হৃদয়_ভীষণ_ব্যাকুল

হৃদয়_ভীষণ_ব্যাকুল


নিয়ায নিজের ঘরে এলো পাক্কা সাত মাস পর। ঘরে ঢুকেই সে হতভম্ব হয়ে যায়। পুরো ঘরের আসবাবপত্র বদলে গেছে। নতুন খাট, নতুন আলমারি, নতুন পর্দা—সবকিছুই নতুন। শুধু এই ঘরের মালিকটাই পুরোনো। নিয়ায ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ঢুকে চারপাশে চোখ বুলালো। ঘরের এক পাশে তার আঁকা পেইন্টিংগুলো খুব যত্ন করে রাখা আছে। এটা নিশ্চয়ই মায়ের কাজ। মা তার সব জিনিসই খুব যত্ন করে গুছিয়ে রেখেছেন। চশমাটা খুলে নিয়ায দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে চিৎ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল হাত-পা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। দীর্ঘ জার্নি করে সে ভীষণ ক্লান্ত। কিন্তু এভাবে শুয়ে থাকলে হবে না। আগে ফ্রেশ হয়ে খাওয়াদাওয়া করতে হবে, নয়তো মা ভীষণ রাগারাগি করবে।
নিয়ায উঠে বসল। আলমারি থেকে ট্রাউজার আর তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমে গেল। গোসল সেরে নিয়ায ভেজা চুল মুছতে মুছতে এসে আরাম করে বিছানায় বসে। কিন্তু আকস্মিক নিয়ায চমকে উঠে চোখ বড় বড় করে তাকায়। ভেজা তোয়ালেটা বিছানার ওপর ফেলে দ্রুত ল্যাপটপ ব্যাগের চেইন খুলে কিছু একটা খুঁজতে লাগল। কিন্তু না, কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা পেল না। নিয়ায লাগেজগুলোও খুলে খুঁজল। সেখানেও নেই। নিয়াযের অস্থিরতা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, জিনিসটা তার কাছে কতটা মূল্যবান। নিয়ায প্রতিটা ব্যাগ তন্নতন্ন করে খুঁজল। কিন্তু কিছুই পেল না। অথচ তার স্পষ্ট মনে আছে, সে জিনিসটা ল্যাপটপ ব্যাগেই রেখেছিল। তাহলে জিনিসটা কোথায় গেল? নিয়ায হতাশ হয়ে মাথার চুল টেনে ধরে ফ্লোরে বসে পড়ল। ফেলে এসেছে ঢাকায় তার অতি প্রিয় জিনিসটা। যে জিনিসটা এতগুলো বছর ধরে সে যত্ন করে আগলে রেখেছিল নিজের কাছে, আজ সেটাই হারিয়ে ফেলেছে। নিয়াযের ইচ্ছে করছে জোরে চিৎকার করে বুকের ভেতরের চাপা যন্ত্রণাটা কমাতে। ঠিক তখনই নীলা এলো তার ঘরে। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাপড়চোপড় আর ভাইকে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় বসে থাকতে দেখে নীলা আতকে উঠে বলল।
"ভাইয়া, কী হইছে?"
নিয়ায বোনের কণ্ঠ শুনে শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "কিছু হয় নাই। তুই কেন এসেছিস বল।"
নীলার ঠিক বিশ্বাস হলো না ভাইয়ের কথা। ভাইয়ের কিছু তো একটা হয়েছে এটা নিশ্চিত। নীলা বলল, "মা খেতে ডাকছে তোমাকে।"
নিয়ায ধীর স্বরে বলল, "যা, আসছি।"
কিন্তু নীলা গেল না। বরং কৌতূহলী গলায় বলল, "ভাইয়া, তুমি কি খুঁজছো?"
নিয়ায গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "না।"
নীলা চলে গেল। নিয়ায বিছানায় এসে বসতেই হঠাৎ তার চোখ পড়ে অদূরে রাখা সোফার নিচে। সেখানে রুপালি কিছু একটা চকচক করছে। নিয়ায এক মুহূর্তও দেরি না করে হুড়মুড় করে গিয়ে সোফার নিচ থেকে জিনিসটা বের করল। আর বের করেই যা দেখল, তাতে তার চোখ-মুখ স্বস্তিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নিয়ায তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে জিনিসটা বুকের সঙ্গে চেপে ধরল। তারপর বিড়বিড় করে বলল, "ফাইনালি খুঁজে পেলাম।"
নিয়ায রুপালি রঙের বস্তুটা তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলের মাঝে ধরে চোখের সামনে ধরল। আফসোস মাখা কণ্ঠে বলল, "দেখ আলো, আজকাল তোর নুপূরটাও তোর মতো আমার সাথে লুকোচুরি খেলে। আমার তো হার্টবিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম ছিল। তুই আর তোর নুপূর, পুরো সেইম টু সেইম।"
ঠিক তখনই নাজমা খানমের চিৎকার ভেসে এলো, "নিয়ায বাবা, তাড়াতাড়ি আয়। খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।"
নিয়াযও জোরে বলল, "আসছি মা।"
নিয়ায নুপুরটা সাবধানে ট্রাউজারের পকেটে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। নিয়ায খাবার টেবিলে এসে বসতেই নাজমা খানম প্রশ্ন করেন, "কিছু কি হচ্ছে নিয়ায?"
"কি হবে?"
"নীলা এসে বলল..।"
মায়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই নিয়ায বলল, "একটা মূল্যবান জিনিস হারিয়ে গিয়েছিল মা তাই খুঁজছিলাম।"
"পেয়েছিস জিনিসটা?"
নিয়ায মৃদু হেসে বলল, "হুম পেয়েছি।"
______
নিয়াযের খেতে খেতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে যায়। শিকদার বাড়ির বসার ঘরে যেন ছোটখাটো এক আসর জমে উঠেছে। ঢাকায় কাটানো দিনগুলোর গল্প করছে নিয়ায। আর পরিবারের সবাই তাকে শোনাচ্ছে এই কয়েক মাস গ্রামে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা। একপর্যায়ে নিয়ায মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, "মা, ভাবি আর কাব্য কই? আসার পর থেকে তো একবারও ওদের দেখলাম না।"
শেফালি বেগম উত্তর দিলেন, "খাদিজার আজ বাপের বাড়ি থেকে আসার কথা ছিল। কিন্তু বেয়াই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় আর আসা হয়নি। তবে আগামীকাল আসবেই। কাব্য তো তুই এসেছিস শুনে আর থাকতেই চাইছে না।"
নিয়ায মুচকি হেসে নীলার দিকে তাকাল বলল, "কি রে, কাব্যের জন্য আনা জিনিসগুলো অক্ষত আছে তো?"
নীলা সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, "ভাইয়া, তুমি কি আমাকে চোর-চোট্টা ভাবো নাকি? যে ভাতিজার জিনিসে হাত দিব?"
নিয়ায গম্ভীর মুখে বলল, "তোর যা স্বভাব, বলা যায় না। ভাতিজার খাবার খেয়েও ফেলতে পারিস।"
"মা, দেখছো? ভাইয়া কিভাবে অপমান করছে আমাকে!"
নাজমা খানম প্রতিবাদ করে বললেন, "আহ নিয়ায, আমার মেয়েটাকে এভাবে বলবি না তো।"
নাহিন পাশ থেকে খোঁচা মেরে বলল, "ভাইয়া ভুল কি বলছে? আপুর যা নোলা বাবাগো!"
নীলা এবার রেগে-মেগে নাহিনের দিকে তেড়ে গেল, "কি বললি তুই?"
নাহিন আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। নীলাও তার পেছন পেছন ছুটল। বসার ঘরে থাকা সবাই দুজনের কাণ্ড দেখে হেসে উঠল। ছেলে মেয়ে দুটো বড় হচ্ছে আর দিন দিন একে অন্যের শত্রু হচ্ছে। একে বার সাপে নেউলের সম্পর্ক।
এমন সময় বাইরে থেকে গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে এলো।ইখলাস শিকদার আর আহসান শিকদার বাড়ি এসেছেন। নিয়ায প্রথমে ইখলাস শিকদারের কাছে গিয়ে বলল,‌ "চাচ্চু, কেমন আছো?"
ইখলাস শিকদার হেসে বললেন, "আমি পুরো ফিট।"
নিয়ায এবার বাবার কাছে গেল। আহসান শিকদার ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। কাঁধে চাপড় মেরে গর্বের সঙ্গে বললেন, "এই যে আমার ডাক্তার পোলা আইসা পড়ছে। এখন আর এই গ্রামের মানুষদের চিকিৎসার অভাবে মরতে হবে না। কি আব্বা, ঠিক কইছি না?"
নিয়ায মুচকি হেসে বলল, "বাবা, বাঁচা-মরা তো আর আমার হাতে না। আমি একজন ডাক্তার হিসেবে চেষ্টা করব মানুষদের সেবা করতে।"
ইখলাস শিকদার ছোট ভাইকে খোঁচা মেরে বললেন, "হুম, ছেলের সেবা পাইয়া যদি গ্রামের মানুষ কিছু ভোট দেয় তোরে দয়া কইরা।"
চাচার কথা শুনে নিয়ায ভ্রু কুঁচকে বলল, "মানে?"
ইখলাস শিকদার সোফায় বসে স্ত্রীকে এক গ্লাস পানি দিতে বললেন। নিয়াযও চাচার পাশে বসে বলল, "চাচ্চু, কি হইছে একটু বলবা?"
ইখলাস শিকদার বললেন, "তোর বাপ আবার ভোটে দাঁড়াইতাছে।"
নিয়ায অবাক হয়ে বলল, "কি?"
"হু।"
নিয়ায উত্তেজিত হয়ে বলল, "কিন্তু কেন?"
ইখলাস শিকদার স্ত্রীর কাছ থেকে পানির গ্লাস নিয়ে এক ঢোক পানি খেয়ে বললেন, "সেটা তোর বাপরে জিজ্ঞেস কর। এই শেষ বয়সে আইসা আবার ভোটে দাঁড়াইতাছে।"
নিয়ায বাবার দিকে তাকাল। "বাবা, চাচ্চু যা বলছে তা কি সত্যি? তুমি সত্যিই আবার ভোটে দাঁড়াবে?"
আহসান শিকদার মেকি একটা হাসি দিলেন। বাবার হাসি দেখে নিয়ায যা বোঝার বুঝে গেছে, "তার মানে সত্যি তুমি ভোটে দাঁড়াইবা তাই তো। কিন্তু কথা হইল, তুমি ভোটে দাঁড়াইতাছো আর দাদা সবটা মেনে নিয়েছে?"
ইখলাস শিকদার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, "তোর দাদাই তো তোর বাপরে ভোটে দাঁড়াইতে বলছে।"
কথাটা বলে তিনি নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। নিয়ায হতভম্ব হয়ে বলল, "কি! দাদা এটা কি করে করল? আর ওই অচিন্ত সরকারের সাথে তুমি পারবা, এটা ভাবলা কি করে? অতীতে তিন তিন বার তো তুমি ওনার কাছে হেরেছো বাবা। এবার জিতবা তা ভাবলে কি করে?"
আহসান শিকদার ছেলেকে বোঝানোর স্বরে বললেন, "আরে এত চিন্তা করিস না। এবার ওই অচিন্ত সরকারকে আমি গো-হারা হারামু। এখন গ্রামের মানুষ আর ওরে পছন্দ করে না। কেউ আর ওরে ভোট দিবে না।"
নিয়ায বলল, "গ্রামে মুসলিমদের চেয়ে সনাতন ধর্মের মানুষ বেশি, বাবা। তারা নিশ্চয়ই অচিন্ত সরকারকে ভোট না দিয়ে তোমাকে দিবে না।"
আহসান শিকদার শান্ত গলায় বললেন, "শোন বাবা, ধর্মের আগে মানুষ। তাই আমি বলতাছি, সনাতন ধর্মের মানুষও আমাকে ভোট দিবে। ওনারাও বুঝে গেছে অচিন্ত সরকার কেমন মানুষ।"
নিয়ায বিরক্ত হয়ে বলল, "যা মন চায় তাই করো। আমি তোমাদের আগেও নেই, পিছেও নেই।"
কথাটা বলেই নিয়ায উঠে চলে গেল। পেছন থেকে ইখলাস শিকদার চিৎকার করে বললেন, "ছেলে হইয়া বাপের প্রচারণার কাজটা অন্তত করিস!"
নাজমা খানম নরম গলায় স্বামীকে বললেন, "ছেলেও যখন চাইতেছে না, শুধু শুধু কেন..."
আহসান শিকদার বিরক্ত হয়ে বললেন, "উফ, কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করো না তো। ভাত বাড়ো, আমি হাত-মুখ ধুইয়া আসতেছি।"
ইখলাস শিকদার চলে যেতে নিবে তখন জিজ্ঞেস করলেন, "নিয়ায খাইছে?"
নাজমা খানম মাথা নেড়ে বললেন, "হু, খাইছে।"
________
সরকার পাড়া— এই পাড়ার নামকরণ হয়েছে সরকার বাড়ির নাম অনুসারে। সরকার বাড়ির পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই এই পরিবারের সঙ্গে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে, যার প্রভাব আজও গ্রামজুড়ে বিদ্যমান।
পাড়ার মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সরকার বাড়ি। বিশাল সীমানাপ্রাচীর ঘেরা বাড়িটিতে পুরোনো ঐতিহ্য আর আধুনিকতার অপূর্ব মিশেল দেখা যায়। প্রশস্ত উঠান, সারি সারি গাছপালা আর দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য বাড়িটির আভিজাত্যকে আরও ফুটিয়ে তুলেছে। দূর থেকে দেখলেই বোঝা যায়, এটি শুধু একটি বাড়ি নয়, বরং এই এলাকার ইতিহাস ও প্রভাবের এক নীরব সাক্ষী। পুরো সরকার বাড়ি কৃত্রিম আলোয় ঝলমল করছে। দূর থেকেও সেই আলো চোখে পড়ার মতো। বিশাল বারান্দার এক কোণে বসে আছেন অচিন্ত সরকার। পরনে পাঞ্জাবি-পাজামা, চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা। সামনে টেবিলের উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বেশ কয়েকটি ফাইল। তিনি মনোযোগ দিয়ে সেগুলো দেখছিলেন। এমন সময় অংশু এসে বলল।
"জেঠু, ওই উত্তর পাড়ার আহসান শিকদার তো ভোটে দাঁড়াইতাছে।"
অচিন্ত সরকার মুখ তুলে ভাতিজার দিকে তাকিয়ে বললেন,
"কস কি?"
অংশু চেয়ার টেনে বসে বলল, "হ জেঠু। বাজারে তো এই নিয়া পুরাই চর্চা চলছে।"
অচিন্ত সরকার বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব দিলেন না। আবার ফাইলের দিকে মনোযোগ দিলেন। অংশু অবাক হয়ে বলল, "জেঠু, কিছু বলবা না?"
অচিন্ত সরকার শান্ত গলায় বললেন, "কি কমু? চাইলে দাঁড়াইব। অতীতেও তো তিন বার হারছে, এবার না হয় শেষ বয়সে আইসা আবার হারব।"
অংশু কিছুটা চিন্তিত গলায় বলল, "না জেঠু, এবার নাও হারতে পারে। আহসান শিকদারের বদলে তুমি হেরেও যাইতে পারো।"
কথাটা শুনেই অচিন্ত সরকার ভাতিজার গালে টাস করে একটা চড় বসিয়ে দিলেন। অংশু হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। অচিন্ত সরকার রাগী কণ্ঠে বললেন, "যা এখান থেইকা। ওই তেলাপোকার কাছে আমি হারমু? কখনো না।"
অংশু চুপচাপ এখান থেকে চলে গেল। অচিন্ত সরকার শরীরটা চেয়ারে হেলিয়ে দিলেন। তবে ওনার চোখেমুখে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ ফুটে উঠে।
______
বাহারুল হাওলাদারের বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় এগারোটা বেজে যাু। তিনি হাত-মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে এসে বসলেন। শারমিন সুলতানা ওনার পাতে ভাত আর আলুভাজি তুলে দিলেন।
বাহারুল হাওলাদার জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা সবাই খাইছো?"
শারমিন সুলতানা বললেন, "হুম, খেয়েছে। তুমি খাও।"
কথাটা বলে তিনি পাশের চেয়ারে এসে বসলেন। বাহারুল হাওলাদার খেতে খেতে স্ত্রীর দিকে তাকান। শারমিন সুলতানা স্বামীর চাওনি দেখে বুঝতে পারলেন, কিছু একটা বলতে চাইছে।তাই নিজে বলতে শুরু করলেন, "কিছু বলবা?"
বাহারুল হাওলাদার ইতস্তত করে বললেন, "বাজার থেকে শুনে আসলাম, ছোট ভাইজান নাকি আবার নির্বাচনে দাঁড়াইব।"
শারমিন সুলতানা বিস্মিত হয়ে বললেন, "কি বলছো! ছোট ভাইজান আবার নির্বাচনে দাঁড়াইতাছে?"
ঠিক তখনই আলোর কণ্ঠ ভেসে এলো, "কে নির্বাচনে দাঁড়াইতাছে মা?"
শারমিন সুলতানা কাঠখোট্টা গলায় বললেন, "কেউ না। পড়তে বস, গিয়ে।"
মুহূর্তের মাঝে আলোর মনটা খারাপ হয়ে গেল। মা তার সঙ্গে সবসময় এমন রুঢ়ভাবে কথা বলে কেন? মা যখন তার সাথে এমন রুঢ়ভাবে কথা বলে তখন যে আলোর কষ্ট হয় সেটা কি মা বুঝে না? বাহারুল হাওলাদার মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন মেয়ের মনের অবস্থা। তিনি স্ত্রীকে বললেন, "আহ শারমিন, চুপ করো তো।"
তারপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন, "কি হইছে আম্মাজান? কিছু বলবা?"
আলো মাথা নেড়ে নরম কণ্ঠে বলল, "না বাবা, কিছু না।"
কথাটা বলেই আলো নিজের ঘরে চলে যায়। বাহারুল হাওলাদার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে স্ত্রীর দিকে তাকালেন বললেন, "মেয়েটার সাথে এভাবে কথা বলো না তো। আর কদিনই বা আছে মেয়েটা আমাদের মাঝে। দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেল। আর কিছুদিন পরই তো পর হয়ে যাবে। তখন এই দূর্ব্যবহার জন্য নিজেই কষ্ট পাবে।"
কথাগুলো বলতে বলতে কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো বাহারুল হাওলাদারের। মেয়েদের জীবনটা সত্যিই বড্ড অদ্ভুত। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একসময় বাবা-মায়ের ঘর ছেড়ে অন্য একটা অচেনা ঘরই তাদের আপন হয়ে যায়।

Post a Comment

0 Comments