ্সরা চোখের পলকে আড়াল হয়ে যায়। অনেক খুজেও লাভ হয়নি।
এই মুহূর্তে আবরার কি করবে ভেবে পাচ্ছে না কিছু। এই তো কিছুক্ষণ আগ পর্যন্ত দিব্যি গাড়ি ড্রাইভ করছিলো ও। ঢাকা থেকে জরুরী কাজে সকালেই মানিকগঞ্জ এসেছিলো। কাজ শেষ করতেই দিন পার হয়ে ধরণীর বুকে সন্ধ্যার প্রহর নামে। কর্মস্থলের সবাই ওকে থাকতে বললেও সে থাকেনি। আগামীকাল আবার ঢাকায় দলিয় মিটিং রয়েছে। তাই কোনোমতে থাকা যাবে না। সাথে তার সহকারী ভাই বন্ধু শাওন। ওকে নিয়েই সব জায়গায় যাওয়া হয় আয়াজ আবরারের। এক কথায় শাওন ওর সর্ব কাজের সঙ্গী।
রাজনীতির সঙ্গে ওৎপ্রোত ভাবে জরিত আয়াজ আবরার মির্জা। বলা যায় রাজনীতি ওর রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। বংশ পরম্পরায় পরিবারের সব পুরুষ গুলো রাজনীতি করে আসছে। সেই সূত্র ধরে আয়াজ মির্জা পাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের একজন। ছাত্র জীবন থেকেই ওর রাজনীতির পথ চলা শুরু হয়েছে। ত্রিশ বছর চলছে ওর। আর এই বয়সেই হয়ে উঠেছে দক্ষ রাজনীতিবিধ। একজন পাকা রাজনীতিবিধের চেয়ে কোনো অংশে কম যায় না আবারার। এজন্য বাবা আর চাচা আবারার কে নিয়ে অনেক গর্ব করে থাকে। যদিও বাবা চাচাদের থেকেই রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছিলো ওর।
খোশ মেজাজে আজকের মতো মিটিং শেষে আবরার মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকার পথে ওর যাত্রা শুরু করেছিলো। বেশ ভালো ভাবেই আবরার গাড়ি ড্রাইভ করছিলো। পাশের সিটে শাওন বসা। গাড়িতে উঠেই আবরার আয়াজ মৃদু শব্দে হিন্দি গান চালিয়ে দেয়। মনটা ওর কঠিন হলেও গান শোনার সময় স্যাড গান শোনে। শাওনের আবার স্যাড গান শুনলে ভিষণ ঘুম পায়। ওর বুঝে আসে না এই দুঃখে ভরা স্যাড গান শুনে কি লাভ? আবরার ভাইয়ের মনে এতো দুঃখ কিসের? ভাই তো তার কাজ কর্ম করেই কূল পায় না। এসব আকাশ পাথাল চিন্তা ভাবনা করতে করতে বেচারা শাওন গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে গিয়েছে।
বাংলা মাসের আশ্বিন মাস। যখন তখন বৃষ্টি শুরু হয়। আজকের পুরো দিনটা বৃষ্টি ছাড়া কাটলেও ইতি মধ্যে আকাশে ভিষণ মেঘ জমেছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি সাথে মেঘের ঘর্ষণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এভাবে কেটে যায় অনেকটা সময়। এরপরেই আকাশের বুক চিরে বৃষ্টি পরতে শুরু করেছে। বৃষ্টির গতি কম থাকায় গাড়ি চালাতে আয়াজের তেমন সমস্যা হচ্ছে না। এভাবে প্রায় চল্লিশ মিনিট অতিবাহিত হবার পর হঠাৎ আয়াজ কষিয়ে গাড়ি ব্রেক করে। হঠাৎ ব্রেক করায় ঘুমন্ত শাওন ধরফরিয়ে ওঠে। বুকে থু থু ছিটিয়ে এদিক সেদিক লক্ষ্য করে। বেচারা ধরেই নীয়েছে বড়ো সরো এক্সিডেন্ট বোধ হয় হয়েই গেলো।
বিদ্যুতের ঝলকানি সাথে মৃধু বৃষ্টি পরছে। এমন সময় দূর থেকেই সামনে কিছু একটা দেখছিলো আয়াজ। দেখতে দেখতে সেটা একসময় আরো স্পষ্ট হয়। কিছুটা কাছে আসতেই বুঝতে পারে "আরেহ্ এতো জলজ্যান্ত মানুষ একটা! তাও আবার মেয়ে মানুষ। চুল গুলো ছেড়ে দেওয়া। এলোমেলো এলোকেশী, কেমন নির্জীব হয়ে হেটে গাড়ির সামনে চলে আসে সে। প্রথমে দেখে মনে হয়েছিলো কোনো ভূত পে'ত্নি হবে হয়তো। কিন্তু নাহ, গাড়ির হেড লাইটের আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কালো রঙের শাড়ি পরা এক অল্প বয়সী ললনা সে। আচল তার মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
সঠিক সময়ে আয়াজ ব্রেক করলেও সামনের মানবী গাড়ির ডিকির সামনে এসে দাড়িয়ে পরে। একটুর জন্য গাড়ির সাথে ধাক্কা লাগেনি তার। মূর্তির ন্যায় নির্বিক তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে কিছু আনমনে ভেবেই চলছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে "নিশ্চিত সে ম’রার জন্যই গাড়ির সামনে ইচ্ছে করেই ঝাঁপ দিয়েছে। ঠিক তখনই
“ওহ শীট” বলে আয়াজ গাড়ির দরজা খুলে যেই না বের হতে যাবে ওমনি শাওন ওর বাম হাত ধরে ফেলে। আয়াজ শাওনের দিকে তাকায়। শাওন ঢোক গিলে কাপা স্বরে বলে ওঠে
“আয়াজ ভাই যাবেন না প্লিজ। এমন নির্জন রাতে ভূত পেত্নি ছাড়া কিছুই চলাচল করে না। এটা নির্ঘাত কোনো মায়াবিনী হবে। সে মায়াবি জাল বিছিয়েছে। সামনে গেলে তার ফাদে পা দিতেই ধরে সোজা ঘার মটকাবে। প্রথমে আপনারটা, পরে আমারটা।
ওর কথা শুনে আয়াজের মেজাজ খারাপ হয়। রাগের সহিত নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয় ওর হাত থেকে। মুখে ওর বিরক্তির ছাপ। একটু জোড়েই ওকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে
“স্টপ ননসেন্স। এসব কি ধরনের লজিক ছাড়া কথা বার্তা? একটা মেয়ে নির্ঘাত বিপদে পরেছে। আর তুই কিনা কি সব ভুল বা*ল বকছিস।
বলেই আয়াজ গাড়ি থেকে নেমে তড়িগরি করে গাড়ির সামনের দিকে চলে আসে। মেয়েটি তখনও নির্জীব ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। আয়াজ ছাতা না নিয়েই বেরিয়ে পরে। তখন বৃষ্টির বরফ ঠান্ডা বড়ো বড়ো ফোঁটা গুলো আয়াজকে ছুয়ে দিচ্ছে। শরিরটা মুহূর্তেই কেপে ওঠে ওর। বৃষ্টির জলে যার ঠান্ডা কাশি আর এলার্জির সমস্যা। আজ সে সবে মোটেও তোয়াক্কা করছে না আয়াজ। ওর কি হবে সেই ভাবনা মনে কাজ করছে না। বরং মেয়েটির কাছে গিয়ে জোড় গলায় বলতে থাকে
“এই যে শুনছেন? এতো রাতে এখানে কি করছেন? আর গাড়ির সামনেই কেনো এসে পরছেন? আর একটু হলে তো গাড়ির নিচে চলে যেতেন।
কিন্তু ওর করা একটা প্রশ্নের জবাব ও অপর পক্ষ থেকে আসে না। একটু বিরক্ত নিয়ে আয়াজ আরেকটু কাছে এগিয়ে যায়। বুজতে পারে মেয়েটি অতিরিক্ত ভেজার ফলে শরিরে কাপুনি ধরে গেছে তার। আরো কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই মেয়েটি নিস্তেজ হয়ে পরে যেতে লাগলে আয়াজ ওর হাতের বন্ধনিতে দ্রুত মেয়েটিকে আবদ্ধ করে নেয়। তখনও মেয়েটির দীঘল কালো ভেজা চুল গুলো মুখের ওপর লেপ্টে আছে। তাই চেহারা ঠিকঠাক বোঝা যাচ্ছে না। কোনো দ্বিধা দ্বন্দ্ব ছাড়াই মেয়েটির মুখ থেকে চুল সরাতেই আয়াজ স্তব্ধ হয়ে যায়। জোড় গলায় তখন শাওন কে ডাকতে থাকে। অচেতন মেয়েটির দিকে চেয়ে ঢোক গিলে আবরার আয়াজ। আর বির বির করে বলতে থাকে
“প্রিয়তম, “এক শ্রাবণঝরা সন্ধ্যায়” তুমি আমার মন কেড়ে নিয়েছিলে। আবার সেই শ্রাবণঝরা সন্ধ্যায় নতুন করে এসে আবার ধরা দিলে। আর পালাতে পারবে না প্রিয়। একবার যেহেতু বাহুড়োরে আবদ্ধ করে নিয়েছি, তো আর সহজে ছাড়ছি না জান।”
এরমধ্যে শাওন ছাতা নিয়ে গাড়ি থেকে বের হয়ে আসে। গাড়ির সামনে আসতেই ও আৎকে ওঠে। জোড় গলায় বলতে থাকে
“আয়াজ ভাই এটা কি করলেন? মেয়েটি ম,রে গেছে নাকি? আল্লাহ নির্ঘাত পুলিশ কে’স হবে। এহার মনে হয় জেলের ভাত খেতেই হবে। এ জন্যই বারবার নামতে নিষেধ করেছিলাম। এখন কি হবে?
ওস এমন উদ্ভট কথা বার্তা শুনে আয়াজের মন চাইছে শাওনকে কষিয়ে একটা চড় মা'রতে।
“জাস্ট স্যাটআপ শাওন। গাড়ির পেছনের দরজা খোলো, কুইক। এখনই মেয়েটাকে নিয়ে ঢাকার পথে রওয়ানা হতে হবে।
“ভাই এ কাজ করবেন না। সমস্যায় পরবেন। হতে পারে আপনার জন্য এটা কেনো। ফাঁদ। আপনার শত্রুর কিন্তু অভাব নেই। তাই বলছি…..
বাকি কথা শেষ করার আগেই আয়াজ বলে ওঠে
“স্টপ ইউর মাউথ। যা বলছি তাই করো। বেশি দেরি হলে খারাপ কিছু ঘটতে পারে। এমনিতেই মাথায় কাজ করছে না কিছু। যাথা সময়ে মেয়েটির চিকিৎসা না করতে পারলে একটা অঘটন ঘটতে পারে।
ওর কথা শুনে শাওন আর রথা বাড়ায় না। চুপচাপ ওঠে দ্রুত গিয়ে গাড়ির পেছনের দরজা খোলে। আয়াজ মেয়েটিকে পাজা কোলে তুলে গাড়ির পেছনের সিটে নিয়ে শুইয়ে দেয়। শাওন কে বলে ড্রাইভ করতে। যেহেতু শাওন নিজেও খুব ভালো ড্রাইভ করতে পারে। আওয়াজ মেয়েটির সাথে পেছনের সিটে বসে। অচেতন মেয়েটির মাথা ওর কোলের ওপর রেখে গাড়ির দরজা বন্ধ করে শাওন কে গাড়ি স্টার্ট দিতে বলে। অভয় শুনে শাওন আর দেরি করে না। গাড়ি আবারও চলছে ঢাকার পথে। শাওন গাড়ির মিররে খেয়াল করে আয়াজকে। খুব চিন্তিত দেখা যাচ্ছে ওকে। শাওন আরো ভাবে
“এমন অজানা অচেনা একটা মেয়ের জন্য ভাই এতোটা অস্থির হচ্ছে কেনো? আর কেনোই বা তার চোখে মুখে এতো চিন্তার ছাপ দেখা যাচ্ছে? তাহলে কি মেয়েটা আয়াজ ভাইয়ের পূর্ব পরিচিতো কেউ হবে?

0 Comments