একদিন_বিকালে_সকাল_হয়েছিল

একদিন_বিকালে_সকাল_হয়েছিল

 'সবার নি‌ষেধ করা স‌ত্ত্বেও তুই ঐ অপয়া বিধবা মে‌য়েটা‌কে বি‌য়ে ক‌রে কেন আন‌লি ভাই। তোর কা‌ছে ঐ অপয়া মে‌য়েটাই সব? আমরা কেউ নই? তোকে বি‌য়ে থে‌কে আটকা‌নোর জন্য আমি রাগ ক‌রে বা‌ড়ি থে‌কে চ‌লে গেলাম, ভাবলাম তা‌তে য‌দি তুই ফি‌রিস কিন্তু তুই কী কর‌লি? সবাই‌কে এক‌দি‌কে রে‌খে ঐ মে‌য়েটা‌কে এক‌দি‌কে রাখ‌লি? লজ্জা ক‌রে না তোর এত বছর যা‌কে ভা‌গ্নি ম‌নে কর‌তি আজ তা‌কে বি‌য়ে ক‌রে স্বামী-স্ত্রীর ম‌তো থাক‌তে?'

শশীর কথা শু‌নে রেনু আর সেখা‌নে দাঁড়া‌লো না। চুপচাপ নি‌জের রুমে চ‌লে গে‌ল। ও জা‌নে এখা‌নে আজ ওর কিছু বলা বেমানান।
শিহাব শশীর মাথায় হাত দি‌য়ে বলল,
'বাচ্চা অ‌নেকদূর জা‌র্নি ক‌রে এসে‌ছিস আগে বস, বিশ্রাম নে তারপর তো‌কে সবটা বু‌ঝি‌য়ে বল‌ছি। আশাক‌রি তোর বু‌দ্ধি এতটা লোপ পায়‌নি যে, ভাই‌য়ের বি‌য়ের প‌রের দিন তুই তামাশা ক‌রে লোক জড়ো কর‌বি?'
শশী বেশ রাগ ক‌রে চে‌ঁচি‌য়ে বলল,
'তুই যে তামাশা করে রাখ‌ছিস তারপর আমরা যা-ই করি না কেন তা তোর তামাশার ন্যায় ক্ষুদ্র ম‌নে হ‌বে। এত বছর জেদ ধ‌রে রইলি বি‌য়ে কর‌বি না ব‌লে। শেষ মেস বিয়ে কর‌লি তাও একটা বিধবা মে‌য়েকে। যে মে‌য়ে কি না বি‌য়ের সাত দি‌নের মাথায় স্বামী খে‌য়ে‌ছে। শোন ভাই ঐ মে‌য়ের স্বামী খাবার ভা‌গ্যের কার‌ণে তোর য‌দি কো‌নো ক্ষ‌তি হয় ওকে আমি খুন ক‌রে ফেলব। কোথায় অপায়া বজ্জাতটা? প্রথম স্বামী খে‌য়ে আবার র্নিল‌জ্জের ম‌তো নাচ‌তে নাচতে দ্বিতীয় বি‌য়ে ক‌রে ফেল‌ছে। কোথায় সে?'
শশী রেনুর ঘ‌রের দি‌কে রওনা দি‌ল। শশী রেনুর ঘ‌রে প্র‌বেশ ক‌রে, রেনুর দি‌কে তা‌কি‌য়ে কিছুক্ষণ কিংকর্তব্য‌বিমূঢ় হ‌য়ে দাঁ‌ড়ি‌য়ে রইল। রেশ‌মের ম‌তো মোলা‌য়েম দেখ‌তে মে‌য়েটা। সৌন্দর্য যেন সারা শরীর বে‌য়ে উঁপ‌চে পড়‌ছে, ঠিক চাঁ‌দের ম‌তো স্নিগ্ধ মে‌য়েটা। শশীর অনেকটা ঘো‌রের ম‌তো লেগে গে‌ল।
ম‌নে ম‌নে ভাবল,
'এত সুন্দর মে‌য়েটা কী ক‌রে বা‌জে কথা বলব! ঘো‌রের মা‌ঝেই শশী রেনুর মু‌খোমুখি দাঁ‌ড়ি‌য়ে বলল,
'বাহ্ কী সুন্দর তুমি!'
প‌রোক্ষ‌ণেই নি‌জের ক‌ঠিন রূপ ধারণ ক‌রে বলল,
'এই সৌন্দর্য দি‌য়েই তো আমার ভাইটা‌কে বস ক‌রে‌ছ তু‌মি। নয়তো যে ভাই আমার বাবা-মা‌য়ের কথা ছাড়া উঠ বস করত না, সে সবার বিপ‌ক্ষে গি‌য়ে তোমা‌কে বি‌য়ে ক‌রে কীভা‌বে? এখন বুঝ‌তে পার‌ছি। রূ‌পের জা‌লে ফেঁ‌সে‌ছে আমার ভাইটা। তোমার একবারও লজ্জা করল না, বিধবা হ‌য়ে অ‌বিবা‌হিত একটা ছে‌লে‌কে বি‌য়ে কর‌তে? অবশ্য শিক্ষাটা তো প‌রিবার থে‌কে আসে। তোমার প‌রিবার বোধ হয় সে শিক্ষা দেয়‌নি। তাদের বি‌বে‌কেও বাঁধল না তোমার ম‌তো অল‌ক্ষী মে‌য়েকে আমার ভাই‌য়ের গলায় ঝোলা‌তে।'
‌রেনু কিছু সময় শশীর দি‌কে তাকি‌য়ে রইল। তারপর নিচু গলায় বলল,
'‌শো‌নো শশী, আজ তে‌া‌মা‌কে আ‌মি কিছুই বলব না, শুধু শুনব। এখন তো আমি নতুন বউ, তাই কিছু বলাটা বেমানান লা‌গে। আগে নতুন বউ‌য়ের তকমাটা শরীর থে‌কে যাক তারপর তোমার সব কথাটার জবাব হিসাব ক‌রে দিব। তাছাড়া গুরুজনেরা একটা কথা ব‌লেন, স‌য়ে থাক‌লে আল্লাহ ব‌সে দেখান। আমি ব‌সে দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।'
শশী বিস্ফ‌রিত চো‌খে রেনুর দি‌কে তা‌কি‌য়ে রইল। শশী ভাব‌তেও পা‌রে‌নি, রেনু প্রথম দিনই শশী‌কে এমন জব্দ ক‌রে কথা বল‌বে। রেনু‌কে প্রথমবার দেখ‌লে ম‌নে হ‌বে, মো‌মের পুতুল একটা। একটু আঁচেই গ‌লে যা‌বে। কিন্তু শশী জানে না রেনু আঘাত পে‌তে পে‌তে পাথ‌রের পাহা‌রের ন্যায় শক্ত আর অটল হ‌য়ে গে‌ছে। ওকে ভে‌ঙে গু‌ড়ি‌য়ে দেওয়া সহজ কাজ নয়।
শশী আরও কিছু বলার আগেই ‌শিহাব শশীর হাত টে‌নে বাই‌রে নি‌য়ে গি‌য়ে বলল,
'‌শশী তো‌কে অসম্ভব ভা‌লোবা‌সি ব‌লে তো‌কে কিছু বল‌ছি না, তার মা‌নে এই নয় যে, তুই রেনু‌কে যা নয় তাই বল‌বি। তো‌কে স্নেহ ক‌রি ভা‌লোবা‌সি তার মা‌নে এই যে রেনু‌কে ভা‌লোবা‌সি না। তো‌কে যেমন সব বিষ‌য়ে আজ পর্যন্ত সা‌পোর্ট ক‌রে আস‌ছি রেনু‌কেও তেমন সা‌পে‌ার্ট করব। বেটার হয় তুই রেনু‌কে ভা‌বি ব‌লে মে‌নে নি‌য়ে ননদ ভা‌বির একটা সুন্দর সম্পর্ক তৈরী কর।'
শশী ‌বেশ রাগ ক‌রেই বলল,
'ওমন স্বামী‌খে‌কো মে‌য়ের সা‌থে আমার সুন্দর সম্পর্ক তৈরী কর‌তে ব‌য়েই গে‌ছে। অলক্ষী একটা!'
‌শিহাব ‌বেশ শান্ত গলায়ই বলল,
'তোর চিন্তাধারা সুন্দর ব‌লেই আমি জানতাম। কিন্তু আজ তোর কথা শু‌নে ম‌নে হ‌চ্ছে তুই চরম মাত্রায় অশি‌ক্ষিত মূর্খ। কো‌নো শি‌ক্ষিত, জ্ঞানী মানুষ এমন নীচু কথা বার্তা ব‌লে না। ও কি ওর পূ‌র্বের স্বামী‌কে নি‌জে খুন ক‌রে‌ছি‌লো? না‌কি রাক্ষসের ম‌তো চি‌বি‌য়ে চি‌বি‌য়ে খে‌য়ে‌ছে যে, স্বামীখে‌কো বল‌ছিস? শোন কার কখন মৃত্যু হ‌বে তা কেবল সৃ‌ষ্টিকর্তাই জা‌নেন। সেটায় কো‌নো মানু‌ষের হাত থা‌কে না। তোর ম‌তো শি‌ক্ষিত মে‌য়ের মুখে, এমন মূ‌র্খের ম‌তো কথা শু‌নে আমি স‌ত্যি হতবাক। যা হোক অনেকটা পথ জা‌র্নি ক‌রে এসে‌ছিস এখন বিশ্রাম নে, কিছু খা তারপর কথা হ‌বে।'
‌শিহাব শশীর কথার অপেক্ষা না ক‌রে চ‌লে গে‌ল।
রেনু ব‌সে ব‌সে ভাব‌ছে,
'এমন মন্ত‌ব্যের সম্মুখীন হ‌তে হ‌বে তা আমি আগে থে‌কেই জানতাম। কিন্তু সেটা যে আজ ফজ‌রের নামা‌জের প‌র থে‌কেই হ‌তে হ‌বে সেটা একদম-ই ভা‌বি‌নি।'
ফজ‌রের নামা‌জের পর একটু ঘু‌মি‌য়ে‌ছিল শিহাব-রেনু। দরজায় কা‌রো টোকার শ‌ব্দে ঘুম ভাঙল। রেনু ঘড়ির দি‌কে তা‌কি‌য়ে দেখল মাত্র সা‌ড়ে ছয়টা বা‌জে। শিহাব দরজা খুল‌তেই লি‌পি ভি‌তরে প্র‌বেশ করল। লি‌পি‌ ভিত‌রে ঢোকায় শিহাব রু‌মের বাই‌রে চলে গে‌ল।
লিপি রেনুর কা‌ছে এসে বলল,
'‌কেমন আছো রেনু?'
'ভা‌লো আপ‌নি?'
'‌ভা‌লো।'
'এত সকা‌লে এলেন? জরু‌রি কিছু?'
'জরু‌রি তো বটেই। দেখ‌তে এলাম তু‌মি গোসল সে‌রে তৈরি হ‌য়ে‌ছো কিনা? বি‌য়ে বা‌ড়ি ব‌লে কথা একটু পরই দেখ‌বে নতুন বউ দেখ‌তে দ‌লে দ‌লে ম‌হিলারা চ‌লে আস‌বে। তাই দেখ‌তে এলাম তু‌মি তৈরি কি না?'
'‌জি আমি তৈরি।'
'‌গোসল সারা হ‌য়ে‌ছে?'
‌রেনুর এমন কথার উত্তর দি‌তে অস্বস্তি লাগে তবুও লজ্জায় মাথা নিচু ক‌রে বলল,
'‌জি।'
লি‌পি রেনু‌র ‌দি‌কে তা‌কি‌য়ে ঠোঁটের কো‌ণে দুষ্টু হা‌সি এঁকে বলল,
'তা রাত কেমন কাটল? বর ঘুমা‌তে দি‌য়ে‌ছে সারারাত?'
এ ধর‌নের সস্তা মজার কথায় ‌রেনু তেমন অভ্যস্ত নয়। ওর এসব কথা খুব বিরক্ত লা‌গে। কিন্তু লি‌পির কথায় শুধু লজ্জামাখা মৃদু হা‌সি হাসল‌। লি‌পি রেনুর চু‌লে হাত দি‌য়ে বলল,
'ওমা চুল তো দেখি শুক‌নো। অবশ্য তোমার তো আর নতুন বি‌য়ে নয়, তু‌মি জা‌নো কখন কিভা‌বে সব সামলা‌তে হয়।'
‌রেনুর কথাটা একটু খারাপ লাগল। মৃদু হে‌সেই বলল,
'ভা‌বি সবই যখন বো‌ঝেন তখন আর জি‌জ্ঞেস ক‌রে কেন নি‌জের রু‌চির প‌রিচয় দি‌চ্ছেন?'
‌রেনুর হুট ক‌রে এমন কথা বলায় লি‌পি কিছুটা দ‌মে গি‌য়ে ব‌লে‌ছি‌লো,
'তু‌মি ব‌সো, আমি নাস্তা নি‌য়ে আস‌ছি।'
এরপর কতক্ষণ যে‌তে না যে‌তেই শশীর এমন হাঙ্গামা। রেনুর ম‌াথাটা বড্ড ধ‌রে‌ছে। এত অপমান টেনশন আর নি‌তে পার‌ছে না ও। রেনু ম‌নে ম‌নে বলল,
'‌হে আল্লাহ আর কত অপমান, তু‌মি আমার ললা‌টে লি‌খে রে‌খেছ? সুখ কী আস‌বে আমার জীব‌নে?'

Post a Comment

0 Comments