টাকার ক্ষমতা

টাকার ক্ষমতা


কাকে জিজ্ঞেস করে গলদা চিংড়িটা তুমি রিন্টুর পাতে দিলে বৌমা? নীলিমা দেবীর রাগী গলা শুনে আপনার থেকেই মাথা নীচু হয়ে গেল রাকার| যবে থেকে তার চাকরিটা গেছে সেদিন থেকে অপমান আর গঞ্জনা নিত্যসঙ্গী| বিদেশে বসবাসকারী অনিমেষের দাদা-বৌদির আগমনে বাড়িতে এই কদিন একটু ভালো খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করা হয়েছে| সকাল থেকেই রান্নাঘরে রাকা, শাশুড়ির নির্দেশ অনুযায়ী একের পর এক রান্না সারছিল| সুস্বাদু পদগুলো শোভা পাচ্ছিল ডাইনিংয়ে| ভোর হতে না হতেই দরজা ধাক্কা দিয়ে তুলে শাশুড়ি অনিমেষকে বাজারে পাঠিয়েছিল, বড় ছেলে-বউয়ের আগমন উপলক্ষ্যে বাজার তুলে আনার নির্দেশ দিয়েছিল, অনেকগুলো টাকাও দিয়েছিল হাতে| অথচ এমনিতে অভাবের সংসারে খাবার চালটুকু ফুরিয়ে গেলেও শাশুড়ির হাত দিয়ে টাকা গলে না| যে করেই হোক অনিমেষকে সবটা ম্যানেজ করতে হয়|
মাস ছয়েক আগেও পরিস্থিতি এমনটা ছিল না| অনিমেষ, রাকা দুজনের আয়ে সচ্ছল ভাবে চলে যেত সংসার| কিন্তু পিংকির মা হঠাৎ গ্ৰামে বাড়ি করে কাজ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরেই ঘটল বিপদ| ছোট্ট রিন্টুর দেখভালের লোক খুঁজতে খুঁজতে গলদঘর্ম হয়ে যাচ্ছিল দুজনে, শাশুড়ি মা বাড়িতে বসে থাকলেও ছেলে সামলাবেন না কিছুতেই| তার নিজের কাজ আছে, পাড়া বেড়ানো আছে, সিরিয়াল দেখা আছে, এত কাজ সেরে বাচ্চা ছেলে দেখা সম্ভব! অফিসে যেতে দেরি, রাকার কাজে কর্মেও ভুল হতে লাগল| ফলাফল কয়েক মাসের মধ্যে কোম্পানি পিঙ্ক স্লিপ ধরিয়ে দিল| অনেক চেষ্টা করেও চাকরি বাঁচাতে পারল না রাকা| সেই থেকে অভাব নিত্যসঙ্গী| একার আয়ে অনিমেষ সবকিছু টেনে উঠতে পারে না| রাকার চাকরি যাওয়ার পর থেকেই নীলিমা দেবীর মুখ গোমড়া, রিন্টুকে একদম দেখতে পারেন না| কথায় কথায় মুখঝামটা, খাওয়াদাওয়া নিয়ে খোঁটা| বাচ্চা ছেলে এত কি বোঝে? বরাবর সচ্ছলতায় মানুষ, অভাব কি বুঝতে পারে না| যখন তখন এটা ওটা খাওয়ার জন্য বায়না করে| নিজের পেনশনের টাকায় নীলিমা দেবী ঘরে বাদাম চিট, চকোলেট, চানাচুর এনে রাখেন| ছোট্ট রিন্টু একদিন একটা বাদাম চাট বের করে খেয়ে নিয়েছিল, শাশুড়ির চোখে পড়ে যাওয়ায় সে কি অশান্তি| এখন থেকেই চোর তৈরি হচ্ছে, সামলে রেখো বৌমা, নইলে দেখবে বড় হয়ে কোনোদিন চু*রির দায়ে জেলে যাবে| সেদিন ছেলের ছোট্ট নরম পি*ঠে দুমদাম কয়েক ঘা দিয়ে দিয়েছিল, পরে ছেলেকে কোলে নিয়ে নিজের অপরাগতার কথা ভেবে কেঁদেই যাচ্ছিল, তখন ছোট্ট রিন্টু দুহাতে চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলেছিল আমার লাগে নি মা, আর কোনদিন ঠাম্মার ঘরে যাব না|
চিংড়িটা তুলে নাও এখুনি, ওই গলদা চিংড়িগুলো আশু দাদাভাই আর পরী দিদিভাইয়ের জন্য আনা হয়েছে| জানোই তো ওরা অন্য মাছ খায় না, কেবল চিংড়িটুকুই তো খায়, তাতেও এই ছেলের নজর! তোমারও বা কি আক্কেল বৌমা ওদের সঙ্গে রিন্টুটাকে খেতে দিয়েছ| ও কি ওদের সঙ্গে বসার যোগ্য? কেউ কিছু খেলেই নজর! তোমরা খাও দাদাভাই, সস্নেহে আশুর মাথায় হাত রাখেন নীলিমা|
না, না ও চিংড়ি আর তুলতে হবে না| ওটা ওই রিন্টুটাই খাক, বরং| না দিলে আবার আমার ছেলেমেয়েদের খাওয়ার দিকে নজর দেবে, দুদিনের জন্য দাদুর বাড়ি বেড়াতে এসে বেচারারা পেটখা''রাপে ভুগবে| ও চিংড়ি রিন্টুই খাক, আপনি তো আগেই ওদের সঙ্গে রিন্টুকে খেতে বসতে মানা করতে পারতেন, বিরক্ত মুখে বলে ওঠে অদিতি, রাকার ভাসুর বৌ|
কোনরকমে দাঁতে দাঁত চেপে চোখের জল আটকে রাকা দেখল দরজায় অনিমেষ দাঁড়িয়ে| তার চোখভর্তি জল| আজ মা এভাবে ছেলেটাকে বলল, রিন্টুটা যে বড্ড চিংড়ি ভালোবাসে| কারুর ঠাকুমা যে নাতিকে এভাবে বলতে পারে রাকার তা জানা ছিল না| মনে মনে ভাবছিল কি অসহায় মা সে, ছেলেকে এক টুকরো চিংড়ি খাওয়ানোরও সাধ্য নেই তার| একসময় এই ভাসুর এলে অনিমেষ দুহাতে বাজার করেছে, জমানো টাকা বের করে দিয়েছে রাকা| অদিতি দিদিভাইয়ের জন্য অফিস শেষে মার্কেট ঘুরে পছন্দসই ব্যাঙ্গালোর সিল্ক কিনে এনেছে| কিনে এনেছে মুক্তোর সেট| শুধু তাই কেন, শাশুড়ির জন্য কম করেছে রাকা? অফিস ফেরতা মাঝেমধ্যেই রকমারি উপহার নিয়ে আসত| মাত্র ছ'মাসের ব্যবধানে সম্পর্কগুলো কেমন ঠুনকো হয়ে গেল!
কে''টে গেছে সপ্তাহ দুই| কালই কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাবে নিখিলেশ, অনিমেষের বড়দা| স্পেশাল বাজার করার নির্দেশ দিতে এসে নীলিমা দেখলেন ছোটছেলের ঘরে গোছগাছ চলছে| এ কি তোরা আবার সাতসকালে কোথায় চললি? বাজার করা বাকি, সৃষ্টির রান্নাবান্না পড়ে আছে| ফালতু সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে যাও বৌমা| তোমাদের এখন কোথাও যাওয়া টাওয়া হবে না|
যেতে তো আমাদের হবেই মা| বড় রাস্তায় গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে যে| বেশিক্ষণ অপেক্ষা করা সম্ভব নয়| রাকা পুনরায় গোছগাছ করতে শুরু করে|
মানে? কোথায় যাচ্ছ তোমরা? বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকান নীলিমা, জানো না কাল বড় খোকা বিদেশ চলে যাচ্ছে| রান্নাবান্নাগুলো করবে কে?
সে আপনি যা ভালো বুঝবেন করে নেবেন| চাইলে বড়দিভাইও আপনাকে সাহায্য করতে পারে|
তুমি থাকতে অদিতি আমায় সাহায্য করবে? আমি রান্না করব? তোমার মাথা ঠিক আছে তো বৌমা?
একদম মা, আর তো আমরা থাকছি না| তাই আমার ওপর নির্ভরশীলতা কাটানোই ভালো হবে আপনার পক্ষে| চলে যাচ্ছি এ বাড়ি ছেড়ে চিরদিনের মতো| ভালো থাকবেন মা|
ব্যঙ্গের হাসি ফুটে ওঠে নীলিমা দেবীর ঠোঁটে, অনিমেষের মাইনেতে তো জলটুকু গরম হয় না| ওইটুকু ছেলে নিয়ে থাকবে কোথায়? বস্তিতে?
আমি একটা চাকরি পেয়েছি মা| আগেরটার থেকে অনেক ভালো| তিনগুণ মাইনে, সঙ্গে ফুল ফার্নিসড ফ্ল্যাট| আপনার নাতি ঠিকঠাকই মানুষ হবে|
ওই বিচ্ছু ছেলেকে সামলে চাকরি? দেখলাম তো একবার| অফিস থেকে তাড়িয়ে দিলে তো ফ্ল্যাট ছেড়ে সবাই মিলে রাস্তায় নামতে হবে|
হবে না, মা| নতুন অফিসে ক্রেশের ব্যবস্থা রয়েছে সেখানেই বাকি বাচ্চাদের সঙ্গে রিন্টু থাকবে| ওয়ার্কিং মমদের সুবিধার কথা কোম্পানি না ভাবলে এমপ্লয়িরা কোম্পানির লাভের অঙ্ককে সর্বাধিক উচ্চতায় পৌঁছে দেবে কিভাবে?
কোন কিছুতেই কাজ হচ্ছে না দেখে নীলিমা দেবী তাঁর মোক্ষম অ*স্ত্র ছাড়েন| বৌয়ের ফ্ল্যাটে থাকবি তুই লজ্জা করবে না?
রাকা আমায় ভালোবাসে মা, দুজনে মিলে আমরা ঠিক সংসার গড়ে নেব| অন্ততঃ আয়ের বিচারে সেখানে ভালোবাসা বদলে যাবে না| রাকা বেশি রোজগার করলে আমার কোন সমস্যা নেই| স্বাচ্ছন্দ্য থাকবে কিনা জানি না কিন্তু এটা জানি সেখানে কেউ অন্ততঃ আমার ছেলের মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়ার সাহস দেখাবে না| ভালো থেকো মা, আসি আমরা| রিন্টুকে কোলে নিয়ে ট্রলি হাতে দরজার দিকে এগিয়ে যায় অনিমেষ|
কেঁদে ফেলেন নীলিমা দেবী| একা একা এতবড় বাড়িতে কিভাবে বাঁচব আমি? এমন শাস্তি তুই দিস নি ছোট খোকা| আমার ভুল হয়ে গেছে, আমি অন্ধ হয়ে গেছিলাম| তুই তো জানিস বড় খোকারা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত, সে সংসারে আমার ঠাঁই নেই|
গেট পার করে রাকা বলল, একা তো কি মা? একা নিয়ে আপনি কবে ভেবেছেন? আপনার তো পেনশন আছে| যার জোরে ওইটুকু বাচ্চা ছেলেকে চো*র বলতেও আটকায় না আপনার| নিজের সাজানো দুনিয়ায় ভালো থাকবেন আপনি|
ওই দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে রাকা-অনিমেষ| ঝাপসা চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছেন নীলিমা দেবী| এমন দিন দেখতে হবে ভাবেন নি কখনো| সারাজীবন টাকাপয়সার হিসেব কষতে কষতে সম্পর্কের বাঁধন কবে আলগা হয়ে গেছে টেরও পান নি| আজ বুঝতে পারছেন বড্ড ভুল করে ফেলেছেন| ইউনিভার্সিটি টপার রাকাকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়া উচিত হয় নি তাঁর| বড় ছেলের সংসারে কোনদিন ঠাঁই হবে না| অদিতি চিরকালই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত| অনিমেষ হয়ত আর কোনদিনই ফিরবে না এ বাড়িতে|অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হয়েই বাকি জীবনটা তাঁকে দিনাতিপাত করতে হবে|

Post a Comment

0 Comments