কাঁপতে কাঁপতে কাগজের ভাঁজটা খুললাম। চিরকুটের লেখাগুলোর ওপর চোখ বুলাতেই আমার পুরো অস্তিত্ব যেন থরথর করে কেঁপে উঠল। সেখানে লেখা ছিল:
> "আমি ভেবেছিলাম আমার বাবা-মা যখন মারা যান, তখনই বুঝি আমি এতিম হয়েছি। কিন্তু আজ বুঝলাম, আসল এতিম হওয়া কাকে বলে। আসল এতিম তো সেদিন হয়েছি, যেদিন এমন একটা পুরুষকে স্বামী বলে মেনে নিয়েছিলাম, যে নিজের মা-বোনকে দিয়ে আমার সম্মান ককূরে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে। আমাকে ভেঙে ফেলার অধিকার তোমার থাকতে পারে রায়য়ান, কিন্তু আমার আত্মবিশ্বাস আর আত্মসম্মান ভেঙে চুরমার করার অধিকার আমি তোমাকে আর কখনো দেব না। আমি চলে গেলাম। আর কোনোদিন আমার মুখ দেখতে পাবে না, অন্তত যতদিন না আমি আমার সেই হারিয়ে যাওয়া সম্মান ফিরে পাচ্ছি, যা তোমার আর তোমার পরিবারের জন্য সস্তায় বিলিয়ে দিয়েছিলাম।"
আমি পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। হাত থেকে চিরকুটটা মেঝেতে খসে পড়ল। এতক্ষণ যে শব্দটাকে আমি শোবার ঘরের দরজা বন্ধের আওয়াজ ভেবেছিলাম, সেটা আসলে আমার জীবনের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার শব্দ ছিল। যে ঘরটা একটু আগেও নিঝুমের চঞ্চলতায় মুখর থাকত, আজ সেটা এক নিমেষেই এক বিশাল, ভুতুড়ে আর প্রাণহীন মরুভূমি বলে মনে হতে লাগল। জীবনে এই প্রথমবার আমার মনে হলো—আমি শুধু আমার স্ত্রীকেই হারাইনি, আমার ভেতরের পুরুষত্বটাকেও হারিয়ে ফেলেছি। রাগের মাথায় যে সংসারটা আমি তিলে তিলে গড়েছিলাম, তা এক মুহূর্তে ছাই হয়ে গেল। এখন এই ঘরের চারটে দেয়াল যেন আমাকেই উপহাস করছে।
শার্টের বোতামটা খুলতে খুলতে মাথা থেকে এসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছিলাম, ঠিক তখনই দরজায় সজোরে কলিংবেল বেজে উঠল। কেউ যেন দরজার ওপর তার সবটুকু রাগ ঢেলে দিচ্ছে, অবিরাম আর হন্যে হয়ে ধাক্কাচ্ছে। চোর বা কোনো সাধারণ অতিথি এভাবে আসে না, এ যেন কোনো জরুরি তলব।
ধড়ফড়ানি বুকে দরজাটা খুলতেই আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন পুলিশের একজন এসআই আর সাথে দুজন কনস্টেবল। তাঁদের গম্ভীর আর কঠোর চেহারা দেখেই আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
এসআই সাহেব আমাকে ওপর-নিচ অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে নিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "আপনিই কি রায়য়ান হাসান?"
আমি কোনোমতে শুধু মাথা নেড়ে 'হ্যাঁ' বললাম, ভয়ের চোটে গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোচ্ছিল না।
তিনি পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে আমার চোখের সামনে ধরে বললেন, "আপনার স্ত্রী ঘণ্টাখানেক আগে থানায় গিয়ে আপনার এবং আপনার মা-বোনের নামে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা করেছেন। ওনার সাথে সরকারি হাসপাতালের মেডিকেল রিপোর্ট আছে, যেখানে ওনার শরীরে মারাত্মক আঘাতের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওনার এজাহার অনুযায়ী, নিজে উপস্থিত থেকে আপনার মা আর বোনকে ওনার ওপর অত্যাচার করার সুযোগ করে দিয়েছেন। আপনাদের তিনজনের নামেই মারধর এবং শ্লীলতাহানির মামলা রুজু হয়েছে।"
আমার চোখের সামনে চারপাশটা যেন ঘুরতে লাগল। এসআই সাহেবের কথাগুলো আমার মাথায় একেকটা হাতুড়ির মতো এসে আঘাত করছিল। তিনি কাগজটা দেখিয়ে আবার বললেন, "মেডিকেল রিপোর্টে ধারালো কোনো অস্ত্র বা ভারী বস্তু দিয়ে আঘাতের কথা উল্লেখ আছে। তাই এটা কোনো সাধারণ পারিবারিক ঝগড়া নয়, এটা এখন বড় অপরাধের পর্যায়ে চলে গেছে। আপনাদের এক্ষুণি থানায় যেতে হবে।"
আমি পুরোপুরি নির্বাক হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ আগে যে মা আর বোন আমাকে বলছিল—"ওর পেছনে এক টাকাও খরচ করবি না, পেটে ভাত না পড়লে এমনিতেই সোজা হয়ে যাবে", আজ তারা আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামী। থানায় না গিয়ে কোনো উপায় নেই। নিজের গাড়িটা বের করলাম। ড্রাইভ করছি আমি, আর পেছনের সিটে মা আর বোন বসা। গাড়ির ভেতরের পরিবেশটা এতটাই থমথমে যে শুধু আমাদের নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। মা তখনো বিড়বিড় করে নিজের অহংকার ধরে রাখার চেষ্টা করছিল, "একদম ভয় পাবি না রায়য়ান, ও একটা ছোটলোকের মেয়ে, কত বড় সাহস থানায় গেছে! দুই মিনিটে ওসির হাত-পা ধরে এই মামলা তুলে নিতে বাধ্য করব।" কিন্তু মার গলার সেই চড়া সুর আজ গায়েব, ওনার কাঁপতে থাকা কণ্ঠই বলে দিচ্ছিল ভেতরের আসল ভয়টা।
থানায় পৌঁছানোর পর সেখানকার গুমোট বাতাস আর পরিবেশ আমাকে আরও দমবন্ধ করে দিল। ভেতরে পা রাখতেই আমার চোখ গেল এক কোণায় থাকা কাঠের বেঞ্চটার দিকে। সেখানে ও বসে ছিল। কিন্তু ওনার মায়াবী, চঞ্চল চেহারার বদলে সেখানে বসে ছিল এক অচেনা, পাথরের মতো শান্ত এক নারী। নিজের আইনজীবীর সাথে ও অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে কথা বলছিল। মাত্র দুই ঘণ্টা আগে যে মেয়েটা আমার ড্রয়িংরুমে ছেঁড়া জামা আর উস্কোখুস্কো চুলে আমার কাছে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছিল, ও যেন সেই মেয়েটাই না।
আমাদের দেখে ও একবার তাকাল। সেই দৃষ্টিতে কোনো জল ছিল না, কোনো অভিমান ছিল না, ছিল শুধু এক চূড়ান্ত সমাপ্তির বার্তা। মা থানায় ঢুকেই স্বভাবসুলভভাবে চিল চিৎকার করতে চাইলেন, কিন্তু ও ডিউটি অফিসার টেবিল চাপড়ে ধমক দিয়ে উঠলেন, "একদম চুপ! এটা কোনো বাজারের আড়ত না যে চেঁচামেচি করবেন। এখানে আইনের কথা হবে।"
থানার বড় বাবুর সামনে আমাদের বসানো হলো। জবানবন্দি শুরু হতেই আমরা একে একে কোণঠাসা হতে লাগলাম। হাসপাতালের সেই রিপোর্টে নিঝুমের শরীরের প্রতিটা ক্ষতচিহ্নের বিবরণ নিখুঁতভাবে লেখা ছিল। কিন্তু সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেলাম যখন অফিসার বললেন যে ওনার মাথায় চিনামাটির ভারী পাত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছে, যার কারণে ওনার মাথায় ১০টি সেলাই লেগেছে! আমি স্তম্ভিত হয়ে মায়ের দিকে তাকালাম। রাগের মাথায় মা যে এত বড় কাণ্ড ঘটিয়েছেন, তা আমি নিজেও জানতাম না।
মা আর বোন নিজেদের বাঁচাতে একেকবার একেক মিথ্যা কথা বলছিল, যার কারণে ওনারা নিজেদের জালেই নিজেরা জড়িয়ে যাচ্ছিলেন। আর আমি? অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলাম। নিঝুম শক্ত গলায় ওসির দিকে তাকিয়ে বলল, "স্যার, ওনারা আমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। আর আমার স্বামী? ও পাশে দাঁড়িয়ে পুরো নাটকটা উপভোগ করছিল।
ঐ একটা কথাই আমার সমস্ত পুরুষত্ব আর আত্মসম্মানকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। ঠিক তখনই নিঝুম ঘুরে দাঁড়াল। মা আর বোনের দিকে তীব্র ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে, এক অদ্ভুত আর ভয়ানক আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে উঠল
"আপনারা তো আমার এতিম হওয়া নিয়ে খুব খোঁটা দিলেন, খুব মারলেন আমাকে। কিন্তু আপনারা কি জানেন, আজ আমাদের মধ্যে এই ঝগড়াটার আসল কারণটা কী ছিল? রায়য়ান কেন আমার ওপর এভাবে ক্ষেপে গিয়েছিল?"
কোন সেই গোপন সত্য, যা নিঝুম সবার সামনে আনতে চাইল? কী এমন ঘটেছিল আমাদের মধ্যে, যা এই পুরো সংসারটাকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল?

0 Comments