মায়ের মৃ*ত্যুর চল্লিশ দিন যেতে না যেতই বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন বউ ঘরে উঠান। তিনি নাকি বিয়ে করতে চাননি, আমার আর আমার ছোট বোন মিনুর জন্যই নাকি তার বিয়ে করা, একথা বাবা নিজের মুখেই বলেছেন। আমি পিয়াস, ২০০৬ সালে আমার বয়স তখন ১৪ আর মিনুর ৫ । মিনুর ভালো নাম মিনারা, মায়ের নাম মনোয়ারা। মায়ের নামের সাথে মিল রেখেই এই নাম রাখা। আমি নিজের টা ঠিক নিজে করে নিতে পারলেও মিনুর জন্যই ঘটে বিপত্তি।
বাবা একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, বেশ ভালো টাকাই বেতন পান। উত্তরাধিকার সূত্রেও বেশ অনেক সম্পত্তি পেয়েছেন তিনি। শহরের মধ্যিখানে আমাদের জায়গাসহ দুতলা বাড়ি রয়েছে, সেখানেই ছিল আমাদের বসবাস। সুখের কোনো কমতি ছিলো না। কিন্তু সুখ কি সবার কপালে সয়? সারাজীবন কেউই সুখে কাটাতে পারে না। ক্যা*ন্সার নামক মরন ব্যাধি আগুন ধরায় আমাদের জীবনে। আমার প্রিয় মাকে কেড়ে নেয় নিষ্ঠুরভাবে।
মা যখন মৃত্যু পথযাত্রী তখন তিনি বাবাকে ডেকে হাতজোড় করে বলেছিলো, আমার বাচ্চাদের অবহেলা করিও না সোহেল, ওদের মানুষ করিও, আমার অভাব বুঝতে দিও না।
মায়ের চোখে সেদিন আমি কষ্ট দেখেছি, না না, মৃত্যুর জন্য কষ্ট না, সন্তানদের এই নিষ্ঠুরতম পৃথিবীতে একা অসহায় ফেলে যাওয়ার কষ্ট। কথিত আছে মা মরলে বাপ তালই।
মা চলে যাওয়ার পর আমরা বাবার সাথেই মা বাবার ঘরে ঘুমাতাম, কিন্তু আজ আমাদের সেখানে জায়গা হলো না। আমারা আমাদের জন্য বরাদ্দ করে রাখা সেই পুরনো ঘরে ফিরে গেলাম।
মিনু তার প্রিয় পুতুল টা নিয়ে খেলছিলো। পুতুল টাকে আদর করছিলো, ঘুম পাড়াচ্ছিলো আবার আঙুল উচিয়ে শাসন করা টাও বাদ দিচ্ছে না। ঠিক মায়ের মতো। মিনুর চেহারাতে মায়ের ছায়া খুজি আমি, পেয়েও যাই।
বাচ্চা মানুষ খেলাতেই ভূলে থাকে বিধায় তার তেমন কোনো কষ্ট নেই। এক-দুবার মায়ের কথা মনে পরলে কেঁদে উঠে তখন আমাকেই সামলাতে হয়। ফুপুও আসে মাঝেমধ্যে, নানু খালারাও এসে দুঃখ প্রকাশ করে। বাবা তেমন একটা সময় দিতে পারেনা।
মিনুর দিকে তাকিয়ে থেকে কিছুক্ষণ পর আমার মনে অন্যচিন্তা ঢুকে।
সৎ মায়ের সংসারে আমরা না আগাছা হয়ে যাই।
গ্রাম অঞ্চলে একটা প্রবাদ আছে, মায়ের আদরে বাবার কোলে বসে। আমাদের তো মা নেই তাহলে বাবার কোলে কীভাবে বসে থাকবো।
আজকেই তো বাবার ঘরেই জায়গা হলো না। মায়ের মৃত্যুর কষ্টটা দিগুণ হয়েছে বাবার বিয়ে করাতে। বুক চাপা কষ্ট নিয়ে বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করি। কিন্তু নাহ্ কিছুতেই ঘুম আসছে না। মিনু অনেক আগেই ঘুমিয়ে কাতর শেষ রাতে চোখ লেগে আসে আমারও।
সকালে ঘুম ভাঙলো এক নতুন কণ্ঠস্বর শুনে। কেউ একজন মিষ্টি করে ডাকছিলো
" পিয়াস বাবা উঠো, আর কতো ঘুৃমোবে তোমার নাস্তা দিয়েছি টেবিলে খেতে এসো। "
মা আমাকে পিয়াস বাবা বলে ডাকতো, ঘুমের মধ্যে মুহুর্তের জন্য ভেবে নিয়েছিলাম মা এসেছে।
ঘুৃমঘুম কন্ঠে বললাম
" মা আরেকটু ঘুমাই! "
তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। হাতের স্পর্শ পেয়ে আমি হুট করে চোখ খুলে তাকালাম।
চোখ খুলতেই আমি আশাহত হলাম। আমার সামনে মা নয়, বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী দাড়িয়ে।
আমি বেশ বিরক্ত হলাম। আমার বিরক্তি তিনিও বুঝতে পারলেন।
আমি উঠে গেছি দেখে তিনি বললেন
" খেতে এসো। "
আমি কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলাম, তারপর উঠে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে গেলাম।
গতকাল বাবার বিয়ে ছিলো, তাই ফুপু, চাচারা এসেছিলো। আমাদের দাদা দাদি নেই। হয়তো দাদি থাকলে আমার বাবার আবার দ্বিতীয় বিয়ে করতে হতো না।
ডাইনিং টেবিলে এলাহী আয়োজন। সবই নাকি বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী রান্না করেছেন। মহিলা এতো সকালে উঠে এতোকিছু করেছেন। নিশ্চয়ই তা লোক দেখানো। প্রথম দিন এসে ভালো মানুষি দেখাচ্ছেন। সবার মন জয় করতে হবে তো। দিন গড়ালে নিশ্চয়ই আমাদের দুচোখে দেখতে পারবে না।
মিনুকে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে ওই মহিলা। অনেকদিন পরে মিনু কোনো তামাশা না করে খাচ্ছে, খেতে খেতে এটা ওটা বলে খিলখিলিয়ে হাসছে। আর মহিলা মিনুকে কিসব উদ্ভট কাহিনী শুনাচ্ছে, বাচ্চা বলে কি যা মনে আসে তাই শুনিয়ে দেয়া যায়?
আমি ছাড়া বাকি সবার মুখে প্রশান্তির হাসি।
পাতে দুমোটো ভাত নাড়াচাড়া করছিলাম, ওই মহিলা আমার পাতে একটা বড় গলদা চিংড়ি তুলে দিল, যা আমার বেশ প্রিয় । সব থেকে প্রিয়ই বলা যায়৷ মাও এই কাজটা করতো, গলদা চিংড়ি রাখলে সবার আগে সবচেয়ে বড় চিংড়ি টা আমার পাতে দিত । আমি উনার দিকে তাকালাম, উনি আমার পানে চেয়ে মুচকি হাসি দিল।
যা আমার সহ্য হলো না। আমি পাতে পানি ঢেলে খাওয়া ছেড়ে উঠে চলে গেলাম। যাওয়ার সময় মিনুকেও কোলে করে নিয়ে এসেছি।
মিনুর হাতে মুরগীর লেগ পিস টা রয়ে গেছে, আর মুখে ঠাসা মাংস। ও এগুলো চিবুতে চিবুতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, কোনো কথা বলতে পারছে না, মুখ ভর্তি তাই।
মিনুকে ওর বিছানায় বসিয়ে রেখে আমি স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে আসি, তারপর মিনুকেও তৈরি করে দিই। মিনুকে এবার স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে , নার্সারিতে আর আমি অষ্টম শ্রেণিতে।
দু'ভাইবোনে রুম থেকে বেড়িয়ে বসার ঘরে কারো দিকে না তাকিয়ে বাহিরের দিকে হাটা শুরু করি। তখন বাবার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর কানে বাজে
" পিয়াস.... "
আমার পা জোড়া স্থির হয়, তবে বাবার দিকে আমি তাকাইনি। যেদিন থেকে শুনেছি বাবা আবার বিয়ে করছে, সেদিন থেকেই আমাদের বাবা ছেলের মধ্যিখানে দুরত্ব বেড়ে গিয়েছিলো।
আমি পিছনে না ঘুরায় বাবাই আমার সামনে এসে দাড়ালো।
শান্ত কন্ঠে বললো
" আজ স্কুলে যাওয়ার দরকার নেই, কাল যেও। তোমার ফুপু আর চাচারা আজ চলে যাবে। "
আমি বাবার কথার প্রতিত্তোরে সংক্ষিপ্ত জবাব দিলাম
" স্কুলে যাবো। "
মিনু দৌড়ে বাবার কাছে চলে যায়, বাবা ওকে কোলে তুলে নেয়। মিনু বাবার কোলে উঠে বলে
" আমি স্কুলে যাবো না। "
আমি সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে চলে যাই।
বিকালে যখন স্কুল থেকে ফিরি তখন বাসার পাল্টে যাওয়া চেহারা চোখে পরে। আমার মায়ের সাজিয়ে রেখে যাওয়া বাসা টা বদলে গেছে। সোফা, চেয়ার, ডাইনিং টেবিল, টিভি, ফ্রিজ সব কিছুরই জায়গা বদল হয়েছে। দেয়ালে টাঙানো আমাদের ফ্যামিলি ফটোর পাশে জায়গা পেয়েছে বাবার সাথে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর বিয়ের ছবি। আমার মাথা রাগে টগবগ করছে। একদিনেই সবকিছু পরিবর্তন করে দিয়েছে।
আমি সোজা হেটে বাবার রুমে ওই মহিলার কছে গিয়ে চিৎকার করে বললাম,
"আমার মায়ের শখের সাজানো সংসারের জিনিস পত্র এদিক ওদিক সরানোর অধিকার কে দিয়েছে আপনাকে?"
সে শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল
" যে দুনিয়ায় নেই তার আবার শখের দাম দিতে হবে কেন? সে কি দেখছে নাকি কি হচ্ছে না হচ্ছে। "
তারপর দেয়ালে নিজের শাড়ী পরা সুন্দর একটা ছবি লাগালো, ঠিক আমার মায়ের পাশে।
" আমি কিন্তু তোমার মায়ের কোনো ছবি বা সৃতি চিহ্ন ফেলে দিইনি। শুধু সবকিছু নিজের মন মতো করে সাজিয়ে নিয়েছি। কারন এটা এখন আমার সংসার, তোমার মায়ের নয়। "
শেষ কথাটা উনি আমার কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলেছেন। আমার কানে কথাটা বার বার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, জীবনে শুনা সব থেকে ভয়ংকর সত্যি কথাটা হচ্ছে, এটা আমার মায়ের সংসার নয়। অন্যকারো সংসার।
বাবাও মাকে এতো তাড়াতাড়ি ভূলে গেলো?
উনি উনার কাজ করছে, আমি ঠায় একজায়গায় দাড়িয়ে রয়েছি।
আমার দিকে তাকিয়ে উনি একবার মুচকি হাসি হাসলো।
আমি বেড়িয়ে এলাম।
রুমের সামনে বাবার সাথে দেখা। আমার চোখমুখ থমথমে দেখে বাবা জিজ্ঞেস করলেন
" কি হয়েছে পিয়াস, কোনো সমস্যা? "
" তুমি খুব খারাপ বাবা, খুব খারাপ। আমি কোনোদিন তোমার মতো হবো না। "
আমি বাবার কাছে থেকে চলে গিয় রুমের ভিতর দরজা আটকে বসে অনেক্ক্ষণ কান্না করেছি। ছেলেদের নাকি কান্না করতে নেই। এটা মা বলতো। মা নেই বিধায় মায়ের কথার'ও কোনো দাম রইল না আমার কাছে।
সবার মতো কি আমিও মাকে অবহেলা করছি?
না না এ অসম্ভব, দুনিয়াতে মা আমাকে সব চেয়ে বেশি ভালোবাসতো, আর আমিও তো মাকে খুব ভালোবাসি, সারাজীবন বেসে যাবো। এভাবে অন্য কেউ উড়ে এসে জুড়ে বসবে আমার মায়ের সংসারে, তা তো হতে দেওয়া যায় না।
কান্না করতে করতে কখন ঘুমিয়ে গেছিলাম জানি না। ঘুম ভাঙ্গে মাঝ রাতে। দেয়ালে টাঙানো ঘড়িতে ১২:৪৫ । আমি যে রাতে খাইনি তাও কেউ আমাকে ডাকতে এলো না, মিনুও এলো না। হয়তো বাবার সাথে ঘুমিয়েছে। অবশ্য মা থাকলে এক বেলা না খেয়ে থাকতে পারিনি, ক্ষুধা না থাকলেও খেতে হয়েছে। প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে, দুপুরেও খাইনি কিছু। পেটে মেঘের মতো গর্জন করছে।
দরজা খুলে বেরিয়ে রান্না ঘরে যাওয়ার পথে বাবার কণ্ঠস্বর শুনতে পাই
" এ জীবন ধন্য হলো তোমাকে পেয়ে। যদি না পেতাম হয়তো শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আফসোস থেকেই যেতো। এক মুহুর্তের জন্যও তোমাকে ভূলতে পারিনি । আর ছেড়ে যেও না রুপসা। আমি সব সুখ তোমার পায়ের কাছে এনে রাখবো। "
" তোমায় ছেড়ে কোনোদিন যাবো না আর না গিয়েছিলাম, মনে করে দেখো। যাই হোক অতীত ভূলে আবারও এক হয়েছি আমরা।"

0 Comments