পরদিন সকালটা ছিল অস্বাভাবিক শান্ত। আকাশ ছিল পরিষ্কার, সূর্যের আলো অ্যাশবোর্ন হলের সাদা পাথরের দেয়ালে পড়ে সোনালি আভা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। বাইরে অতিথিদের গাড়ি একের পর এক এসে থামছিল।
সবাই উৎসবের পোশাকে সেজে এসেছিল, কিন্তু কেউ জানত না এই দিনের শেষটা কেমন হতে চলেছে। আমি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছিলাম। রাতভর এক ফোঁটাও ঘুম হয়নি। তবুও আমার চোখে ক্লান্তি ছিল না।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখলাম। গতকাল যে মেয়েটিকে আবর্জনার ব্যাগের পাশে দাঁড়িয়ে অপমান সহ্য করতে হয়েছিল, আজ সে আর সেই মেয়ে নেই। আজ আমি শুধু একজন প্রতারিত নারী নই, আমি আমার পরিবারের প্রতিনিধি।
আমার সামনে টেবিলের ওপর রাখা ছিল একটি পুরোনো চামড়ার ফাইল। ফাইলটির ভেতরে এমন কিছু কাগজ ছিল, যা অ্যাশবোর্ন হলের প্রকৃত মালিকানার ইতিহাস বহন করছিল। বহু বছর আগে আমার দাদা এই সম্পত্তি একটি ট্রাস্টের অধীনে দিয়েছিলেন। পরে বিভিন্ন ব্যবসায়িক চুক্তি এবং পরিচালনার দায়িত্ব বদলাতে বদলাতে সম্পত্তিটি মিস্টার ইয়াসিনের পরিবারের হাতে ব্যবস্থাপনার জন্য আসে। কিন্তু মালিকানা কখনোই তাদের ছিল না। তারা শুধু দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল। আর সেই দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে তিন মাস আগে। তারা বিষয়টি জানত না, কারণ ট্রাস্টি বোর্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন বেছে নিয়েছিল। সেই দিনটাই ছিল আজ।
আমি ধীরে ধীরে ফাইলটি বন্ধ করলাম। ফোনে একটি মেসেজ এল। শুধু দুটি শব্দ লেখা ছিল।
সব প্রস্তুত।
মেসেজটি পাঠিয়েছিলেন আমার চাচা মাহবুব করিম, যিনি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান।
আমি জানালার বাইরে তাকালাম। দূরে অ্যাশবোর্ন হলের বাগানে কর্মচারীরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাদের অনেকেই আমাকে চিনত। গত এক বছর ধরে আমি এখানে সহকারী কিউরেটর হিসেবে কাজ করেছি। তারা আমাকে একজন সাধারণ কর্মচারী ভাবত। কিন্তু সেই ভুল ধারণা আজ ভেঙে যাবে।
দুপুরের দিকে অতিথিদের ভিড় আরও বাড়ল। ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, সমাজের প্রভাবশালী মানুষ, সবাই এসেছেন এই বিয়েতে। মিস্টার ইয়াসিন গর্বের সঙ্গে সবার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছিল। তানহা রহমান যেন বিজয়ীর মতো হাসছিল। তার বাবা দেশের অন্যতম ধনী বিনিয়োগকারী। এই সম্পর্ককে ঘিরে অনেক ব্যবসায়িক চুক্তির কথাও শোনা যাচ্ছিল।
আমি হলরুমের এক কোণে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলাম।
হঠাৎ তানহা আমাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এল।
তার ঠোঁটে সেই একই বিদ্রূপাত্মক হাসি।
সে বলল, আমি ভেবেছিলাম তুমি আসবে না।
আমি শান্ত গলায় বললাম, আমন্ত্রণ তো পেয়েছিলাম।
সে হেসে বলল, সাহস আছে তোমার। সবাই হলে নিজের অপমানের দিনটা দেখতে আসে না।
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
কারণ আমি জানতাম, কয়েক ঘণ্টা পর কে অপমানিত হবে।
বিকেলের দিকে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো। অতিথিরা নিজেদের আসনে বসে পড়লেন। সঙ্গীত বাজতে লাগল। সবাই অপেক্ষা করছিল বর এবং কনের জন্য।
মিস্টার ইয়াসিন মঞ্চে উঠে দাঁড়াল। তার মুখে আত্মবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট ছিল।
তানহাও ধীরে ধীরে মঞ্চের দিকে এগিয়ে এল।
ঠিক তখনই প্রধান প্রবেশদ্বারের সামনে কয়েকটি কালো গাড়ি এসে থামল।
প্রথমে কেউ গুরুত্ব দিল না।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর পরিস্থিতি বদলে গেল।
গাড়ি থেকে একে একে কয়েকজন আইনজীবী, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তারা নেমে এলেন।
পুরো হলরুমে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।
মিস্টার ইয়াসিন ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
তার মা শারমিন চৌধুরীও বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন।
এরপর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন মাহবুব করিম।
তাকে দেখে আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম।
আমার চাচা সোজা মঞ্চের সামনে গিয়ে থামলেন।
তার হাতে ছিল একটি সিল করা নথি।
তিনি শান্ত গলায় বললেন, অনুষ্ঠানের আগে একটি জরুরি আইনি ঘোষণা রয়েছে।
হলরুম মুহূর্তেই নীরব হয়ে গেল।
মিস্টার ইয়াসিন বিরক্ত স্বরে বলল, এখন নয়। অনুষ্ঠান চলছে।
মাহবুব করিম তার দিকে তাকিয়ে বললেন, বিষয়টি এই সম্পত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এখনই বলতে হবে।
শারমিন চৌধুরী এগিয়ে এসে বললেন, আপনি কে?
মাহবুব করিম উত্তর দিলেন, আমি করিম ফ্যামিলি ট্রাস্টের চেয়ারম্যান।
এই নামটি উচ্চারণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অনেক অতিথি বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকালেন।
কারণ করিম ফ্যামিলি ট্রাস্ট ছিল দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ঐতিহ্যবাহী সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান।
মিস্টার ইয়াসিনের মুখের আত্মবিশ্বাস প্রথমবারের মতো টলে উঠল।
মাহবুব করিম নথি খুললেন।
তারপর স্পষ্ট কণ্ঠে ঘোষণা করলেন যে অ্যাশবোর্ন হলের ব্যবস্থাপনা অধিকার আজ থেকে বাতিল করা হচ্ছে এবং সম্পত্তির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনরায় ট্রাস্টের অধীনে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
হলরুমে যেন বজ্রপাত হলো।
মিস্টার ইয়াসিন চিৎকার করে উঠল, এটা অসম্ভব।
কিন্তু আইনজীবীরা সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় নথিপত্র তুলে ধরলেন।
প্রত্যেকটি কাগজ বৈধ।
প্রত্যেকটি স্বাক্ষর সম্পূর্ণ আইনসম্মত।
তানহার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
শারমিন চৌধুরী কাঁপা কণ্ঠে বললেন, কিন্তু আমাদের পরিবার তো এই সম্পত্তি পরিচালনা করছে বহু বছর ধরে।
মাহবুব করিম বললেন, পরিচালনা করা আর মালিক হওয়া এক জিনিস নয়।
এরপর তিনি ধীরে ধীরে আমার দিকে ফিরলেন।
পুরো হলরুমের দৃষ্টি তখন আমার ওপর।
তিনি সম্মানের সঙ্গে মাথা নত করে বললেন,
মিস মিথিলা করিম, ট্রাস্টি বোর্ড আপনার নির্দেশনার অপেক্ষায় আছে।
সেই মুহূর্তে হলরুমে উপস্থিত শত শত মানুষের মুখে একই বিস্ময় ফুটে উঠল।
কারণ প্রথমবারের মতো তারা বুঝতে পারল আমি আসলে কে।
আর মিস্টার ইয়াসিনের মুখের রঙ ধীরে ধীরে সাদা হয়ে গেল।

0 Comments