বেস্ট_ফ্রেন্ড_থেকে_সতীন

বেস্ট_ফ্রেন্ড_থেকে_সতীন



নিচতলার করিডোরটা অন্য সময়ের মতোই ব্যস্ত ছিল, কিন্তু সাদিয়া রহমানের কাছে সবকিছু যেন ধীর হয়ে যাচ্ছিল। লিফট থেকে বের হয়েই সে দেখতে পেল, কোণার দিকে দাঁড়িয়ে আছে তার আইনজীবী রায়হান আহমেদ। কালো ফাইলটা হাতে শক্ত করে ধরা, চোখে এমন এক গাম্ভীর্য যেটা সাধারণ কোনো মামলার জন্য হয় না। তার পাশে হাসপাতালের প্রশাসনিক একজন সিনিয়র কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন, মুখে অস্বস্তির ছাপ।
সাদিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। তার মনে তখনও উপরে ঘটে যাওয়া দৃশ্যটা ঘুরছে—মিস্টার ইয়াসিনের হাসি, লাবিবার নিচু হয়ে যাওয়া চোখ, আর সেই শিশুটির নিষ্পাপ মুখ। কিন্তু রায়হানের মুখ দেখেই সে বুঝে গেল, বিষয়টা শুধু অতীত নয়, কিছু একটা এখনই ভেঙে পড়তে যাচ্ছে।
রায়হান তাকে দেখেই সামনে এগিয়ে এল।
“সাদিয়া, এটা খুব জরুরি,” সে নিচু গলায় বলল।
তারপর চারপাশে একবার তাকিয়ে ফাইলটা একটু শক্ত করে ধরল, যেন কেউ শুনে ফেলবে।
সাদিয়া শান্ত গলায় বলল, “বলুন, কী হয়েছে?”
রায়হান এক সেকেন্ড চুপ থেকে ফাইলটা খুলল।
ভেতরের কাগজগুলো বের করতেই তার হাত একটু কাঁপছিল। “তুমি যেটা এক বছর ধরে এড়িয়ে যাচ্ছিলে… সেটাই এখন আবার সামনে এসেছে।”
সাদিয়ার বুকের ভেতর হালকা চাপ অনুভূত হলো।
“স্পষ্ট করে বলুন।”
রায়হান গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
“যে শিশুটিকে তুমি আজকে দেখলে… তার জন্মসংক্রান্ত কাগজপত্রে কিছু গুরুতর অসঙ্গতি আছে।”
এই কথাটা যেন বাতাস থামিয়ে দিল। সাদিয়া এক পলক স্থির হয়ে গেল। “অসঙ্গতি মানে?”
রায়হান ফাইল থেকে একটি রিপোর্ট বের করল।
“ডিএনএ রিপোর্ট।”
এই শব্দটা শোনার পর সাদিয়ার চারপাশের সব শব্দ যেন হঠাৎ দূরে সরে গেল। হাসপাতালের শব্দ, মানুষের হাঁটা, নার্সদের ডাক—সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল।
রায়হান ধীরে ধীরে বলল, “এই রিপোর্ট অনুযায়ী… মিস্টার ইয়াসিন ওই শিশুটির জৈবিক বাবা না।”
এক মুহূর্তের জন্য সাদিয়া কিছু বলল না। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু চোখের গভীরে ঝড় উঠছে। তারপর খুব শান্ত গলায় সে বলল,
“আপনি নিশ্চিত?” রায়হান মাথা নাড়ল।
“দুইবার টেস্ট করা হয়েছে। দুইবারই একই ফল।”
এই সময় হাসপাতালের করিডোর দিয়ে হালকা বাতাস বয়ে গেল। সাদিয়া অনুভব করল, তার ভিতরের অনেক পুরোনো প্রশ্ন হঠাৎ করে নতুনভাবে মাথা তুলছে।
মিস্টার ইয়াসিনের কথা মনে পড়ল—“এটাই আমার ছেলে।” তার চোখের সামনে আবার ভেসে উঠল সেই শিশুর মুখ। সাদিয়া খুব ধীরে বলল, “তাহলে সত্যটা কী?” রায়হান ফাইল বন্ধ করে বলল, “সেটাই আমরা জানার চেষ্টা করছি। কিন্তু আরও একটা বিষয় আছে…”
সে থামল। “লাবিবা এই টেস্টের কথা জানত।”
এই নামটা শোনার সাথে সাথে সাদিয়ার ভেতরটা আবার কেঁপে উঠল। লাবিবা।
তার বেস্ট ফ্রেন্ড।
যে তার সব কষ্ট জানত।
যে তার পাশে ছিল প্রতিটি ইনজেকশনের দিন।
যে তার কান্না মুছে দিত।
সাদিয়া ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
“সে জানত?”
রায়হান মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। “আর সবচেয়ে বড় কথা… সে-ই এই টেস্টের ব্যবস্থা করেছিল।”
এই কথার পর সাদিয়া আর এক সেকেন্ডও নড়ল না।
তার চারপাশে সবকিছু যেন হঠাৎ থেমে গেল, কিন্তু তার ভেতরে একটা জিনিস খুব ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করল।
যে ভালোবাসা একদিন তাকে ভেঙে দিয়েছিল—আজ সেই ভাঙনের ভিতরেই কিছু নতুন শক্তি জন্ম নিচ্ছিল।
সে ধীরে ধীরে ফাইলটা হাতে নিল।
তারপর শান্ত গলায় বলল,
“আমাকে পুরো ফাইলটা দিন।”
রায়হান একটু দ্বিধা করল, তারপর দিল।
সাদিয়া ফাইল খুলে একে একে পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগল। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি রিপোর্ট সে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। বাইরে থেকে তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই, তার ভিতরে কী চলছে।
কিন্তু তার চোখে এখন আর সেই পুরোনো ভাঙা নারীটা নেই। একজন ডাক্তার, একজন নারী, এবং এখন একজন এমন মানুষ—যে সত্য জানতে শুরু করেছে।
ফাইল বন্ধ করে সে রায়হানের দিকে তাকাল।
“এই তথ্য কেউ আর জানে?” রায়হান বলল, “তুমি ছাড়া, আমি আর হাসপাতাল অথরিটি ছাড়া কেউ না।
কিন্তু…” সে একটু থামল।
“মিস্টার ইয়াসিন যদি এটা জানতে পারে, তাহলে পরিস্থিতি খুব দ্রুত বদলে যাবে।”
সাদিয়া ধীরে মাথা নাড়ল। তার চোখে এবার এক অদ্ভুত শীতলতা। “সে জানবে,” সে বলল।
“কিন্তু এখন না।” রায়হান অবাক হয়ে তাকাল।
“তুমি কী করতে চাও?”
সাদিয়া ফাইলটা ব্যাগে রেখে দিল।
তারপর শান্তভাবে বলল, “আমি এখন কিছু করব না।”
সে একটু থামল। “আমি শুধু দেখতে চাই… সে কত দূর যায় তার মিথ্যার সাথে।” এই কথা বলার সময় তার চোখে কোনো রাগ ছিল না। ছিল না কোনো কান্না।
ছিল শুধু এক অদ্ভুত নীরব প্রতিশোধের ছায়া।
ঠিক তখনই হাসপাতালের উপরের দিক থেকে হঠাৎ লিফট খুলে গেল।
মিস্টার ইয়াসিন আবার নিচে নামছে।
তার কোলে সেই শিশু। আর তার পাশে লাবিবা নেই।
এই দৃশ্য দেখে সাদিয়ার চোখ একটু সরু হয়ে গেল।
রায়হান নিচু গলায় বলল, “ও আবার আসছে।”
সাদিয়া ফাইলের স্ট্র্যাপটা ঠিক করে নিল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,“এবার আমি যাব না।”
সে এক পা এগিয়ে গেল, কিন্তু লুকাল না।
এবার সে অপেক্ষা করল।
কারণ এবার গল্পটা আর অপমানের ছিল না।
এবার গল্পটা ছিল সত্যের।
আর সত্য সবসময় দেরিতে আসে… কিন্তু একবার এলে, কাউকে ছাড়ে না। লিফটের দরজা খুলতেই মিস্টার ইয়াসিন সামনে এসে দাঁড়াল।
তার মুখে এখনও সেই অহংকার। “তুমি এখনো এখানে?” সে তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।
“ভেবেছিলাম তুমি পালিয়ে গেছো।”
সাদিয়া শান্ত চোখে তাকাল।
এবার তার চোখে কোনো ভাঙন নেই।
শুধু এক ভয়ংকর শান্তি।
সে ধীরে ধীরে বলল—
“আমি পালাই না, মিস্টার ইয়াসিন।”
একটু থেমে সে যোগ করল “আমি অপেক্ষা করি।”
মিস্টার ইয়াসিন একটু থমকে গেল।
কারণ এই সাদিয়াকে সে চেনে না।
এই সাদিয়া ভাঙা না।
এই সাদিয়া নীরব না।
এই সাদিয়া… প্রস্তুত।
লাবিবার চোখ এবার সাদিয়ার দিকে উঠল দূর থেকে, যেখানে সে দাঁড়িয়ে ছিল করিডোরের শেষ মাথায়।
তার চোখে ভয়। আর সেই ভয়টা ছিল সত্যের ভয়।
আর ঠিক সেখানেই, গল্পটা আবার নতুন মোড় নিল।

Post a Comment

0 Comments