শ্যাডো_প্রিন্স

 

শ্যাডো_প্রিন্স

হোটেল কক্ষের বদ্ধ বাতাসে তখন এসি-র হিমশীতল পরশ, কিন্তু আয়ান হকের ভেতরে বইছে তপ্ত লু-হাওয়া। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা খালি স্ট্রিপগুলো ওর বর্তমান অবস্থার নীরব সাক্ষী। সেই যে কয়েকদিন আগে থেকে শুরু করে ৩০২ নম্বর রুমের সেই বয়টা কিছু ওষুধ দিয়ে যায় নিয়মিত , এর পর থেকে আয়ান এক গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছে।
ওষুধগুলো না নিলে ওর শিরা-উপশিরায় যেন সহস্র অগ্নিপিঁপড়ে কামড়াতে থাকে, মাথা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু ওষুধটা ভেতরে গেলেই নিমেষে শান্ত হয়ে আসে চারপাশ।
সেই হোটেল-বয়টা এখন আয়ানের কাছে এক নিয়মিত আগন্তুক। নির্দিষ্ট সময়ে সে আসে, নীলচে রঙের ছোট ছোট ট্যাবলেটগুলো দিয়ে যায়, আর আইয়ান এক অদ্ভুত তৃপ্তি নিয়ে সেগুলো গিলে ফেলে।
ওর মস্তিষ্ক এখন অসাড়, অথচ অবচেতন মনটা পড়ে আছে অন্য কোথাও।
আয়ান প্রতিদিন নেশাতুর চোখে ডিস্কো তে যায়, বারে যায় ।ওর চোখ দুটো আগে খোঁজে লিরাকে। সেই রহস্যময় মেয়েটা, যে ঝড়ের মতো জীবনে এসেছিল, আবার একদিন হঠাৎ করেই কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেল।
লিরা নেই, ওর কোনো ফোন নেই, কোনো খবর নেই। তবে আজ সকালে আয়ানের হাতে কিছু অস্পষ্ট সূত্র এসেছে। লিরার হদিস পাওয়ার জন্য একটা ক্ষীণ আশার আলো দেখা দিয়েছে। কাঁপা হাতে আয়ান ফোনটা হাতে নিল। লিরার জন্য ওর বুকটা ফেটে যাচ্ছে, এই অস্থিরতা ও আর সহ্য করতে পারছে না।
সে ফোন দিল তার বাবা, রায়হান হককে।
শহরের অভিজাত এক হোটেলের আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাসিনোতে তখন রঙিন আলোর ঝলকানি আর তামাকের কড়া গন্ধ। জুয়ার টেবিলের রাজা হয়ে বসে আছেন রায়হান হক। তবে আজ তার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু তার জেতা টাকা নয়, বরং তার পাশে বসে থাকা এক অনিন্দ্যসুন্দরী যুবতী।
মেয়েটির চেহারায় বিদেশী আভিজাত্য আর বাঙালি লাবণ্যের এক দুর্লভ সংমিশ্রণ। গত চার-পাঁচ দিন ধরে এই ক্যাসিনোতে মেয়েটি যেন জাদুর মতো আবির্ভাব ঘটেছে।
রায়হান হকের বয়স হয়েছে, কিন্তু এই রহস্যময়ীর ছোঁয়ায় তিনি যেন আবার যৌবন ফিরে পেয়েছেন। গত কয়েকদিনে তাদের সখ্যতা তুঙ্গে উঠেছে। রায়হান হক নিজের অজান্তেই ডুবে গেছেন এই অল্পবয়সী তরুণীর মোহজালে। মেয়েটি যেন তার জন্য 'লাকি চার্ম'। সে যা বলছে, রায়হান তাতেই জিতছেন।
রায়হান হকের স্ত্রী নেই।পনের-ষোল বছর আগে যখন তিনি গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছিলেন, তখন তার সাথে কোনো স্ত্রী ছিল না। শুধু আয়ান।গ্রামে এক রহস্যময় পরিস্থিতিতে তার স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু রায়হান হকের ক্ষমতার দাপটে সেই মৃত্যু নিয়ে কেউ টু শব্দ করার সাহস পায়নি।কোন মামলা হয়নি।
শশুর বাড়ীর লোকজন গরীব থাকায় মামলা করতে সাহস পায়নি। যেহেতু কোনো মামলা হয়নি, কোনো তদন্ত হয়নি। সেই রক্তাক্ত ইতিহাস ধামাচাপা দিয়ে তিনি আজ শহরের বড় ব্যবসায়ী।
জুয়ার টেবিলে তখন টানটান উত্তেজনা। সামনে পড়ে আছে লক্ষ লক্ষ টাকার চিপস। মেয়েটি আলতো করে রায়হান হকের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। পরম আবেশে একটি চুমু খেল তার হাতের পিঠে, তারপর একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে একটা নম্বর বলল। রায়হান হক সম্মোহিতের মতো সেই নম্বরটি ডিলারের উদ্দেশ্যে উচ্চারণ করলেন।
গুমোট নীরবতা ভেঙে ডিলার ঘোষণা করল, "উইনার, মিস্টার রায়হান হক!"
টাকার পাহাড় আবার তার দিকে এগিয়ে এল। খুশিতে আত্মহারা রায়হান মেয়েটির কানের কাছে মুখ বাড়িয়ে যখন গভীর ভালোবাসার এক চুমু দিতে যাবেন, ঠিক তখনই পকেটে থাকা ফোনটা তারস্বরে চিৎকার করে উঠল।
মুহূর্তেই মেজাজটা বিগড়ে গেল তার। কপালে ভাঁজ ফেলে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখলেন ছেলে আয়ানের নাম। বিরক্তির চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে তিনি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, "এক্সকিউজ মি সুইটহার্ট, জাস্ট এক মিনিট।"
চেয়ার ছেড়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে ফোনটা রিসিভ করলেন তিনি। ফোনের ওপাশ থেকে আয়ানের জড়িয়ে আসা কণ্ঠস্বরটা ভেসে আসতেই রায়হান হকের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা আয়ানের কণ্ঠস্বর তখন আর স্বাভাবিক মানুষের মতো নেই। নেশার ঘোরে আর লিরার বিরহে সেই স্বরে এক জান্তব হাহাকার।
"বাবা, আমি আর পারছি না! আমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছে। লিরাকে চাই আমার, এই মুহূর্তেই ওকে আমার সামনে এনে দাও।
আমার শরীর চলছে না, আমার রক্তে আগুন জ্বলছে বাবা। আমি কথা দিচ্ছি, কোনো ভয়ংকর কিছু করব না, শুধু ওকে আমার কাছে নিয়ে এসো!"
ছেলের এমন উন্মাদ দশা দেখে রায়হান হক বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত করলেন। ফোনটা কানে থেকে সরাতেই স্ক্রিনে একটি মেসেজ টপকে উঠল। আয়ান একটি ঠিকানা পাঠিয়েছে। খুব বেশি দূরে নয়, হাতের নাগালেই। ম্যানেজারকে তৎক্ষণাৎ ফোন দিয়ে হুকুম করলেন গাড়ি বের করার জন্য।
ছেলের এই গোপনীয়তা রায়হান হক নিজে ম্যানেজ করে।সবাই কে নিজে তুলে নেয়।কেও যেনো জানতে না পারে আয়ান সুস্থ নয়। বিশেষ করে বড় ভাই রাজিবুল হক।নয়তো সায়রা কে আয়ানের বউ করার সপ্ন সপ্নই রয়ে যাবে। সিঙ্গাপুর থাকার মেইন উদ্দেশ্য ও এইটা আয়ানকে রাজিবুল হক থেকে দুরে রাখা।
তাই আজও নিজেই যাবেন।
ক্যাসিনোর সেই মায়াবী আলোর নিচে ফিরে এলেন রায়হান হক। রহস্যময়ী মেয়েটি তখনও বসে আছে, ঠোঁটে সেই মায়াবী হাসি। রায়হান তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "আজকের মতো উঠতে হচ্ছে সুইটহার্ট। একটা জরুরি কাজ পড়ে গেল। কাল আবার দেখা হবে।"
মেয়েটি শুধু একবার চোখের পলক ফেলে রহস্যময় হাসিতে তাকে বিদায় জানালো।
গাড়ি ছুটছে মিরপুর রূপনগরের দিকে। রায়হান হকের পাশে তার বিশ্বস্ত ম্যানেজার এবং পেছনের সিটে দুই সশস্ত্র বডিগার্ড। রায়হান হকের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় জানা আছে, কেউ যদি স্বেচ্ছায় আসতে না চায়, তবে তাকে কীভাবে ঘাড় ধরে নিয়ে আসতে হয়।
গুগল ম্যাপ অনুসরণ করে গাড়িটা যখন থামল, তখন চারপাশটা ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। জায়গাটা একটু বিচ্ছিন্ন, লোকালয় থেকে বেশ দূরে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে জীর্ণ একটি তিন তলা বাড়ি। আশেপাশে আর কোনো ঘরবাড়ি নেই, দূরে শুধু একটা পরিত্যক্ত কারখানার ধোঁয়াটে অবয়ব দেখা যাচ্ছে।
রায়হান হক গাড়ি থেকে নামলেন। এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা চারদিকে। মনে মনে ভাবলেন, 'এই নির্জন জায়গায় একটা মেয়ে একা থাকে কী করে? পুরো বাড়িটা কি খালি? কোনো ভাড়াটিয়া নেই কেন?'
সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় চারজনের পায়ের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। প্রতিটি ধাপ পেরোনোর সময় রায়হান হকের মনে একটা কু ডাক দিচ্ছিল, কিন্তু ছেলের জেদের কাছে সেই সংশয় ধোপে টিকল না।
তিন তলার ছাদে উঠে তারা দেখল এক কোণে ছোট একটা চিলেকোঠার ঘর। ভেতর থেকে একটা টিমটিমে হলুদ বাতি জ্বলছে।
বাকি তিনজনকে ইশারা দিয়ে রায়হান হক ঘরের দিকে এগুলেন। মনে মনে ভাবছেন, এই ঘরের মেয়েটার মধ্যে এমন কী যাদু আছে যার জন্য তার ছেলে আজ উন্মাদ? আয়ান কথা দিয়েছে সে কোনো সহিংসতা দেখাবে না, শুধু লিরাকে চায়। দেখা যাক, সেই লিরার রূপ কতখানি!
ঘরের দরজার কাছে পৌঁছাতেই রায়হান হকের ইশারায় বডিগার্ডরা পা দিয়ে লাথি মেরে দরজাটা খুলে ফেলল। কিন্তু ভেতরে পা রাখা মাত্রই এক অদ্ভুত, তীব্র তামাটে গন্ধ তাদের নাকে এসে ধাক্কা দিল।
"কিসের গন্ধ এটা—?" ম্যানেজার কিছু একটা বলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু বাক্যটা শেষ করতে পারলেন না।
মুহূর্তের মধ্যে এক অদৃশ্য বিষাক্ত গ্যাস ঘরের বাতাসকে ভারী করে তুলল। রায়হান হক নিজের গলা চেপে ধরার চেষ্টা করলেন, কিন্তু চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। তার শরীর অবশ হয়ে আসছে, হাত-পা যেন নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। ম্যানেজার আর বডিগার্ডরা টাল সামলাতে না পেরে মেঝের ওপর ধপাস করে লুটিয়ে পড়ল।
অন্ধকার নেমে আসার ঠিক আগে রায়হান হক দেখলেন, ঘরের কোণ থেকে একটা ছায়া অবয়ব ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে। তারপর আর কিছু মনে নেই। এক গভীর, অতল অন্ধকারে তলিয়ে গেলেন মিরপুরের সেই অন্ধকার বাড়িতে অন্ধকার সাম্রাজ্যের অধিপতি।

Post a Comment

0 Comments