নীরব_বিদ্রোহ

নীরব_বিদ্রোহ


রাতটা হাসপাতালের ভেতর অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। ঘড়ির কাঁটা যেন এগোচ্ছিল না, বরং থেমে থেমে আমার বুকের ভেতর একটা ভারী চাপ তৈরি করছিল। মিস্টার ইয়াসিন চলে যাওয়ার পর পুরো ঘরটা আরও নিঃশব্দ হয়ে গেল। এই নিঃশব্দতা আগের মতো শান্ত ছিল না, বরং এটা ছিল এমন এক নীরবতা, যেটা যুদ্ধের আগে বাতাসে জমে থাকা উত্তেজনার মতো শরীরকে অস্থির করে তোলে।
আমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলাম, কিন্তু ঘুম আসছিল না। কারণ এখন আমার শরীরের চেয়ে বেশি জেগে ছিল আমার ভেতরের সিদ্ধান্তগুলো। আমি আর আগের মানুষটা নেই—এই সত্যটা বুঝতে সময় লাগছিল, কিন্তু অস্বীকার করার আর কোনো উপায় ছিল না। হঠাৎ ফোনটা ভাইব্রেট করল, স্ক্রিনে অচেনা একটা নম্বর।
আমি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফোনটা ধরলাম। ওপাশে একজন পুরুষের কণ্ঠ বলল, তিনি একজন অ্যাডভোকেট এবং আমার স্বামীর পরিবারের পক্ষ থেকে কিছু কাগজপত্র নিয়ে কথা বলছেন।
তারা নাকি আমার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে চায়, কারণ আমি পরিবারের খরচ বন্ধ করে দিয়েছি। আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে শুধু বললাম “ঠিক আছে”, তারপর ফোনটা কেটে গেল। সেই মুহূর্তে আমি বুঝলাম, এটা আর শুধু পারিবারিক সম্পর্কের বিষয় নেই, এটা এখন আইন, অস্তিত্ব আর আত্মসম্মানের লড়াই।
পরদিন সকালে ডাক্তার রাউন্ডে এসে বললেন আমার শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে ভালো, কিন্তু মানসিক চাপ খুব বেশি। আমি হালকা হেসে বললাম, “মনটাই এখন যুদ্ধক্ষেত্র।” দুপুরে তানজিলা আক্তার হাসপাতালে এলো। তার মুখে আগের নরম ভান ছিল না, ছিল স্পষ্ট রাগ আর চাপা ক্ষোভ। সে বলল আমি নাকি পরিবার ভেঙে দিচ্ছি। আমি শান্তভাবে বললাম, আমি ভাঙছি না, আমি শুধু বোঝার চেষ্টা করছি আমি কোথায় ছিলাম এতদিন। আমার কথা শুনে সে আরও অস্থির হয়ে উঠল, কিন্তু আমি আর পেছনে ফিরিনি।
সন্ধ্যায় মিস্টার ইয়াসিন আবার এল। তার চোখে আগের মতো আত্মবিশ্বাস নেই, কিন্তু মুখে এখনো কঠোরতা আছে। সে সরাসরি বলল আমি অ্যাডভোকেটের সাথে কথা বলেছি কি না। আমি বললাম হ্যাঁ। সে জানতে চাইল আমি সত্যিই আদালতে যেতে চাই কি না।
আমি জানালার দিকে তাকিয়ে বললাম, আমি সত্য চাই। সে বিরক্ত হয়ে বলল আমি ঝামেলা বাড়াচ্ছি। আমি শান্তভাবে বললাম, আমি ঝামেলা বাড়াচ্ছি না, আমি শুধু হিসাব চাইছি—আমি কোথায় ছিলাম এই সম্পর্কের ভেতরে। তার সঙ্গে কথা বাড়তে বাড়তে সে হুমকি দিল ডিভোর্স কেস করবে। আমি কোনো দ্বিধা ছাড়াই বললাম, তাহলে করো। সেই মুহূর্তে আমার ভেতরে ভয় না, বরং এক ধরনের স্পষ্টতা জন্ম নিল।
রাত গভীর হলে আমি বিছানায় শুয়ে ব্যাংক অ্যাপ খুলে গত তিন বছরের লেনদেন দেখতে থাকলাম। প্রতি মাসে ২৫,০০০ টাকা করে পাঠানো হয়েছে, একটানা, নিঃশর্তভাবে। প্রতিটি ট্রান্সফার যেন আমার নিজের অস্তিত্বের একটা অংশ হারিয়ে যাওয়ার মতো লাগছিল।
আমি বুঝতে পারছিলাম, আমি শুধু টাকা পাঠাইনি, আমি ধীরে ধীরে নিজের জায়গা থেকেও সরে গিয়েছি।
কিন্তু এখন সেই জায়গাটা আবার খুঁজে পাওয়ার সময় এসেছে।
দুই দিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার দিন এলো। আকাশে হালকা বৃষ্টি পড়ছিল, মাটি ভেজা গন্ধে ভরে উঠেছিল। আমি গেটের দিকে এগোতেই দেখলাম মিস্টার ইয়াসিন দাঁড়িয়ে আছে।
তার পাশে অ্যাডভোকেটও আছে। তার চোখে আর আগের দম্ভ নেই, আছে শুধু এক ধরনের অস্বস্তি।
সে আমাকে আবার থামানোর চেষ্টা করল, কিন্তু আমি থামলাম না। আমি শুধু শান্তভাবে বললাম, আমি শুরু করিনি, আমি শুধু নিজেকে বাঁচাচ্ছি। তারপর আমি হাঁটা শুরু করলাম, আর পেছনে পড়ে রইল সেই জীবন, যেখানে আমি শুধু হিসাবের একটা নাম ছিলাম।

Post a Comment

0 Comments