তোমাকে_ভাবিনি_কখনও

তোমাকে_ভাবিনি_কখনও

 " আমি কোনভাবে ৩৫ বছরের বুড়োকে বিয়ে করতে চাই নাহ বাবা। তোমরা কিভাবে ভাবলে আমার মতো সুইট, কিউট মেয়েকে একটা বুড়োর সাথে মানাবে? "

" নীলা, বিহেভ ইউরসেল্ফ। তারা এখনও বাহিরের রুমে বসে আছে। সব শুনতে পাবে। "
" তো আমার কি? আমি এই বিয়ে করবো নাহ। এখনই তোমার বন্ধুকে পরিবার নিয়ে চলে যেতে বলো। "
" তুমি দিন দিন বড্ড বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছো। আমি কি তোমাকে মানুষ করতে পারি নি? "
" কি যে বলো নাহ বাবা! আমি তো দিব্যি মানুষের মতোই দুই পায়ে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। "
নীলার কথা শেষ হতেই তার বাবা রাগে কপালের রগ ফুলিয়ে তাকালেন। মেয়েটার মুখে কোনো ভয়ডর নেই, বরং ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি লেগেই আছে।
" তুমি কি সবকিছুকে মজা মনে করো, নীলা? "
দাঁত চেপে বললেন তিনি। নীলা কাঁধ ঝাঁকালো। একটু বুঝানোর ভঙিতে বললো,
" আচ্ছা বাবা, তুমি একবার নিজের জায়গায় আমাকে বসিয়ে ভাবো তো। আমার বয়স বাইশ, আর যার সাথে বিয়ে দিতে চাইছো তার বয়স পঁয়ত্রিশ! মানুষটা আমার থেকে তেরো বছরের বড়! লাইক সিরিয়াসলি! "
" বয়স বড় হলেই সমস্যা কোথায়? ছেলে প্রতিষ্ঠিত, ভদ্র, শিক্ষিত। "
" লোকটা আর একটু বড় হলে তো তুমি সরাসরি আমাকে আঙ্কেল ডাকতে বলতে। "
" নীলা! "
বাবার গর্জনে পুরো ঘর কেঁপে উঠলো। কিন্তু নীলা থামলো না।
" আমি সত্যিই বলছি। উনি হয়তো ভালো মানুষ, কিন্তু আমি বিয়ে করবো না। অন্তত এখন না। "
এমন সময় ছোট্ট ছোট্ট পায়ে একটা বাচ্চা ছেলে নীলার রুমের সামনে চলে আসে। এতে নীলার বাবা রফিকুল ইসলাম থেমে যান৷
" সোহান বাবা, তুমি এখানে? "
" বিগ আঙ্কেল, আমি এই মিষ্টি পরিটার সাথে কথা বলতে এসেছি। "
নীলা প্রথমে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। তারপরই মুখে হাসি টেনে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
" দেখলে বাবা, একটা বাচ্চা ছেলেও আমাকে পরি বলে ডাকছে। অথচ তুমি আমাকে এক বুড়োর সাথে বিয়ে দিয়ে বুড়ি বানিয়ে দিতে চাচ্ছো। "
" আমাকে বাচ্চা বলবে নাহ পরি। আমি হ্যান্ডসাম বয়। "
" ওলে হ্যান্ডসাম বয় আমার! কি কথা বলবে আমার সাথে? "
" শোনো পরি, তুমি তো আমার চাচ্চুর বউ হবে তাই নাহ। তারপর থেকে কিন্তু আমি তোমার সাথে থাকবো। তোমাকে আমার অনেক পছন্দ হয়েছে। "
" কিন্তু আমি তো তোমার চাচ্চুর বউ হবো নাহ হ্যান্ডসাম বয়।"
" কিন্তু আম্মু তো বললো তোমার সাথে আমার কিয়ান চাচ্চুর বিয়ে হবে। "
" তোমার আম্মু মজা করেছে তোমার সাথে। আমি তোমার চাচ্চুকে বিয়ে করবো নাহ। "
" নীলা! বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে এখন। সাজিদুলের সাথে আমার আগেই কথা হয়ে গিয়েছিলো। এখন কি জবাব দিবো তাদের? "
" সেটা আমি কি জানি? আমি কি সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলাম নাকি? এই বুড়োকে আমি বিয়ে করবো নাহ। "
" কিয়ান মোটেও বুড়ো নয়।।তুমি এখনও বাহিরের ঘরে গেলেই নাহ, দেখলেই নাহ ছেলেকে। এর আগেই এত কথা বলছো কিভাবে? "
" বয়স শুনেই আমি মনের মাঝে চেহারা সাজিয়ে নিয়েছি। আর আমার সাজানো সেই চরিত্র পুরোই বুড়ো একটা লোক। "
" তো তুমি তোমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিচ্ছো? এই বিয়ে করবে নাহ তুমি? "
" নাহ, করবো নাহ। "
" পরে আবার পস্তাবে নাহ তো? "
" অফকোর্স নো। জীবনেও পস্তাবো নাহ। "
সোহান এতক্ষণ একবার রফিকুল সাহেবের দিকে, আরেকবার নীলার দিকে তাকিয়ে সব শুনছিলো। তার বাচ্চা মন সবটা না বুঝলেও এইটুকু বুঝেছে, নীলা পরি তার কিয়ান চাচ্চুকে বিয়ে করবে নাহ৷
তখন সে নীলার পড়নের কুর্তি ধরে টানতে থাকে। নীলা একটু উবু হয়ে তাকালে সোহান মন খারাপ করে বলে,
" ও মিষ্টি পরি, তুমি আমার কিয়ান চাচ্চুকে বিয়ে করবে নাহ?"
নীলা বনিতা না করে বলে,
" নো হ্যান্ডসাম বয়। তোমার ওই বুড়ো চাচ্চুকে আমি বিয়ে করবো নাহ। "
" আমার যে তোমাকে অনেক ভালো লেগেছে পরি। "
" আমারও তোমাকে অনেক ভালো লেগেছে সোনা। তুমি চাইলে মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে আসতে পারো। আমরা একসাথে অনেক ভালো সময় কাটাবো। "
সোহানকে নিয়ে রফিকুল সাহেব রুমের বাহিরে বেরিয়ে যান। তারপর আর নীলার জানা নেই কি ঘটেছে। সে তো রুমের বাহিরে বেরই হয় নি। উল্টো কানে হেডফোন গুঁজে সে গান শুনতে থাকে। বাবা আজ তাকে না জানিয়েই হুট করে অতিথিদের বাড়িতে নিয়ে এসেছে। নীলা প্রথমে কিছুই জানতো নাহ। পরে বাবা এসে যখন তাকে বাহিরে সবার সামনে যেতে বলে, তখন নীলা সাফ সাফ না করে দেয়। তারপর কি ঘটেছে তা জানার তার আর কোন আগ্রহই নেই। তাই সে দায়ছাড়া ভাবে গান শুনতে থাকে।
*****
সকাল সকাল নীলা ঘুম থেকে উঠে দেখে নয়টা বেজে গেছে। আজকে দশটায় ক্লাস তার। সে দ্রুত উঠে হুড়োহুড়ি করে তৈরি হতে থাকে। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে দেখে বাবা বাসায় নেই। তিনি ইতোমধ্যে নিজের ডিউটিতে চলে গিয়েছেন। তবে টেবিলের উপর তার জন্য নাস্তা তৈরি করা আছে। নাস্তা হিসেবে দুই পিস স্যান্ডউইচ, আর একটা আস্ত সিদ্ধ ডিম রাখা। ডিমের পিসটা দেখেই নীলার মুখ কুঁচকে যায়। তার ডিম মোটেও পছন্দ নাহ। তবুও তার বাবা তাকে জোর করে প্রতিদিনই ডিম খাওয়াবে। সে মাঝে মাঝে অজুহাত দেখিয়ে পরিক্ষায় ডিম খাওয়ার কথা বলে পালাতে চাইতো। তারপরও তার বাবা বলতো,
" মা, তুই ডিম খেয়ে আরও দুটো ডিম পেলে আমার কোন সমস্যা নেই। তবুও তোকে ডিম খেতেই হবে৷ "
এটা নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই তাদের বাবা-মেয়ের কাহিনী চলে। আজ বাবা বাসায় নেই বিধায় এই ঝগড়ার মুলতবি ঘোষনা হলো। সুযোগ পেয়ে নীলা শুধু স্যান্ডউইচ মুখে নিয়েই দ্রুত ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরে।
ভার্সিটি পৌছতেই দেখে একপাশে বিশাল বড় এক জটলা। কৌতুহল নিয়ে কাছে এগুতেই দেখে দুই পক্ষের মাঝে বিশাল মারামারি চলছে। সম্ভবত কোন মেয়ে নিয়ে কেলেঙ্কারি। নীলা মুখ বাকিয়ে নেয়। আশেপাশে সেই সুন্দ্রি মেয়েটাকে খুঁজতে থাকে যাকে নিয়ে এত কাহিনী। সে এগিয়ে একটা মেয়েকে কাঁধে টোকা দিয়ে বলে,
" এই যে আপা, কাহিনী কি? কাকে নিয়ে এসব ঘটতেছে? "
মেয়েটা একটু দূরে দাঁড়ানো একটা মেয়েকে দেখিয়ে দেয়। তাকে ঘিরে আরও কয়েকজন মেয়েরা ঝটলা পাকিয়ে আছে। মেয়েটার পড়নের বেশভুষা দেখে বেশ বড়লোকের মেয়েই মনে হচ্ছে। তবে চেহারা দেখে তার ভয়ের কারণ আন্দাজ করা যাচ্ছে। দুটো ছেলেই তার বয়ফ্রেন্ড। একজনের আড়ালে অপরজনের সাথে রিলেশনে ছিলো। দুজনই সেটা জানতে পেরে দু-এক কথায় মারামারিতে লেগে গিয়েছে।
নীলা সেই মারামারি বেশ ভালোই উপভোগ করছে। তবে এটা কোন সিনেমার মতো ফাইটিং নাহ। ছেলে দুটোই মারামারিতে বড্ড অপটু। ফলে একে অপরকে শুধু ধাক্কিয়েই যাচ্ছে। তাদের মারামারি দেখে মনে হচ্ছে চুলগুলো বড় থাকলে নির্ঘাত চুলোচুলি শুরু করে দিতো। নীলার বড্ড হাসি পাচ্ছিলো।
হটাৎই একজেড়া হাত তার কোমড় পেঁচিয়ে ধরে। নীলা আঁতকে উঠে পেছনে তাকিয়েই নাবিহাকে দেখেই মেরে বসে৷
" সর সর, বেয়াদব লুচি মেয়ে। সামনে দেখ, ফাইটিং সীন চলতেছে। দুই অবিবাহিত ছেলে সতীনের চুলোচুলি। "
নাবিহা এসব দেখে খিলখিলিয়ে হেসে বলে,
" এটা কিসের ফাইটিং সীন ভাই? লাঠি-সোঁটা কিছুই নেই তো। মজা লাগতেছে নাহ। "
তারপরই সে গলা উঁচিয়ে বলে উঠে,
" খেলা জমতেছে নাহ ভাই। এই কেউ ওদের লাঠি-সোঁটার ব্যবস্হা করে দাও প্লিজ। "
নীলাও তার কথা শুনে হাসছিলো। নাবিহার কথায় আশেপাশের কয়েকজনও হেসে উঠে। এমন সময় হটাৎই একটা ঘটনায় চারপাশের পরিস্হিতি অস্বাভাবিকভাবে শান্ত হয়ে যায়। নীলা আর নাবিহা চলে আসতেই নিয়েছিলো। তখনই ছেলে দুটোর চিৎকার শুনে তারা পুনরায় ভীড়ের মাঝে দৌড়ে যায়। তাকিয়ে যা দেখে, তাতে তাদের চোখ খুলে আসার জোগার।
শ্যামলা গড়নের একজন পুরুষ হাতে একটা গাছের ঢাল নিয়ে ছেলে দুটোকে ইচ্ছেমতো পি'টাচ্ছে। পুরুষটির হাতের শার্টটি কুনুই পর্যন্ত গোটানো। তার সেই পুরুষালি হাতের ক্রমাগত আঘাতে গাছের ঢালটা সপাসপ পরছে ছেলে দুটোর পিঠে। পুরুষটি একটি ছেলের হাত ধরে রেখে ধুমধাম পেছনে একের পর এক আঘাত করে যাচ্ছে।
" ভার্সিটিটাকে সার্কাস বানিয়ে ফেলেছিস তোরা। এসবের জন্য বাবা-মা তোদের পেছনে টাকা ঢালে। অসভ্য ছেলে.. "
লোকটি জোড়ালো অথচ গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠে। এতে একটি ছেলে কিছু বলতে নিলে লোকটি তার পায়ে আঘাত করে বসে। এভাবে একের পর এক আঘাতে ছেলে দুটো হাত জোড় করে মিনতি করা শুরু করে। এমনিই একে অপরকে আঘাত করে আহত ছিলো তারা। এখন এই অজানা লোকটার আঘাতে তারা কান্না শুরু করে।
তাদের মিনতিতে এবার লোলটি হাতের ঢাল ফেলে দেয়। চারপাশে নীরবতা নেমে আসে। যারা কিছুক্ষণ আগেও মজা দেখছিলো, তারাও এখন নীরব হয়ে থাকে। এসব দেখে নীলা কিছু না বুঝতে পেরে বলে,
" নাবি বেইব, কে রে এই লোকটা? এত দেমাগ দেখাচ্ছে যে? "
নাবিহা ফিসফিসিয়ে বলে,
" ভার্সিটিতে নতুন ডন এসেছে বস। তুই তো গত কয়দিন ধরে ভার্সিটি আসিস নি। তাই জানিস নাহ। গতকাল ইনি ভার্সিটি থেকে বেরুতে গিয়ে ওই শিহাবদের দলকে একটা জুনিয়রকে র্যাগ দিতে দেখেছিলো। এটা দেখেই ইনি গিয়ে সপাটে শিহাবকে থাপ্পড় দেয়। ওনার উপরে শিহাবদের প্রভাবও খাটে নি। "
" কিন্তু লোকটা কে, সেটা তো বল। কিসের ডন-ফন বলে যাচ্ছিস শুধু। "
নাবিহা কিছু বলতেই নেয়, তখনই পাশ থেকে একটি মেয়ে বলে উঠে,
" কিয়ান স্যার। ক্যামিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের নতুন লেকচারার। গত সপ্তাহেই নতুন জয়েন করেছে। "
কথাটি শুনে নীলা থমকে যায়। সে আবারও সামনে দাঁড়ানো শ্যামবর্ণের পুরুষটির দিকে তাকায়। উচ্চতায় বেশ লম্বা লোকটি, পাশাপাশি দাঁড়ালে সে নিশ্চয়ই বুক বরাবর হবে৷ মুখে চাপ দাড়ি আর চওড়া কাধবিশিষ্ট পুরুষটি তার আগ্রহের কারণ হয়ে বসে।
তার ডিপার্টমেন্টের নতুন লেকচারার! অথচ সে জানেই নাহ সেটা। মাঝে কিছুদিন অনিয়মিত থাকায় সাক্ষাৎ হয় নি। তাছাড়া তার আবার এসব বোরিং ক্লাস ফেলে পালানোর স্বভাব আছে। তবে কিয়ান নামটা তার কাছে বেশ চেনা পরিচিত লাগে। খুব সম্ভবত সম্প্রতি কোথাও শুনেছে। কিন্তু এই মুহুর্তে মন করতেই পারছে নাহ।

Post a Comment

0 Comments