নিভৃত_অক্ষর

নিভৃত_অক্ষর

 আমার স্ত্রীকে আমি তালাক দিয়েছিলাম শুধু একটা কারণেই—তার শরীরে সাদা দাগের রোগ ধরা পড়েছিল। নতুন চেহারাটা আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারিনি। মনে হয়েছিল, এই সম্পর্ক শেষ করলেই আমি মুক্তি পাব, আবার আগের মতো স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাব।

কিন্তু তালাকের পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ খুলতেই এমন একটা দৃশ্য দেখলাম, যা আমার পুরো পৃথিবীটাই ওলটপালট করে দিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মাথা ঝিমঝিম করে উঠল, বুক ধড়ফড় করতে লাগল, তারপর আর কিছু মনে নেই…
আমি ছোটবেলা থেকেই নিজের চেহারা, পোশাক আর ব্যক্তিত্ব নিয়ে ভীষণ সচেতন ছিলাম। সবকিছুতেই একটা পারফেকশন চাইতাম। জামা-কাপড় থেকে শুরু করে জুতা, ঘড়ি, চুলের স্টাইল—সব যেন একদম নিখুঁত হয়, এটাই ছিল আমার স্বভাব।
অনেকেই বলত, আমি নাকি নিজের সৌন্দর্য নিয়েই বেশি ব্যস্ত। কিন্তু কথাগুলো কখনো গুরুত্ব দিইনি। বরং মনে মনে গর্বই হতো।
যখন বিয়ের বয়স হলো, তখন নিজের কাছে একটা শর্ত ঠিক করেছিলাম—যে মেয়েকে বিয়ে করব, সে দেখতে অসাধারণ সুন্দর হতে হবে। আমি চাইতাম, আমার স্ত্রীকে দেখে সবাই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকুক। সবাই বলুক, "কী সুন্দর একটা জুটি!"
অনেক খোঁজাখুঁজির পর আমার জীবনে আসে মেহরীন।
প্রথম দিন ওকে দেখেই মনে হয়েছিল, এত সুন্দর মানুষ সত্যিই হয়?
ফর্সা, উজ্জ্বল মুখ, বড় বড় মায়াভরা চোখ, ঠোঁটভরা শান্ত হাসি—সব মিলিয়ে যেন একেবারে নিখুঁত।
বেশি সময় নিইনি। পরিবারে কথা বললাম, তারপর বিয়েটাও হয়ে গেল।
বিয়ের পরের একটা বছর যেন স্বপ্নের মতো কেটেছিল।
মেহরীন শুধু সুন্দরই ছিল না, ভীষণ যত্নশীলও ছিল।
আমি কী খেতে ভালোবাসি, কোন রঙের পাঞ্জাবি পরলে আমাকে মানায়, কোন সুগন্ধি পছন্দ—সবকিছু ওর নখদর্পণে ছিল।
প্রতিদিন নিজেকে সুন্দর করে সাজাত, শুধু আমার জন্য।
আমরা যখন একসঙ্গে কোথাও যেতাম, তখন বুকটা গর্বে ভরে যেত।
অনেকের চোখে ঈর্ষা দেখতাম।
মনে হতো, পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষটা বুঝি আমি।
আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম, এই সুখ কখনো শেষ হবে না।
কিন্তু মানুষের জীবন তো নিজের ইচ্ছেমতো চলে না।
একদিন সন্ধ্যায় বসে গল্প করছিলাম। হঠাৎ মেহরীনের হাতের কনুইয়ের কাছে ছোট্ট একটা সাদা দাগ চোখে পড়ল।
প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো অ্যালার্জি, কিংবা ত্বকে কোনো সাময়িক সমস্যা।
কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই দাগটা একটু বড় হলো।
এরপর আঙুলের কাছেও আরও কয়েকটা ছোট ছোট সাদা দাগ দেখা দিল।
আমার ভেতরে অদ্ভুত একটা অস্থিরতা কাজ করতে লাগল।
পরদিনই ওকে নিয়ে ঢাকার একজন নামকরা চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গেলাম।
ডাক্তার অনেকক্ষণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে শান্ত গলায় বললেন,
—আপনার স্ত্রীর ভিটিলিগো, অর্থাৎ শ্বেতী রোগ হয়েছে।
কথাটা শুনে আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল।
ডাক্তার অনেক বুঝিয়ে বললেন,
এই রোগ ছোঁয়াচে নয়।
এটা কারও স্পর্শে ছড়ায় না।
এটা শুধু শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটা সমস্যার কারণে হয়।
চিকিৎসা আছে, নিয়ন্ত্রণেও রাখা যায়।
কিন্তু আমি সেদিন ডাক্তারের একটা কথাও মন দিয়ে শুনিনি।
আমার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ঘুরছিল—
মেহরীনের সেই সুন্দর মুখ, সুন্দর শরীর... সব কি বদলে যাবে?
সেদিনের পর থেকেই আমি পাল্টে যেতে শুরু করলাম।
ধীরে ধীরে ওর কাছ থেকে দূরে সরে গেলাম।
আগের মতো হাত ধরতাম না।
এক বিছানায় শুতে অস্বস্তি লাগত।
কাছাকাছি এলেই চোখ চলে যেত সাদা দাগগুলোর দিকে।
অদ্ভুত এক বিরক্তি আর অস্বস্তি আমাকে গ্রাস করে ফেলেছিল।
মেহরীন বুঝতে পারত।
আমি যতই অভিনয় করি, ওর চোখ এড়াতে পারতাম না।
কখনো বলতাম অফিসের কাজের চাপ।
কখনো বলতাম খুব ক্লান্ত।
কখনো অন্য ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম।
ধীরে ধীরে বাইরে কোথাও নিয়ে যাওয়াও বন্ধ করে দিলাম।
আত্মীয়দের বাড়ি, দাওয়াত, ঘোরাঘুরি—সবকিছুতেই নানা অজুহাত দিতাম।
আসলে আমি চাইতাম না, কেউ ওকে দেখে প্রশ্ন করুক।
আমি চাইতাম না, মানুষ ওর দিকে তাকিয়ে থাকুক।
কিন্তু বুঝতে পারিনি, আমার এই আচরণ প্রতিদিন একটু একটু করে মেহরীনকে ভেতর থেকে মেরে ফেলছিল।
আগে যে মেয়েটা সারাক্ষণ হাসত, গল্প করত, ঘরটা প্রাণবন্ত করে রাখত—সে একসময় চুপচাপ হয়ে গেল।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরের দাগগুলো দেখত।
তারপর নিঃশব্দে কাঁদত।
অনেক রাতেও দেখেছি, বালিশ ভিজে আছে।
কিন্তু আমি এগিয়ে যাইনি।
একদিন আমার খুব ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর বিয়ে ছিল।
কাকতালীয়ভাবে, কনের সবচেয়ে কাছের বান্ধবী ছিল মেহরীন।
বিয়েতে যাওয়ার জন্য ও কয়েকদিন ধরেই খুব উচ্ছ্বসিত ছিল।
বলছিল,
—অনেকদিন পর সবাইকে দেখব।
বিয়ের দিন ও খুব যত্ন করে সাজল।
মেকআপ দিয়ে যতটা সম্ভব সাদা দাগগুলো ঢাকার চেষ্টা করল।
শাড়িটাও অনেক যত্ন করে পরল।
সব প্রস্তুতি শেষ করে আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল।
আমি ওকে দেখে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলাম।
তারপর ঠান্ডা গলায় বললাম,
—তুমি আজ যেও না। শরীর ভালো না। বাসায় থাকো।
মেহরীন কিছুক্ষণ স্থির হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
—আমার শরীর খারাপ না। তুমি যদি আমার সঙ্গে যেতে না চাও, আমি একাই যাব।
ওর কণ্ঠে কষ্ট ছিল, কিন্তু আত্মসম্মানও ছিল।
আমি আর কিছু বলতে পারলাম না।
শেষ পর্যন্ত ওকে নিয়েই গেলাম।
কিন্তু পুরো রাস্তা একটা কথাও বলিনি।
বিয়ের অনুষ্ঠানে ঢোকার পর আমার আশঙ্কাই সত্যি হলো।
অনেকে মেহরীনের শরীরের দাগ দেখে অবাক হয়ে প্রশ্ন করতে লাগল।
—কী হয়েছে?
—ডাক্তার দেখিয়েছ?
—হঠাৎ এমন হলো কীভাবে?
আমি সেই মুহূর্তে ওর পাশে দাঁড়ানোর বদলে বন্ধুদের সঙ্গে গিয়ে দাঁড়ালাম।
পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ইচ্ছে করেই ওকে একা রেখে দিলাম।
দূর থেকে দেখছিলাম, ও একা একটা চেয়ারে বসে আছে।
মাঝে মাঝে চারদিকে তাকাচ্ছে।
হয়তো আমাকে খুঁজছিল।
কিন্তু আমি আর কাছে যাইনি।
রাত করে বাসায় ফিরলাম।
সারা পথ দুজনের মধ্যে একটা কথাও হয়নি।
বাসার দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেহরীন আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
চোখভরা জল নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—আমার অপরাধটা কী?
—আমি কি ইচ্ছে করে এই রোগ ডেকে এনেছি?
—আমি কি চেয়েছিলাম আমার এমন হোক?
আমি বিরক্ত হয়ে টাই খুলতে খুলতে বললাম,
—আমি খুব ক্লান্ত। এখন এসব নিয়ে কথা বলতে চাই না। পরে কথা হবে।
কিন্তু এবার মেহরীন আমাকে যেতে দিল না।
আমার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলল,
—না, আজই কথা হবে।
—একটা কথা বলো...
—এতদিনের সংসারে তুমি কি শুধু আমার সৌন্দর্যটাই ভালোবেসেছিলে?
—আমাকে মানুষ হিসেবে কখনো ভালোবাসোনি?
আমি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলাম।
তারপর এমন একটা কথা বললাম, যেটা কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে কখনো বলা উচিত নয়।
আমি বললাম,
—হ্যাঁ।
—আমি সবসময় সুন্দর জিনিস ভালোবাসি।
—আমি এই পরিবর্তনটা মেনে নিতে পারছি না।
—এটা আমার পক্ষে সম্ভব না।
কথাগুলো শুনে মেহরীন আর কাঁদল না।
চোখের জল মুছে অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে করে বলল,
—তাহলে এখন আমাকে আর দেখতে ভালো লাগে না... তাই তো?
আমি কোনো উত্তর দিইনি।
আমার নীরবতাই সব উত্তর দিয়ে দিয়েছিল।
কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকার পর ও মাথা উঁচু করে বলল,
—তাহলে আমাকে তালাক দিয়ে দাও।
অদ্ভুতভাবে, সেই মুহূর্তে কথাটা আমার কাছে মুক্তির মতোই মনে হয়েছিল।
এক মুহূর্তও দেরি করিনি।
বলেছিলাম,
—ঠিক আছে।
পরদিন সকালে মেহরীন নিজের সব কাপড়-চোপড় গুছিয়ে বাবার বাড়ি চলে গেল।
একবারও পেছনে ফিরে তাকায়নি।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর অনেকক্ষণ আমি একা বসে ছিলাম।
ভেতরে কোথাও একটা অপরাধবোধ হচ্ছিল।
মনে হচ্ছিল, আমি হয়তো খুব অন্যায় করেছি।
আবার নিজের মনই আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল—
এটাই ভালো হয়েছে।
এভাবেই দুজনের জীবন সহজ হবে।
সেই ভাবনাটা মাথায় নিয়েই রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লাম।
অনেকদিন পর মনে হচ্ছিল, বুকের ওপর থেকে যেন বিশাল একটা বোঝা নেমে গেছে।
কিন্তু পরদিন সকালেই আমার সেই বিশ্বাসটা চুরমার হয়ে গেল।
সূর্যের আলো মুখে এসে পড়তেই ধীরে ধীরে চোখ খুললাম।
ঘুমজড়ানো চোখে সামনে তাকাতেই যা দেখলাম...
মুহূর্তের মধ্যে আমার শরীর অবশ হয়ে গেল।
বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
চোখ বড় বড় হয়ে গেল আতঙ্কে।
তারপর...
আমি আর কিছুই মনে রাখতে পারিনি।

Post a Comment

0 Comments