ঘৃণার ভালোবাসার গল্প❤️

ঘৃণার ভালোবাসার গল্প❤️


হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে অর্কের হাত কাঁপছে।
খামের ভেতর থেকে বের করা পুরোনো জন্মসনদের দিকে সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
চোখের সামনে যেন পৃথিবীটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।
চিঠির পরের লাইনগুলো পড়তেই তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
"আঠারো বছর আগে যে নবজাতক কন্যাশিশুকে শেখ পরিবার নিজেদের মেয়ে হিসেবে বড় করেছে, সে তাদের রক্তের সন্তান নয়। হাসপাতালের একটি ভয়াবহ ভুলের কারণে দুই নবজাতক বদলে যায়। সত্যটা জানতেন মাত্র তিনজন মানুষ। তাদের মধ্যে দুজন আর বেঁচে নেই।"
অর্ক চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল।
তাহলে...
দাদাজান এতদিন ধরে এই সত্য লুকিয়ে রেখেছেন!
আর মীরা...
সে নিজের পরিচয়ই জানে না।
ঠিক তখনই পেছন থেকে অবিরের কণ্ঠ ভেসে এলো।
— "কী লুকাচ্ছেন আপনি?"
অর্ক দ্রুত চিঠিটা ভাঁজ করে পকেটে রেখে দিল।
— "কিছু না।"
অবির তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল,
— "মিথ্যা বলবেন না। আমি অনেক কিছুই দেখেছি, অনেক কিছুই শুনেছি। এই বিয়ের পেছনে বড় একটা রহস্য আছে।"
অর্ক কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
— "যদি সত্যিই মীরাকে ভালোবাসো, তাহলে এখন কোনো প্রশ্ন কোরো না।"
অবির হতবাক।
— "ভালোবাসি মানে?"
অর্ক শান্তভাবে উত্তর দিল,
— "ছোটবেলা থেকে তোমার চোখে আমি সেই অনুভূতি দেখেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি তোমার শত্রু নই।"
কথাগুলো বলে অর্ক চলে গেল।
অবির স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো, অর্ক যেন তাকে কোনো অদৃশ্য বিপদ থেকে দূরে রাখতে চাইছে।
হাসপাতালের কেবিনে দাদী আমেনা খাতুন ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরলেন।
চোখ খুলেই তিনি চারদিকে তাকালেন।
তারপর কাঁপা গলায় বললেন,
— "মীরাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।"
সবাই অবাক হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর মীরা ভেতরে ঢুকল।
দাদী তার হাত শক্ত করে ধরে চোখ ভিজিয়ে বললেন,
— "তোর ডান কাঁধের পেছনে... একটা জন্মদাগ আছে?"
মীরা অবাক হয়ে গেল।
— "হ্যাঁ... কিন্তু আপনি জানলেন কীভাবে?"
দাদীর মুখ মুহূর্তেই সাদা হয়ে গেল।
তিনি চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে বললেন,
— "হুবহু... ঠিক আগের মতোই..."
ঠিক তখনই শেখ জামান দ্রুত কেবিনে ঢুকে পড়লেন।
তিনি দাদীর কথা থামিয়ে দিয়ে বললেন,
— "ডাক্তার বিশ্রাম নিতে বলেছেন। এখন আর কোনো কথা নয়।"
দাদী প্রতিবাদ করতে চাইলেন।
কিন্তু শেখ জামানের কঠিন দৃষ্টি দেখে চুপ হয়ে গেলেন।
মীরা বুঝে গেল—
তার কাছ থেকে আবারও কিছু লুকানো হচ্ছে।
রাতের দিকে সবাই বাড়ি ফিরে এলো।
সারা বাড়ি নিস্তব্ধ।
কিন্তু মীরার চোখে ঘুম নেই।
সে ঠিক করল—
আজ উত্তর না নিয়ে সে ঘুমাবে না।
ধীরে ধীরে অর্কের স্টাডি রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
দরজাটা আধখোলা।
ভেতরে কেউ নেই।
টেবিলের ওপর রাখা ছিল সেই পুরোনো ডায়েরি।
এবার আর নিজেকে আটকাতে পারল না।
ডায়েরির প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরে লেখা—
"যদি কখনো এই ডায়েরি মীরার হাতে পড়ে... তাহলে বুঝবে সত্য লুকিয়ে রাখা আর সম্ভব নয়।"
মীরার বুক কেঁপে উঠল।
সে দ্রুত পরের পাতা উল্টাল।
সেখানে একটি পুরোনো পরিবারের ছবি।
ছবিতে শেখ জামান, রাহেলা বেগম, আর তাদের কোলে একটি নবজাতক।
কিন্তু ছবির নিচে লেখা তারিখ দেখে মীরা থমকে গেল।
তার জন্মতারিখের সঙ্গে মিলছে না!
আরও নিচে লেখা—
"এই শিশুটি এক সপ্তাহ পর নিখোঁজ হয়ে যায়..."
ঠিক তখনই পিছন থেকে একটি গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল—
— "ডায়েরিটা বন্ধ করো, মীরা।"
সে চমকে ঘুরে দাঁড়াল।
দেখল অর্ক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।
তার চোখে আজ প্রথমবার ভয় স্পষ্ট।
মীরা কাঁপা গলায় বলল,
— "আমার আসল পরিচয় কী?"
অর্ক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— "তুমি উত্তর জানতে চাও?"
— "হ্যাঁ।"
— "তাহলে প্রস্তুত থেকো। কারণ সত্য জানার পর হয়তো তুমি এই বাড়িতে আর এক মুহূর্তও থাকতে চাইবে না।"
মীরা দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— "মিথ্যার মধ্যে বাঁচার চেয়ে সত্য জেনে কষ্ট পাওয়া অনেক ভালো।"
অর্ক গভীরভাবে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে ডায়েরির শেষের দিক থেকে একটি সিল করা খাম বের করল।
খামের ওপর লাল কালিতে লেখা মাত্র চারটি শব্দ—
"শুধু মীরার জন্য..."
অর্ক খামটি মীরার হাতে তুলে দিল।
মীরা কাঁপতে কাঁপতে সিল ভাঙতে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ হঠাৎ নিভে গেল।
চারদিকে ঘন অন্ধকার।
আর অন্ধকারের মধ্যেই নিচতলা থেকে ভেসে এলো এক নারীর আতঙ্কিত চিৎকার—
"বাঁচাও...! কেউ একজন দাদাজানকে মেরে ফেলেছে...!"
মীরার হাত থেকে খামটি মেঝেতে পড়ে গেল।
অর্ক দৌড়ে দরজার দিকে ছুটল।
আর শেখ বাড়ির বহু বছরের গোপন রহস্য রক্তের গন্ধে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল...

নিচতলা থেকে ভেসে আসা চিৎকারে মুহূর্তের মধ্যেই পুরো শেখ বাড়ি আতঙ্কে কেঁপে উঠল।
অর্ক সবার আগে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল।
তার পেছনেই দৌড়ে এল মীরা, অবির এবং বাড়ির অন্য সদস্যরা।
ড্রয়িংরুমের সামনে পৌঁছাতেই সবাই থমকে দাঁড়াল।
মেঝেতে পড়ে আছেন শেখ জামান।
তার মাথার পাশে রক্ত ছড়িয়ে আছে।
রাহেলা বেগম কাঁদতে কাঁদতে স্বামীর মাথা কোলে নিয়ে বসে আছেন।
— "কেউ ডাক্তার ডাকো! প্লিজ...!"
অর্ক দ্রুত শেখ জামানের নাড়ি পরীক্ষা করল।
কয়েক সেকেন্ড পর সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
— "উনি বেঁচে আছেন। মাথায় আঘাত লেগেছে। দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।"
বাড়ির সবাই মিলে শেখ জামানকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
কিন্তু যাওয়ার আগে অবিরের চোখ পড়ল মেঝেতে পড়ে থাকা একটি ভাঙা ব্রোঞ্জের ফুলদানির দিকে।
সেটিতেই রক্ত লেগে আছে।
আর ঠিক তার পাশেই পড়ে আছে একটি কালো রঙের বোতাম।
অবির বোতামটি চুপচাপ পকেটে রেখে দিল।
তার মনে হলো—
এটা হয়তো হামলাকারীর জামা থেকে ছিঁড়ে পড়েছে।
হাসপাতালে পৌঁছে ডাক্তার জানালেন,
— "আঘাত গুরুতর হলেও রোগী এখন বিপদমুক্ত। তবে জ্ঞান ফিরতে কিছুটা সময় লাগবে।"
সবাই কিছুটা স্বস্তি পেল।
কিন্তু মীরার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—
কে আক্রমণ করল শেখ জামানকে?
আর কেন?
রাত গভীর হলে অর্ক একা হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এলো।
ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে ভারী কণ্ঠ ভেসে এল।
— "তুমি কথা রাখোনি, অর্ক।"
অর্কের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
— "আপনি কে?"
লোকটি হেসে উঠল।
— "আমি কে, সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো। শুধু মনে রেখো, যদি মেয়েটা সত্য জেনে যায়... তাহলে শুধু শেখ পরিবার নয়, তুমিও সব হারাবে।"
লাইন কেটে গেল।
অর্ক কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
তার কপালে ঘাম জমে উঠেছে।
এতদিন পর...
সে আবার ফিরে এসেছে!
এদিকে বাড়িতে ফিরেও অবিরের মাথা থেকে কালো বোতামের কথা সরছে না।
সে পুরো বাড়ি ঘুরে সবার পোশাক লক্ষ করতে লাগল।
হঠাৎ তার চোখ পড়ল শেখ পরিবারের পুরোনো ম্যানেজার করিম চাচার ওপর।
তার পাঞ্জাবির একেবারে উপরের বোতামটি নেই।
অবির এগিয়ে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে বলল,
— "চাচা, আপনার বোতামটা কোথায় গেল?"
করিম চাচা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললেন,
— "ও... পুরোনো জামা। হয়তো কোথাও ছিঁড়ে পড়েছে।"
অবির আর কিছু বলল না।
কিন্তু তার সন্দেহ আরও গভীর হলো।
পরদিন সকালে মীরা একা নিজের ঘরে বসে ছিল।
হঠাৎ তার মনে পড়ল—
বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার আগে অর্ক তাকে যে খামটি দিয়েছিল!
সে তাড়াতাড়ি ঘরের মেঝে খুঁজতে লাগল।
কিন্তু খামটি নেই।
পুরো ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজেও কিছুই পাওয়া গেল না।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
অর্ক ভেতরে ঢুকল।
মীরার মুখ দেখেই সে বুঝে গেল কী হয়েছে।
— "খামটা খুঁজছ?"
— "হ্যাঁ। সেটা কোথায়?"
অর্ক কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল,
— "খামটা হারায়নি। কেউ নিয়ে গেছে।"
— "কে?"
— "যে এতদিন ধরে সত্যিটাকে লুকিয়ে রাখতে চাইছে।"
মীরা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
— "আপনি এত কিছু জানেন, তবু কিছুই বলছেন না কেন?"
অর্ক ধীরে ধীরে বলল,
— "কারণ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখাটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।"
— "আমার প্রাণেরও কি ঝুঁকি আছে?"
অর্ক কোনো উত্তর দিল না।
তার নীরবতাই যেন সব বলে দিল।
সেদিন বিকেলে হাসপাতালে শেখ জামানের জ্ঞান ফিরল।
তিনি চোখ খুলেই চারদিকে তাকালেন।
তারপর কষ্ট করে বললেন,
— "মীরা... কোথায়?"
মীরা এগিয়ে এলো।
শেখ জামান কাঁপা হাতে তার হাত ধরলেন।
চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
— "আমি... অনেক বড় অন্যায় করেছি।"
মীরা হতবাক।
— "কী অন্যায়?"
শেখ জামান কিছু বলতে যাচ্ছিলেন।
ঠিক তখনই কেবিনের দরজা হঠাৎ জোরে খুলে গেল।
একজন পুলিশ অফিসার ভেতরে ঢুকলেন।
তার সঙ্গে ছিলেন এক মধ্যবয়সী নারী।
মহিলার চোখ দুটো কান্নায় ভেজা।
পুলিশ অফিসার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
— "মিস্টার শেখ জামান, আঠারো বছর আগে হাসপাতাল থেকে নিখোঁজ হওয়া এক নবজাতকের মামলাটি আবার তদন্ত শুরু হয়েছে।"
পুরো কেবিন নিস্তব্ধ।
মহিলাটি কাঁপতে কাঁপতে মীরার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
তারপর হঠাৎ মীরার মুখ দু'হাতে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।
— "আমার মেয়ে...! এত বছর পর আমি তোকে খুঁজে পেলাম!"
মীরা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
সে এক পা পিছিয়ে গেল।
— "না... আপনি ভুল করছেন।"
মহিলা কাঁদতে কাঁদতে নিজের ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো শিশুর হাতের রূপার বালা বের করলেন।
— "এই বালার জোড়ার আরেকটা এখনও তোর হাতেই আছে... জন্মের সময় আমি নিজের হাতে পরিয়ে দিয়েছিলাম।"
মীরা বিস্ময়ে নিজের হাতের দিকে তাকাল।
শৈশব থেকেই পরে থাকা সেই ছোট্ট রূপার বালাটি...
যেটার ইতিহাস সে কখনো জানত না।
অর্ক চোখ বন্ধ করে ফেলল।
সে বুঝে গেল—
যে সত্য এতদিন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল...
আজ তা আর থামানো যাবে না।
আর শেখ পরিবারের ইতিহাস এখন এমন এক মোড় নিতে চলেছে, যেখান থেকে আর কেউ আগের জীবনে ফিরে যেতে পারবে না।

Post a Comment

0 Comments