প্রাপ্য

 

প্রাপ্য

বাবার মৃ**ত্যুর পর উইল খুলে দেখা গেল, পুরো সম্পত্তির মালিক একজন অচেনা মেয়ে।

​টেবিলের চারপাশে আমরা চার ভাইবোন স্তব্ধ হয়ে বসে আছি। আমাদের পারিবারিক আইনজীবী মিস্টার রহমান চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে গম্ভীর গলায় উইলের শেষ লাইনটি পড়লেন। ঘরের ভেতরের সিলিং ফ্যানটা ক্যাঁচক্যাচ শব্দে ঘুরছে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল চারপাশের বাতাস একদম জমে বরফ হয়ে গেছে।
​আমার বড় ভাই আসাফ সাহেব, যিনি নিজেকে সবসময় এই পরিবারের অঘোষিত সম্রাট মনে করতেন, তিনি হুট করে দাঁড়িয়ে গেলেন। তার মুখটা রাগে লাল হয়ে গেছে। টেবিল চাপড়ে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, "ইম্পসিবল! রহমান সাহেব, আপনি নিশ্চয়ই কোথাও ভুল করছেন! বাবা তার পৈতৃক সম্পত্তি, এই আলিশান বাড়ি, ফ্যাক্টরি—সব একজন অচেনা মেয়ের নামে লিখে দিয়ে গেছেন? কে এই আরিশা রহমান? আমরা তো কোনোদিন এই নামের কাউকে চিনিই না!"
​রহমান সাহেব শান্ত ভঙ্গিতে উইলের কাগজগুলো ফাইলে পুরলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "আসাফ, আমি তোমার বাবার দীর্ঘদিনের বন্ধু আর এই পরিবারের আইনি সাহায্যে করি। এই উইলে চৌধুরী মোতাহের হোসেনের নিজের দস্তখত আছে, আর দুজন নিরপেক্ষ সাক্ষীও আছেন। আইনগতভাবে এই উইলে কোনো খুঁত নেই। তোমার বাবা তার সম্পূর্ণ সচেতন জ্ঞান থাকা অবস্থায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।"
​মেজো বোন তানিয়া ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, "তার মানে আমরা রাস্তায় বসে গেলাম? সারা জীবন আমরা বাবার সেবা করলাম, আর শেষ বয়সে এসে বাবা আমাদের এভাবে ঠকালেন? একটা বাইরের মেয়ের জন্য?"
​আমি, রাইয়ান, পরিবারের ছোট ছেলে। চুপচাপ কোণায় বসে পুরো দৃশ্যটা দেখছিলাম। বাবার প্রতি রাগ বা সম্পত্তির প্রতি ক্ষো*ভের চেয়ে আমার ভেতরে এক তীব্র কৌতূহল কাজ করছিল। বাবা মানুষটা আমুদে ছিলেন, কিন্তু তার ভেতরে একটা বিশাল রহস্যের দেয়াল ছিল, যা আমরা কোনো ভাইবোন কখনো ভা*ঙতে পারিনি। তিন মাস আগে যখন হসপিটালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন তার শেষ কথাটা ছিল, "রাইয়ান, আলমারির নিচের ড্রয়ারটা..."। তখন তিনি কথা শেষ করতে পারেননি। আজ বুঝলাম, বাবা আসলে কী ইঙ্গিত করতে চেয়েছিলেন।
​"উইলের একটা শর্ত আছে," রহমান সাহেবের কথায় সবার মনোযোগ আবার তার দিকে ফিরল।
​"কী শর্ত?" বড় ভাইয়া দাঁত কিড়মিড় করে জিজ্ঞেস করলেন।
​"আগামীকাল সকাল ১০টায় আরিশা রহমান এই বাড়িতে আসবে। উইলের শর্তানুযায়ী, সে এই বাড়িতেই থাকবে। আর তোমরা যদি এই সম্পত্তির অংশ বা মাসিক কোনো খরচ দাবি করতে চাও, তবে আগামী এক বছর তোমাদের এই বাড়িতেই আরিশার সাথে মিলেমিশে থাকতে হবে। এক বছর পর আরিশা নিজেই সিদ্ধান্ত নেবে সে সম্পত্তির কোনো অংশ তোমাদের দেবে কি না। আর যদি তোমরা এখনই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাও, তবে তোমরা আইনত এক পয়সাও পাবে না।"
​রহমান সাহেবের কথা শুনে পুরো ড্রয়িংরুমে যেন একটা বো**মা ফাটল। আসাফ ভাইয়া আর তানিয়া আপা ক্ষো**ভে ফেটে পড়লেন। সেজো ভাই ফাহিম, যে এতক্ষণ মোবাইল টিপছিল, সেও এবার নড়েচড়ে বসল।
​রাতটা আমাদের কারো ঘুমিয়ে কাটল না। সবার মনে একটাই প্রশ্ন—কে এই আরিশা? বাবার সাথে তার সম্পর্ক কী ছিল? বাবা কি গোপনে কোনো বিয়ে করেছিলেন? নাকি এই মেয়ে বাবার কোনো অ''বৈধ সন্তান? নানা নোংরা ও কুৎ*সিত চিন্তায় ভাইয়াদের মুখ বিষিয়ে উঠল। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল, ঘটনা এতটাও সস্তা নয়। বাবা আর যাই হোন, একজন নীতিবান মানুষ ছিলেন।
​পরদিন সকাল ঠিক ১০টা।
​আমরা চার ভাইবোন ড্রয়িংরুমে আদালতের আসামির মতো বসে আছি। বাইরে একটা কালো রঙের গাড়ি এসে থামার শব্দ হলো। আমাদের সবার চোখ দরজার দিকে।
​কয়েক মুহূর্ত পর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল একটি মেয়ে। পরনে সাদামাটা একটা সালোয়ার-কামিজ, কাঁধে একটা সাধারণ ঝোলা ব্যাগ। বয়স বড়জোড় তেইশ বা চব্বিশ। মেয়েটার চেহারা অত্যন্ত শান্ত, কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। কোনো আভিজাত্যের অহংকার নেই, নেই কোনো চাতুর্য। তাকে দেখে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক মনে হওয়া তো দূরের কথা, খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে বলেই মনে হয়।
​মেয়েটি ঘরে ঢুকে আমাদের দিকে তাকিয়ে আলতো করে একটু হাসল। তারপর বলল, "আসসালামু আলাইকুম। আমি আরিশা। মোতাহের আঙ্কেলের... মানে চৌধুরী সাহেবের উইলের সূত্রে আমি আজ এখানে এসেছি।"
​আসাফ ভাইয়া সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, "চৌধুরী সাহেব? আঙ্কেল? নাটক বন্ধ করো মেয়ে! পরিষ্কার করে বলো, কোন জাদুবলে তুমি আমার বাবার সমস্ত সম্পত্তি নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছ? ব্ল্যা**কমেইল করেছ, নাকি কোনো জালিয়াত চ*ক্রের সদস্য তুমি?"
​আরিশা আসাফ ভাইয়ার এই রুঢ় আচরণে একটুও দমে গেল না। সে তার ব্যাগটা সোফায় রেখে সোজা ভাইয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "আপনারা যেভাবে ভাবছেন, বিষয়টা তেমন নয়। এই সম্পত্তি আমি চেয়ে নেইনি, আমাকে দেওয়া হয়েছে। আর আমি কেন এসেছি, তার উত্তর এই ডায়েরিতে আছে।"
​আরিশা তার ব্যাগ থেকে একটা পুরনো চামড়ার ডায়েরি বের করল। ডায়েরিটা দেখেই আমার বুকটা ছ্যাত করে উঠল। ওটা বাবার প্রিয় ডায়েরি ছিল, যা বাবা সবসময় নিজের কাছে রাখতেন!
​মেয়েটি ডায়েরিটা টেবিলের ওপর রাখল..

Post a Comment

0 Comments