যখন_বাবাই_শত্রু

যখন_বাবাই_শত্রু

 আমার ছোট্ট মেয়েটা হোটেলের সুইমিং পুলে পড়ে যাওয়ার ঠিক আগে আমার বোনের মুখে যে হাসিটা দেখেছিলাম, সেটা আজও ভুলতে পারিনি। আর যখন ওকে বাঁচাতে ছুটলাম, তখনই বাবা আমার হাত শক্ত করে ধরে বললেন—‘যেতে হবে না!’ সেদিন তারা বুঝতেই পারেনি, এরপর আমি তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় জিনিসটাই কেড়ে নেব।

প্রথমে ভেসে এলো আমার মেয়ে ইভার খিলখিল হাসি।
তারপরই—
ঝপাং!
পানিতে কিছু পড়ার শব্দ।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার মাথা যেন কাজ করছিল না।
কী ঘটেছে, সেটা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না।
ঈদের ছুটিতে আমরা সবাই কক্সবাজারের একটি রিসোর্টে বেড়াতে এসেছিলাম।
ইভা পুলের ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। হলুদ রঙের সুন্দর ফ্রক, সাদা ছোট্ট সোয়েটার আর চকচকে রূপালি জুতো পরে হাতে এক গ্লাস লেবুর শরবত ধরে হাসছিল।
ঠিক তখনই আমার ছোট বোন বৃষ্টি ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
তার ঠোঁটে সেই চেনা হাসি—যে হাসি দেখলেই বুঝতাম, সে কোনো না কোনো দুষ্টুমি করতে যাচ্ছে।
পরের মুহূর্তেই...
ইভা সোজা পানিতে পড়ে গেল।
চারপাশে সবাই চিৎকার করে উঠল।
কেউ একজন বলল,
— "বাচ্চাটা পানিতে পড়ে গেছে!"
আমি এক মুহূর্তও দেরি করিনি।
হাতের ব্যাগটা মাটিতে ফেলে, স্যান্ডেল খুলে দৌড়ে পুলের দিকে ছুটলাম।
ঠিক তখনই কেউ আমার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।
পেছনে তাকিয়ে দেখি—
আমার নিজের বাবা।
— "বাবা, হাত ছাড়ো!"
আমি চিৎকার করে উঠলাম।
কিন্তু তিনি ছাড়লেন না।
পুলের ধারে দাঁড়িয়ে আমার বোন বৃষ্টি দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে নির্বিকারভাবে সবকিছু দেখছিল।
আমার মা মুখে হাত চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু এক পা-ও সামনে এগোলেন না।
আর আমার ভাই মাথা নিচু করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল, যেন এটা তাদের কাছে কোনো নতুন ঘটনা নয়।
আমি প্রাণপণে বাবার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছিলাম।
কাঁদতে কাঁদতে বললাম,
— "বাবা! ওকে বাঁচাতে হবে!"
বাবা আমার কানের কাছে মুখ এনে ঠান্ডা গলায় বললেন,
— "থাক... একটু শিক্ষা হোক।"
সেই মুহূর্তে আমার ভেতরে কিছু একটা চিরতরে বদলে গেল।
রাগ নয়।
ক্ষমাও নয়।
এর থেকেও অনেক বেশি ঠান্ডা, কঠিন একটা অনুভূতি।
বাবার হাতের চাপ একটু ঢিলে হতেই আমি নিজেকে ছাড়িয়ে সোজা পানিতে ঝাঁপ দিলাম।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ইভাকে খুঁজে পেলাম।
সে ভয়ে কাঁপছে, আমার গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে।
আমি তাকে নিয়ে কোনোমতে পুলের বাইরে উঠে এলাম।
ও কাঁপছিল।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
আমি চিৎকার করে বললাম,
— "কেউ অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন! দ্রুত!"
রিসোর্টের কর্মচারীরা দৌড়ে এলো।
একজন ইভার গায়ে শুকনো তোয়ালে জড়িয়ে দিল।
আরেকজন আমাদের পাশে বসে রইল, যতক্ষণ না অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছায়।
আমার বোন বৃষ্টি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— "আরে, এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে? আমি তো শুধু মজা করছিলাম!"
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আমার বাবা সবার সামনে উচ্চস্বরে বললেন,
— "এখনকার বাচ্চাদের একটু শাসন দরকার।"
হাসপাতালে পুলিশ যখন আমাকে জিজ্ঞেস করল—
"আসলে কী ঘটেছিল?"
আমি কাঁচের ওপাশে তাকালাম।
আমার ছোট্ট মেয়েটা কম্বলে মোড়ানো অবস্থায় ঘুমিয়ে আছে।
সে নিরাপদ।
তারপর আমি ধীরে ধীরে ঘুরে আমার পরিবারের দিকে তাকালাম।
সারা জীবন তারা ভেবেছিল—
আমি সবসময় পরিবারের পক্ষেই থাকব।
কখনো নিজের সন্তানের জন্য তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াব না।
কিন্তু তারা জানত না...
সেদিনের পর আমি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিলাম, যা তাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সবকিছুই কেড়ে নেবে।

Post a Comment

0 Comments