বাড়িতে। রাত গভীর হয়ে এসেছে। ডাইনিং টেবিল গুছিয়ে স্রোতসীনি বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল। কিছুক্ষণ পর সমুদ্রও পাশে এসে দাঁড়াল। নীরবতা ভেঙে স্রোতসীনি বলল‚ “আজ আরিয়ান স্যার কিছু রেফারেন্স দিয়েছেন।”
সমুদ্র তার দিকে তাকাল। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কিসের রেফারেন্স?”
“আমার থিসিসের জন্য। বেশ ভালো কিছু জার্নাল আর বইয়ের নাম। সত্যি বলতে‚ সেগুলো আমার অনেক কাজে লাগবে।”
সমুদ্র ধীরে মাথা নাড়ল। জিজ্ঞেস করল, “আর কিছু বলেছে?”
স্রোতসীনি একটু ভেবে বলল‚ “হ্যাঁ। একটা অদ্ভুত কথা বলেছে।”
“কী?”
“বলল‚ আমার গবেষণায় যেন আপনার ছায়া না পড়ে। আমার নিজের দৃষ্টিভঙ্গিটাই যেন থাকে।”
কথাটা শুনে সমুদ্রের মুখের পেশিগুলো টানটান হয়ে উঠল। কয়েক সেকেন্ড সে কোনো কথা বলল না। তারপর শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল‚ “হুবহু এই কথাই বলেছে?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি কী উত্তর দিয়েছ?”
“বলেছি‚ আমার থিসিস আমার নিজের। আমার ভাবনাও আমার নিজের।”
সমুদ্র মৃদু মাথা নেড়ে মৃদু স্বরে বলল, “ঠিকই বলেছ।”
স্রোতসীনি এবার সমুদ্রকে সরাসরি জিজ্ঞেস করল‚ “কিন্তু সে এমন কথা বলল কেন, মাস্টার মশাই?”
সমুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, “হয়তো আন্দাজ করতে পারছি।”
“বলুন।”
সমুদ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল‚ “আমার ধারণা‚ সে ধীরে ধীরে তোমার আর আমার মাঝখানে একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি করতে চাইছে।”
স্রোতসীনি বিস্মিত হয়ে তাকাল। অবাক হয়ে শুধাল, “কিন্তু এসব উনি কেন করবে, মাস্টার মশাই?”
“কারণ একজন মানুষকে দুর্বল করতে হলে আগে তাকে একা করতে হয়।”
ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। স্রোতসীনি ধীরে সমুদ্রের কাছে এসে তার হাত ধরল। কোমল কন্ঠে বলল, “আমি কারও কথায় বদলে যাব না, মাস্টার মশাই।”
সমুদ্র তার দিকে তাকিয়ে রইল। অনেকক্ষন পর বলল, “জানি।”
“তাহলে এত চিন্তা করছেন কেন?”
সমুদ্র মৃদু হাসল। স্রোতসীনির হাতের উপর মৃদু চাপ দিয়ে বলল, “চিন্তা না স্রোত, এটা সতর্কতা।”
“দুটো কি এক নয়?”
“হ্যাঁ‚ এক নয়।”
স্রোতসীনি সমুদ্রের কাঁধে মাথা রাখল। তার একটা হাত জড়িয়ে ধরে বলল, “আমি আছি, মাস্টার মশাই।”
মাত্র দুটি শব্দ। কিন্তু সেই দুটি শব্দেই যেন সমুদ্রের বুকের ভার কিছুটা হালকা হয়ে গেল। কারণ এই মেয়েটা শুধু কথায় নয়‚ কাজেও পাশে থাকে। সবসময়।
সেইদিন রাতেই সৈকত নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপ খুলল। লন্ডনে থাকা পুরোনো বন্ধুর কাছ থেকে নতুন একটি ই-মেইল এসেছে। সে মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করল। এক জায়গায় লেখা—
“হি ডাজন্ট কম্পট ফেয়ার। হি নেভার ডিড।” (সে ন্যায়ভাবে প্রতিযোগিতা করে না। সে কখনোই করেনি।)
সৈকতের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল সেটা দেখে। সেখানে আরও কিছু তথ্য ছিল। আরিয়ান নাকি প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারানোর জন্য ব্যক্তিগত সম্পর্ককেও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে দ্বিধা করত না।
সৈকত ফোনটা হাতে নিল। সমুদ্রকে এখনই সব বলবে? না। এখনও প্রমাণ যথেষ্ট নয়। কিন্তু তার মনে একটাই অনুভূতি ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল— সময় খুব কম।
পরের সপ্তাহে মঙ্গলবার সকালে বিভাগের নোটিশ বোর্ডের সামনে ভিড় জমেছে। সেখানে একটি নতুন বিজ্ঞপ্তি টাঙানো হয়েছে।
“সাউথ এশিয়ান পোস্টকলোনিয়াল রিসার্চ প্রজেক্ট। স্টুডেন্ট রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট রিকোয়্যার্ড।” (দক্ষিণ এশীয় উত্তর-ঔপনিবেশিক গবেষণা প্রকল্প | ছাত্র গবেষণা সহকারী প্রয়োজন।)
স্রোতসীনি বিজ্ঞপ্তিটা পড়ল। পাশে দাঁড়ানো মিতু ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল‚ “এটাই কি সেই প্রজেক্ট?”
“হ্যাঁ।”
“তুই আবেদন করবি?”
স্রোতসীনি মাথা নাড়ল।
“না।”
“কিন্তু বিষয়টা তো তোর থিসিসের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়!”
“মিলে যায়। কিন্তু তবু করব না।”
মিতু আর কিছু বলল না। দুজন ধীরে ধীরে করিডোর ধরে হাঁটতে লাগল।
*
বিকেলে আরিয়ান নিজের কক্ষে স্রোতসীনিকে ডেকে বললেন, “একটু বসো।”
স্রোতসীনি বসলে আরিয়ান সরাসরি বললেন‚ “আমি চাই তুমি এই প্রজেক্টে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করো।”
“দুঃখিত স্যার‚ আমি পারব না।”
“কারণ?”
“স্যার, আমি এখন পুরো মনোযোগ থিসিসে দিতে চাই।”
আরিয়ান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর হালকা হেসে বললেন, “ঠিক আছে। সিদ্ধান্ত তোমার।”
কিছুক্ষণ পর আবার বললেন‚ “তবে একটা অনুরোধ আছে।”
“জি?”
“এই মাসের বিভাগীয় সেমিনারে ‘পোস্টকলোনিয়াল আইডেনটিটি ইন সাউথ এশিয়ান লিটারেচার’(দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যে উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিচয়) বিষয়ের ওপর পনেরো মিনিটের একটি উপস্থাপনা করবে? তোমার গবেষণার সঙ্গে বিষয়টা মিলেও যায়।”
স্রোতসীনি ভেবে দেখল। এটা গবেষণা প্রকল্পে যোগ দেওয়ার মতো বিষয় নয়। একাডেমিক সেমিনারে বক্তব্য রাখা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। তাই সে খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল, “ঠিক আছে, স্যার।”
আরিয়ান সন্তুষ্ট হয়ে বললেন‚ “ধন্যবাদ।”
*
রাতে বাড়িতে ফিরে স্রোতসীনি পুরো বিষয়টা সমুদ্রকে জানাল। সমুদ্র মনোযোগ দিয়ে শুনল সবটা। তারপর শান্ত স্বরে শুধাল, “তো তুমি এখন সেমিনারে বক্তব্য দেবে?”
“হ্যাঁ।”
“ভালো।”
কথাটা বললেও তার মুখের ভেতরের অস্বস্তি লুকানো গেল না। স্রোতসীনিও সেটা টের পেল। কিন্তু আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
পরদিন সৈকত আরও কিছু তথ্য জোগাড় করল। লন্ডনের সেই ঘটনার বর্ণনা আগের চেয়েও স্পষ্ট করে জানতে পেরেছে। আরিয়ান নাকি পরিকল্পনা করেই এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছিল‚ যাতে একজন সহকর্মীর বৈবাহিক সম্পর্কে সন্দেহ আর দূরত্ব তৈরি হয়।
সৈকতের বুকের ভেতর হঠাৎ ঠান্ডা একটা শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। তাহলে কি এখানেও একই কৌশল? ঠিক তখনই তার মনে পড়ল— শুক্রবারের সেমিনারের কথা।
সে আর দেরি করল না। দ্রুত সমুদ্রকে ফোন করল। সব শুনে সমুদ্র দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। শেষ পর্যন্ত শুধু বলল‚ “আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই... তবু সতর্ক থাকব।”
,
শুক্রবার। সেমিনারের দিন। সকাল থেকেই বিভাগে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। শিক্ষক‚ গবেষক‚ শিক্ষার্থী—সবাই উপস্থিত। স্রোতসীনির উপস্থাপনা ছিল দিনের অন্যতম আকর্ষণ।
সে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মঞ্চে উঠল। একটি করে নিজের গবেষণার মূল যুক্তিগুলো তুলে ধরল। প্রশ্নোত্তর পর্বেও প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিল যুক্তি আর তথ্য দিয়ে। হলরুমে উপস্থিত অনেকেই তার প্রশংসা করলেন।
শেষে আরিয়ান মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বললেন‚
“অসাধারণ উপস্থাপনা। ধন্যবাদ‚ স্রোতসীনি।”
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সবাই মিলে স্মারক ছবি তুলতে বাইরে গেল। একটি গ্রুপ ছবি। আরিয়ান স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললেন‚ “এদিকে দাঁড়াও‚ সবাই যেন ফ্রেমে আসে।”
স্রোতসীনি অন্যদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল এবং একটি সাধারণ ছবি তোলা হলো।
সেই মুহূর্তে ছবিটা সবার কাছেই ছিল একটি স্মৃতি মাত্র। কিন্তু কেউ জানত না— পরবর্তীতে ছবিটিকে এমনভাবে ব্যবহার করা হবে‚ যাতে একটি নির্দোষ মুহূর্তকেও সন্দেহের গল্পে রূপ দেওয়া যায়।
আর সেই একটি ছবিই ধীরে ধীরে এমন এক ঘটনার সূচনা করবে‚ যা সমুদ্র‚ স্রোতসীনি এবং আরিয়ান—তিনজনের জীবনকেই অপ্রত্যাশিত মোড়ে নিয়ে যাবে।
★
শনিবার। সকালটা অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিক ছিল। বাড়ির ভেতর নীরব‚ শান্ত এক পরিবেশ। নাশতার টেবিলে পাশাপাশি বসেছিল সমুদ্র আর স্রোতসীনি। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছিল। ছোট ছোট কথায় সকালটা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল। খাওয়া শেষ করে স্রোতসীনি নিজের থিসিস নিয়ে বসে পড়ল। তার সামনে ল্যাপটপ খোলা। চারদিকে বই ছড়িয়ে আছে। সমুদ্রও নিজের কিছু কাজ করছিল। সবকিছু যেন আগের মতোই স্বাভাবিক। কোনো অস্বস্তি নেই। কোনো ঝড়ের পূর্বাভাসও নেই।
কিন্তু দুপুরের দিকে হঠাৎ সবকিছু বদলে গেল। সমুদ্রের ফোনে একটি মেসেজ এলো। অচেনা নম্বর থেকে। কোনো লেখা নেই। শুধু একটি ছবি। সমুদ্র ছবিটা খুলল। তারপর অনেকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
ছবিটা ছিল সেদিনের সেমিনারের। হলের বাইরে তোলা। আসল ছবিটা ছিল একটি গ্রুপ ফটো। সেখানে বিভাগের আরও শিক্ষক‚ গবেষক এবং শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু এই ছবিটা সেরকম নয়। এখানে শুধু দুজন মানুষ। আরিয়ান আর স্রোতসীনি।
ছবিটা এমনভাবে ক্রপ করা হয়েছে‚ যেন আশপাশে আর কেউ ছিলই না। আরিয়ানের মুখে পরিচিত সেই আত্মবিশ্বাসী হাসি। স্রোতসীনির মুখে সফল উপস্থাপনা শেষ করার স্বস্তি। দুজনের মাঝখানে বাস্তবে যে স্বাভাবিক দূরত্ব ছিল‚ সেটাও ছবির কোণ আর ক্রপিংয়ের কারণে অনেক কম মনে হচ্ছে। যেন তারা ইচ্ছা করেই পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে। যেন মুহূর্তটার অন্য কোনো অর্থ আছে।
সমুদ্র অনেকক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে জমতে লাগল পুরোনো‚ পরিচিত একটা শীতল অনুভূতি। এই অনুভূতিটাকে সে চেনে। অনেক বছর ধরে চেনে। মা চলে যাওয়ার পর থেকে— একটা ভয় তার ভেতরে বাসা বেঁধেছিল। যে মানুষটা খুব কাছে আসে‚ একদিন সে চলে যায়। যাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করি‚ একদিন সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়। ছবিটা যেন সেই পুরোনো ক্ষতটাকেই আবার ছুঁয়ে দিল। স্ক্রিনের আলোটাও তখন তার চোখে কাঁটা হয়ে বিঁধছিল।
সমুদ্র ধীরে ফোনটা বন্ধ করল। কোনো কথা না বলে উঠে দাঁড়াল। তারপর বাড়ির উঠানে গিয়ে একা দাঁড়িয়ে রইল।
“
কিছুক্ষণ পর স্রোতসীনি খেয়াল করল‚ সমুদ্র ঘরে নেই। সে নিচে নেমে এল। উঠানে এসে দেখল‚ সমুদ্র একা দাঁড়িয়ে আছে। দরজার দিকে পিঠ করে। দুই হাত পকেটে গুজা। দৃষ্টি অনেক দূরে কোথাও স্থির হয়ে আছে।
স্রোতসীনি ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে গেল। মৃদু স্বরে বলল, “কী হয়েছে, মাস্টার মশাই?”
সমুদ্র ঘুরে তাকাল। মুখটা দেখেই স্রোতসীনি থমকে গেল। এই মুখ সে অনেকদিন দেখেনি। পাথরের মতো কঠিন, নিঃশব্দ, বন্ধ। সমুদ্র খানিকক্ষণ সময় নীরব থেকে মৃদু স্বরে বলল, “কিছু না।”
“মিথ্যে বলছেন কেন, মাস্টার মশাই? আপনার চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে কিছু হয়েছে।”
সমুদ্র ফের গম্ভীর গলায় বলল, “বললাম তো কিছু হয়নি।”
স্রোতসীনি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। বুঝতে পারল এই মানুষটা আবার নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু কেন?
“মাস্টার মশাই...”
“হুম?”
“আমাকে বলুন কী হয়েছে।”
“বললাম তো‚ কিছু না।”
“আপনি মিথ্যে বলছেন।”
সমুদ্র এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল। চোখ দুটো ঠান্ডা, দূরের, অপরিচিত। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল‚ “আজ বিকেলে একটু কাজে বের হব।”
“একা?”
“হ্যাঁ।”
“কোথায়?”
“কাজে।”
এর বেশি আর কিছু বলল না সমুদ্র, ভেতরে চলে গেল। স্রোতসীনি উঠানে দাঁড়িয়ে রইল। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও সব ঠিক ছিল। তাহলে হঠাৎ কী বদলে গেল?
*
বিকেলে সমুদ্র বেরিয়ে গেল। কোথায় গেল‚ সে জানাল না। স্রোতসীনি একা ঘরে ফিরে এল। থিসিস খুলল। কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর আবার বন্ধ করে দিল। একটাও শব্দ পড়তে পারছে না। বারবার মনে পড়ছে সমুদ্রের সেই মুখ। সেই ঠান্ডা চোখ। কী এমন ঘটল?
সকালে তো সব ঠিকই ছিল। নাশতার সময় গল্প হয়েছে। দুজন হেসেছে। তারপর হঠাৎ এই পরিবর্তন কেন?
অস্থির হয়ে সে ফোন তুলে সমুদ্রকে কল করল। রিং হলো কিন্তু ফোন ধরল না। আবার করল, তবুও রিসিভ করল না। শেষ পর্যন্ত স্রোতস্বীনি ফোনটা রেখে দিল। হঠাৎ করেই তার বুকের ভেতর অকারণ একটা অস্বস্তি জমতে শুরু করেছে।
রাত আটার দিকে সমুদ্র বাড়ি ফিরল। এসে থেকেই চুপচাপ রইল, কারও সঙ্গে বিশেষ কোনো কথা বলল না। খাবারও খেল না। সোজা উপরে উঠে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
নিচে দাঁড়িয়ে সুফিয়া বেগম বললেন‚ “বউমা‚ খাবেন?”
স্রোতসীনি মৃদু হেসে বলল‚ “একটু পরে।”
স্রোতসীনি ধীরে ধীরে উপরে উঠে গেল। সে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে সমুদ্র জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পিঠ দরজার দিকে করে। এই ভঙ্গিটা স্রোতসীনি খুব ভালো করেই চেনে। যখন সমুদ্র একা থাকতে চায়। যখন নিজের ভেতরের ঝড় কাউকে দেখাতে চায় না, তখনই এভাবে থাকে।
“আপনি কিছু খাননি।”
“ক্ষুধা নেই।”
“কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
“মাস্টার মশাই...”
সমুদ্র ধীরে ঘুরে তাকাল। চোখে এমন একটা অনুভূতি যেটা স্রোতসীনি চিনতে পারল। সেটা সন্দেহ নয়, বরং সন্দেহের ভয়।
“আপনি কি কিছু দেখেছেন?”
“না।”
“আবারো মিথ্যে বলছেন।”
দীর্ঘ নীরবতার পর সমুদ্র ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে ছবিটা খুলে স্রোতস্বীনির হাতে দিল।
স্রোতসীনি ছবিটা দেখে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে থমকে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল‚ “এটা সেমিনারের ছবি।”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু এটা আসল ছবি নয়।”
সমুদ্র চুপ। স্রোতসীনি ফের নিজেই বলল, “ওটা ছিল গ্রুপ ছবি। সেখানে অনেকেই ছিল। এখানে সবাইকে কেটে শুধু আমাদের দুজনকে রাখা হয়েছে।”
“এই ছবিতে তো কেউ নেই।”
“কারণ কেউ ইচ্ছে করে এটা ক্রপ করেছে।”
কিছুক্ষণ নীরবতার পর স্রোতসীনি ধীরে জিজ্ঞেস করল‚ “আপনি কি আমাকে বিশ্বাস করছেন না, মাস্টার মশাই?”
সমুদ্র কোনো উত্তর দিল না। তার এই নির্বিকার, নিস্তব্ধ নীরবতায় স্রোতসীনির বুকের ভেতর কষ্টের একটা ঢেউ উঠল। সে পুনরায় মৃদু স্বরে বলে উঠলো, “মাস্টার মশাই...”
“হুম।”
“আমার দিকে তাকান।”
সমুদ্র তাকাল। স্রোতসীনি ভাঙ্গা গলায় বলল, “আমি কিছু করিনি।”
সমুদ্র ধীরে বলল‚ “জানি আমি।”
“তাহলে এই নীরবতা কেন?”
সমুদ্র চোখ ফিরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। খুব নিচু স্বরে বলল‚ “পুরোনো কিছু কথা মনে পড়ে যায়।”
“কোন কথা?”
দীর্ঘ নীরবতার পর সমুদ্র বলল‚ “যারা বলেছিল আমার কাছে থাকবে... তারা সবাই একদিন আমাকে চলে গেছে।”
স্রোতসীনি বুঝে গেল। এটা আজকের ছবির জন্য নয়। এটা সমুদ্রের অতীত, মায়ের চলে যাওয়া, উর্মির বিশ্বাসঘাতকতা, সব মিলিয়ে জমে থাকা ভয়। সে ধীরে সামনে এগিয়ে এল। সমুদ্রের একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কোমল এবং শান্ত গলায় বলল, “আমি কোথাও যাব না।”
সমুদ্র মৃদু স্বরে বলল‚ “সবাই বলেছিল সেই কথা। কিন্তু একদিন ঠিকই সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে”
“আমি শুধু বলছি না। আমি থেকে দেখাব।”
“কথা বলা আর থেকে যাওয়া এক নয়।”
স্রোতসীনি তার চোখের দিকে স্থির তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,“আমার চোখের দিকে তাকান, মাস্টার মশাই।”
সমুদ্র তাকাল। স্রোতসীনি চোখে চোখ রেখে বলল, “এই ছবিটা মিথ্যে, মাস্টার মশাই।”
একটু থেমে ফের ধীরে ধীরে বলল‚ “এবং যে পাঠিয়েছে‚ সে চায় আপনি কষ্ট পান। আমাদের মাঝে দূরত্ব তৈরি হোক।”
সমুদ্র শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল‚ “প্রমাণ?”
স্রোতসীনি মৃদু হাসল।
“প্রমাণ নেই।”
একটু থেমে আবার বলল‚ “কিন্তু আমি জানি। আর আমার বিশ্বাস‚ আপনিও ভেতরে ভেতরে সেটা জানেন।”
ঘর আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সমুদ্র কিছু বলল না। তার ভেতরে চলতে লাগল এক কঠিন লড়াই। বিশ্বাসের সঙ্গে ভয়ের। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের। স্রোতসীনি ধীরে সমুদ্রের হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল। আস্তে করে বলল‚ “আরিয়ান জিততে পারবে না, মাস্টার মশাই।”
সমুদ্র কোনো উত্তর দিল না। তবে এবার সে নিজের হাত সরিয়েও নিল না। এই নীরব সম্মতিটুকুই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ভরসা মনে হলো।
রাত আরও গভীর হলো। দুজন একই বিছানায় শুয়ে আছে। কিন্তু আজ তাদের মাঝখানে যেন অদৃশ্য একটা দূরত্ব শুয়ে আছে। সমুদ্র পাশ ফিরে শুয়ে আছে। স্রোতসীনি তার পিঠের দিকে তাকিয়ে রইল। অনেকক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
সমুদ্র তাকে অবিশ্বাস করেনি। মুখে বলেছে, “জানি।” তবুও সেই পাথরের মুখ। সেই নীরবতা। সেই অদৃশ্য দূরত্ব। এসবই বলে দিচ্ছে, সমুদ্রের ভেতরে পুরোনো ভয়টা আবার জেগে উঠেছে। যাকে ভালোবাসি‚ সে একদিন চলে যায়। আর সেই ভয় থেকেই সে নিজেকে একটু একটু করে সরিয়ে নিচ্ছে। নিজেকে রক্ষা করার জন্য। নিজেকে ভাঙা থেকে বাঁচানোর জন্য।
স্রোতসীনি সেটা বুঝতে পারল। তবু বোঝা আর সহ্য করা এক জিনিস নয়। কারণ এই দূরত্ব চোখে দেখা যায় না। স্পর্শ করা যায় না। কিন্তু অনুভব করা যায়। আর সেই অনুভূতিটাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। বিছানার মাঝখানের খালি জায়গাটুকুই তখন সবচেয়ে ভারী হয়ে ছিল।

0 Comments