গাড়ি একটা নির্জন, জনমানবহীন পুরোনো রাস্তার মোড়ে এসে থামল।গাড়িটা থামার সাথে সাথেই একটা যান্ত্রিক শব্দ করে ডিকির ভারী ডালাটা ওপরের দিকে খুলে গেল।ভেতরের ঘুটঘুটে অন্ধকার আর দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে আরিশা তড়িৎবেগে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। পিচঢালা রাস্তার একপাশে বসে সে দুই হাতে নিজের হাঁটু চেপে ধরে হাঁপাতে লাগল। বুকভরে মুক্ত বাতাস টেনে নিতে থাকল। পেটের ভেতরটা তখনো ওলটপালট করছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দুই হাত জোড় করে সে রেগে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
"ওওও আল্লাহ! রক্ষা করেছো এই যাত্রায়! আমি যদি সত্যিই একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ হয়ে থাকি, তবে তওবা করছি—আর জীবনেও এই শয়তান লয়ারের পিছু নেব না! এর গাড়ির আশেপাশেও যাব না!"
"কিন্তু আমার জানা মতে তুমি তো মোটেও সুস্থ নও, সুইটি! তুমি হলে এক্কেবারে আস্ত একটা পাগল। তার মানে, ভবিষ্যতে আমার পিছু নেওয়ার একশ ভাগ সম্ভাবনা তোমার এখনো আছে!"
হঠাৎ অত্যন্ত পরিচিত, গম্ভীর অথচ কৌতুকপূর্ণ একটা কণ্ঠস্বর কানে আসতেই আরিশা চমকে তাকাল। ডিকির ঠিক পাশেই, গাড়ির বডিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফারিশ। পরনের শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো, দুই হাত প্যান্টের পকেটে গোঁজা। তার ঠোঁটের কোণে ঝুলে আছে সেই চেনা, বাঁকা রহস্যময় হাসি। সে আরিশার দিকে তাকিয়ে বাঁকা চোখে ভ্রু নাচাল।
ফারিশের এই সাবলীল আর শান্ত ভঙ্গি দেখেই আরিশার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। এতক্ষণে তার বুঝতে আর বাকি রইল না যে, এই বজ্জাত লোকটা এতক্ষণ ধরে ইচ্ছে করেই আঁকাবাঁকা রাস্তায় ফুল স্পিডে গাড়ি চালিয়ে আরিশার বারোটা বাজাচ্ছিল!রাগে শরীর কাঁপতে লাগল আরিশার। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল,
"শয়তানের শয়তান! খবিস কোথাকার! এতক্ষণ ধরে ইচ্ছে করে আমাকে ডিকির ভেতর আটকে রেখে মেরে ফেলার প্ল্যান করছিলে, না?!"
কথাটা শেষ করেই আরিশা এদিক-ওদিক তাকিয়ে রাস্তা থেকে একটা মাঝারি সাইজের শুকনো গাছের ডাল কুড়িয়ে নিল। সেটা উঁচিয়ে সে রেগে ফারিশের দিকে তেড়ে যেতে চাইল। কিন্তু ফারিশ একটুও ঘাবড়াল না। বরং আরিশার রাগী রূপ দেখে তার ঠোঁটের হাসি আরও চওড়া হলো। সে-ও অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে রাস্তার পাশ থেকে একটা শক্ত লাঠি তুলে নিল এবং সেটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে আরিশার দিকে এক পা এগিয়ে এলো।ফারিশের চোখ দুটো এবার গম্ভীর হয়ে উঠল।
"আমার পিছু কেন নিচ্ছিলে, হ্যাঁ? মাঝরাস্তায় বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে আমার গাড়ির পেছনে কেন এসেছিলে?"
ফারিশ লাঠি হাতে কিছুটা ধমকের সুরে এগিয়ে আসতেই আরিশার ভেতরের সব বীরত্ব নিমেষেই হাওয়া হয়ে গেল। সে এক পা পিছিয়ে গিয়ে হাতের লাঠিটা একটু নিচু করল। ফারিশের শক্ত চওড়া হাত আর তার হাতের লাঠির দিকে তাকিয়ে আরিশা ঢোক গিলল। বুঝতে পারল, এখানে শক্তির লড়াইয়ে নামলে নির্ঘাত পিঠের চামড়া থাকবে না।নিমেষেই আরিশা তার চিরচেনা রূপ পরিবর্তন করে ফেলল। মুখের রাগী ভাবটা সরিয়ে অত্যন্ত নিরীহ আর করুণ একটা ফেস বানিয়ে, চোখে পিটপিট করে তাকিয়ে নাটকীয় গলায় বলল,
"আ... আমি মোটেও আপনার পিছু নেইনি লয়ার সাহেব! ওটা তো ভুল করে... মানে জাস্ট একটা অ্যাকসিডেন্ট ছিল! কিন্তু... আপনি কি সত্যি সত্যিই আমায় মারবেন, ফারিশ? এই তপ্ত রোদে, এই নির্জন জায়গায় আমার মতো একটা কিউট, নিষ্পাপ আর অবলা মেয়েকে লাঠি দিয়ে মারবেন? আপনার একটুও দয়া হবে না?"
আরিশার এই তাৎক্ষণিক পল্টি খাওয়া এবং ওভার-অ্যাক্টিং দেখে ফারিশ এবার আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে লাঠিটা একপাশে কাত করে ধরে আবার সেই চেনা বাঁকা হাসিতে আরিশার দিকে তাকাল।
"শুধু মারব না আরু, তোমাকে একেবারে তুলে আছাড় মারব! যদি নিজের পিঠের চামড়া বাঁচাতে চাও, তবে পালাও এখন...!"
কথাটা শেষ করেই ফারিশ এক গাল হেসে লাঠি উঁচিয়ে আরিশাকে তাড়া করল। ফারিশকে সত্যিই এগিয়ে আসতে দেখে আরিশা এবার প্রাণভয়ে দিল এক বিশাল দৌড়। আরিশা জুতা হাতে নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে চিৎকার করতে লাগল,
"ও আল্লাহ গো! বাঁচাও! এই লয়ারের মাথাটা আজ এক্কেবারে গেছে গো! লয়ার শিশু... আরে না না, লয়ার এখন বউ নির্যাতন করছে গো! হেল্প... সামওয়ান প্লিজ হেল্প মি! ও আঙ্কেল, ও আয়ান ভাই, কে কোথায় আছো—এই জল্লাদের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও!"
আরিশার এমন এলোমেলো আর উল্টোপাল্টা সংলাপ শুনে ফারিশের হাসির বেগ আরও বেড়ে গেল। সে আরিশাকে আরেকটু ভয় দেখানোর জন্য তার ঠিক পেছনে পেছনে গতি বাড়িয়ে দৌড়াতে লাগল। কিন্তু দৌড়ানোর মাঝপথেই ফারিশের তীক্ষ্ণ ও পেশাদার চোখ দুটো হঠাৎ চারপাশের ঝোপঝাড়ের দিকে গেল। বাতাসে এক অদ্ভুত নীরবতা এবং পাতার খসখস শব্দ তার কান এড়াল না। একজন দক্ষ ও সতর্ক মানুষের মতো ফারিশের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তৎক্ষণাৎ সঙ্কেত দিল—তারা এখানে একা নয়। কেউ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তাদের ওপর নজর রাখছে এবং তাদের পিছু নিয়েছে।ফারিশের মুখের চওড়া হাসি এক সেকেন্ডের মধ্যে মিলিয়ে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। দৌড়ানোর গতি বজায় রেখেই সে চোখের পলকে চারপাশের পরিবেশ, গাছের আড়াল সব পর্যবেক্ষণ করে নিল। ঠিক তখনই দূর থেকে রোদের আলোয় একটা ধাতব জিনিসের ঝিলিক তার চোখে পড়ল। ওটা আর কিছু নয়—একটা স্নাইপার রাইফেলের ব্যারেল!
বিপদের তীব্রতা বুঝতে ফারিশের এক মুহূর্তও সময় লাগল না। সে আর কোনো কথা না বলে, এক ঝটকায় আরিশার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আরিশা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফারিশ তাকে কোলে তুলে নিল।
"অ্যাঁহ! কী করছেন কী আপনি?! ছাড়ুন আমাকে...!"
আরিশা অবাক হয়ে হাত-পা ছুড়তে চাইল।
"একদম চুপ! একটা কথাও বলবে না!"
ফারিশ আরিশাকে কোলে নিয়েই রাস্তার পাশে থাকা একটা পরিত্যক্ত, অর্ধেক ভেঙে পড়া পুরোনো বাড়ির দিকে ঝড়ের গতিতে ছুটল। ঠিক সেই মুহূর্তেই, পুরো নীরবতা চিরে একটা বিকট শব্দ হলো—
"ঠা ঠা ঠা!"
অনবরত বুলেটের দেয়ালে ধাক্কা খাওয়ার তীব্র শব্দে আরিশা চমকে উঠে ফারিশের শার্টের কলারটা খপ করে চেপে ধরল।
"কী... কী হচ্ছে এসব? এই লোকগুলো কারা? আমাদের গুলি করছে কেন?!"
ফারিশ আরিশাকে দেয়ালের সবচেয়ে নিরাপদ কোণায় চেপে ধরে তার ঠোঁটে নিজের একটা আঙুল রাখল। চোখের মণি দুটো তীক্ষ্ণ করে ফিসফিসিয়ে বলল,
"হুশশ...! একদম চুপ। একটা কথাও বলবে না। আর আমি নিজে এসে বলা না পর্যন্ত এই দেয়ালের আড়াল থেকে এক পা-ও বাইরে বাড়াবে না, বুঝেছ?"
কথাটা শেষ করেই ফারিশ নিজের কোমর থেকে একটা চকচকে কালো পিস্তল বের করল। মূলত মিশনে যাচ্ছিল বলেই অস্ত্রটা আজ তার সাথে ছিল। কিন্তু শত্রুপক্ষ যে এত নিখুঁতভাবে আগে থেকেই তাকে ট্র্যাক করে এভাবে মাঝরাস্তায় আক্রমণ করবে, সেটা ফারিশ ভাবেনি। তবে সে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে অত্যন্ত দেয়ালের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো।বাইরে তখন প্রায় চার-পাঁচজন সশস্ত্র লোক চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছিল। ফারিশ এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে পজিশন নিলো। শুরু হলো ফাইট। ফারিশের নিখুঁত নিশানা আর ক্ষিপ্রতার কাছে একে একে লুটিয়ে পড়তে লাগল লোকগুলো। প্রায় সব কটা গুন্ডাকেই সে একাই শায়েস্তা করে ফেলল।কিন্তু একেবারে শেষ লোকটার মুখোমুখি হতেই ঘটল এক চরম বিপর্যয়। লোকটা বেশ লম্বাচওড়া এবং শক্তিশালী ছিল। ফারিশ তাকে শুট করতে যাওয়ার আগেই সে আচমকা এক ডাইভ দিয়ে ফারিশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুজনের মধ্যে শুরু হলো তুমুল ধস্তাধস্তি। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে লোকটার একটা জোরালো আঘাতে ফারিশের হাত থেকে পিস্তলটা ছিটকে বেশ কিছুটা দূরে গিয়ে পড়ল।ফারিশ মাটিতে পড়া পিস্তলটার দিকে তাকাতেই তার চোখ চড়কগাছ! সে দেখল, আরিশা কখন যেন ফারিশের নিষেধ অমান্য করে দেয়ালের আড়াল থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। আর ভাগ্যিস, ছিটকে যাওয়া পিস্তলটা ঠিক আরিশার পায়ের সামনেই এসে পড়েছে!ফারিশ লোকটার শক্ত হাতের বাঁধনে আটকে থাকা অবস্থাতেই আরিশাকে চোখের ইশারায় বলতে লাগল—বন্দুকটা তোলো! তুলে আমার দিকে ছুড়ে দাও!আরিশা কপাল কুঁচকে, দুই হাত কোমরে দিয়ে ফারিশের এই চোখের ইশারা দেখতে লাগল। ফারিশ আবারও দাঁতে দাঁত চেপে চোখের ইশারা করল। কিন্তু আরিশা নড়লই না। উল্টো রেগে বলে উঠল,
"আপনার মাথা খারাপ লয়ার সাহেব?! এই তো একটুখানি আগেই আপনি আমাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তুলে আছাড় মারার জন্য আমার পিছু নিচ্ছিলেন! আর এখন বিপদে পড়ে আমার কাছেই হেল্প চাচ্ছেন?? নো ওয়ে! নিজের কাজ নিজে করুন, আমি কেন সাহায্য করতে যাব?!"
লোকটার সাথে কুস্তি লড়তে লড়তে ফারিশের তখন জান যায় যায় অবস্থা। সে আরিশার এমন অসময়ের পাগলামি দেখে রাগে চিৎকার করে উঠল,
"এতদিন তোমায় শুধু একটা সুস্থ পাগল ভেবেছিলাম, কিন্তু এখন দেখছি তুমি পুরাই আস্ত একটা মানসিক রোগী! এই সিরিয়াস সময়ে তুমি ফাজলামো করছ?!"
আরিশাও কম যায় না। সে পায়ের কাছে পড়ে থাকা বন্দুকটার দিকে এক নজর দেখে নিয়ে ফুঁসে উঠল,
"একদম আমায় রাগাবেন না ফারিশ!"
"সরো তো এখান থেকে! যতসব পাগল ছাগল এসে জুটেছে জীবনে!"
ফারিশ রাগে গজগজ করতে করতে লোকটার হাত মুচড়ে ধরার চেষ্টা করল।ব্যাস! ওদিকে ফারিশের জীবন-মরণ সমস্যা, আর এদিকে ফারিশ আর আরিশার মধ্যে পুরোদমে ঝগড়া আর তর্কাতর্কি চলতে লাগল। তাদের এই অদ্ভুত কর্মকাণ্ড দেখে স্বয়ং সেই আক্রমণকারী গুন্ডাটাও চরম বিরক্ত ও বিভ্রান্ত হয়ে গেল। সে ভাবল—আরে! আমি এখানে খুন করতে এসেছি, নাকি এদের পারিবারিক ঝগড়া দেখতে এসেছি?!লোকটা একপর্যায়ে চরম বিরক্ত হয়ে ফারিশের সাথে ধস্তাধস্তি ছেড়ে দিল। সে নিজেই হেঁটে গিয়ে আরিশার পায়ের সামনে থেকে বন্দুকটা তুলে নিল। আরিশা ভাবল লোকটা বুঝি এবার তাকেই গুলি করবে, কিন্তু লোকটা বন্দুকটা হাতে নিয়ে আরিশার দিকে তাকিয়ে বেশ অভিভাবকসুলভ রাগী গলায় বলল,
"বড়দের কথা শুনতে হয়, মেয়ে! তার ওপর উনি একজন লয়ার মানুষ! উনার সাথে এভাবে তর্ক করতে আছে?"
কথাটা বলেই লোকটা অত্যন্ত ভদ্রলোকের মতো বন্দুকটা ফারিশের দিকে বাড়িয়ে দিল!এই অভাবনীয় কাণ্ড দেখে ফারিশ আর আরিশা—দুজনেই মহাবিস্ময়ে হা করে তাকিয়ে রইল। আরিশার পুরো প্ল্যান ছিল লোকটাকে কথায় ডাইভার্ট করে নিজেই বন্দুকটা তুলে তাকে শুট করবে বা ফারিশকে দেবে। কিন্তু এই গুন্ডা যে এত বড় আহাম্মক বের হবে এবং বিরক্ত হয়ে নিজেই বন্দুক ফেরত দিয়ে দেবে, তা আরিশার কল্পনাতেও ছিল না!লোকটা বন্দুকটা ফারিশের হাতে দিয়ে যেই না পুনরায় ফারিশকে আক্রমণ করতে যাবে, ফারিশ এক সেকেন্ডও দেরি করল না। সে ট্রিগার চেপে লোকটার পায়ে শুট করল। লোকটা আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
"আহহ! বস যে কেন এমন সব আহাম্মকদের আমাদের টিমে রেখেছে! আনবিলিভেবল! পুরো টিমের মান-সম্মানটাই ডুবিয়ে দিল!"
হঠাৎ পাশ থেকে এক উপহাসমিশ্রিত কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই ফারিশ সেদিকে নিজের বন্দুকটা তাক করল। দরজার আড়াল থেকে হাততালি দিতে দিতে বেরিয়ে এলো রাশেদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং ডান হাত বলে পরিচিত লোক—রিদান।ফারিশকে নিজের দিকে বন্দুক তাক করতে দেখে রিদান মোটেও ঘাবড়াল না। সে দুই হাত ওপরে তুলে এক গাল হেসে বলল,
"আরে আরে লয়ার সাহেব! রিল্যাক্স, রিল্যাক্স! আমি এখানে ফাইট করতে আসিনি। আমি তো কেবল আপনার সাথে একটা জরুরি কথা বলতে এসেছি!"
ফারিশের চোখ দুটো সরু হয়ে এল। সে পরিস্থিতি বোঝার জন্য বন্দুকটা সামান্য একটু নিচে নামাল, তবে নিশানা সরাল না।রিদান এক পা এগিয়ে এসে পকেটে হাত দিয়ে বেশ চড়া সুরে বলল,
"শুনুন লয়ার সাহেব। শুধু শুধু বসের সাথে ঝামেলা বাড়িয়ে আপনার কোনো লাভ নেই। আইন-আদালত দিয়ে আমাদের বসের কিচ্ছু ছেঁড়া যাবে না। তার থেকে ভালো হয় বসের অফারটা মেনে নিন। আমাদের দলে চলে আসুন। এতে আপনারই ভালো, ক্যারিয়ার আরও উঁচুতে যাবে। নয়তো..."
রিদান একটু থামল, তারপর এক কুৎসিত হাসি দিয়ে বলল,
"আইনের খাতায় আপনি যত বড় লয়ারই হোন না কেন, বাস্তবে আপনি আমাদের কিচ্ছু করতে পারবেন না! কোনো প্রমাণই টিকবে না আদালতে!"
রিদানের এই অহংকারী কথা শুনে ফারিশের ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা আবারও ফিরে এলো। সে সরাসরি রিদানের দিকে তাকিয়েই চোখের কোণ দিয়ে আরিশাকে একটা সূক্ষ্ম ইশারা করল। আরিশা ফারিশের সেই চোখের ভাষা এবার ঠিকই ধরে ফেলল।ফারিশ অত্যন্ত ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে শিস দিতে দিতে হেঁটে আরিশার পাশ দিয়ে পার হতে লাগল। পার হওয়ার ঠিক ওই এক সেকেন্ডের মধ্যে সে আরিশাকে ফিসফিসিয়ে বলল,
"ফোন বের করে জলদি ছবি তোলো...!"
কথাটা শেষ করেই ফারিশ চট করে নিজের হাতের লোডেড পিস্তলটা রিদানের দিকে ছুড়ে মারল!হঠাৎ ফারিশ নিজের অস্ত্র শত্রুর দিকে ছুড়ে দেওয়ায় রিদান হকচকিয়ে গেল।আত্মরক্ষার সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই সে জলদি নিজের দুই হাত বাড়িয়ে ফারিশের ছুড়ে দেওয়া পিস্তলটা ক্যাচ করল।ঠিক এই মোক্ষম মুহূর্তেই—যখন রিদানের এক হাতে ফারিশের পিস্তল এবং সে সেটা ধরে বোকার মতো তাকিয়ে আছে—আরিশা ঝড়ের গতিতে ফোনটা বের করে "ক্লিক ক্লিক" করে কয়েকটা ছবি তুলে নিল!
"এটা কী হলো?! এই মেয়ে হঠাৎ আমার ছবি তুলল কেন?!"
রিদান কপাল কুঁচকে, সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হয়ে চিল্লিয়ে উঠল।ফারিশ ততক্ষণে রিদানের একেবারে মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।
"প্রমাণ! আইন চলে প্রমাণের ভিত্তিতে, মিস্টার রিদান। লয়ার ফারিশ নাভানকে অ্যাটেম্পট টু মার্ডার অর্থাৎ খুনের চেষ্টা করার কেসে এবং অবৈধ অস্ত্র বহনের দায়ে তোমায় এবার পাকড়াও করা হলো। ছবিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে অস্ত্রটা তোমার হাতে এবং তুমি আমার দিকে তাক করে আছ!"
কথাটা মুখ থেকে শেষ হওয়ার আগেই ফারিশ রিদানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। রিদান কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফারিশ তার হাত থেকে অস্ত্রটা কেড়ে নিয়ে এক ঝটকায় তার হাত দুটো পিঠের মোড়কে এনে মাটিতে চেপে ধরল। রিদানের পিঠে নিজের হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে ফারিশ ঠান্ডা গলায় বলল,
"এবার দেখবি লয়ার ফারিশ নাওয়ান আসলে কী করতে পারে!"
_________
ক্লাস শেষ করে সবেমাত্র রুমে এসে চেয়ারটায় আরাম করে বসেছিল আয়ান। টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লেকচার শিটগুলো একপাশে সরিয়ে রেখে সে তার বাকি তিন-চারজন কলিগের সাথে আড্ডায় মেতে উঠল। ক্লাসের গম্ভীর লেকচারার আয়ান এখন পুরো অনাবিল হাসিতে মেতে আছে, হাত নেড়ে নেড়ে সহকর্মীদের সাথে কোনো একটা মজার কৌতুক শেয়ার করছে। ঠিক এই আনন্দঘন মুহূর্তেই দরজার কাঠের পাল্লায় আলতো করে দুটো টোকা পড়ল।
"মে আই কাম ইন...?"
মিষ্টি একটা কণ্ঠস্বর শুনে আয়ান গল্প থামিয়ে দরজার দিকে তাকাল। আর তাকানো মাত্রই সে অবাক! দরজায় দাঁড়িয়ে আছে আর কেউ নয়—স্বয়ং ইনায়া!ইনায়াও দরজার ওপাশ থেকে আয়ানের দিকে একপলক তাকাল। তার চোখের ভেতরে তখন রাগের এক বিশাল আগ্নেয়গিরি জ্বলছে, যার আঁচ আয়ান দূর থেকেই পাচ্ছিল। তবে নিজের ভেতরের সেই চরম রাগটাকে যথাসম্ভব কন্ট্রোল করে, ঠোঁটের কোণে একটা কৃত্রিম ও জবরদস্তিমূলক মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে ইনায়া রুমের ভেতরে পা রাখল। গটগট করে হেঁটে সে সোজা আয়ানের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। আয়ান তখনো হা করে তাকিয়ে আছে।
ইনায়া এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে তার কাঁধে থাকা ব্যাগটা থেকে একটা নিখুঁতভাবে ভাঁজ করা কাগজ বের করল। তারপর সেটা আয়ানের ঠিক সামনে ধরে টেবিলের ওপর রাখল। আয়ান অবাক হয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠিটা তুলে নিতেই রুমের আবহাওয়া এক নিমেষে বদলে গেল।আয়ানের পাশে বসা বাকি কলিগরা এই দৃশ্য দেখে আর নিজেদের ধরে রাখতে পারল না। তারা সবাই মিলে একসাথে চিল্লিয়ে উঠল,
"ওওওওওওওওওও...! কী ব্যাপার আয়ান সাহেব?!"
পুরো রুম জুড়ে যখন হুল্লোড় পড়ে গেছে, তখন ইনায়া তার আসল উদ্দেশ্য সফল হয়েছে দেখে সবার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত লাজুক ও মিষ্টি একটা হাসি দিল। যেন সে সত্যিই তার মনের মানুষকে প্রেমপত্র দিতে এসেছে! এরপর সে এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে চলে গেল।ইনায়া চলে যেতেই কলিগদের একজন আয়ানের কাঁধে একটা জোরালো চাপড় মেরে বরল,
"ওহহো! আমাদের আয়ান সাহেব দেখছি আরও একটা লাভ লেটার পেয়ে গেলেন! আরে ভাই, এতদিন তো ক্লাসের স্টুডেন্টরা টেবিলের নিচে উড়ো চিঠি রেখে যেত, এখন দেখছি বাইরের আরও সুন্দর সুন্দর পরীর মতো মেয়েরাও আয়ানকে সরাসরি এসে লাভ লেটার দেয়! তা আমাদের এই ভাবি সাহেবার পরিচয়টা কী, শুনি?"
সহকর্মীদের এই হুল্লোড় আর প্রশংসায় আয়ানের ভেতরে তখন এক বিশাল ভাব চলে এলো। সে চেয়ারে একটু হেলান দিয়ে বসে, কলারটা সামান্য ঠিক করে রোমান্টিক নায়কের মতো ভাব ধরল। মুখে এক চিলতে বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে সে অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে কাগজটা খুলল। মনে মনে ভাবল—হুহ! ইনায়া তাহলে শেষমেশ আমার প্রেমে পড়েই গেল! মেয়েদের মন বোঝা আসলেই দায়!কিন্তু সাদা কাগজটার ভাঁজ খোলামাত্রই আয়ানের মুখের সেই রাজকীয় ভাব উবে গেল। কাগজের গোটা গোটা অক্ষরে লেখা রয়েছে,
"যদি তুই বিয়া করছ শয়তান, তবে বাসর রাতই হবে তোর শেষ রাত! কল্লা কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেবো! মাইন্ড ইট, ইটস মি, ইনায়া।"
লেখাটা পড়া মাত্রই আয়ানের মেরুদণ্ড দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে শুকনো একটা ঢোক গিলে কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল। এদিকে আয়ানের মুখের এই আকস্মিক পরিবর্তন দেখে বাকি কলিগদের কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। একজন টেবিলের ওপর দিয়ে ঝুঁকে এসে বলল,
"কী হে আয়ান? মুখটা এমন শুকিয়ে গেল কেন? দেখি দেখি, চিঠিতে কী এমন গোপন রোমান্টিক কথা লিখেছে ভাবি! আমাদের একটু পড়ে শোনাও!"
আরেকজন তো হাত বাড়িয়ে চিঠিটা প্রায় কেড়েই নিতে যাচ্ছিল। আয়ান দেখল—সর্বনাশ! এই চিঠি যদি এখন এরা পড়ে, তবে প্রফেসর আয়ান সাহেবের ইজ্জতের ফালুদা হতে আর এক সেকেন্ডও সময় লাগবে না! দুনিয়ার বুকে মুখ দেখানোর উপায় থাকবে না তার!চরম আপদকালীন মুহূর্তে আয়ান তার স্বভাবজাত বুদ্ধিতে এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটিয়ে বসল। কলিগরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে চোখের পলকে কাগজটা হাতের মুঠোয় নিয়ে মুচড়ে একদম গোল মার্বেলের মতো বানিয়ে ফেলল। তারপর সবার হা হয়ে থাকা চোখের সামনে সেই কাগজটা টপ করে নিজের মুখের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল! শুধু তাই নয়, টেবিলের ওপর থাকা পানির গ্লাসটা তুলে এক ঢোক পানি মুখে নিয়ে ঢকঢক করে কাগজটা গিলে ফেলার চেষ্টা করল!আয়ানের এই পাগলামি দেখে কলিগরা পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল। আয়ান তখনো মুখের ভেতর কাগজ নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আবার সেই আগের মতো কৃত্রিম ভাব ধরে হাসার চেষ্টা করল।ভাবটা এমন যেন প্রেমিকার চিঠির প্রতিটি অক্ষর সে নিজের ভেতরে ধারণ করে নিচ্ছে!কলিগরা একে অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করে মুখ কুঁচকে বলল,
"ইহহহ! ভাবখানা এমন যেন আমরা কোনোদিন বিয়েই করব না! প্রেমিকার চিঠি কেউ এভাবে চিবিয়ে খায় নাকি? ফাইন, ফাইন! আমাদেরও দিন আসবে ভাই, তখন আমরাও দেখাবো!সাথে পানি দিয়ে চিবিয়েও খাবো!!"
কথাটা বলেই কলিগরা একে একে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তারা রুম থেকে বের হওয়া মাত্রই আয়ানের মুখের সেই কৃত্রিম ভাব ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সে চেয়ার ছেড়ে এক লাফ দিয়ে উঠে দৌড়ে রুমের ভেতরের ওয়াশরুমে গিয়ে ঢুকল।
বেসিনের সামনে গিয়ে কাগজটা বের করার চেষ্টা করতে লাগল।
"ওয়াককক...! থু থু...!"
বেসিনে জোরে জোরে থুতু ফেলতে ফেলতে এবং পানি দিয়ে মুখ ধুতে ধুতে আয়ান বলতে লাগল,
"এই জল্লাদ মেয়ের জন্য যে আমার লাইফে আর কতো কী অদ্ভুত কাজ করতে হবে! ও আল্লাহ! কাগজের স্বাদ যে এত তিতা, তা আমি আজ প্রথম জানলাম! আল্লাহ রে... বাঁচাও আমায় এই পেত্নীর হাত থেকে!"

0 Comments