সন্তানের_প্রমাণ

সন্তানের_প্রমাণ


কারণ অন্ধকারের মধ্যে আরও কয়েকজন অস্ত্রধারী মানুষ আমাদের দিকে এগিয়ে আসছিল।
চারপাশের নীরবতা মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে গেল।
আমার কানে শুধু নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দ ভেসে আসছিল।
নোভা মাটিতে পড়ে আছে।
তার শরীরের নিচে ধীরে ধীরে রক্ত ছড়িয়ে পড়ছে।
কয়েক সেকেন্ড আগেও সে কথা বলছিল।
এখন সে নিস্তব্ধ।
আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
আমি ছেলেকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরলাম।
রায়হান বিদ্যুতের গতিতে মাটিতে পড়ে থাকা পেনড্রাইভটা তুলে নিল।
তারপর আমার হাত ধরে টেনে নিচে বসিয়ে দিল।
আরেকটা গুলির শব্দ হলো।
এইবার গুলিটা আমাদের মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল।
দূরের একটি কাচের জানালা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
“নিচু হও!”
রায়হান চিৎকার করল।
আমি মাটিতে বসে পড়লাম।
আমার পুরো শরীর কাঁপছিল।
আমার ছেলে ঘুম ভেঙে কেঁদে উঠল।
ওর কান্নার শব্দ শুনে আমার বুক ভেঙে যাচ্ছিল।
এই নিষ্পাপ শিশুটি জন্মের পর থেকেই শুধু ভয় আর ষড়যন্ত্রের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
রায়হান দ্রুত ফোন বের করল।
কাউকে লোকেশন পাঠাল।
তারপর বলল,
“আমাদের এখান থেকে বের হতে হবে।”
“নোভা?”
আমার গলা কেঁপে উঠল।
রায়হান একবার তার দিকে তাকাল।
তার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“এখন থামলে আমরা সবাই মরব।”
আমি দাঁত চেপে চোখের পানি আটকে রাখলাম।
আরেকটা গুলি ছুটে এল।
এইবার আরও কাছ দিয়ে।
আমরা দৌড় শুরু করলাম।
রিসোর্টের পেছনে একটা পুরোনো বন ছিল।
অন্ধকারে গাছগুলোর ছায়া যেন ভৌতিক অবয়বের মতো দাঁড়িয়ে ছিল।
আমরা সেদিকেই ছুটলাম।
পেছন থেকে মানুষের চিৎকার ভেসে আসছিল।
তারা আমাদের অনুসরণ করছে।
রায়হান আমাকে সামনে যেতে বলল।
আমি প্রাণপণে দৌড়াতে লাগলাম।
শরীর তখনো প্রসবের যন্ত্রণা থেকে পুরোপুরি সেরে ওঠেনি।
প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে।
কিন্তু থামার সুযোগ নেই।
আমার সন্তানের জন্য আমাকে বাঁচতেই হবে।
প্রায় দশ মিনিট দৌড়ানোর পর আমরা একটা পরিত্যক্ত কটেজের সামনে এসে থামলাম।
রায়হান দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল।
আমরাও ঢুকে পড়লাম।
ঘরটা ধুলোয় ভরা।
অনেক বছর ধরে কেউ এখানে আসেনি।
কিন্তু আপাতত এটা আশ্রয়।
আমি মেঝেতে বসে পড়লাম।
আমার ছেলে তখনো কান্না করছে।
আমি তাকে বুকে জড়িয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলাম।
কয়েক মিনিট পর সে ধীরে ধীরে শান্ত হলো।
রায়হান জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছিল।
তারপর ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
তার হাতে সেই পেনড্রাইভ।
আমরা দুজনেই জানতাম এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস সম্ভবত এটাই।
“এটার মধ্যে কী আছে?”
আমি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম।
রায়হান ল্যাপটপ বের করল।
কয়েক সেকেন্ড পরে পেনড্রাইভটা সংযুক্ত করল।
স্ক্রিনে অসংখ্য ফাইল ভেসে উঠল।
ভিডিও।
অডিও।
ব্যাংক নথি।
ইমেইল।
আর একটি ফোল্ডার।
ফোল্ডারের নাম দেখে আমার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
ফোল্ডারের নাম—
“লামীসা_ফাইনাল_ফেজ”
আমার পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“ফাইনাল ফেজ মানে কী?”
রায়হান ধীরে ফাইল খুলল।
ভেতরে কয়েকটি নথি।
প্রথম নথি খুলতেই আমার হাত কেঁপে উঠল।
সেখানে লেখা ছিল—
“বিষয়: সম্পত্তি হস্তান্তরের পরবর্তী ব্যবস্থা।”
আমি পড়তে শুরু করলাম।
প্রতিটি লাইন পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হচ্ছিল কেউ আমার বুকের মধ্যে ছুরি চালাচ্ছে।
নথিতে লেখা ছিল—
আমার সমস্ত সম্পত্তি ও ব্যবসায়িক শেয়ার মিস্টার ইয়াসিনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর আমাকে মানসিকভাবে অস্থির ঘোষণা করার পরিকল্পনা।
তারপর আমাকে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানোর পরিকল্পনা।
আর শেষে—
আমার সন্তানের অভিভাবকত্ব স্থায়ীভাবে কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা।
আমার চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে গেল।
“ওরা... ওরা এসব পরিকল্পনা করেছিল?”
রায়হান নিচু গলায় বলল,
“হ্যাঁ।”
আমি চেয়ার আঁকড়ে ধরলাম।
“আমি ওদের কী ক্ষতি করেছিলাম?”
কেউ উত্তর দিতে পারল না।
কারণ এর উত্তর খুব সহজ।
আমি শুধু ভুল মানুষদের বিশ্বাস করেছিলাম।
আর সেই ভুলের মূল্য ছিল আমার পুরো জীবন।
রায়হান আরেকটি ভিডিও খুলল।
ভিডিওটি দেখে আমার শরীর হিম হয়ে গেল।
কারণ ভিডিওতে দেখা গেল—
আমার বাবা।
আমি অবিশ্বাসে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
ভিডিওটা কয়েক বছর আগের।
বাবা একটি অফিস কক্ষে বসে আছেন।
তার মুখ গম্ভীর।
ক্লান্ত।
চোখে উদ্বেগ।
তিনি সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“যদি এই ভিডিও লামিসার হাতে পৌঁছায়, তাহলে বুঝতে হবে আমি ব্যর্থ হয়েছি।”
আমার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
আমি পর্দার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
বাবা বলতে লাগলেন—
“আমি কিছুদিন ধরে ভয়ঙ্কর সত্যের মুখোমুখি হয়েছি। যাদের আমি ব্যবসায়িক অংশীদার ভেবেছিলাম, তারা আসলে অপরাধী।”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
“তারা শুধু টাকা চুরি করে না। তারা মানুষকেও সরিয়ে দেয়।”
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এল।
বাবা আবার বললেন—
“আমি অনেক দেরিতে বুঝেছি যে ইয়াসিন পরিবার আমার কাছাকাছি এসেছে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে।”
আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।
“তারা আমার সম্পদের জন্য এসেছে।”
ভিডিওতে বাবা এক মুহূর্ত থামলেন।
তারপর এমন একটি কথা বললেন যা আমার পৃথিবী সম্পূর্ণ বদলে দিল।
“আর সবচেয়ে বড় ভুল করেছি আমি যখন ইয়াসিনকে তোমার কাছাকাছি আসতে দিয়েছি।”
আমার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল।
আমি স্ক্রিন ছুঁয়ে দিলাম।
বাবা যেন আমার সামনে বসে আছেন।
কিন্তু তিনি নেই।
বহু বছর আগে হারিয়ে গেছেন।
ভিডিওর শেষ অংশে তিনি একটি নাম উচ্চারণ করলেন।
একটি নাম যা আমি আগে কখনো শুনিনি।
“যদি আমার কিছু হয়, তাহলে সাদিক রহমানকে খুঁজে বের করো।”
ভিডিও শেষ হয়ে গেল।
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা।
আমি চোখ মুছলাম।
“সাদিক রহমান কে?”
রায়হান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“আমি তাকে চিনি।”
“তুমি চেনো?”
“হ্যাঁ।”
“সে কোথায়?”
রায়হান গভীর শ্বাস নিল।
“সমস্যা হলো... সাদিক রহমান গত পাঁচ বছর ধরে নিখোঁজ।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
আরেকটা রহস্য।
আরেকটা হারিয়ে যাওয়া মানুষ।
ঠিক তখনই বাইরে কোনো শব্দ হলো।
আমরা দুজনেই চমকে উঠলাম।
কেউ যেন কটেজের বাইরে হাঁটছে।
ধীরে।
সতর্কভাবে।
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে লাইট বন্ধ করে দিল।
ঘর অন্ধকার হয়ে গেল।
আমি ছেলেকে জড়িয়ে ধরলাম।
আমার নিশ্বাস পর্যন্ত আটকে গেল।
বাইরে পদশব্দ আরও কাছে আসছে।
একজন নয়।
কয়েকজন।
আমরা স্থির হয়ে রইলাম।
তারপর হঠাৎ দরজায় ধাক্কা পড়ল।
একবার।
দুইবার।
তিনবার।
আমার বুকের ভেতর হৃদপিণ্ড যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে।
রায়হান টেবিলের ওপর থাকা লোহার রডটা হাতে নিল।
তার চোখ দরজার দিকে স্থির।
বাইরে থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।
“রায়হান! আমি জানি তুমি ভেতরে আছো!”
কণ্ঠটা শুনে আমার শরীর কেঁপে উঠল।
কারণ আমি কণ্ঠটা চিনতে পেরেছি।
সেটা মিস্টার ইয়াসিনের কণ্ঠ।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে আমার স্বামী।
আর তার কণ্ঠে এমন কিছু ছিল যা আগে কখনো শুনিনি।
ভয়।
মিস্টার ইয়াসিন ভয় পেয়েছে।
সত্যিকারের ভয়।
আর সেই কারণটা সম্ভবত পেনড্রাইভের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এমন কোনো সত্য, যা এখনও আমরা খুঁজে পাইনি।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর বাইরে থেকে সে আবার বলল—
“লামিসা, যদি তুমি ভেতরে থাকো, তাহলে আমার কথা শোনো।”
আমি নিঃশ্বাস আটকে রইলাম।
“আজ রাতের পর সবকিছু বদলে যাবে।”
তার কণ্ঠ কাঁপছিল।
“কারণ যাদের বিরুদ্ধে তোমরা লড়ছ, তারা আমি নই...”
আমি আর রায়হান একে অপরের দিকে তাকালাম।
বাইরে ঝড়ের বাতাস বইছিল।
আর তারপর মিস্টার ইয়াসিন এমন একটি নাম উচ্চারণ করল, যা শুনে রায়হানের মুখ মুহূর্তের মধ্যে সাদা হয়ে গেল।
একটি নাম—
যে নামটা বহু বছর ধরে মৃত বলে সবাই বিশ্বাস করে এসেছে।

Post a Comment

0 Comments