আগের দিনের সেই অলৌকিক ঝড়ঝাপটা শেষে আজকের সকালটা যেন একটু বেশিই স্নিগ্ধ আর আলোকময়। ভোরের চনমনে রোদ এসে পড়েছে আয়াতের বারান্দায়। রাতের সব স্মৃতি মর্ত্যের মানুষের মন থেকে মুছে গেলেও, আয়াতের মনে রয়ে গেছে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। আজ অনেকদিন পর সে কলেজে যাচ্ছে।
কলেজের গেটে পা রাখতেই দূর থেকে চঞ্চল পায়ে ছুটে এলো আনাইয়া। আনাইয়া দেখতে যেমন ডাগর চোখের এক সুন্দরী রূপবতী, মনটাও তার তেমনি সরল আর মায়ায় ভরা। আয়াতকে দেখেই সে দুই হাত ধরে একগাল হেসে বলল,
"কী রে রুপবতী! এতদিনের ডুব মারলি কোথায়? তোকে ছাড়া কলেজটা একদম মরুভূমি মনে হচ্ছিল!"
আয়াত হেসে ফেলল। দুই সখী হাত ধরাধরি করে ক্যাম্পাসের চেনা মেহগনি গাছের তলায় গিয়ে বসল। কতদিন পর মন খুলে হাসা, কত গল্প! আনাইয়া তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাত নেড়ে নেড়ে সারা দুনিয়ার গল্প করছিল, আর আয়াত মুগ্ধ হয়ে তার বান্ধবীর নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
গল্পের এক পর্যায়ে আনাইয়া হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে আয়াতের চোখের দিকে তাকাল। কেমন যেন একটা বিষাদের ছায়া দেখতে পেল সে আয়াতের চোখে। আনাইয়া আলতো করে আয়াতের হাতটা চেপে ধরে বলল,
"আচ্ছা আয়াত, তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি? তুই ইদানীং কেমন যেন বদলে গেছিস।ধর, কেউ কেউ তোকে জিজ্ঞাসা করল,
'কেমন আছো?'
তখন তুই তাকে কি বলবি বল তো? কিন্তু তোকে দেখে আমার নিজেরই বলতে ইচ্ছে করছে—"
জীবনে দুঃখ আছে, দুঃখে কষ্ট আছে,
কষ্টে এক ধরনের আনন্দ আছে,
আর সেই আনন্দেই আমি আছি। 
আনাইয়ার মুখে এই গভীর কথাটি শুনে আয়াত এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সে মনে মনে ভাবল,
'সত্যিই তো! জীন রাজার অলৌকিক ভালোবাসার মাঝে যে কত বিরহ আর কষ্ট লুকিয়ে আছে, তা কেউ জানে না। কিন্তু সেই কষ্টের মাঝেই এক অদ্ভুত পরম আনন্দ লুকিয়ে আছে, যা নিয়ে আমি বেঁচে আছি।' আয়াত শুধু একটা মিষ্টি রহস্যময় হাসি দিয়ে আনাইয়ার কাঁধে মাথা রাখল।
দেখতে দেখতে কলেজের ক্লাস শেষ হয়ে গেল। ছুটির ঘণ্টা পড়তেই আনাইয়া আর আয়াত গেটের সামনে এসে দাঁড়াল। ঠিক তখনই বাইকের চেনা হর্ন শুনে দুজনে তাকিয়ে দেখল—আয়াতকে নিতে এসেছে আয়মান।
হেলমেটটা খুলতেই আয়মানের সুঠাম, গম্ভীর চেহারাটা ভেসে উঠল। কিন্তু যেই না আয়মানের চোখ দুটো আনাইয়ার ওপর পড়ল, তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতায় মোচড় দিয়ে উঠল। আয়মান কখনো মুখে কিছু প্রকাশ করেনি, কিন্তু তার হৃদয়ের এক অতি গোপন কুঠুরিতে আনাইয়ার জন্য এক তীব্র অনুরাগ আর পবিত্র অনুভূতি লুকিয়ে আছে। আনাইয়াকে দেখলেই তার ভেতরের সমস্ত গাম্ভীর্য যেন এক পলকে গলে জল হয়ে যায়।
আনাইয়া মিষ্টি করে হেসে দুকদম এগিয়ে এসে বলল, "ভাইয়া! কেমন আছেন?"
আনাইয়ার সেই সুরিল কণ্ঠস্বর আর নিষ্পাপ চাউনি দেখে আয়মান এক মুহূর্তের জন্য যেন খেই হারিয়ে ফেলল। সে নিজের ভেতরের উথাল-পাথাল অনুভূতিটা আড়াল করে কোনোমতে একটু হেসে বলল,
"হ্যাঁ আনাইয়া, ভালো আছি। তুমি ভালো আছো? পড়াশোনা কেমন চলছে?"
"এই তো ভাইয়া, আলহামদুলিল্লাহ ভালো," আনাইয়া বিনম্রভাবে জবাব দিল।
আয়মান বাইক স্টার্ট দিতে দিতে আয়াতকে বলল, "উঠে বোস আয়াত, মা বাড়িতে অপেক্ষা করছে।" কিন্তু আয়মানের অবচেতন চোখ তখনো লুকোচুরি করে আয়নার মধ্য দিয়ে আনাইয়ার চলে যাওয়া পথের দিকেই তাকিয়ে ছিল। আয়ত ভাইয়ের এই মৃদু পরিবর্তন লক্ষ্য করে মনে মনে একটু হাসল।
বিকেলের দিকে ফাইজান শিকদার বাড়িতে এলো আরমান শিকদারের একটা মেডিকেল রিপোর্ট নিয়ে। ফাইজান যখন ড্রয়িংরুমে বসে আইরিন শিকদারের সাথে কথা বলছিল, আয়াত তখন দূর থেকে ফাইজানের দিকে তাকাল। ফাইজান একজন চমৎকার মানুষ, তার দায়িত্ববোধ আর সততা অতুলনীয়।
কিন্তু মর্ত্যের এক সাধারণ মানুষের নজর যখনই আয়াতের ওপর পড়ে, কাফ পর্বতের স্ফটিক প্রাসাদে বসে জীন রাজা আশিকের বুকটা তখন ঈর্ষায় জ্বলে ওঠে! জীনদের স্বভাবজাত তীব্র অধিকারবোধ আর অহংকার আশিককে চঞ্চল করে তোলে। সে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না যে, তার ভালোবাসার দিকে অন্য কোনো পুরুষ তীব্র অনুরাগ নিয়ে তাকাক—তা সে ফাইজানই হোক না কেন!
আয়াত আচমকা অনুভব করল, ঘরের ভেতরের বাতাসটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠছে। ফাইজানের বসার জায়গার ঠিক পেছনের দেওয়ালে একটা বিশাল ছায়া আবছাভাবে ফুটে উঠছে, যা ফাইজান দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু আয়াত স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে—সেটি আশিকের সেই অতিপ্রাকৃতিক, গম্ভীর অবয়ব।
আশিকের অদৃশ্য কণ্ঠস্বর কেবল আয়াতের কানে এসে ফিসফিস করে বেজে উঠল, তীব্র হিংস্র অথচ গভীর ভালোবাসার সুরে—
“ফাইজানকে আমি তোমার সুরক্ষার দায়িত্ব দিয়েছি, কিন্তু তার এই মুগ্ধ চোখের চাউনি জীন রাজা আশিক বেশিদিন সহ্য করবে না। মর্ত্যের বুকে দাঁড়িয়ে ও যেন ভুলে না যায়—তোমার এই রূপ, এই আত্মা আর তোমার এই চঞ্চল হাসির ওপর কেবলই আমার একচ্ছত্র অধিকার। তুমি কেবলই এই আশিকের!”
আয়াত দ্রুত নিজের চোখ নামিয়ে নিল। সে বুঝতে পারল, আশিকের এই তীব্র ঈর্ষা আসলে তার ভালোবাসারই আরেক রূপ। ফাইজান যখন বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছিল, আয়াত বারান্দার গ্রিল ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
‘শান্ত হও আশিক। এই মায়াবতী আয়াত কেবল আপনারই মায়ায় বাঁধা।’
কিন্তু ফাইজানের মনে যে অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে, আর আয়মানের বুকে আনাইয়ার জন্য যে সুপ্ত প্রেম ডালপালা মেলছে—তা কোন নতুন মোড় নেবে?

0 Comments