ইঁচড়ে_পাকা_মেয়ে

ইঁচড়ে_পাকা_মেয়ে



সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এসেছে। কাঠফাটা রোদ্দুরের তেজ ম্লান হয়ে এসেছে। সূর্য বিদায় নিচ্ছে একটু একটু করে। গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে তার সামান্য ঝলক। মাঝে মাঝে মৃদু মন্দ বাতাস বইছে। এলোমেলো করে দিচ্ছে কিশোরীর পৃষ্ঠদেশে ছড়িয়ে থাকা উন্মুক্ত কেশ গুচ্ছ। সেদিকে কিশোরীর বিন্দুমাত্র খেয়ালও নেই। সে বিষণ্ণ মনে ক্লান্ত বদনে ডুবে আছে আপন ভাবনায়। অবসাদগ্রস্ত দুচোখ স্থির সামনের বিশাল জলরাশির পানে। এক মনে কি যেন দেখে চলেছে রমণী। মস্তিস্কে চলছে তার নীরব বোঝাপড়া। কিশোরী কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছে না প্রিয়তম প্রেমিকের অভিনয়। মন বলছে,
"সে তো অভিনয়ই করেছে তোমাকে ঠকায় তো নি।"
মস্তিস্ক বলছে,
"অভিনয় এক প্রকার ছলনা। সে ছলনা করেছে। যে ছলনা করতে পারে সে ঠকায়নি এর কি নিশ্চয়তা রয়েছে?"
মন-মস্তিষ্কের দ্বন্দে নাজেহাল রমণী। তার মন ভালো নেই। বুঁকের কোনো এক কোণে অজানা চিনচিনে ব্যথার আভাস মিলছে। ধীরে ধীরে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত অঙ্গ জুড়ে। লোকটার কলার ধরে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে,
"দিনের পর দিন কেন অভিনয় করে গেলেন আমার সাথে? কি ক্ষতি করেছিলাম আমি আপনার? একটু তো ভালোই বেসেছি এর বেশি কিছু তো করিনি। তবে কেন এই শাস্তি? কেনো এভাবে ধোঁকা দিলেন আমায়? চোখের সামনে থেকেও দিনের পর দিন নিদারুন অভিনয় করে গেছেন। কেন? কেন এই লুকোচুরি? কেনোই বা ছলনা করলেন আমার সাথে?"
তবে মিষ্টি তা করবে না। সে চায়না পুনরায় ওই মানুষটির মুখোমুখি হতে।
মিষ্টি যখন আপন ভাবনায় মশুল এমন সময় কেউ একজন ধরাম করে কিল বসিয়ে দিলো তার পিঠে। হতচকিয়ে উঠলো মিষ্টি। বুঁকে হাত রেখে বড় বড় শ্বাস নিয়ে নিজেকে সমলে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করছে। তবে বেসামাল সত্ত্বাকে কি চাইলেই এতো সহজে সামলানো যায়? উহু যায় না তো। রমণীও পারলো না। ওপর দিকের মানুষটা অভিমানী গলায় অভিযোগ ঝাড়তে শুরু করলো,
"হারামি এখানে ঘাপটি মেরে বসে আছিস? ওদিকে সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজে এসেছি আমি।"
বিপরীতে কোনো জবাব এলো না। অবাক হলো আনহা। এতো কিছুর পরেও চুপচাপ থাকার মেয়ে তো মিষ্টি নয়। বসে পড়লো মিষ্টির পাশে। জিজ্ঞেস করলো,
"কিছু বলছিস না যে? এখানে বসে আছিস কেন?"
মিষ্টি বিরস গলায় জবাব,
"এমনি। ভালো লাগছিলো না তাই।"
"আমি কিন্তু তোর ওপর খুব রেগে আছি।"
"জানি!"
"তারপরও তোর মাঝে সামান্যও অনুতপ্ততা নেই? কতো করে রিকোয়েস্ট করলাম দুপুরে আমাদের বাড়িতে খেতে গেলি না কেন? মিমি কতবার ডেকে গেল, তোর ভাই এলো তাও গেলি। আমি ব্যাস্ত ছিলাম বলে আসতে পারিনি। জানিস সবাই বারবার তোর খোঁজ করছিলো। আম্মু তোর জন্য খাবার পাঠিয়ে দিয়েছে। সবাই ছিলো তুইই ছিলি না।"
শেষের কথা গুলো মন খারাপ নিয়েই বলল আনহা। মিষ্টি সেসবে পাত্তা দিলো না। আর না কোনো প্রকার জবাব দিলো। মিষ্টিকে এরকম উদাস ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে একটু অবাক হলো আনহা। এরকম চুপচাপ থাকার মেয়ে তো মিষ্টি না। তাহলে কি হয়েছে মেয়েটার? গতকালের মিষ্টির সাথে এখন যে পাশে বসে আছে তার মাঝে বিস্তর ফারাক। দুজন যেন ভিন্ন মানুষ। গতকালের মিষ্টি ছিলো উৎফুল্ল চিত্তের কিশোরী। যে ভাইয়ের বিয়ের প্রতিটা অনুষ্ঠান মাতিয়ে রেখেছে। মন খুলে আনন্দ করেছে, সবাইকে আনন্দ দিয়েছে। অথচ এই মুহূর্তে আনহার পাশে যে বসে আছে সে যেন এক নির্জীব সত্ত্বা। তার মাঝে আবেগ, অনুভূতি কোনোটাই নেই। কয়েক ঘন্টার মাঝে কি এমন হলো যে মেয়েটা এতটা বদলে গিয়েছে? আনহার স্মরণ হলো গতকালের তেহজীবের করা পাগলামো। তবে কি দুজনের মাঝে কোনো ঝামেলা হয়েছে? সেই জন্যই কি গতকাল তেহজীব এমন পাগলামো করেছিলো? মস্তিস্কে একটু চাপ প্রয়োগ করতেই স্মরণ হলো তেহজীব বলেছিলো মিষ্টি তাকে ভুল বুজেছে। কিন্তু কি নিয়ে ভুলে বুঝেছে তা বলেনি। কাজের প্রেসারে সবটা ভুলে গিয়েছিলো আনহা। এখন ওর কি করা উচিত বুঝে উঠতে পারলো না। সরাসরি মিষ্টিকে কি তেহজীবের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা উচিত? পরে যদি মিষ্টি তাকেও ভুলে বোঝে তখন? ভয়ে ভয়ে মিষ্টির কাঁধে হাত রাখলো আনহা। নরম গলায় প্রশ্ন করলো,
"কি হয়েছে মিষ্টি? এমন উদাস ভঙ্গিতে বসে আছিস কেন?"
পানির দিকে দুচোখ স্থির রেখে জবাব দিলো,
"কিছু হয়নি।"
"কিছু তো একটা হয়েছে। নাহয় এতটা চুপচাপ থাকার মেয়ে তো তুই না। কি হয়েছে? বল আমাকে?"
জবাব দিলো না মিষ্টি। আনহা ফের জিজ্ঞেস করলো,
"বলবি না আমাকে?"
মিষ্টি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ওর দিকে। চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
"তেহজীব আর তাজ যে একই ব্যক্তি জানতিস তুই?"
থতমত খেয়ে গেল আনহা। মিষ্টি হঠাৎ এই প্রশ্ন করছে যে? তবে কি তেহজীব নিজের পরিচয় জানিয়ে দিয়েছে মিষ্টিকে? আনহা কি উত্তর দিবে বুঝে উঠতে পারলো না।
"হঠাৎ এরকম উদ্ভট প্রশ্ন করছিস যে?"
"যেটা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দে।"
মিষ্টির চোখে মুখে কাঠিন্য ভাব। আনহা বুঝে গেল মিষ্টি সবটা বুঝে গেছে। এখন আর লুকিয়ে লাভ নেই। তবে কি এই জন্যই মিষ্টি রেগে আছে? ধমকে উঠলো মিষ্টি,
"কি হলো? উত্তর দিচ্ছিস না কেন?"
মিষ্টির এরূপ ধমকে কেঁপে উঠলো আনহা। এর আগে কখনো মিষ্টি এভাবে ধমক দিয়ে কথা বলেনি তার সাথে। ধমক খেয়ে নত মুখে জবাব দিলো,
"হ্যা জানতাম।"
"তারমানে জেনে শুনেই সেদিন ডেয়ার দিয়েছিলি তাই তো!"
আনহা মাথা নিচু করে নিলো। এর মাঝে সেখানে এসে উপস্থিত হলো ইশা, ফারিহা। আনহা, মিষ্টি দুজনের মাঝে তখন ঘোর নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। ফারিহা প্রশ্ন করলো,
"বাহ্! ভাবি ননদ বসে গল্প করা হচ্ছে? আমরা কেউ নোই তাই না?"
দুজনের কেউই জবাব দিলো না। ইশা, ফারিহা একে ওপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। দুজনকে এরূপ শান্ত ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে পরিস্থিতি ভালো ঠেকলো না ওদের নিকট। ওদের দুজনের সংঙ্কাকে সত্যি করে দিয়ে মিষ্টি ফের জিজ্ঞেস করলো,
"কি হলো বল? জেনে শুনেই দিয়েছিলি তাই না?"
আনহা দুদিকে মাথা নাড়লো। মুখে জবাব দেওয়ার সাহস হলো না ওর। ইশা জানতে চাইলো,
'"কোন বিষয়ে কথা বলছিস তোরা? আনহা জেনে শুনে কি করেছে?"
মিষ্টি এবার আনহার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ইশা ফারিহার দিকে তাকালো। শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
"তোরা জানতিস তেহজীব আনহার কাজিন হয়?"
ইশা, ফারিহা দুজন কিছু না জেনেই জবাব দিলো,
"হ্যা জানতাম। কি হয়েছে তাতে?"
"জেনে শুনেই ডেয়ার দিয়েছিলি তাই না?"
ফারিহা বলল,
"কি সব বলছিস? কিছুই তো বুঝতে পারছি না।"
মিষ্টি দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
"মিস্টার তেহজীব প্রতারণা করেছে আমার সাথে।"
"প্রতারণা করেছে মানে? তোর সাথে তার কথা হতো? কখনো বলিসনি তো!"
"হ্যা কথা হতো। সেদিন তোদের দেওয়া ডেয়ার পালন করার পর তার সাথে কমেন্ট বক্সে টুকটাক কথা হতো। কমেন্ট বক্স থেকে ইনবক্সে কথা হতে শুরু করে। এক পর্যায়ে যেয়ে তিনি জানায় তিনি আমাকে পছন্দ করেন। ধীরে ধীরে আমাদের প্রেমের সম্পর্ক শুরু হয়। উনি যে আনহার কাজিন একটা বারের জন্য সে কথা বলেননি আমায়।"
মিষ্টির কথার মাঝে আনহা বলে উঠলো,
"ভাইয়া তোকে সামনাসামনি বলতে চেয়েছিল।"
মিষ্টি ফের বলতে শুরু করলো,
"প্রথমত উনি স্বীকার করেননি। যখন তাকে আনহার বিয়েতে ওনার কণ্ঠ শুনে আমার সন্দেহ হয়। দুটো মানুষের কণ্ঠ এতোটা কিভাবে মিলে যেতে পারে? তখন উনি কি করেছে জানিস?"
"কি করেছেন?"
"অবলীলায় মিথ্যা কথা বলেছেন। অস্বীকার করেছেন যে ওটা তিনি না। চোখের সামনে থেকেও প্রতিটা মুহূর্ত ধোঁকা দিয়ে গিয়েছেন আমায়। এমনকি ধরা পড়ার পরেও অস্বীকার করে গেছেন।"
ইশা বলল,
"তো তুই আনহার সাথে রাগারাগি করছিস কেন? আমরা কেউ জানতাম নাকি তোদের মাঝে এতো কিছু হয়েছে?"
ফারিহা বলল,
"তেহজীব ভাইয়াকে প্রপোজ করতে বলেছিলাম কারণ উনি আনহার ভাই এটা আমরা জানতাম। অপরিচিত কাউকে নিয়ে ডেয়ার দিলে সেই মানুষটা যদি উল্টোপাল্টা আচরণ করে। তাই চেনাজানার মধ্যে দিয়েছি। কিন্তু তোদের মাঝে এতো কিছু ঘটে যাবে আমরা কিভাবে জানবো বল?"
"তোরা না জানতি আনহা তো জানতো। ওকে তো সবটা বলেছিলাম আমি। তাও ও আমার সামনে দিব্যি অভিনয় করে গেছে। ঠিক যেমনটা ওর ভাই করেছে তেমনটাই। দুই ভাই-বোন পাক্কা অভিনেতা। দুজনই প্রতারক।"
আনহার চোখ ছলছল করছে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
"তুই আমাকে ভুল বুঝছিস মিষ্টু। আমি চেয়েছিলাম তোকে জানাতে। ভাইয়াকে অনেক বার বলেছিলাম তোকে সত্যিটা যেমন বলে দেয়। কিন্তু ভাইয়া বলেছে তোকে সারপ্রাইজ দিবে তাই তোকে জানাতে বারণ করেছে। বিশ্বাস কর ভাইয়া তোর সাথে কোনো প্রকার প্রতারণা করেননি।"
"করেছে প্রতারণা। তোরা দুজনই প্রতারক। যখন ওনার এক্সসিডেন্ট হয়েছে তুই জানতিস না তার ব্যাপারে? তাও তুই আমাকে কিছু জানিয়েছিস? সেই দিনগুলো আমি কিভাবে কাটিয়েছি তুই দেখছিসনি? তোর ভাইয়ের চিন্তায় চিন্তায় নাওয়া-খাওয়া ভুলে গিয়েছিলাম প্রায়। তখনও তুই আমাকে কিছুই জানাসনি। তোদের দুই ভাই-বোনের অভিনয়ের প্রশংসা করতে হচ্ছে। তোরা অনেক বড় ভালো অভিনয় পারিস।"
"এমন করিস না মিষ্টি। একটু বোঝার চেষ্টা কর। আমি চাইলেই তখন তোকে বলতে পরতাম তবে এতে হিতে বিপরীত হতো। এখন যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তার চেয়ে বেশি বাজে পরিস্থিতি হতো। তাই বলিনি। একটু তো বোঝার চেষ্টা কর।"
"আমার কিছু বোঝার দরকার নেই। দয়া করে তোরা দুই-ভাই বোনের একজনও আমার সামনে আসবি না। তোদের সহ্য হচ্ছে না আমার। আমাকে আমার মতো ছেড়ে দে।"
কথা শেষ করে বড় বড় কদম ফেলে চলে গেল মিষ্টি। একটা বারের জন্যও পিছু ফিরে তাকালো না। ওর যাওয়ার পানে ছলছল নয়নে চেয়ে রইলো আনহা। ইশা আর ফারিহাও অবাক। সবটা যেন ওদের মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। আচমকা এতো কিছু বুঝে উঠতে পারছে না দুজন। আড়াল থেকে সরে গেল একটা ছায়া। তেহজীব এসেছিলো আনহার পিছু পিছু। ভেবেছে কথা বলে ভুল বোঝাবুঝি শেষ করবে। তবে শেষ হতাশ। মিষ্টি যে ভালোই খেপেছে এটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে সে। তবে কি এভাবেই দুজনের পথ চলা শেষ হয়ে যাবে? সমাপ্ত হবে তাদের গল্প?


Post a Comment

0 Comments